ঢাকা, শুক্রবার,২৩ আগস্ট ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

স্থানীয় সরকারের দলীয়করণ

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

১৬ অক্টোবর ২০১৫,শুক্রবার, ১৮:৫২


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের চাপ লাঘবের জন্য দেশের সমগ্র ভূ-ভাগকে বিভিন্ন এলাকার ভিত্তিতে বিভাজন করা হয়। এসব এলাকাভিত্তিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই হলো স্থানীয় সরকার। এ সরকার প্রথমত স্থানীয় এবং দ্বিতীয়ত কেন্দ্রীয় সরকার অর্পিত সংগঠন। জন ক্লার্ক মনে করেন, ‘স্থানীয় স্ব-শাসিত সরকার জাতীয় বা প্রাদেশিক সরকারের সে অংশ, যা শুধু স্থানীয়পর্যায়ে সম্পৃক্ত, স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দায়বদ্ধ। পৃথিবীর সর্বত্র স্থানীয় সরকার প্রশাসন এবং গণতন্ত্রের লালন ক্ষেত্র (Nursing home of administration and democracy) বলে পরিচিত। অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কি গণতন্ত্রের উপযোগিতা ও উপলব্ধির জন্য স্থানীয় সরকারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। লর্ড ব্রাইস পৌরসভার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতন্ত্রের বিদ্যালয় (School of democracy) বলে অভিহিত করেছেন। সুতরাং তৃণমূলপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এবং প্রত্যক্ষ জনসম্পৃক্ততার কারণে আমাদের শাসন কাঠামোতেও স্থানীয় সরকারব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯১৯ সাল থেকে বিভিন্নপর্যায় অতিক্রম করে এটি অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেছে। বিগত দীর্ঘ সময়ে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার নির্বাচন দলীয় মোড়কে কখনোই অনুষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশে প্রায় পঞ্চাশ বছরে সরকার পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার। স্থানীয় সরকারের ধরন-ধারণ, নাম-ধাম, ক্ষমতার বিন্যাসও ঘটেছে বেশ কয়েকবার; কিন্তু স্থানীয়পর্যায়ের নির্বাচন থেকেছে দলীয় প্রভাব বলয়ের বাইরে। এই নির্বাচনগুলো সবসময়ই নির্দলীয়ভাবে নির্বাচিত হয়ে আসছে। সন্দেহ নেই, সব সময় সরকারি দলের কমবেশি প্রভাব অনুভূত হয়েছে সর্বত্র; কিন্তু নির্বাচনব্যবস্থা হারায়নি এর স্বকীয়তা। এ বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে গ্রামীণ সংস্কৃতি। ‘আম গাছ জাম গাছ বাঁশঝাড় যেন, মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন’। গ্রাম অঞ্চলের মানুষেরা তাদের আত্মীয়তা, সমঝোতা তার সহমর্মিতা দিয়ে এসব নির্বাচন অতিক্রম করেছে। রাজনীতির কচকচানি, বিরোধ সঙ্ঘাত এবং ঝগড়া বিবাদ সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে তারা অনেকটা নিরাপদেই ছিলেন। অস্বীকার করা যাবে না যে, সর্বনাশা রাজনীতির বিভেদ আমাদের পরিবারেও অনুপ্রবেশ করতে চাইছে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের সর্বত্র, সর্বাত্মক রাজনীতিকীকরণের প্রয়াস অনেকটা দায়ী। এখন যদি দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার নির্বাচন পরিচালিত হয়, তাহলে তা হবে গ্রামীণপর্যায়ে দলীয়করণের আইনানুগতা এবং প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়া।
গত ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরেই দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে মেয়র, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীক থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকবে। স্থানীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ রাখা হলেও তাদের জন্য বিধি ঠিক করবে কমিশন। সংশোধনী অনুযায়ী পাঁচ বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদ পূরণের পর কোনো কারণে নির্বাচন না হলে প্রশাসকের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে। এ বছরের ডিসেম্বরে পৌরসভা নির্বাচন দিয়েই শুরু হবে দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে প্রথম স্থানীয় নির্বাচন। সময় কম থাকায় আইনের বদলে অধ্যাদেশ করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। তবে জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে এই অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করা হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কয়েক দফা ক্ষমতাসীন থাকলেও আওয়ামী লীগ কখনোই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে করেনি বা করার চেষ্টা করেনি। এখন আকস্মিকভাবে তারা কী কারণে এ সিদ্ধান্ত নিলোÑ তা রাজনৈতিক মহলে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। প্রধান বিরোধী দল বলছে, ‘দুরভিসন্ধিমূলক’। সিপিবি বলেছে, ‘এ পদক্ষেপ স্থানীয় সংস্থাগুলোকে দেশের লুটেরা ধনীদের স্বার্থের কাছে বেশি করে বন্দী করবে।’ জামায়াত আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, ‘স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে সরকার আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করবে।’ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ‘এ সিদ্ধান্ত তৃণমূলে দলীয়করণ ও দলবাজিকে আরো পাকাপোক্ত করবে’। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সরকার এককভাবে স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করল এবং দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থার সূচনা করতে যাচ্ছে, তাতে আমার ভিন্ন মত রয়েছে। তাদের এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এবং সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলাপ-আলোচনা করা উচিত ছিল।’ সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন হলে বিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেয়ারই সুযোগ থাকবে না।’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন নিঃসন্দেহে টাকা এবং পেশিশক্তির খেলায় পরিণত হবে। আরো হবে মনোনয়ন বাণিজ্য।’ গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও উচ্চারিত গরিষ্ঠ মতামত দলীয় নির্বাচনের বিপক্ষে। স্থানীয় সরকারে বিরোধীদলীয় মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং অন্যদের প্রতি ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টিভঙ্গি যে কী রকম, তা জানা গেছে বিগত বছরগুলোয় তাদের আচরণে। ইতোমধ্যে বড় শহরগুলোর বিএনপিদলীয় মেয়রেরা বরখাস্ত হয়েছেন, নতুবা কারাগারে রয়েছেন। সারা দেশে ২৩ জন মেয়র, ২৭ জন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং দেড় শতাধিক ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। যা হোক, দেশের এই অবস্থায় এবং ব্যাপক জনমতকে অগ্রাহ্য করে কেন ক্ষমতাসীন সরকার দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর, তাও আলোচিত হয়েছে সুশীল সমাজে। একটি সংবাদ ভাষ্যে বলা হয়, ‘ স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় নির্বাচিত দলীয় প্রতিনিধি থাকলে রাজনৈতিক সঙ্কট কিংবা জাতীয় নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা যাবেÑ দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারের মধ্যে এই বিবেচনা কাজ করেছে।’ সরকার অনেক হিসাব-নিকাশ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে প্রকাশ। একটি প্রধান দৈনিকে প্রকাশিত জনমত যাচাইয়ে দেখা যায়, ৬৭.৭৫ শতাংশ ভোটদাতা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন সমর্থন করেন না। দলীয় নির্বাচনের সিদ্ধান্তের পেছনে যে কারণগুলো রয়েছে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণায় তা নিম্নরূপ : ক. আওয়ামী সরকার নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পেরেছে, জনগণ তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কোনো সুষ্ঠু নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে তাদের জয়লাভ সম্ভব নয়। ২০১৩ সালে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে তারা এ মেসেজ পায়। কোনো চতুর রাজনৈতিক নেতৃত্বই বোকার মতো নিজেদের পরাজয় আহ্বান করতে পারে না। সুতরাং ছল, বল, কলাকৌশলে যা করা হয়েছে দেশবাসীর সামনে তা স্পষ্ট। এর পরও ২০১৪ সালে গৃহীত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রাথমিক দুই পর্বের ফলাফল আওয়ামী লীগের বিপক্ষে যায়। তখন বিএনপি-জামায়াত সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে ধাবিত হলে আওয়ামী লীগকে শক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করতে হয়। একই ঘটনা ঘটে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে। আর সর্বশেষ ঢাকা, চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনের কারসাজি সচেতন নাগরিক মাত্রেরই জানা কথা।
খ. আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি সরকারি নিপীড়ন-নির্যাতনে প্রায় কোণঠাসা। তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোই কঠিন। ‘বিরোধী দলের এই ভঙ্গুর দশা এবং প্রশাসনে শক্ত নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বর্তমান সময়টাকেই বেছে নেয়া হয়েছে।
গ. বাংলাদেশে শীতকাল রাজনৈতিক আন্দোলনের উপযুক্ত সময়। তা ছাড়া ৫ জানুয়ারি ২০১৬ হতে পারে আরেকটি আন্দোলনের দিনক্ষণ। সুতরাং গোটা জাতির দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানো এবং স্থানীয় নির্বাচন দিয়ে বিরোধী শক্তিকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এ সময়টি যথাযথ মনে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের কাছে।
ঘ. সরকারের বর্তমান কৌশল হচ্ছে সর্বত্র সর্বাত্মক দলীয়করণ। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে পেশাজীবী সংগঠনগুলো দখলের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব মনে করে, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা দলীয় প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সরকার ম্যানেজ করার জন্যই এই দলীয় নির্বাচনের মেকানিজম নেয়া হয়েছে।
ঙ. আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক মনে করেন, নিবন্ধনের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে জামায়াতে ইসলামী দলের প্রতীক ও দলীয় প্রার্থী বাছাই করে নির্বাচন করতে পারবে না। ব্যালট পেপারে সব দলের প্রতীক থাকলেও দাঁড়িপাল্লা থাকবে না। দীর্ঘ দিন এভাবে চলতে থাকলে ভোটারদের মন থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক হারিয়ে যাবে। ওই নেতা আরো বলেন, প্রতীক থাকলে প্রশাসনের জন্যও বোঝা সহজ হবে, কে সরকার দল সমর্থিত আর কে বিরোধী দলের প্রার্থী। একটি জনপ্রিয় দৈনিকে এ মতামত প্রকাশিত হয়।
চ. ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন সঙ্গত কারণেই বহির্বিশ্বে সরকারের জন্য সঙ্কট সৃষ্টি করেছিল। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের নির্বাচনী সাফল্য (তা যেকোনো মেকানিজমেই হোক) সরকারের জন্য বাড়তি সমর্থন ও সুবিধা বয়ে আনবে।
এভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি সত্যি সত্যিই দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয় তাহলে গোটা নির্বাচনব্যবস্থাটি মূল্যহীন, গুরুত্বহীন এবং প্রতিযোগিতাহীন হয়ে পড়বে। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগ বিপাকে পড়বে। স্থানীয়পর্যায়ে মন্ত্রী, এমপিদের কোন্দল ও স্বার্থসঙ্ঘাতে নির্বাচন সহিংস হয়ে উঠবে। অপর দিকে, বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের সাথে সরকারি দলের দ্বন্দ্বসঙ্ঘাত হয়ে উঠবে তীব্রতর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি দলের মনোনয়ন না পেলেও নব্যধনিক বণিকেরা নিশ্চিত জয়ের জন্য অর্থ ও শক্তি প্রয়োগ করতে এবং ভায়োলেন্স ঘটাতে পারে। সব মিলিয়ে দলীয় নির্বাচন গ্রামগঞ্জে দাঙ্গাহাঙ্গামা, অশান্তি, অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ভালোর চেয়ে মন্দই বেশি হতে পারে।
অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অবশেষে দলীয় নির্বাচনের ফলাফল আওয়ামী লীগের জন্য বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা রাজনৈতিক ঐতিহ্য বা নিয়মের বিপরীতে জনসাধারণ এ ব্যবস্থায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারেন। দলের অভ্যন্তরে প্রার্থী না হওয়ার অসন্তোষ প্রকারান্তরে দলীয় স্বার্থবিরোধী বলে বিবেচিত হতে পারে। খুব স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলপর্যায়ে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস নির্বাচনব্যবস্থাকে আরো দুর্নীতিগ্রস্ত, অকার্যকর ও অগ্রহণযোগ্য করে তুলবে। এ ধরনের ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ফলে বৈধতার সঙ্কটে নিপতিত সরকারের জন্য আরো সঙ্কট সৃষ্টি করবে।
অনেকে যুক্তি দেখান, উন্নত গণতন্ত্রে স্থানীয়পর্যায়ের নির্বাচন যদি দলীয় ভিত্তিতে হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশে তা হওয়া সঙ্গত হবে না কেন? আমরা সবাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত। উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি-সভ্যতার যে মান, বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত। যে রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতার পরিমণ্ডলে ওই সব দেশের মানুষেরা বেড়ে ওঠেন, তা আমাদের দেশে একেবারেই অনুপস্থিত। তা ছাড়া আইনের শাসনের (Rule of law)- দৃঢ়তা ওই সব সমাজে যেভাবে সুপ্রোথিত, আমাদের দেশে তা অসম্ভব। বরং যারা বা যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তারা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে আইন-কানুন, রীতি-রেওয়াজ এবং বিধি-বিধানÑ সবকিছুকে অগ্রাহ্য করেন।
আরেকটি অপ্রিয় সত্য এই যে, স্থানীয়পর্যায়ের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের সরাসরি অংশগ্রহণ বা দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব ও সমর্থন অনুভূত হয়ে আসছে। ১৯৭৩ থেকে এ পর্যন্ত যত স্থানীয়পর্যায়ের নির্বাচন হয়েছে, এগুলোতে ক্রমেই বেশি বেশি করে রাজনীতির অনুরণন লক্ষ করা গেছে। তবুও সরাসরি রাজনৈতিকভাবে অংশগ্রহণ না করার যে ব্যবধান, তাই আমাদের রক্ষাকবচ। আজকের সমাজ ও রাজনীতির প্রান্তিকপর্যায় দাঁড়িয়ে ওই মূল্যবোধটুকু রক্ষা করা আমাদের সবার নাগরিক দায়িত্ব।
সুতরাং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ১. দলীয় প্রতীক নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হোক। ২. স্থানীয় সরকারব্যবস্থা এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় যেকোনো পরিবর্তন জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে কার্যকর করা হোক। ৩. প্রস্তাবিত অধ্যাদেশটি ঘোষণার আগে বিশেষজ্ঞ এবং সুশীলসমাজের মতামত নেয়া হোক। ৪.আইনের শাসন নিশ্চিত করা হোক ৫. সুদূরপ্রসারী সংস্কারের লক্ষ্যে পাঁচটি স্থানীয়পর্যায়ের নির্বাচন একক আইনে পরিচালিত হোক ৬. প্রত্যাশিত নির্বাচনে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা এবং অধিকার নিশ্চিত করা হোক ৭. স্থানীয় সরকারের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং অর্থ সংগ্রহের সুযোগ নিশ্চিত করা হোক ৮. সংবিধানে বিভিন্নপর্যায়ের স্থানীয় প্রশাসনের যে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে তা নিশ্চিত করা হোক ৯. পর্যাপ্ত জনশক্তি দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদসহ সব পর্যায়ের প্রশাসনকে শক্তিশালী করা হোক ১০. রাজধানী থেকে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ না করে জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদের সমন¦য়ে স্থানীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক।
আমরা আগেই বলেছি, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকারই হলো যেকোনো প্রকার গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। গণতন্ত্রকে তৃণমূলপর্যায় থেকে উত্তমরূপে গড়ে তুলতে না পারলে তা কখনোই সুফলদায়ক হবে না। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন গণতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তিমূল। কারণ এখান থেকেই গণতন্ত্রের শুভ যাত্রা শুরু হয়। স্থানীয় সরকারগুলোর মাধ্যমে যদি গণতান্ত্রিক শাসন বাস্তবায়িত না হয় তাহলে জাতীয়পর্যায়ে কোনো সময়ই তা প্রতিষ্ঠিত হবে না। বেশির ভাগ স্থানীয় সরকারবিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীয় রাজনীতির চক্রজালের বাইরে থাকাই শ্রেয়। এর কারণ এদের সমস্যা স্থানীয়পর্যায়ের। জাতীয় বা আন্তর্জাতিকপর্যায়ে স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্টতা বিষয়টিকে জটিল করে তুলবে মাত্র। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অনেকটা রাজনীতি নিরাসক্ত। বাংলাদেশে তা বিবি তালাকের ফতোয়া থেকে জমির আল পর্যন্ত বিস্তৃত। তা ছাড়া রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলে রাজনীতি নিরাসক্ত সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন করতে নিরুৎসহিত হবেন। রাজনীতি চালু থাকলে স্থানীয় পরিষদ উন্নয়ন সংস্থার পরিবর্তে দলীয় কার্যালয় হিসেবে অধিকতর ব্যবহৃত হবে। যে দল যখন ক্ষমতায় যাবে, সে দলের ক্রীড়নকে পরিণত হবে স্থানীয় পরিষদ। রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল ভিন্ন পার্লামেন্ট চলতে পারে না; কিন্তু স্থানীয় পরিষদ নিশ্চিতরূপে পরিচালিত হতে পারে। মহাত্মা গান্ধী এ কারণে দলবিহীন স্থানীয় সরকারের পক্ষে স্বীয় মতামত প্রকাশ করেছেন। সুতরাং দীর্ঘ দিন চলে আসা ঐতিহ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিকতাকে অগ্রাহ্য করে দেশের জন্য আর একটি অমঙ্গল ক্ষমতাসীন সরকার ডেকে আনবে না এটাই নাগরিক সাধারণের বিনীত নিবেদন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫