ঢাকা, শুক্রবার,২৩ আগস্ট ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

পৌরসভা নির্বাচন : দলীয়করণ বনাম নির্দলীয়করণ

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

০৪ ডিসেম্বর ২০১৫,শুক্রবার, ১৯:০৩


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতার একটি লক্ষণ হলো তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসনের অধিকতর বিকেন্দ্রীকরণ। বাংলাদেশের সংবিধানে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও কার্যত ঘটছে এর বিপরীত। স্থানীয় শাসনকাঠামো : ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাÑ উভয় ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণের বদলে ক্রমেই কেন্দ্রীকরণ অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইÑ এই অব্যাহত কেন্দ্রীকরণের একটি উদাহরণ হতে পারে। প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল প্রার্থী বাছাইয়ে স্থানীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অগ্রাধিকার পাবে। এখন দেখা যাচ্ছে, দলের শীর্ষ কর্তৃত্ব মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন। শাসক আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার স্বাক্ষরে দলীয়প্রার্থী মনোনয়ন পাবেন। এ সিদ্ধান্তের সুফল বর্ণনা করে শাসক দল দাবি করছে এতে তৃণমূলপর্যায়ে গণতন্ত্র পাকাপোক্ত হবে। আরো সুবিধা এই যে, কোন্দল আকীর্ণ আওয়ামী লীগে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ার শখ মিটিয়ে দেয়া যাবে।

স্মরণ করা যেতে পারে, স্থানীয় সরকারের স্বাতন্ত্র্য, স্বকীয়তা এবং অরাজনৈতিক অবস্থানকে নির্মূল করে এই প্রথমবারের মতো নির্বাচনগুলো দলীয়পর্যায়ে, দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শাসক দল যুক্তি দিচ্ছে, এত দিন ধরে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হলেও দলীয় পরিচয়ে তা প্রচ্ছন্ন ছিল। প্রকারান্তরে, দলীয় পরিচয় যখন স্পষ্ট হচ্ছে, তখন দলীয় পরিচিতি সরাসরি হলে ক্ষতি কী? কেউ বা রসিকতা করে ভাসুরের নাম নেয়া বা ঘোমটা খোলার বিড়ম্বনার কথা বলছেন। মূলত বাংলাদেশের সমাজতত্ত্ব যারা বোঝেন, জনগণের মনস্তত্ত্বের খবর যারা রাখেন, বিশেষত গ্রামীণ সমাজের চরিত্র এবং বৈশিষ্ট্য বোঝেন, তারা অবশ্যই স্বীকার করবেন যে, এই রাখঢাক, পরোক্ষ মনোভাব এবং নির্ধারিত দূরত্বের একটি অপরিসীম মূল্য রয়েছে। অরাজনীতির ভদ্র আভরণ দিয়ে তারা রাজনীতির কূটিলতা, জটিলতা তথা ‘পলিটিকস’কে অতিক্রম করতে চায়। ভাসুরের নাম যদি না নেয়া হয় বা বউ যদি ঘোমটা দেয়- তাহলে বুঝতে হবে তাও বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘আম গাছ জাম গাছ বাঁশঝাড় যেন, মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন’। গ্রামগঞ্জে, পৌরসভার মতো ছোট শহরে- আত্মীয়তা, পাড়া প্রতিবেশীর সহমর্মিতা, এলাকার এবং খাল-রাস্তার বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ এই নিবিড় সম্পর্ক, আত্মীয়তা এবং মানবিক সম্পর্ককে ক্ষমতাসীনেরা স্বীয় স্বার্থে বলি দিতে যাচ্ছে।
আকস্মিকভাবে গত ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেয় যে, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন রাজনৈতিক দলীয় পরিচয়ে অনুষ্ঠিত হবে। কেন তারা এ সিদ্ধান্ত নিল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন- ক. সম্ভাব্য শীতকালীন রাজনৈতিক আন্দোলন মোকাবেলা, খ. আন্তর্জাতিক মহলে প্রতারণা, গ. বিরোধীদের তৃণমূলপর্যায়ে নির্মূলকরণ, ঘ. তৃণমূলপর্যায়ে দলকে সুসংহতকরণ, ঙ. স্থানীয়পর্যায়ে সম্পদ ও সুবিধার দলীয়করণ নিশ্চিতকরণ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই অনুধাবন করে যে, তারা একটি মারাত্মক জনবিচ্ছিন্নতার সম্মুখীন হয়েছে। শক্তির দীর্ঘায়িত শাসন সত্ত্বেও গ্রামগঞ্জে, ছোট শহরে এবং বড় শহরেÑ সর্বত্র যে ধূমায়িত গণ-অসন্তোষ রয়েছে, তা অতিক্রম করে সত্যিকার প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রার্থীদেরকে বৈতরণী পার করানো দুঃসাধ্য হবে। সুতরাং ‘এক নেতা এক দল’ ধরনের সিদ্ধান্ত ছাড়া উপায় নেই। আর ইতোমধ্যে বিরোধী দল নির্মূল অভিযানে পনেরো আনা সফলতা অর্জিত হয়েছে। বিগত দুই বছরে বিএনপি-জামায়াতের যেসব স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন, তাদের প্রায় সবাইকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে অথবা গ্রেফতার করা হয়েছে। তারপরও বিএনপি বা অন্য কোনো দল থেকে যাতে কেউ প্রার্থী না হতে পারে, সে জন্য অনেক আগে থেকেই গ্রেফতার অভিযান এবং মামলাবাজি শুরু হয়েছে। খবর পাওয়া যাচ্ছে, বিরোধী দলের সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণার সাথে সাথেই তিনি গ্রেফতার হয়ে যাচ্ছেন। যদি তাকে ধরা না যায়, তা হলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে মামলা রুজু হয়ে যাচ্ছে অথবা সম্পূরক চার্জশিটে প্রার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি দলীয় পরিচয় বহন করে না এমন স্বতন্ত্র শক্তিশালী প্রার্থীদের রেহাই দেয়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, ‘এ যেন হাত পা বেঁধে কোনো সাঁতারুকে সাঁতার প্রতিযোগিতায় আহ্বান’।
নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রাথমিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। নির্বাচনী কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এরা যে কর্তা ইচ্ছায় কীর্তন করেÑ এইচ টি ইমাম তা স্বীকার করেছেন। নির্বাচন কমিশন এতই বশংবদ যে, বিএনপিসহ অন্যান্য দলের সময় বাড়ানোর আবেদনকে এক কথায় নাকচ করেছে। গত নির্বাচনগুলোতে নির্বাচন কমিশনের ‘অসহায়ত্ব’, ‘নাবালকত্ব’ এবং ‘অভিনবত্ব¡’ প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচন প্রার্থীরা স্ব-স্বাক্ষরে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও প্রার্থিতা বহাল ছিল। বিগত তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘নতুন নির্বাচন প্রকৌশল’ এর নিকৃষ্ট নমুনা দেশবাসী দেখেছে। আর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনী তামাশার কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। এহেন নির্বাচন কমিশন, দেখা যাবে, বিরোধী প্রার্থীদের নামের বানানের আ-কার ই-কার ধরে বসবে, ঋণখেলাপি অথবা মামলা-মোকদ্দমায় আসামি দেখাবে। এক রসিকজন লিখেছেন, ‘হয়তো এমন ব্যবস্থা করা হবে যাতে যাত্রী স্টেশনে পৌঁছার আগেই যাতে ট্রেন ছেড়ে দেয়’। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘দলীয়ভাবে নির্বাচন হওয়ার মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন’।
এই অবস্থার মোকাবেলায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য দল উভয় সঙ্কটে পড়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অর্থ হলো আওয়ামী নিরঙ্কুশ কারসাজির বিজয়কে বৈধতা দেয়া। অপর দিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না হলে তৃণমূল পর্যায়ে জনবিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হবে। আওয়ামী অত্যাচার, নিপীড়নে পিষ্ট তৃণমূল নেতাকর্মীরা নির্বাচনকে হয়তো একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। সুতরাং বিএনপিকে সতর্কতার সাথে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, জনগণের কাছে যাওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে এটি ব্যবহার করতে চায় বিরোধী দলগুলো। অনুমান করা হচ্ছে, বিরোধী দলের কোনো প্রার্থীকেই হয়তো সঠিকভাবে নির্বাচন করতে দেবে না। সে ক্ষেত্রে বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো একটি রণকৌশল গ্রহণ করতে পারে। আর তা হলো: ‘তোমাকে হারানোর জন্য তাকে জেতাবো’। অর্থাৎ, নিজ দলীয় প্রার্থীদের যদি কোথাও বিজয়ের সম্ভাবনা নিশ্চিত করা যায়Ñ অতি উত্তম। আর যদি হারানো হয় বা হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেখানে বিজয়ী হতে পারে এ রকম নির্দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে দেয়া। আওয়ামী লীগ যেমন তার প্রার্থীকে অনিবার্যভাবে জেতাতে চায়, তার বিপরীতে বিএনপি এবং জোটের সব শক্তি, সামর্থ্য, অর্থ, সময়, শ্রম অর্থাৎ সর্বতোভাবে চেষ্টা করে আওয়ামী প্রার্থীর পরাজয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সর্বত্র এই রণকৌশল গ্রহণ করার সমালোচনা হতে পারে, তবে রণকৌশল হিসেবে এটি সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারলে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা প্রমাণিত হবে। তারা যেমন চরম দলীয়করণ চায়, তার উত্তরে নির্দলীয়করণ হবে একটি উৎকৃষ্ট উত্তর। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫