ঢাকা, সোমবার,১৪ অক্টোবর ২০১৯

কূটনীতি

শ্রমবাজার হুমকিতে!

মনির হোসেন

১২ মে ২০১৮,শনিবার, ০৬:৫৬


প্রিন্ট
শ্রমবাজার

শ্রমবাজার

মালয়েশিয়ায় গণতান্ত্রিকপন্থায় সরকার পরিবর্তন হওয়ায় ‘জি টু জি প্লাস’ পদ্ধতিতে জনশক্তি প্রেরণে ফের জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকার বদলালেও তাদের পলিসির কোনো পরিবর্তন হওয়ার সম্ভবনা দেখছেন না তারা। তার পরও আগামীতে যদি কোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়ে-ই যায়, সে ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রায় অর্ধলাখ শ্রমিকের বিদেশযাত্রা অনেকটা হুমকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এ পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি, মেডিক্যাল সেন্টার এবং ভিসা প্রসেসিংয়ের সাথে জড়িতদের অনেকে।


বুধবার মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিস্ময়কর বিজয়ের পর সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ৯২ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদ। মাহাথির এবারের সাধারণ নির্বাচনে নিজের সাবেক দলের বিরুদ্ধেই লড়েছেন। যে দলের হয়ে তিনি ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, বিরোধী জোটের নেতা হিসেবে সে দলেরই প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে ক্ষমতা থেকে টেনে নামালেন তিনি। নাজিব রাজাক ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশ থেকে ‘কম টাকায়’ শ্রমিক নিতে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্বারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয় ২০১৬ সালে। এরপরই সোর্স কান্ট্রির মর্যাদায় দেশটিতে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে মাহাথির মোহাম্মদের সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশটিতে সরকার টু সরকার প্লাস রিক্রুটিং এজেন্সি (জি টু জি প্লাস) পদ্ধতিতে ঢাকার ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমেই শ্রমিক যাবে নাকি অন্য কোনো পদ্ধতিতে কর্মী যাবে তা নিয়ে উভয় দেশের এ পেশার সাথে সংশ্লিষ্টরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কারণ ইতোমধ্যে অনেকেই বিপুল টাকা ভিসা কেনায় বিনিয়োগ করে ফেলেছেন।


গত রাতে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণে প্রসেসিংয়ের সাথে জড়িত একাধিক ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তকে বলেন, মাহাথির মোহাম্মদ জয়লাভ করার আগে বলেছেন, তিনি প্রতিশোধ নেবেন না। কিন্তু আমরা তো দেখছি, দেশটিতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়ে গেছে। সেই ক্ষেত্রে জি টু জি প্লাস ফর্মুলাটি হচ্ছে নাজিব রাজাকের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ের। তাতে বোঝা যাচ্ছে, এই সিস্টেমের বিরুদ্ধেও মাহাথির বা তার দলের সদস্যরা অ্যাকশনে যেতে পারেন। এটি অসম্ভব কিছু নয়। তবে তার মতে, নতুন করে যেসব অ্যাপ্রুভাল বের হয়েছে সেগুলো সম্ভবত আর অনুমোদন নাও হতে পারে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রসেসিং যারা করেছেন তাদের কোনো লোকসান হবে না। তবে ইতোমধ্যে যেসব শ্রমিকের নামে অ্যাপ্রুভাল, লেভীসহ কলিং ভিসা মেডিক্যাল সম্পন্ন হয়েছে, তাদের যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়Ñ সে ব্যাপারে দুই দেশের সংশ্লিষ্টদের এখন থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
শুক্রবার রাতে মালয়েশিয়া থেকে একজন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এ প্রতিবেদককে বলেন, নাজিব রাজাকের আমলে শ্রমবাজার ওপেন হলেও নতুন সরকার কিন্তু এখনো শ্রমবাজার নিয়ে কোনো ধরনের চিন্তা করেনি। তবে আমার জানা মতে, এখনো বাজারে ৩০-৪০ হাজারের মতো কাজ পেন্ডিং হয়ে আছে। সেগুলো যাতে সুষ্ঠুভাবে তোলা সম্ভব হয় সে ব্যাপারে এখন দুই দেশের সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন।


এ প্রসঙ্গে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক (বহির্গমন) ডি এম আতিকুর রহমান গত রাতে নয়া দিগন্তকে বলেন, জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় এখন পর্যন্ত আনুমানিক দেড় লাখ কর্মী বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে চলে গেছেন। আরো অনেকে দেশটিতে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সরকার পরিবর্তন হলেও শ্রমিক নেয়ার ক্ষেত্রে দেশটির পলিসির কোনো ধরনের পরিবর্তন হবে না।


উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পর চলতি বছর ১০ মার্চ জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে ৯৮ জন শ্রমিক নিয়ে প্রথম ফ্লাইটটি হজরত শাহজালাল রহ: আন্তজার্তিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত শ্রমিক যাওয়া অব্যাহত রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে। দেশটিতে শ্রমিক পাঠাতে সরকার যে পরিমাণ টাকা নির্ধারণ করেছেন, সেই টাকার ৯ গুণ বেশি টাকা লাগছে একজন শ্রমিকের মালয়েশিয়ায় যেতে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় ডাকা সংবাদ সম্মেলন, সভা-সেমিনারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীকে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করছেন। তবে মন্ত্রী এ ব্যাপারে তার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি বলে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন?


বলাবাহুল্য এর আগেও মালয়েশিয়ায় জনশক্তি প্রেরণে জটিলতা দেখা দেয়ায় ২০০৭ সালে দেশটির সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর ফের দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের দক্ষ কূটনীতিক হিসেবে পরিচিতি রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম দেশটির সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা করে জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে শ্রমিক পাঠানোর বাজার খুলতে সক্ষম হন। তবে জি টু জি প্লাস পদ্ধতিটি ভালো হলেও সব রিক্রুটিং এজেন্সি এখানে ব্যবসায় করতে না পারায় এ ব্যাপারে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে দুই দেশের মধ্যে।


গত রাত পৌনে ৯টায় অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাসনীম সিদ্দিকী নয়া দিগন্তকে বলেন, জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে শ্রমিক পাঠানো নিয়ে যেহেতু মালয়েশিয়া সরকারের সাথে ডিল (চুক্তি) আছে, সেহেতু শুরুতেই এ নিয়ে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলার কথা নয়। তবে লং টার্মে গিয়ে নিশ্চিতভাবে এই পদ্ধতি বদলাবে। হতে পারে পরে নতুন সরকার যারা এসেছে তারা শুধু ১০ জনের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে মার্কেটটা সবার জন্য ওপেন করে দিতে পারে বলে আমার ধারণা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫