ঢাকা, সোমবার,১৪ অক্টোবর ২০১৯

ক্লাসিক

আদুভাই

আবুল মনসুর আহমদ

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫,মঙ্গলবার, ১৬:২১


প্রিন্ট

এক

আদুভাই ক্লাস সেভেনে পড়তেন। ঠিক পড়তেন না বলে পড়ে থাকতেন বলাই ভাল।
কারণ ঐ বিশেষ শ্রেণি ব্যতীত আর কোন শ্রেণিতে তিনি কখনো পড়েছেন কি না, পড়ে থাকলে ঠিক কবে পড়েছেন, সে কথা ছাত্ররা কেউ জানত না। শিক্ষকরাও অনেকে জানতেন না বলেই বোধ হত।
শিক্ষকরাও অনেকে তাঁকে ‘আদুভাই’ বলে ডাকতেন। কারণ নাকি এই যে, তাঁরাও এককালে আদুভাইর সমপাঠী ছিলেন, এবং সবাই নাকি ও এক ক্লাস-সেভেনেই আদুভাইর সঙ্গে পড়েছেন।
আমি যখন ক্লাস সেভেনে আদুভাইর সমপাঠী হলাম ততদিনে আদুভাই ঐ শ্রেণির পুরাতন টেবিল ব্ল্যাকবোর্ডের মতই নিতান্ত অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক অঙ্গে পরিণত হয়ে গিয়েছেন।
আদুভাইর এই অসাফল্যে আর যে-ই যত হতাশ হোক, আদুভাইকে কেহ কখনো সেজন্য বিষণ্ন দেখে নি। কিম্বা নম্বর বাড়িয়ে দেবার জন্য তিনি কখনো কোনো শিক্ষক বা পরীক্ষককে অনুরোধ করেন নি। যদি কখনো কোনো বন্ধু বলেছে : যান না আদুভাই, যে কয় সাবজেকটে শর্ট আছে, শিক্ষকদেরে বলে-কয়ে নম্বরটা নিন না বাড়িয়ে।’ তখন গম্ভীরভাবে আদুভাই জবাব দিয়েছেন : সব সাবজেকটে পাকা হয়ে উঠাই ভাল।
কোন কোন সাবজেকটে শর্ট, সুতরাং পাকা হওয়ার প্রয়োজন আছে, তা কেউ জানত না। আদুভাইও জানতেন না; জানবার কোনো চেষ্টাও করেন নি; জানবার আগ্রহও যে তাঁর আছে, তাও বোঝবার উপায় ছিল না। বরঞ্চ তিনি যেন মনে করতেন, ও-রকম আগ্রহ প্রকাশ করাই অন্যায় ও অসঙ্গত। তিনি বলতেন : যেদিন তিনি সব সাবজেকটে পাকা হবেন, প্রমোশন সেদিন তাঁর কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। সে শুভদিন যে একদিন আসবেই, সে বিষয়ে আদুভাইর এতটুকু সন্দেহ কেউ কখনো দেখে নি।
কত খারাপ ছাত্র প্রশ্ন-পত্র চুরি করে অপরের খাতা নকল করে আদুভাইর ঘাড়ের উপর দিয়ে প্রমোশন নিয়ে চলে গিয়েছে, এ ধরনের ইঙ্গিত আদুভাইর কাছে কেউ করলে, তিনি গর্জে উঠে বলতেন : জ্ঞানলাভের জন্যই আমরা স্কুলে পড়ি, প্রমোশন লাভের জন্য পড়ি না।
সেজন্য অনেক সন্দেহবাদী বন্ধু আদুভাইকে জিজ্ঞেস করেছে : আদুভাই, আপনার কি সত্যই প্রমোশনের আশা আছে?
নিশ্চিত বিজয়-গৌরবে আদুভাইর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তিনি তাচ্ছিল্যভরে বলেছেন : আজ হোক, কাল হোক, প্রমোশন আমাকে দিতেই হবে। তবে হ্যাঁ, উন্নতি আস্তে-আস্তে হওয়াই ভালো। যে গাছ লকলক করে বেড়েছে, সামান্য বাতাসেই তার ডগা ভেঙেছে।
সেজন্য আদুভাইকে কেউ কখনো পিছনের বেঞ্চিতে বসতে দেখে নি। সামনের বেঞ্চিতে বসে তিনি শিক্ষকদের প্রত্যেকটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, হা করে গিলতেন, মাথা নাড়তেন ও প্রয়োজনমত নোট করতেন। খাতার সংখ্যা ও সাইজে আদুভাই ছিলেন ক্লাসের একজন অন্যতম ভাল ছাত্র।
শুধু ক্লাসের নয়, স্কুলের মধ্যে তিনি সবার আগে পৌঁছুতেন। এ ব্যাপারে শিক্ষক কি ছাত্র কেউ তাঁকে কোনোদিন হারাতে পেরেছে বলে শোনা যায় নি।
স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার-বিতরণী সভায় আদুভাইকে আমরা বরাবর দুটো পুরস্কার পেতে দেখেছি। আমরা শুনেছি, আদুভাই কোন অনাদিকাল থেকে ঐ দুটো পুরস্কার পেয়ে আসছেন। তার একটি, স্কুল কামাই না করার জন্য; অপরটি সচ্চরিত্রতার জন্য। শহরতলির পাড়া-গাঁ থেকে রোজ-রোজ পাঁচ মাইল রাস্তা তিনি হেঁটে আসতেন বটে; কিন্তু ঝড়-তুফান, অসুখ-বিসুখ কিছুই তাঁর এ কাজের অসুবিধে সৃষ্টি করে উঠতে পারে নি। চৈত্রের কাল-বোশেখী বা শ্রাবণের ঝড়-ঝঞ্ঝায় যেদিন পশুপক্ষীও ঘর থেকে বেরোয় নি, সেদিনও ছাতার নিচে নুড়িমুড়ি হয়ে, বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে, আদুভাইকে স্কুলের পথে এগোতে দেখা গিয়েছে। মাইনের মমতায় শিক্ষকরা অবশ্য স্কুলে আসতেন। তেমন দুর্যোগে ছাত্ররা কেউ আসে নি নিশ্চিত জেনেও নিয়ম রক্ষার জন্য তাঁরা ক্লাসে একটি উঁকি মারতেন। কিন্তু তেমন দিনেও অন্ধকার কোণ থেকে ‘আদাব, স্যার’ বলে যে একটি ছাত্র শিক্ষকদেরে চমকিয়ে দিতেন তিনি ছিলেন আদুভাই। আর চরিত্র? আদুভাইকে কেউ কখনো রাগ কিম্বা অভদ্রতা করতে কিম্বা মিছে কথা বলতে দেখে নি।
স্কুলে ভর্তি হবার পর প্রথম পরীক্ষাতেই আমি ফার্স্ট হলাম। সুতরাং আইনত আমি ক্লাসের মধ্যে সব চাইতে ভাল ছাত্র এবং আদুভাই সবার চাইতে খারাপ ছাত্র ছিলেন। কিন্তু কি জানি কেন, আমাদের দু’জনার মধ্যে একটা বন্ধন সৃষ্ট হল। আদুভাই প্রথম থেকে আমাকে যেন নিতান্ত আপনার লোক বলে ধরে নিলেন। আমার উপর যেন তাঁর কতকালের দাবি।
আদুভাই মনে করতেন, তিনি কবি ও বক্তা। স্কুলের সাপ্তাহিক সভায় তিনি বক্তৃতা ও স্বরচিত কবিতা পাঠ করতেন। তাঁর কবিতা শুনে সবাই হাসত। সে হাসিতে আদুভাই লজ্জাবোধ করতেন না, নিরুৎসাহও হতেন না। বরঞ্চ তাকে তিনি প্রশংসা-সূচক হাসিই মনে করতেন। তাঁর উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে যেত।
অন্য সব ব্যাপারে আদুভাইকে বুদ্ধিমান বলেই মনে হতো। কিন্তু এই একটি ব্যাপারে তাঁর নির্বুদ্ধিতা দেখে আমি দুঃখিত হতাম। তাঁর নির্বুদ্ধিতা নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক সবাই তামাশা করতেন, অথচ তিনি তা বুঝতে পারছেন না, দেখে আমার মন আদুভাইর পক্ষপাতী হয়ে উঠত।
গেল এইভাবে চার বছর। আমি ম্যাট্রিকের জন্য টেস্ট পরীক্ষা দিলাম। আদুভাই কিন্তু সেবারও যথারীতি ক্লাস সেভেনেই অবস্থান করছিলেন।

দুই
ডিসেম্বর মাস।
সব ক্লাসের পরীক্ষা ও প্রমোশন হয়ে গিয়েছে। প্রথম বিবেচনা, দ্বিতীয় বিবেচনা, তৃতীয় বিবেচনা ও বিশেষ বিবেচনা ইত্যাদি সকল প্রকারের ‘বিবেচনা’ হয়ে গিয়েছে। ‘বিবেচিত’ প্রমোশন-প্রাপ্তের সংখ্যা অন্যান্য বারের ন্যায় সে-বারও পাশ-করা প্রমোশন-প্রাপ্তের সংখ্যার দ্বিগুণেরও ঊর্ধ্বে উঠেছে।
কিন্তু আদুভাই এসব বিবেচনার বাইরে। কাজেই তাঁর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। টেস্ট-পরীক্ষা দিয়ে আমরা টিউটরিয়েল ক্লাস করছিলাম। ছাত্ররা শুধুশুধি স্কুল-প্রাঙ্গণে জটলা করছিল- প্রমোশন-পাওয়া ছেলেরা নিজেদের কীর্তি-উজ্জ্বল চেহারা দেখাবার জন্য, না-পাওয়া ছেলেরা প্রমোশনের কোনো প্রকার অতিরিক্ত বিশেষ বিবেচনার দাবি জানাবার জন্য।
এমনি দিনে একটু নিরালা জায়গায় পেয়ে হঠাৎ আদুভাই আমার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। আমি চমকে উঠলাম। আদুভাইকে আমরা সবাই মুরুব্বি মানতাম। তাই তাঁকে ক্ষিপ্রহস্তে টেনে তুলে প্রতিদানে তাঁর পা ছুঁয়ে বললাম : কি হয়েছে আদুভাই, অমন পাগলামি করলেন কেন?
আদুভাই আমার মুখের দিকে তাকালেন। তাঁকে অমন বিচলিত জীবন আর কখনো দেখি নি। তাঁর মুখের সর্বত্র অসহায়ের ভাব!
তাঁর কাঁধে সজোরে ঝাঁকি দিয়ে বললাম : বলুন, কি হয়েছে?
আদুভাই কম্পিত কণ্ঠে বললেন : প্রমোশন।
আমি বিস্মিত হলাম; বললাম : প্রমোশন? প্রমোশন কি? আপনি প্রমোশন পেয়েছেন?
: না, আমি প্রমোশন পেতে চাই।
: ও, পেতে চান? সে ত সবাই চায়।
আদুভাই অপরাধীল ন্যায় উদ্বেগ-কম্পিত ও সংকোচ-জড়িত প্যাঁচ-মোচড় দিয়ে যা বললেন, তার মর্ম এই যে, প্রমোশনের জন্য এতদিন তিনি কারো কাছে কিছু বলেন নি; কারণ, প্রমোশন জিনিসটাকে যথাসময়ের পূর্বে এগিয়ে আনাটা তিনি পছন্দ করেন না। কিন্তু একটা বিশেষ কারণে এবার তাঁকে প্রমোশন পেতেই হবে। সে নির্জনতায়ও তিনি আমার কানের কাছে মুখ এনে সেই কারণটি বললেন। তা এই যে, আদুভাইর ছেলে সে-বার ক্লাস সেভেনে প্রমোশন পেয়েছে। নিজের ছেলের প্রতি আদুভাইর কোনো ঈর্ষা নেই। কাজেই ছেলের সঙ্গে এক শ্রেণিতে পড়ার তাঁর আপত্তি ছিল না। কিন্তু আদুভাইর স্ত্রীর তাতে ঘোরতর আপত্তি আছে। ফলে, হয় আদুভাইকে এ-বার প্রমোশন পেতে হবে, নয় ত পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হবে। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে আদুভাই বাঁচবেন কি নিয়ে?
আমি আদুভাইর বিপদের গুরুত্ব বুঝতে পারলাম। তাঁর অনুরোধে আমি শিক্ষকদের কাছে সুপারিশ করতে যেতে রাজি হলাম।
প্রথমে ফারসি-শিক্ষকের কাছে যাওয়া স্থির করলাম। কারণ, তিনি একধা আমাকে মোট একশত নম্বরের মধ্যে একশ পাঁচ নম্বর দিয়েছিলাম। বিস্মিত হেড মাস্টার তার কারণ জিজ্ঞেস করায় মৌলবি সা’ব বলেছিলেন : ‘ছেলে সমস্ত প্রশ্নের শুদ্ধ উত্তর দেওয়ায় সে পূর্ণ নম্বর পেয়েছে। পূর্ণ নম্বর পাওয়ার পুরস্কার স্বরূপ আমি খুশি হয়ে তাকে পাঁচ নম্বর বখশিশ দিয়েছি।’ অনেক তর্ক করেও হেড মাস্টার মৌলবি সা’বকে এই কার্যের অসঙ্গতি বুঝাতে পারেননি।
মৌলবি সা’ব আদুভাইর নাম শুনে জ্বলে উঠলেন। অমন বেতমিজ ও খোদার না-ফরমান বান্দা তিনি কখনো দেখেননি, বলে আস্ফালন করলেন এবং অবশেষে টিনের বাক্স থেকে অনেক খুঁজে আদুভাইর খাতা বের করে আমার সামনে ফেলে দিয়ে বললেন : দেখ।
আমি দেখলাম, আদুভাই মোট তিন নম্বর পেয়েছে। তবু হতাশ হলাম না। পাসের নম্বর দেওয়ার জন্য তাঁকে চেপে ধরলাম।
বড় দেরি হয়ে গিয়েছে, নম্বর সাবমিট করে ফেলেছেন, বিবেচনার স্তর পার হয়ে গিয়েছে, ইত্যাদি সমস্ত যুক্তির আমি সন্তোষজনক জবাব দিলাম। তিনি বললেন, : তুমি কার জন্য কি অন্যায় অনুরোধ করছ, খাতাটা খুলেই একবার দেখ না।
আমি মৌলবি সাবকে খুশি করবার জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও এবং অনাবশ্যক বোধেও খাতাটা খুললাম। দেখলাম : ফারসি পরীক্ষা বটে, কিন্তু খাতার কোথাও একটি ফারসি হরফ নেই। তার বদলে ঠাস-বুনানো বাংলা হরফে অনেক কিছু লেখা আছে। কৌতুহল-বশে পড়ে দেখলাম : এই বঙ্গদেশে ফারসি ভাষা আমদানি অনাবশ্যকতা ও ছেলেদের উহা শিখভার চেষ্টার মূর্খতা সম্বন্ধে আদুভাই যুক্তিপূর্ণ একটি ‘থিসিস’ লিখে ফেলেছেন।
পড়া শেষ করে মৌলবি সা’বের মুখের দিকে চাইতেই বিজয়ের ভঙ্গিতে বললেন : দেখেছ বাবা, বেতমিজের কাজ? আমি নিত্যন্ত ভাল মানুষ বলেই তিনটে নম্বর দিয়েছি অন্য কেউ হলে রাসটিকেটের সুপারিশ করত।
যা হোক, শেষ পর্যন্ত মৌলবি সা’ব আমার অনুরোধ এড়াতে পারলেন না। খাতার উপর ৩ এর পৃষ্ঠে ৩ বসিয়ে ৩৩ করে দিলেন।
আমি বিপুল আনন্দে অংকের পরীক্ষকের বাড়ি ছুটলাম।
সেখানে দেখলাম : আদুভাইর খাতার উপর লাল পেন্সিলের একটি প্রকাণ্ড ভূমণ্ডল আঁকা রয়েছে। ব্যঅপারের গুরুত্ব বুঝেও আমার উদ্দেশ্য বললাম। অংকের মাস্টর ত হেসেই খুন। হাসতে হাসতে তিনি আদুভাইর খাতা বের করে আমাকে অংশ বিশেষ পড়ে শোনালেন। তাতে আদুভাই লিখেছেন যে, প্রশ্নকর্তা ভাল-ভাল অংকের প্রশ্ন ফেলে কতকগুলো বাজে ও অনাবশ্যক প্রশ্ন করেছেন। সেজন্য এবং প্রশ্নকর্তার ত্রুটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে আদুভাই নিজেই কতিপয় উৎকৃষ্ট প্রশ্ন লিখে তার বিশুদ্ধ উত্তর দিচ্ছে,Ñ এইরূপ ভূমিকা করে আদুভাই যে সমস্ত অংক করেছেন, শিক্ষক মহাশয় প্রশ্ন-পত্র ও খাতা মিলিয়ে আমাকে দেখালেন যে, প্রশ্নের সঙ্গে আদুভাইর উত্তরের সত্যিই কোনো সংশ্রব নেই।
প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিল থাক আর নাই থাক, খাতায় লেখা অংখ শুদ্ধ হলেই নম্বর পাওয়া উচিত বলে আমি শিক্ষকের সঙ্গে অনেক ধস্তাধস্তি করলাম। শিক্ষক মশায়, যা হোক, প্রমাণ করে দিলেন যে, তাও শুদ্ধ হয়নি। সুতরাং পাসের নম্বর দিতে তিনি রাজি হলেন না। তবে তিনি আমাকে এই আশ্বাস দিলেন যে, অন্য সব সাবজেক্টের শিক্ষকদের রাজি করতে পারলে তিনি আদুভাইর প্রমোশন সুপারিশ করতে প্রস্তুত আছেন।
নিতান্ত বিষণœ মনে অন্যান্য পরীক্ষকদের নিকটে গেলাম। সর্বত্র অবস্থা প্রায় একরূপ। ভূগোলের খাতায় তিনি লিখেছেন সে পৃথিবীর গোলাকার এবং সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে, এমন গাঁজাখুরি গল্প তিনি বিশ্বাস করেন না। ইতিহাসের খাতায় তিনি লিখেছেন যে, কোন রাজা কোন সম্রাটের পুত্র এসব কথার কোনো প্রমাণ নেই। ইংরেজির খাতায় তিনি নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও লর্ড ক্লাইভের ছবি পাশাপাশি আঁকবার চেষ্টা করেছেন- অবশ্য কে যে সিরাজ কে যে ক্লাইভ, নিচে লেখা না থাকলে তা বুঝা যেত না।
হতাশ হয়ে হোস্টেলে ফিরে এলাম। আদুভাই আগ্রহ-ব্যাকুল চোখে আমার পথপানে চেয়ে অপেক্ষা করছিলেন।
আমি ফিরে এসে নিস্ফলতার খবর দিতেই তাঁর মুখটি ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
: তবে আমার কি হবে ভাই?
-বলে তিনি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
কিছু একটা করবার জন্য আমার প্রাণও ব্যাকুল হয়ে উঠল। বললাম : তবে কি আদুভাই আমি হেডমাস্টারের কাছে যাব?
আদুভাই ক্ষণিক আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বললেন : তুমি আমার জন্য যা করেছ, সেজন্য ধন্যবাদ। হেডমাস্টারের কাছে তোমার গিয়ে কাজ নেই। সেখানে যেতে হয় আমিই যাব। হেডমাস্টারের কাছে জীবনে আমি কিছু চাই নি। এই প্রার্থনা তিনি আমার ফেলতে পারবেন না।
-বলেই তিনি হন হন করে বেরিয়ে গেলেন।
আমি এক দৃষ্টে দ্রুত গমনশীল আদুভাইর দিকে চেয়ে রইলাম। তিনি দৃষ্টির আড়াল হলে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিজের কাজে মন দিলাম।

তিন
সেদিন বড়দিনের ছুটি আরম্ভ। শুধু হাজিরা লিখেই স্কুল ছুটি দেওয়া হল।
আমি বাইরে এসে দেখলাম : স্কুলের গেটের সামনে একটি পোস্তার উপর একটি উঁচু টুল চেপে তার উপর দাঁড়িয়ে আদুভাই হাত-পা নেড়ে বস্তৃতা করছেন। ছাত্ররা ভিড় করে তাঁর বক্তৃতা শুনছে এবং মাঝে মাঝে করতালি দিচ্ছে।
আমি শ্রোতৃমণ্ডলীর ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
আদুভাই বলছিলেন : হাঁ, প্রমোশন আমি মুখ ফুটে কখনো চাইনি। কিন্তু সেজন্যই কি আমাকে প্রমোশন না দেওয়া এঁদের উচিত হয়েছে? মুখ ফুটে না চেয়ে এতদিন আমি এঁদের আক্কেল পরীক্ষা করলাম : এঁদের মধ্যে দানাই বলে কোনো জিনিস আছে কি না, আমি তা যাচাই করলাম। দেখলাম, বিবেচনা বলে কোনো জিনিস এঁদের মধ্যে নেই। এঁরা নির্মম, হৃদয়হীন। একটা মানুষ যে চোখ বুজে এঁদের বিবেচনার উপর নিজের জীবন ছেড়ে দিয়ে বসে আছে, এঁদের প্রাণ বলে কোনো জিনিস থাকলে সে কথা কি এঁরা এতদিন ভুলে থাকতে পারতেন?
আদুভাইর চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি বাম হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে আবার বলতে লাগলেন : আমি এঁদের কাছে কি আর বিশেষ চেয়েছিলাম? শুধুমাত্র একটি প্রমোশন। তা দিলে এঁদের কি এমন লোকসান হত? মনে করবেন না, প্রমোশন না দেওয়ায় আমি রেগে গেছি। রাগ আমি করি নি। আমি শুধু ভাবছি, যাঁদের বুদ্ধি-বিবেচনার উপর হাজার হাজার ছেলের বাপ-মা ছেলেদের জীবনের ভার ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন, তাঁদের আক্কেল কত কম। তাঁদের প্রাণের পরিসর কত অল্প!
একটু দম নিয়ে আদুভাই আরম্ভ করলেন : আমি বহুকাল এই স্কুলে পড়ছি। একদিন এক পয়সা মাইনে কম দেইনি। বছর-বছর নতুন-নতুন পুস্তক ও খাতা কিনতে আপত্তি করি নি। ভাবুন, আমার কতগুলা টাকা গিয়েছে। আমি যদি প্রমোশনের এতই অযোগ্য ছিলাম, তবে এই দীর্ঘ দিনের মধ্যে একজন শিক্ষকও আমায় কেন বললেন না : ‘আদুমিঞা, তোমার প্রমোশনের কোনো চান্স নেই, তোমার মাইনেটা আমরা নেব না।’ মাইনে দেবার সময় কেউ বারণ করলেন না, পুস্তক কেনবার সময় কেউ নিষেধ করলেন না। শুধু প্রমোশনের বেলাতেই তাঁদের যত নিয়ম-কানুনে এসে বাধল? আমি ক্লাস সেভেন পাস করতে পারলাম না বলে ক্লাস এইটেও পাশ করতে পারতাম না, এ কথা এঁদের কে বলেছে? অনেকে ম্যাট্রিক আইএতে কোনোমতে পাস করে বি.এ. এম.এ তে ফাস্ট ক্লাস পেয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত আমি অনেক দেখাতে পারি। কোন কুগ্রহের ফেরেই আমি ক্লাস সেভেনে আটকে পড়েছি। একবার কোনো মতে এই ক্লাসটা ডিঙ্গোতে পারলেই আমি ভাল করতে পারতাম, এটা বুঝা মাস্টারবাবুদের উচিত ছিল। আমাকে একবার ক্লাস এইটে প্রমোশন দিয়ে আমার লাইফের একটা চান্স এরা দিলেন না।
আদুভাইর কণ্ঠরোধ হয়ে এল। তিনি খানিক থেমে ধুতির খুঁটে নাক চোখ মুছে নিলেন। দেখলাম, শ্রোতৃগণের অনেকের গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
গলা পরিষ্কার করে আদু ভাই আবার শুরু করলেন : আমি কখনো এতসব কথা বলিনি, আজো বলতাম না। বললাম শুধু এই জন্য যে, আমার বড় ছেলে এবার ক্লাস সেভেনে প্রমোশন পেয়েছে। সে-ও এই স্কুলেই পড়ত। এই স্কুলের শিক্ষকদের বিবেচনায় আমার আস্থা নেই বলেই আমি গতবারই আমার ছেলেকে অন্য স্কুলে ট্রান্সফার করে দিয়েছিলাম। যথাসময়ে এই সতর্কতা অবলম্বন না করলে, আজ আমাকে কি অপমানের মুখে পড়তে হতো, তা আপনারাই বিচার করুন।
আদুভাইর শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। তিনি গলায় দৃঢ়তা এনে আবার বলতে শুরু করলেন : কিন্তু আমি সত্যকে জয়যুক্ত করবই। আমি একদিন ক্লাস এইটে...
এই সময় স্কুলের দারোয়ান এসে সভা ভেঙ্গে দিল। আমি আদুভাইর দৃষ্টি এড়িয়ে চুপে-চুপে সরে পড়লাম।
তারপর যেমন হয়ে থাকে- সংসার-সাগরের প্রবল স্রোতে কে কোথায় ভেসে গেলাম, কেউ জানলাম না।

চার
আমি সেবার বিএ পরীক্ষা দেব। খুব মন দিয়ে পড়ছিলাম। হঠাৎ লাল লেফাফার এক পত্র পেলাম। কারো বিয়ের নিমন্ত্রণ-পত্র হবে মনে করে খুললাম। ঝরঝরে তকতকে সোনালি হরফে ছাপা পত্র। পত্র-লেখক আদুভাই। তিনি লিখেছেন : তিনি সেবার ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস এইটে প্রমোশন পেয়েছেন বলে বন্ধু-বান্ধবদের জন্য কিছু ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করেছেন।
দেখলাম, তারিখ অনেক আগেই চলে গিয়েছে। বাড়ি ঘুরে এসেছে বলে পত্র দেরিতে পেয়েছি।
ছাপা চিঠির সঙ্গে হাতের লেখা একটি পত্র। আদুভাইর পুত্র লিখেছে : বাবার খুব অসুখ, আপনাকে দেখবেন তাঁর শেষ সাধ।
পড়াশোনা ফেলে ছুটে গেলাম আদুভাইকে দেখতে। এই চার বছর তাঁর কোনো খবর নেইনি বলে লজ্জা-অনুতাপে ছোট হয়ে যাচ্ছিলাম।
ছেলে কেঁদে বলল : ‘বাবা মারা গিয়েছেন। প্রমোশনের জন্য তিনি এবার দিনরাত এমন পড়াশোনা শুরু করেছিলেন যে শয্যা নিলেন তবু পড়া ছাড়লেন না। আমরা সবাই তাঁর জীবন সম্বন্ধে ভয় পেলাম। পাড়াশুদ্ধ লোক গিয়ে হেডমাস্টারকে ধরায় তিনি স্বয়ং এসে বাবাকে প্রমোশনের আশ্বাস দিলেন। বাবা অসুখ নিয়েই পাল্কি চড়ে স্কুলে গিয়ে শুয়ে-শুয়ে পরীক্ষা দিলেন। আগের কথামতো তাঁকে প্রমোশন দেওয়া হলো। তিনি তাঁর ‘প্রমোশন-উৎসব’ উদযাপন করবার জন্য আমাকে হুকুম দিলেন। কাকে কাকে নিমন্ত্রণ করতে হবে, তার লিস্টও তিনি নিজ হাতে করে দিলেন। কিন্তু সেই উৎসবে যাঁরা যোগ দিতে এলেন, তাঁরা সবাই তাঁর জানাজা পড়ে বাড়ি ফিরলেন।’
আমি চোখের পানি মুছে কবরের কাছে যেতে চাইলাম।
ছেলে আমাকে গোরস্তানে নিয়ে গেল। দেখলাম, আদুভাইর কবরে খোদাই করা মার্বেল পাথরের টেবলেটে লেখা রয়েছে :
Here sleeps Adu Mia who was promoted
from Class VII to Class VIII.

ছেলে বলল : বাবার শেষ ইচ্ছামতই ও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫