ঢাকা, সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯

নগর মহানগর

তারল্য ও আস্থার সঙ্কটে অস্থির পুঁজিবাজার

১২ দিনে ডিএসইর প্রধান সূচক হারায় ৩৭৩ পয়েন্ট

নাসির উদ্দিন চৌধুরী

১৯ মে ২০১৮,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মাত্র তিন মাসের মাথায় আবার সঙ্কটে পড়েছে পুঁজিবাজার। প্রতিদিন টানা দরপতন ঘটছে দেশের দুই পুঁজিবাজারে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১২টি কার্যদিবস একটানা সূচক হারায় দেশের পুঁজিবাজারগুলো। ৩০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ পতন অব্যাহত ছিল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। এর আগে ফেব্রুয়ারির শুরুতে আরো একবার অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে পার করে দেশের পুঁজিবাজার। প্রতিদিনই সকালে সূচকের উন্নতি দিয়ে দিন শুরু করা বাজারগুলো লেনদেনের কোনো না কোনো পর্যায়ে বিক্রয়চাপের শিকার হচ্ছে যা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত থাকছে। আর এভাবে গত ১২টি কর্মদিবসে ১৭ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা মূলধন হারায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) যা প্রকারান্তরে বিনিয়োগকারীদের পকেটের টাকা।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজারে এ মুহূর্তে কোনো খারাপ খবর না থাকলেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক আচরণই ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে বাজারকে। কারণ আমাদের পুঁজিবাজার এখনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠাননির্ভর। এখানে লেনদেনের ৭০ শতাংশের বেশি থাকে প্রাতিষ্ঠানিক। কিন্তু তারাই এখন তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। কারণ তারল্য সঙ্কট। এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের অভাব। আবার যা বিনিয়োগ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টিতে তাও এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগসীমার চেয়ে বেশি। ফলে শেয়ার বিক্রি করেই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকে।
এ দিকে সূচকের টানা অবনতিতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে পুঁজিবাজারে। অতীতের মতো বিনিয়োগকারীরা এখনো রাস্তায় না নামলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা। প্রতিদিনই ভালো বাজারের প্রত্যাশায় ব্রোকার হাউজগুলোতে উপস্থিত হওয়া বিনিয়োগকারীরা দিনশেষে ব্যাপক হতাশা নিয়েই বাড়ি ফিরছেন। প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের বাইরে হাজার হাজার ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর মূলধনের একটি বড় অংশই এখন হাওয়া। অনেকের মূলধনের অর্ধেকের বেশি লোকসানের মুখে। এ ছাড়া মার্জিন ঋণ নিয়ে যারা বিনিয়োগ করেছেন তাদের অবস্থা আরো বেশি খারাপ। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক মার্জিন কল শুরু করেছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ হিসেবে ফের টাকা জমা করতে না পারলে বাজারদরেই এসব প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দেবে। তখন বিক্রয়চাপ আরো বাড়বে। আর এভাবে আট বছরের মাথায় আবারো বিপর্যয়ের দিকে যাবে পুঁজিবাজার।
পুঁজিবাজারের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ড. আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা খুবই উদ্বেগের। বাজারে সূচকের ওঠানামা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এভাবে একটানা দিনের পর দিন সূচকের পতনকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলা যায় না। কিন্তু এটাই এখন ঘটছে। এর কয়েকটি কারণের একটি হলো ব্যাংক বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্প্রতি প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবদন প্রকাশ করেছে যা আগের একই সময়ের তুলনায় খারাপ। তা ছাড়া ২০১৭ সালের জন্য ঘোষিত লভ্যাংশ কোনোভাবেই সন্তোষজনক বলা যায় না। আর এ তিনটি খাতে দরপতন ঘটলে সূচকের বড় অবনতিই চোখে পড়ে।
তিনি আরো বলেন, গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে বাজার থেকে প্রচুর ফান্ড বেরিয়ে গেছে যা বাজারে তারল্য সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে। আর যেসব প্রতিষ্ঠান বাজারে ফান্ডের জোগান দিতো বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারির কারণে তারা বিনিয়োগ তো করছেই না বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। আর প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার বিক্রি করলেও বাজার ভালো হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এভাবেই আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে বাজারে।
ড. আবু আহমেদ আরো বলেন, আমাদের পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ারের প্রচণ্ড অভাব। ভালো কোম্পানির কোনো জোগান নেই। তাই দেশী-বিদেশী বড় ফান্ড এ বাজারে বিনিয়োগে উৎসাহী নয়। সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ও অবকাঠামো খাতের কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বললেও তার কোনো কার্যকারিতা নেই। আবার আগে আইসিবি পুঁজিবাজার নিয়ে যে ভূমিকা রাখতে সক্ষমতার অভাবে এখন তা-ও নিচ্ছে না।
তবে তিনি মনে করেন, মন্দারও শেষ আছে। চলমান অবস্থা থেকে বাজারের উত্তরণ ঘটার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই বিনিয়োগকারীদের উচিত এ মুহূর্তে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা। চীনের দু’টি বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে ডিএসইর চুক্তি হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে তারাও এখানে ভূমিকা রাখবে। তাই খুব বেশি হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক মো: রকিবুর রহমান বলেন, পুঁজিবাজারে এখন যা ঘটছে তা খুবই দুঃখজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণেই আজকে পুঁজিবাজারের এ অবস্থা। ফারমার্স ব্যাংকের শেয়ার কিনতে বাধ্য করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কারণে আইসিবির মতো প্রতিষ্ঠানও এখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে না। আর প্রতিষ্ঠাননির্ভর একটি বাজারে প্রতিষ্ঠানগুলো হাত গুটিয়ে থাকলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আস্থাহীনতায় ভোগেন। ফলে তারাও শেয়ার কেনার বদলে বিক্রি মুডে চলে যান। আর এভাবে লোকসানের কবলে পড়েন।
তিনি আরো বলেন, দিনের পর দিন পুঁজিবাজারের এ অবস্থা চলতে থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজার থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। তারা শেয়ার কেনার বদলে প্রতিদিনই বিক্রি করে দিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাজার ভালো হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পুঁজিবাজারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব নিতে হবে। কারণ অতীতের মতো আবারো বাংলাদেশ ব্যাংকের কারণে পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের মুখে পড়লে তা জাতির জন্য খুবই হতাশার কারণ হবে।

 

 

 

অন্যান্য সংবাদ

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫