ঢাকা, সোমবার,২৬ আগস্ট ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

থাকব ন্যায়ের পক্ষে

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

২৭ নভেম্বর ২০১৫,শুক্রবার, ১৯:২৯


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

‘ন্যায়’ একটি নীতিবোধক শব্দ। আমাদের ভাষা ও সমাজে ন্যায় বহুবিধ অর্থে ব্যবহৃত হয়। ন্যায় বলতে সব যুগে, সব সমাজে সাধারণত দায়িত্ব পালন করা, অপরের দায়দেনা পরিশোধ করা, সৎভাবে চলা, দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শন করা, অন্যের ক্ষতি সাধন না করা প্রভৃতি গুণকে বোঝায়। মোট কথা, ন্যায় হচ্ছে ব্যক্তির সামাজিক ব্যবহারের ঔচিত্য-অনৌচিত্যবোধ কথা। সমস্ত মহৎ গুণের সমন্বয়ে ন্যায়ের সৃষ্টি। তাই সব দেশেই সাধারণভাবে ন্যায় মানেই যা কিছু মহৎ ও উত্তম। মনীষী প্লেটো তার মহৎ সৃষ্টি রিপাবলিকে সংলাপের মাধ্যমে ন্যায়ের অনুসন্ধান করেছেন। এই গ্রন্থে ন্যায়ের অবতারণা এতই ব্যাপক যে, কেউ কেউ রিপাবলিকের দ্বিতীয় শিরোনাম দিয়েছেন ‘ন্যায়বিষয়ক আলোচনা’। বিভিন্ন পর্যায়ে বিবিধভাবে ন্যায়ের সংজ্ঞা নির্ণয় করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। প্রথম অভিমতে বলা হয়েছে, কথায় ও কাজে সততাই হচ্ছে ন্যায়। দ্বিতীয় অভিমত, ন্যায় হচ্ছে বন্ধুর প্রতি বন্ধুত্ব এবং শত্রুর প্রতি শত্রুতা। তৃতীয় অভিমতে, হতাশার সাথে বলা হয়েছে : ন্যায় হচ্ছে শক্তিমানের স্বার্থ। চতুর্থ অভিমতে, বাস্তবতার নিরিখে শ্লেষের সাথে মন্তব্য করা হয়েছে, অন্যায় ন্যায়ের চেয়ে অধিক লাভজনক। প্লেটো এসব ইতিবাচক ও নেতিবাচক বক্তব্যের মাধ্যমে যেন বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ চিত্রই অঙ্কন করেছেন, যেখানে অনায়াসে প্রমাণিত হয়, শক্তিমানের স্বার্থই ন্যায়। আমাদের নিত্যদিনের সংবাদচিত্র সাক্ষ্য দেয়, অন্যায় ন্যায়ের চেয়ে অধিক লাভজনক। সুতরাং সম্ভবত ন্যায়ের সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারিত হতে হবে। 

আমরা আমাদের দেশজ কালচারে কথায় কথায় ন্যায়ের উদাহরণ দেই। আমরা বলি, ‘এটি অন্যায়’ অথবা ‘এটা কি ন্যায় হলো’! তার মানে আমরা আমাদের আইনকানুন, রীতি-রেওয়াজ, বিধিবিধান ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে ন্যায়ের একটি মাত্রা নির্ণয় করেছি। রাষ্ট্র যখন আইন তৈরি করে এবং প্রয়োগ করে তখন সময় ও সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। আর যদি তা না করে তাহলে ন্যায়ের ব্যতিক্রম ঘটে। ন্যায় যদি ব্যক্তির বিরুদ্ধেও যায়, তাহলে ব্যক্তি আত্মসমীক্ষা শেষে তা মেনে নেয়। ন্যায় যদি সমষ্টির বিরুদ্ধে যায়, তাহলে গণ-অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। গণ-অসন্তোষ আস্থা ও বিশ্বাসকে নষ্ট করে। কোনো সমাজে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা ও অরাজকতা ডেকে আনে। কাজেই রাষ্ট্র ও সমাজের মানদণ্ড হিসেবে ‘ন্যায়নীতি’ অনুসরণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমা ধারণায় ন্যায় হচ্ছে, সমাজ ও রাষ্ট্রিক সিদ্ধান্তমালায় সততা, সম-অধিকার ও সবার কল্যাণ। সেখানে ন্যায় হচ্ছে মৌলিক মানবাধিকারের পূর্ণতা। এ ধারণায় সুবিধা ও অসুবিধাগুলো সমভাবে ভাগ করে নেয়া হয়। রাষ্ট্রের সম্মান ও সম্পদের কর্তৃত্বপূর্ণ বণ্টনব্যবস্থায় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চেয়ে ন্যায়কে নিশ্চিত করা হয়। কোনো অনাকাক্সিক্ষত অথবা অযাচিতভাবে কোথাও যদি ন্যায়ের বিপরীত কিছু ঘটে তখন প্রতিকার প্রয়াসও বাঞ্ছিত হয়ে ওঠে। অবশ্য এটা করতে গিয়ে ‘চোখের বদলে চোখ ও দাঁতের বদলে দাঁত’ আশা করা হয় না। কারণ, এ ধরনের মানসিকতা ভবিষ্যতের পথচলাকে দুরূহ করে তোলে। ন্যায়কে যথাযথ ভারসাম্যের দ্যোতক বলে নিশ্চিত করা হয়। পশ্চিমা রাষ্ট্রকাঠামো ও সমাজব্যবস্থায় সামাজিক ন্যায়বিচার তাদের অস্তিত্বের পরিপূরক বলে মনে করা হয়। সমাজতাত্ত্বিক জন রাউলস তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এ থিওরি অব জাস্টিস’-এ ন্যায়কে প্রাতিষ্ঠানিক, প্রয়োজনীয় ও প্রায়োগিক বলে মতামত দেন। ভারতের অমর্ত্য সেন অবশেষে অর্থনীতিতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ‘সোস্যাল জাস্টিস’-এর কথা বলছেন। আমাদের নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ব্যবসায় ক্ষেত্রে ন্যায় নিশ্চিত করার জন্য সামাজিক ব্যবসার কথা বলছেন। আমরা যখন আইনের শাসন চাই তখন মূলত সাংবিধানিক ‘ন্যায়’ প্রতিষ্ঠার কথা বলি, আইনের চোখে, সুবিধা অথবা অসুবিধা বণ্টনে একটি সুদৃঢ় নীতিমালাকেই বোঝাই। ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি, ব্যক্তি বনাম সমষ্টি এবং ব্যক্তি-সমষ্টি বনাম রাষ্ট্রÑ যে বিরোধ-বিতর্কে অবতীর্ণ হয় সেখানে আইন আদালত ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে। ন্যায় ধারণার বড় একটি আবর্তন-বিবর্তন বিচারব্যবস্থা-কেন্দ্রিক। ক. যথাযথ ভারসাম্যের উপস্থিতি, খ. সুষ্ঠু নিরপেক্ষ বিচার, গ. নিরপরাধ দাবিকারী এবং অপরাধ প্রমাণকারীর মধ্যে সুসামঞ্জস্য বিধান ও ঘ. একটি ন্যায়ানুগ রায়। এসব নিশ্চিতভাবেই ন্যায়কে নিশ্চিত করে।
মানুষের সামাজিক জীবনের কার্যক্রম এবং আচার আচরণকে যেমন আমরা ‘ন্যায়বোধ’ দ্বারা বিচার করি ঠিক তেমনি ধর্ম দর্শনেও ন্যায়ের বিচারিক মানদণ্ড সর্বত্র। এ দেশের গরিষ্ঠ জনমণ্ডলী যেহেতু ইসলাম ধর্মাবলম্বী সেহেতু ন্যায় সম্পর্কে কুরআনের কিছু উদ্ধৃতি আশা করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
‘সত্য ও ন্যায়পরায়ণতায় তোমার প্রতিপালকের বাণী পরিপূর্ণ। তাঁর বাক্য পরিবর্তনকারী কেউ নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা’ (সূরা আন্ আম : ১১৫)। ‘যাদেরকে আমি সৃষ্টি করেছি তাদের মধ্যে একদল লোক আছে যারা ন্যায়ভাবে পথ দেখায় এবং ন্যায়ভাবে বিচার করে’ (সূরা আল আ’রাফ : ১৮১)। ‘মুমিনদের দুই দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে; আর তাদের একদল অপর দলের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করলে যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করবে; যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে তবে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সাথে ফয়সালা করবে এবং সুবিচার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন’ (সূরা হুজরাত : ৯)। ‘হে মুুমিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ের সাক্ষ্য দানে তোমরা অবিচল থাকবে; কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনো ন্যায়বিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, তোমরা ন্যায়বিচার কর, তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ ভালোভাবেই অবহিত’ (সূরা আল মায়িদা : ৮)।
ন্যায় সম্পর্কে কুরআনের নিদের্শনাগুলো দেখলেন। পৃথিবীর এমন কোনো ধর্ম নেই যা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলে না। ‘সত্যম শিবম সুন্দরাম’Ñ এ আত্মবাক্যটি বহুলভাবে উচ্চারিত হয়ে আসছে। মহামতী বুদ্ধদেব, শ্রীকৃষ্ণ ও হজরত ঈসা আ: সকলের বাণী অন্বেষণ করলে হয়তো ইসলামের বাণীরই প্রতিধ্বনি ঘটবে। যারা ধর্ম বিশ্বাস করেন না, তারাও নীতিশাস্ত্রের কথা বলেন। প্লেটো তার কালজয়ী গ্রন্থ রিপাবলিকে এমন এক ন্যায়ের সমাজ কাঠামো নির্মাণ করেছেন যেখানে রয়েছে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য। সেখানে একই বাগানে ফুটবে শতফুল। মত ও পথের পার্থক্য থাকা সত্ত্ব্যেও গড়ে উঠবে এক ভারসাম্যপূর্ণ সুন্দর সমাজ। এখানে কর্মের বিভাজন থাকবে এবং ন্যায়ের পুণ্য প্রতিভাত হবে সর্বত্র। রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে ন্যায়ের মাধ্যমে ‘সর্বাধিক মানুষের সর্বাধিক সুখ নিশ্চিত করা’। এভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে ন্যায় এবং সদাচার।
মানুষের সর্বময় চেষ্টা হবে ন্যায়ের সেই অবিচল সত্তাকে অনুধাবন করা, ন্যায়কে জানার চেষ্টা করা এবং তাকে আত্মস্থ করা। সুনাগরিকের উচিত সত্য ও ন্যায়ের আদর্শ দিয়ে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করা। ‘চোখের শক্তি পরীক্ষার মতো ন্যায়কে বড় অবয়বে প্রত্যক্ষ করতে পারলে পরবর্তীকালে তাকে ব্যক্তির ক্ষুদ্র অবয়বে প্রত্যক্ষ করা সহজতর হবে।’ তা হলে এই উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে, ন্যায় একটি ‘সত্তাবান অবিচল অস্তিত্ব’। ন্যায় এবং কেবল ন্যায় বাধা-বিঘœœহীনভাবে অনুসরণ করতে পারলে একটি মহৎতর ব্যক্তিজীবন এবং শ্রেষ্ঠতর জাতীয় জীবন গড়ে তোলা সম্ভব। সুতরাং ব্যক্তিক, রাষ্ট্রিক এবং সামাজিক অবস্থান অনুধাবন শেষে নাগরিক প্রতিজ্ঞা যাই হোক না কেনÑ থাকব ন্যায়ের পক্ষে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫