ঢাকা, রবিবার,১৬ জুন ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

নূর হোসেনের হাসি

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

২০ নভেম্বর ২০১৫,শুক্রবার, ১৯:১৮


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

আমি প্লেটোকে উদ্ধৃত করতে ভালোবাসি। রিপাবলিকের অষ্টম অধ্যায়ে প্লেটো বলেন, ‘অধম প্রকৃতির দল এবার তাদের হাতে বন্দী আত্মাকে তার সকল মহৎ গুণ থেকে শোধন করতে শুরু করে। এবার তারা দম্ভ, অনাচার, অমিতব্যয় এবং নির্লজ্জতাকে মশাল শোভাযাত্রা সহকারে পুষ্পমাল্যে ভূষিত করে এবং প্রশংসার মধুর বাণী উচ্চারণ করে বরণ করে এনে আত্মাশূন্য ঘরে তাদের প্রতিষ্ঠা করে। এবার তারা ঔদ্ধত্যকে অভিহিত করে আভিজাত্য বলে, অরাজকতাকে বলে স্বাধীনতা এবং অপব্যয়কে মহানুভবতা, মূর্খতাকে বলে বিক্রম।’ মানব প্রকৃতি সম্ভবত সব সময়ে এবং সর্বত্র একই রকম। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এথেন্সের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে শব্দাবলি উচ্চারণ করেছিলেন প্লেটো আজো তা প্রাসঙ্গিক মনে হয়Ñ এ যেন আমাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলা। সাম্প্রতিক সময়ে যে মর্মান্তিক নিষ্ঠুরতা মানুষের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে; তা হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা। এটি চিত্ত চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এ কারণে যে, এতে দুটো অস্বাভাবিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ‘এলিট ফোর্স’ এর সংশ্লিষ্টতা। দ্বিতীয়ত, শুধু সম্ভাব্য সাক্ষী হওয়ার আতঙ্ককে যারা দেখেছে তাদেরকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা। মামলাটির তৃতীয় মাত্রা হতে পারত নারায়ণগঞ্জের ‘গডফাদার’-এর নিদের্শনা। যেহেতু গডফাদারের বিষয়টি সর্বত্র ঘটছে এবং এটা এখন আমাদের রাজনীতির অলঙ্কারে (!) পরিণত হয়েছে, সে কারণে সেটি উল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম। আর পৈতৃক জীবনটা কে হায় হারাতে চায়!
‘হিউম্যান মাইন্ড ইজ ভেরি শর্ট’Ñ মানুষ সহজেই সব কিছু ভুলে যায়। সে জন্য নূর হোসেনের কাহিনী আবার আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই। গত বছরের ২৭ এপ্রিল ঘটে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে দুটো গাড়িতে থাকা সাতজনকে অপহরণ করা হয়। একটি গাড়িতে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দুই নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম এবং তার সহযোগীরা। অন্য গাড়িতে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক। তিন দিন পর অপহৃত ব্যক্তিদের লাশ ভেসে ওঠে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে। ঘটনার নির্মমতায় শিহরিত হয় গোটা জাতি। নিহতদের আত্মীয়স্বজনেরা নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করে। পরে র‌্যাবের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে র‌্যাব এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়। নূর হোসেন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী এবং অর্থের জোগানদাতা বলে চিহ্নিত হয়। ঘটনাটি ঘটার পরপরই কথিত গডফাদারের পরামর্শে ভারতে পালিয়ে যায় নূর হোসেন। ১৪ জুন কলকাতার বাগুই আটিতে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এই খুনি। দেশে জনমত তীব্রতর হয়ে উঠলে বাংলাদেশ সরকার তাকে ফিরিয়ে আনে। ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো ‘বিনিময় সমঝোতা’ হয়েছিল কি না জনগণ জানে না। তবে আমরা দেখলাম দীর্ঘ দিন কারাগারে থাকা উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে নূর হোসেনকে ফেরত দেয়ার আগের দিন। যা হোক, এটা কাকতালীয় ঘটনাও হতে পারে। নূর হোসেনকে আদালতে হাজির করার পর ভুক্তভোগীসহ সবাই মনে করেছিল যে, পুলিশ তার রিমান্ডের আবেদন করবে। উল্লেখ্য, নূর হোসেনের বিরুদ্ধে আরো ছয়টি হত্যার অভিযোগসহ ২২টি মামলা রয়েছে। নূর হোসেনের রিমান্ড না চাওয়া মানুষকে বিস্মিত এবং বিচলিত করেছে। কারণ কয়েক বছর ধরে আমরা দেখে আসছি, রিমান্ড একটি কালচারে পরিণত হয়েছে। এই রিমান্ড থেকে সন্দেহভাজন, মামলা মোকদ্দমাহীন ১৪ বছরের কিশোরও রেহাই পায়নি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থেকে সামান্য ওয়ার্ড কমিটির সদস্যও রিমান্ড নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জামায়াত শিবিরের এমন কোনো নেতাকর্মী নেই যার বিরুদ্ধে রিমান্ড চাওয়া হয়নি। শীর্ষ আইনজীবীরা মনে করেন, চার্জশিট দেয়ার পরও রিমান্ড চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ না করেই চার্জশিট দেয়াকে আইনজীবীরা উদ্দেশ্যমূলক বলছেন। বিশেষত র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতার কারণে বিষয়টি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। আইন ও অধিকারের পরিপ্রেক্ষিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার প্রশ্নে র‌্যাবের পেশাগত সুনামের প্রতি নেতিবাচক এ ঘটনাটি জনসমক্ষে প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন।
দেশের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী নূর হোসেনকে ভারত থেকে নিয়ে আসায় এক ধরনের স্বস্তির সৃষ্টি হয়েছিল। এখন রিমান্ড না চাওয়ায় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অনুমান করা যায়। আদালতে তার সহাস্য মুখ বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। হাসির অনেক প্রকারভেদ আছে। অট্টহাসি, নিষ্ঠুর হাসি, স্মিত হাসি, মুচকি হাসি, মায়াবী হাসি এবং ক্রুর হাসি। নূর হোসেনের ক্রুর হাসি তার প্রতিপক্ষকে একটি মেসেজ দিয়েছে। এর অর্থ হলো সেই পুরনো কথা। সংবাদপত্রে প্রকাশিত গডফাদারের সেই আশ্বাস বাক্য, ‘তোমার কিছুই হবে না’। নূর হোসেনের শুধু হাসিই নয়, তার হাবভাব নিশ্চিতের ইঙ্গিত দেয়। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট ও হাতকড়া পরা অবস্থায় তাকে আদালতে ঢোকানো হয়। সুন্দর করে চুল আঁচড়ানো আর ক্লিন শেভ করা নূর হোসেন, নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেনি। কাঠগড়ায় ওঠার পরে সে হেলমেট খোলে। অল্প সময়ে আদালতের কার্যক্রম চলে। এ সময়ে নূর হোসেনকে স্বাভাবিক এবং নিশ্চিন্ত মনে হয়েছে। এর দুটো কারণ হতে পারেÑ তিনি লাজলজ্জা, শরমভরমহীন অমানুষে পরিণত হয়েছেন অথবা ক্ষমতাসীনদের আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়েছেন। এ অবস্থায় বাদিপক্ষে স্বস্তির বদলে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। একজন মামলাকারী অভিযোগ করেন, ‘নূর হোসেনের সহযোগীদের অত্যাচারে আমরা ঘর থেকে বের হতে পারছি না। এদের মধ্যে কয়েকজনকে সাত খুনের মামলার অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিয়েছে পুলিশ।’ সুতরাং বোঝা যায় যে, গডফাদার এবং ক্ষমতাসীনদের মদদ অব্যাহত রয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, নূর হোসেন টকশোতে কথা বলতে চায়। কী বলতে চায় সে সেটাও এক রহস্যের ব্যাপার। ওই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোবাইল ফোনালাপ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। একই সময়ে সরকারপ্রধান নারায়ণগঞ্জের গডফাদার বলে কথিত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এই ঘটনার পরে হাইকোট আসামিদের গ্রেফতারে যে নির্দেশনা দেন শীর্ষ নেতৃত্ব তার সমালোচনা করেন।
নূর হোসেন আমাদের কাছে একজন প্রতীকী পুরুষ। সে এই সময়ে বাংলাদেশের হাজারো নূর হোসেনের প্রতিমূর্তি। নূর হোসেনের হাসি তার একার হাসি নয়। এ হাসি সমাজের প্রতি অবহেলার, আইনের প্রতি অবজ্ঞার। এ হাসি ক্ষমতাসীনদের প্রতিনিধিত্ব করে। আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন রাজার ধর্ম’। দেশ-কাল, সময়-সমাজ পাল্টেছে। এখন হয়তো বলতে হবে ‘দুষ্টের লালন এবং শিষ্টের দমন রাজার ধর্ম’। আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সুশাসনের জন্য ‘রুল অব ল’ বা আইনের শাসনের কথা বলে আসছেন। এখন হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষা পাল্টে আইনের শাসনের বদলে, ‘শাসনের আইনের কথা’ বলতে হবে। আমরা দেখলাম একই আইনের দু’ধরনের প্রয়োগ। সিলেটের রাজন আর খুলনার রাকিব হত্যার বিচার হয়েছে দ্রুততম সময়ে। কিন্তু এত দিনেও নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর ত্বকী হত্যার বিচার হয়নি। আর এক কিশোর গাইবান্ধার সৌরভ সংসদ সদস্যের গুলিতে আহত হলেও তিনি জামিন পেয়েছেন। অপর দিকে এই রাষ্ট্র ও সমাজের শীর্ষ ব্যক্তি যারা এখন বায়ুবীয় হুকুমের আসামি জামিন পান না। কারণ তারা ক্ষমতা বলয়ের লোক নয়। তাই বিচারের বাণী কাঁদে নীরবে নিভৃতে সর্বত্র। অবশেষে জীবনানন্দের ভাষায় বলা যায় :
‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা/ যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই/ পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।/ যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,/ এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়/ মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা/ শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।’
লেখক : প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫