ঢাকা, বুধবার,১৯ জুন ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

শুভবুদ্ধির উদয় হোক

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

০৬ নভেম্বর ২০১৫,শুক্রবার, ১৮:৪৮


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ অবশেষে যেমন মানুষের শুভবুদ্ধির উদয় চেয়েছেন, তেমনি শুভবুদ্ধির জাগরণ চেয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার একমাত্র সন্তান ফয়সাল আরেফিন দীপন দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয়পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। জেল ফাঁসি দিয়ে কী হবে?’ এ ছিল এক বেদনাবিধুর পিতার করুণ অথচ নীরব আর্তনাদ। স্বাভাবিক শোকবিহ্বলতা অতিক্রম করে তার এই উক্তি যেন সমাজের প্রতি এক প্রবল চপেটাঘাত। তিনি আরো বলেন, ‘আমি আইনে বিশ্বাস করি, তাই মামলা করব। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ড নিছক ধর্মীয় বিষয় নয়, এর পেছনে আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।’ ‘পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ হিমালয়ের চেয়েও ভারী।’ সেই শোকাবহ পরিবেশকে অতিক্রম করে জাতীয় স্বার্থে কথা বলেছেন এই বুদ্ধিজীবী পিতা। অথচ এ নিয়ে মশকারা করলেন ক্ষমতাসীন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। তিনি বললেন, ‘একজন পুত্রহারা পিতা সন্তানের হত্যার বিচার চায় না, এটা বাংলাদেশে প্রথম। পৃথিবীতে এমনটা দেখি নাই। এর কারণ একটাই হতে পারে, যারা তার পুত্রকে হত্যা করেছে, তার বাবা অধ্যাপক সাহেব হয়তো ওই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। ওনার দলের লোকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান না বলেই তিনি এ ধরনের কথা বলেছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক।’ হানিফ এ মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি শাসক দলের চরিত্রের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে অনেক বিশেষণে আখ্যায়িত হয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য যে, প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি সাহিত্যিক এবং সমাজ পরিবর্তনের রূপকার। তার সমাজচিন্তা ও রাজনৈতিক ভাবনার জন্য অনেকের কাছেই তিনি আদর্শ। বাম ধারার রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী। কিন্তু তিনি তার বিশ্বাসকে মতাদর্শ দিয়ে ভারী করে তোলেননি। একজন উদার, নির্ভীক বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমাজের সব স্তরে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। নিঃসন্দেহে তার সন্তানকে তিনি সেভাবেই তৈরি করেছিলেন, সংস্কারমুক্ত একজন মানুষ হিসেবে। কিন্তু দুর্বৃত্তদের আঘাত তাকেও বাঁচতে দিলো না। 

কয়েক বছর ধরে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে যে হত্যা, গুম ও রক্তপাত চলছে তার সর্বশেষ ঘটনা এবারের নৃৃশংস জোড়া হামলা। ৩১ অক্টোবর দুর্বৃত্তরা শাহবাগে জাগৃতি প্রকাশনার মালিক দীপনকে হত্যা করে। প্রায় একই সময়ে হামলা হয়েছে লালমাটিয়ায় আরেক প্রকাশকসহ দুই কবি ও ব্লগারের ওপর। হত্যার জন্য পুলিশ ইঙ্গিত করছে ‘আনসারউল্লাহ বাংলা’ টিমের প্রতি। কর্মকর্তারা বলছেন, হামলার ধরন দেখে তারা এ রকম ধারণা করছেন। তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। অন্ধকারে হাতড়াচ্ছেন সবাই। বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও ২০০৬ সালের দিকে ‘ইসলামি জঙ্গি’দের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। তৎকালীন জোট সরকার কঠোরহস্তে তাদের দমন করেছিল বিচারের মাধ্যমে। অবশ্য একদল রণকৌশল বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইসলামি জঙ্গিদের উৎপাত ছিল, ‘আকস্মিক’, ‘কৃত্রিম’ ও ‘ষড়যন্ত্রমূলক’। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলে নাস্তিকদের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। তারা ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষতার সুযোগ গ্রহণ করে। তাদের বাড়াবাড়ির কারণে কয়েকজন ব্লগার যারা ইসলাম, কুরআন এবং রাসূল সা: সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করছিল, সরকার তাদের কয়েকজনকে আটক করে। বাংলাদেশের অতিমাত্রিক রাজনীতির কারণে সবকিছুই রাজনীতির ব্যারোমিটার দিয়ে নির্ণীত হচ্ছে। ২০১২ সালে হেফাজতে ইসলামের উত্থানের অনুষঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করা হয় জঙ্গিবাদকে। অপর দিকে হেফাজতের বিপরীতে গণজাগরণ মঞ্চের অত্যধিক ইসলামবিরোধী ভূমিকার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্লগারদের আবির্ভাব ঘটে। মূলত এই বিভাজন এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ছিল, মতাদর্শিক দ্বৈততার চরম প্রকাশ। এক দিকে রাজনৈতিক ইসলামে বিশ্বাসীরা ব্লগারদের ‘ঈমানের দুশমন’ মনে করেন, অপর দিকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয়কে মুক্তিযুদ্ধের শত্রু বলে পরিগণিত করে থাকেন। উভয়পক্ষই কমবেশি অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থা অবলম্বন করেছে। ফলে দেশের গরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসের সাথে কিছু মানুষের মতাদর্শকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব বিগ্রহ ক্রমশ সহিংসতার রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস ও জীবনবোধ এক অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো চিরপ্রবহমান। এ জাতির উত্থান-পতন, ভাঙা-গড়া এবং জাতিরাষ্ট্রের বিবর্তনধারায় জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা সবসময় ক্রিয়াশীল থেকেছে। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত উপমহাদেশ ১৯৭১ সালে ভাষার ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হয়েছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে রাষ্ট্রচিন্তার ‘থিসিস’, ‘অ্যান্টি থিসিস’ এবং ‘সিনথেসিস’-এর ধারায় জাতিসত্তার বহমান ধারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে স্থিত হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি কৌশলগতভাবে ধর্মের আবেদন মেনে নিয়েছে। বিতর্কিত করা সত্ত্বেও সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ বা ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ বাদ দেয়া যায়নি। এ বক্তব্যের দ্বারা আমরা এটা বোঝাবার চেষ্টা করছি যে, শক্তি প্রয়োগে রাজনৈতিক ইসলামের অবস্থান প্রান্তিক সত্ত্বেও এটাই বাস্তব সত্য, ইসলাম বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের গহিন গভীরে একটি সুসুপ্ত শক্তি হিসেবে বিরাজমান। কিন্তু শাসক দল জনগণের নারীর স্পন্দন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। বিবিধ কৌশলে এবং অপনামে প্রকারান্তরে তারা ইসলামি ভাবাদর্শের অবসান চাইলেও তা কখনো সম্ভব নয়। ক্ষমতাসীন সরকার, সিভিল সোসাইটি এবং অন্যান্য সামাজিক শক্তির উচিত ছিল ইসলামের শাশ্বত ভূমিকাকে স্বীকৃতিপূর্বক ধারণযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়া। তাদের বুঝতে হবে, ইসলাম একটি অনতিক্রম্য আদর্শিক শক্তি। নদীর স্বাভাবিক মানবতাকে যদি বাধাগ্রস্ত করা হয় তাহলে প্লাবন অস্বাভাবিক নয়। ক্রমাগত ব্লগার হত্যার পর সরকার অবশ্য ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দেয়ার আবেদন জানিয়ে ইতিবাচক কাজ করেছে।
ধর্মীয় বৈরিতার সাথে সংযুক্ত হলো রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি সরকারের শক্তি প্রয়োগের চরম ব্যবস্থা। গণজাগরণ মঞ্চের সাথে সরকারের সম্পৃক্ততা ততদিন পর্যন্ত টিকে থাকে, যতদিন তারা এ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে পারে। মাঝখান থেকে গণজাগরণ মঞ্চের আশ্রয় আর প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা অবিশ্বাসীদের সাথে বিশ্বাসীদের বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এটা অসম্ভব নয় যে, এক চরমপন্থীরা অপর চরমপন্থীদের ওপর চড়াও হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্ম একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। গরু জবাই তো দূরের কথা, গরুর গোশত খাওয়ার অপরাধে ভারতে মানুষ জবাই হয়ে যাচ্ছে, সে অবস্থা তো আমাদের দেশের নয়। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। যেকোনো সচেতন নাগরিক যদি ঘটনা-পরম্পরা বিশ্লেষণ করেন তাহলে দেখতে পাবেন সরকার একটি আদর্শগত অবস্থানের পরিবর্তে নীতিহীন রাজনৈতিক সুবিধাবাদের ভূমিকা নিয়েছে। এই সুবিধাবাদ হচ্ছে সব সর্বনাশের মূল।
প্রথমেই সংবিধান সংশোধনের বিষয় উল্লেখ করা যায়। সংবিধানের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কথা বলা হয়েছে। আবার ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রয়েছে। ইসলামের যেকোনো প্রকাশ এবং প্রমাণকে সরকার পাইকারিভাবে স্বাধীনতার চেতনার বিরোধী বলে অভিহিত করেছে। একপর্যায়ে ‘মদিনা সনদ’ অনুযায়ী দেশ শাসিত হবেÑ সর্বোচ্চপর্যায় থেকে এ কথাও বলা হয়েছে। সরকার রাজনৈতিক ইসলাম থেকে ব্যবহারিক ইসলামকে পৃথক করতে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক ইসলামের যেকোনো দায়দায়িত্ব এবং ভুলত্রুটি বর্তেছে সাধারণ ইসলামের ওপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বাংলাদেশে বিদ্যমান সহিংসতার দুটো কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়ন-নির্যাতন, খুন-গুম, হামলা-মামলার জের ধরে প্রতিবাদী ভূমিকা। দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক ইসলামি দুনিয়ার প্রতি ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ আরোপ। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ পাশ্চাত্যবিরোধী মনোভাব পোষণ করে। গাজায় যখন ইসরাইলি বর্বরতা প্রকাশ পায়, তখন দেশের সরকার প্রধানসহ সবাই সমব্যথিত হন। সেন্টিমেন্টের প্রকাশ হিসেবে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা অসম্ভব নয়। তবে আবারো সেই পুরনো কথা বলতে হয়Ñবাংলাদেশের মানুষ হিংসাত্মক চরমপন্থায় বিশ্বাস করে না। এখানে সন্ত্রাসবাদ একটি ব্যবস্থা হিসেবে কখনোই জনগণের তেমন সমর্থন পাবে না। সরকারের তরফ থেকে সবচেয়ে মারাত্মক ভুল হচ্ছে, দুর্বৃত্তদের কার্যক্রমকে রাজনৈতিক লেবাস দেয়া। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব থেকে যখন কোনো তদন্তের আগেই বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়, তখন নাগরিক সাধারণের কাছে ওই বক্তব্যের বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক হয়। সরকার বলছে, দেশে আইএস নেই। অথচ বাম ধারাটি দেশে আইএসের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। তারা রূপ রস গন্ধ দিয়ে দেশের বিশ্লেষকদের বিশ্বাস না করে বিদেশী বিশেষজ্ঞ বা ইহুদিবাদের উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা দিয়ে বাংলাদেশকে ‘ব্যর্থরাষ্ট্র’ হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে। এর উদ্দেশ্য একটা বলে মনে হয়Ñ বাংলাদেশে বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। সরকার এবং বিরোধী দলের সাংঘর্ষিক অবস্থা থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা আরোহণের দুঃস্বপ্ন হয়তো দেখে তারা।
গভীর মনোযোগ দিয়ে বাংলাদেশের ৪৪ বছরের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, বাংলাদেশের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের ইতিহাস মূলত আদর্শের সঙ্ঘাত। বিশেষত বিগত প্রায় ১০ বছরে এ সঙ্ঘাতকে উসকে দেয়া হয়েছে; অথচ প্রশমনের কোনো ব্যবস্থাই করা হয়নি। প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হকের ভাষায় বলতে চাই, ‘এ দেশে রাজনৈতিক সমাধান যতক্ষণ পর্যন্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ আইনগত কোনো সমাধান সম্ভব নয়। আমরা শূন্যের মধ্যে ভালো কিছু খুঁজছি। এটা পাওয়া সম্ভব নয়। আদর্শগত ও রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে।’ তাই তার মতো আমাদেরও প্রার্থনাÑ শুভবুদ্ধির উদয় হোক, সমাজে রাজনীতিতে, বুদ্ধিজীবীদের মাঝে। তার কারণ ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫