ঢাকা, সোমবার,১৯ আগস্ট ২০১৯

সিনেমা

কানে থ্রি ফেসেস, বন্দি জাফর পানাহির

আলমগীর কবির, কান, ফ্রান্স থেকে

১৩ মে ২০১৮,রবিবার, ১৯:৫১


প্রিন্ট
কানে থ্রি ফেসেস, বন্দি জাফর পানাহির

কানে থ্রি ফেসেস, বন্দি জাফর পানাহির

বাংলাদেশে পৌষ মাসের শুরুতে যে ঠাণ্ডা আবহাওয়া অনুভূত হয়, ফ্রান্সের কান শহরে এখন সেটাই। রুটিন কাপড়ের সাথে তাই হালকা গরম কাপড় রাখতে হয়। রোববার সকালে এই হালকা শীতল আবহাওয়ার সাথে যোগ হয়েছে মেঘলা আকাশ। অনেকটা বাংলাদেশের কাল বৈশাখী ঝড়ের আগমনি বার্তা মতো। ভাবটা এমন, যেকোনো সময় আকাশ ভেঙ্গে নামবে বৃষ্টি। এই অবহাওয়ার মধ্যেই জোয়া লাপোর হোটেল থেকে কানের উদ্দেশে রওনা দেয়া। দুই মিনিট হাঁটলেই ট্রেন স্ট্রেশন। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ফোটার মাঝেই সেখানে গেলাম। কিন্তু স্ট্রেশনের মূল ফটক বন্ধ। পাশের একটি ছোট্ট দরজা খোলা আছে, সেখানে দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে জানতে পারলাম শ্রমিক ধর্মঘট। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রার ঘোষিত নতুন শ্রমনীতির প্রতিবাদ এটা। ভবিষতে এয়ার ফ্রান্স ও এই ধরণের কর্মসূচী দিতে পারে বলে জানালেন কয়েক জন।

যাহোক, নির্ধারীত সময়ের ঘন্টা খানেক পর কানে পৌছে দেখি ঝুম বৃষ্টি। রাস্তা-ঘাট ছাতাময়। হাল্কা ভিজে অন্যের ছাতার সহযোগিতা নিয়ে পৌছালাম পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনে। এখানেও ছাতা নিয়ে প্রবেশ পথে দীর্ঘ সারি। রাস্তায় এতো ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে এসে শুনি, দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ‌'থ্রি ফেসেস' ছবির স‍ংবাদ সম্মেলনে থাকবে না পরিচালক জাফর পানাহির। ইরান সরকার গৃহবন্দী রাখায় পরিচালকের এই অনুপস্থিতি। তবে কান কর্তৃপক্ষ তাকে সম্মান দেখাতে কোনো কৃপণতা করেনি। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চের ঠিক মাঝখানটায় একটা চেয়ার খালি রেখে পাশাপাশি বসে ছিলেন, ইরানের অভিনেতা বিহনাজ জাফারি, ইরানি চলচ্চিত্র সম্পাদক মস্তানেহ মোহাজের, আলোকচিত্রীর আমিন জাফরি, অভিনেত্রী মারজিয়েছেন রেজায়েই এবং জাফর পানাহির কন্যা সল্মেজ পানাহির।

ইরানের এই বিদ্রোহী পরিচালককে কান চলচ্চিত্র উৎসবে আসতে যেন বাধা দেয়া না হয়, সেই আবেদন জানিয়েছিলেন তার স্বদেশী পরিচালক আসগর ফারহাদি।

দু’বারের অস্কারজয়ী আসগর ফারহাদির ‘এভরিবডি নৌস’ ছবির মধ্য দিয়ে ৮ মে কান উৎসবের ৭১তম আসরের পর্দা ওঠে। এটি আছে মূল প্রতিযোগিতায়। একই বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে জাফর পানাহির ‘থ্রি ফেসেস’। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণে ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তার বিদেশ ভ্রমণও নিষিদ্ধ করে রেখেছে ইরান সরকার।

পাম দ’রের লড়াইয়ে জাফর পানাহি প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও তাকে কানে আসার অনুমতি দিতে ৯ মে সংবাদ সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে আহ্বান জানান আসগর ফারহাদি। তিনি বলেছেন, ‘এখনও সময় আছে। ইরান সরকারের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই : আমার আশা, তাকে কানে আসার অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেবে ইরান।’

তবে কান উৎসবে ১২ মে ‘থ্রি ফেসেস’ ছবির প্রিমিয়ারে জাফর পানাহির অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি। এতে তিনি নিজেই চলচ্চিত্র পরিচালকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। গ্রামীণ একটি মেয়েকে সহায়তার জন্য তাকে এগিয়ে আসতে বলেন একজন অভিনেত্রী। এরপর মেয়েটির রক্ষণশীল পরিবারের বাধা ভাঙতে ভিডিওর মাধ্যমে আহ্বান জানান তারা।

ইরানে নির্মিত ‘অ্যা সেপারেশন’ ও ‘দ্য সেলসম্যান’ ছবি দুটির জন্য দু’বার অস্কার জেতেন আসগর ফারহাদি। তিনি চাইলেই নিজ দেশে কিংবা ইউরোপে গিয়ে ছবি বানাতে পারেন। কিন্তু জাফর পানাহির সেই সুযোগ নেই। ২০০৯ সালে ইরানের কট্টরপন্থী রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ পুনর্নির্বাচিত হওয়ার প্রতিবাদ জানানোর কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়। চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকেও নিষিদ্ধ হন তিনি। কিন্তু দমে যাননি।

তেহরানের এক অ্যাপার্টমেন্টে মোবাইল ফোনে জাফর পানাহি ধারণ করেন ‘দিস ইজ নট অ্যা ফিল্ম’। এরপর ‘ট্যাক্সি’র জন্য বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণভালুক (গোল্ডেন বিয়ার) জেতেন তিনি। এতে ট্যাক্সি ড্রাইভার হিসেবে দেখা গেছে তাকে। যিনি পথে পথে যাত্রীদের গল্প শুনে কোনো ভাড়া ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছে দেন।

১৯৯৫ সালে ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ ছবির জন্য কানে ক্যামেরা দ’র (অভিষেক ছবির পরিচালকের জন্য বরাদ্দ) পুরস্কার জেতেন তিনি।আসগর ফারহাদি বলেন, ‘গৃহবন্দির মতো প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও জাফর পানাহি কাজ করে যাচ্ছেন, এটা বিস্ময়কর ব্যাপার। কানে আমি আসতে পারলেও তিনি পারছেন না, এটা উদ্ভট লাগছে। এই বিষয়টি আমাকে স্বস্তি দিচ্ছে না।’

এদিকে ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণার দিন ইরানি নির্মাতার ছবির প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুরু হয় কান উৎসব। এ প্রসঙ্গে আসগর ফারহাদির ভাষ্য, ‘মিশ্র আবেগাপ্লুত অদ্ভুত একটা দিন কাটলো। ইরানের ছবি কানের প্রতিযোগিতা ও উদ্বোধনীতে দেখে আমরা খুশি। একইসঙ্গে কয়েক বছরের পরিকল্পনার পরও শুধু একজন মানুষের জন্য তা ভেঙে যাওয়া ইরানি জনগণের জন্য ভয়ঙ্কর ব্যাপার। সম্ভবত ইরান সরকারকে চাপে ফেলতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সবার আগে চাপে (অর্থনৈতিক প্রভাব) পড়বে ইরানের জনগণ।’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫