ঢাকা, বুধবার,১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

বিশ^ মা দিবস ও আমাদের পরিবেশ

ড. নূর জাহান সরকার

১৩ মে ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

‘মা’ শব্দের কোনো বিকল্প নেই। ‘মা’-এর তুলনা হয় না। মাকে যে দেশে যে নামেই ডাকে না কেন মা, মা-ই। নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা খুবই বলতে ইচ্ছে করছে। তা হলোÑ আমার ছেলের জন্ম ফ্রান্সে, যখন আমি ছিলাম ওখানে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য। স্বভাবতই ও আমাকে ‘মাম’ বলে ডাকা শুরু করে। মেয়ের জন্ম বাংলাদেশে। ও আমাকে ‘আম্মু’ বলে ডাকে। যখন ছেলেকে বিয়ে করিয়ে ঘরে বউ নিয়ে আসি, দেখা গেল, মেয়েটি আমাকে ‘মা’ বলে ডাকে। তার কারণ ছিল এই, সে তার মাকে ‘আম্মু’ বলে ডাকে। ‘মা’ ডাকটির জন্য একটু কেমন যেন আগ্রহ তৈরি হয় আমার। ‘মা’ ডাকটি শুনলে পরান যেন ভিজে যায়। আমার ছেলেমেয়েরা যে ‘মাম’ বা ‘আম্মু’ ডাকে তাতেও আমার ‘পরান’ ভরে যায়। কিন্তু ওই মেয়েটির ‘মা’ ডাকে পরান ভরাই শুধু নয়, পরান একটু ভেজা ভেজাও লাগে। আমরা আমাদের মাকে ‘মা’ বলেই ডাকতাম; হয়তো সে কারণেই আমার অবচেতন মনের যে প্রকাশ ঘটত তাতে নিজের মুখটা কিছুটা জ্বল জ্বল করে উঠত। একদিন আমার ছেলে ও মেয়ে আমাকে খুবই নম্রভাবে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি কোনো কারণে তাকে আমাদের চেয়ে একটু বেশি ভালোবাস? শুনে আমি তো অবাক! বললাম ‘না’, বরং তাকে তোমাদের মতোই ভালোবাসতে পেরে, খুব ভালো লাগে। তবে হ্যাঁ ও ‘মা’ শব্দটি দিয়েই আমাকে ডাকে। তাই ওই ক্ষণেই আমার মাকে বেশি মনে পড়ে এবং মনে হয়, বাঙালি মায়ের কাছে ‘মা’ শব্দের ওপরে কোনো শব্দ নেই। তারপর থেকে ছেলে আর মেয়েও ধীরে ধীরে রপ্ত করেছে আমাদের ‘মা’ ডাকার অভ্যাস। পরে মেয়েটির বিয়ে হলো। তার বরও আমাকে ‘মা’ বলেই ডাকে। ওই একই কারণে। তবে ওর মাকে ও ডাকে আম্মু বলে।
আমাকে আরও দু’টি ছেলে ‘মা’ বলেই ডাকত। এখন ওরা কোথায় আছে জানি না। তবে ওরা ছিল নেশাগ্রস্ত। আমার শিক্ষকতা জীবনে একটানা বেশ কয়েক বছর ছাত্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছি। কাজটি তখন বাধ্যতামূলক ছিল না বরং ঝামেলাপূর্ণ। তখন পারতপক্ষে এ দায়িত্ব অনেক শিক্ষকই এড়িয়ে চলতেন। আমার একটি স্বভাব হলো- যখন যা করব তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ভালোভাবে করার চেষ্টা করা। বলা যেতে পারে, আমার খুঁতখুঁতে স্বভাব। যা হোক, প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর ব্যক্তিগত তথা পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে জানার আগ্রহ হতো। ভাবতাম ওমুক ছেলেটি দু’দিন ধরে অনুপস্থিত কেন? ওই মেয়েটি ওখানে দাঁড়িয়ে কাঁদছে কেন? বিশ^বিদ্যালয়ের নিয়ম আছে, কাসে উপস্থিতির জন নির্দিষ্ট মার্ক থাকে। আমার সাথে অন্য শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর মো: ফজলুর রহমান। তিনি তো ছেলেমেয়েদের জন্য আমার চেয়ে অধিক দরদি ছিলেন। আমরা দু’জন মিলে ওই ধরনের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বসতাম এবং তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতাম। জানতে পারলাম, ছাত্রছাত্রীরা কখনও কখনও বন্ধুর প্রভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। এর বড় কারণ, কষ্ট ভুলে থাকা। ওই দু’টি ছেলে তাদের অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া থেকে উঠে আসার আলো যখন দেখছিল, তখন হয়তো আমাকে ‘মা’ ডাকতে ওদের ইচ্ছে হচ্ছিল। তাদের মুখে ‘মা’ ডাক আমাকে কম মুগ্ধ করেনি। একটি মেয়ের কঠিন কষ্টের দিনে ওর পাশে ছিলাম। সে এখন একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক, সে এখনো আমাকে ‘মা’ ডাকে। বলা হয়ে থাকে, মেয়েরা মনে রাখে বেশি।
আমাদের পরিবেশে মাদক যেন মরণছোবল। ঠিক তেমনি আমাদের সংস্কৃতির রাতারাতি পরিবর্তন কম ভয়াবহ নয়। একদিন আমার এক বান্ধবীর মেয়েসহ একই রিকশায় যাচ্ছি। মেয়েটি আমাকে ‘আন্টি’ বলে সম্বোধন করছিল। রিকশাওয়ালা শুনে রেগেই গেলেন। বললেন, আপনে ‘আংটি আংটি করবেন না, হয় ‘খালাম্মা কন, নয় ফুফুআম্মা কন’। শিক্ষাবঞ্চিত রিকশার ড্রাইভারের মনে কষ্ট লেগেছিল হয়তো এ জন্য যে, আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।
স্মার্টনেসের পোশাকে ‘আন্টি-আঙ্কেল’ দিয়ে চাপা পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ‘মামা, খালা, ফুফু, চাচা, খালু, ফুফা, চাচি।’ কী সুন্দর প্রথা, প্রত্যেকেরই আলাদা পরিচয় আছে। অথচ আমরা ওভারস্মার্ট হয়ে নিজেদের সুস্থ সংস্কৃতি মুছে ফেলছি। এটাও এক ধরনের ‘পরিবেশ দূষণ’। বিশ^ ‘মা দিবস’ বছরে একদিন নয়, হোক প্রতিদিন। তবে সেটা তখনই সম্ভব হবে, যখন দেশবাসী মা এবং মা জাতির তথা নারী জাতির নিরাপত্তা, সম্ভ্রম ও জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসবে। মাদকে ভেসে যাচ্ছে দেশ। এ দিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষার গলায় ফাঁস পড়ে মৃতপ্রায়। আগে বাসে নারীদের ড্রাইভার ও হেলপার কখনও উত্ত্যক্ত করেছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে কিছু কিছু অসভ্য যাত্রী নারীকে ত্যক্তবিরক্ত করত, সম্ভ্রমহানির চেষ্টা করত। শোনা যায়, এখন মাদকসেবন করে বেশির ভাগ। জনগণ এক হলেই এসব সমস্যাসহ সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।হ
লেখক : বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবিদ, প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫