ঢাকা, রবিবার,১৬ জুন ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

জনগণের রাজনীতিবিমুখতা

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

১১ ডিসেম্বর ২০১৫,শুক্রবার, ১৮:৩৬


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

প্রিন্ট

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ দশকে গ্রিক সভ্যতায় স্টয়সিজম বা নিস্পৃহতামূলক একটি দার্শনিকতত্ত্বের উদ্ভব ঘটে। জেনোকে এই দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়। এপিকুরাসের নেতৃত্বে একই ধরনের অন্য একটি দার্শনিক ধারারও উদ্ভব গ্রিস ধারায় পরিলক্ষিত হয়। এই উভয় দর্শনের বিকাশের পটভূমি হচ্ছে এককালের বীর্যবান ও ঐশ্বর্যময় এথেন্স ও অন্যান্য গ্রিক নগররাষ্ট্রের ক্ষয়গ্রস্ত সঙ্কটাপন্ন অবস্থা। যে গ্রিক গণতন্ত্র জনগণের যথার্থ অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করেছিল, সে গণতন্ত্র তখন বিপন্ন। আত্মধ্বংসী যুদ্ধ, রাজনৈতিক দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র ও অরাজকতায় জনগণের কাছে তাদের প্রিয় গণতন্ত্র অকার্যকর মনে হয়েছে। তাদের কাছে তত দিনে গণতন্ত্র, শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপনে অক্ষম একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে বর্জনীয় বলে বিবেচিত হয়েছে। রাজনীতি তথা রাষ্ট্রীয় জীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণের যে আর্কষণ নাগরিকেরা এত দিন ধরে বহন করছিল তা থেকে নাগরিকদের মোহমুক্তি ঘটেছে। যে ব্যক্তি একদিন নগররাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বের মধ্যে নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত রেখেছে এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেও বাইরে নিজের কোনো অবস্থানের কথা চিন্তা করেনি সে নাগরিক এখন তার ব্যক্তিক জীবনে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের বাইরে নির্বিবাদে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের উপায় অন্বেষণ করছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট, গণতন্ত্রের দুর্দশা ও জনগণের রাজনীতিবিমুখতা গ্রিসের প্রাচীন বাস্তবতার কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়।

ইসলামের ইতিহাসে একই ধারার উদ্ভব ঘটে। খেলাফত অবসানের পর তথা উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসনে ইসলাম যখন ক্রমেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে ক্রমঅপসৃয়মান হতে থাকে তখন একদল মনীষী ইসলামের সত্যিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তাদের ধ্যান-জ্ঞান-গরিমার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। তার ফলাফল দাঁড়ায় শাসককুলের পক্ষ থেকে ওই সব জ্ঞানীগুণী এবং সত্যবাদী মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচার। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় চার মাজহাবের চার ইমামই রাষ্ট্রশক্তি কর্তৃক নিগৃহীত হন। ইমামে আযম আবু হানিফা কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। এসব অন্যায় অত্যাচারের পর একদল ওলামায়ে কেরাম গ্রিস সভ্যতার মতো রাজনীতি সম্পর্কে নিস্পৃহ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তারা একান্ত জ্ঞানসাধনায় নিমগ্ন হন। তারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য নিজেদের খানকা ও মাদরাসায় সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। এভাবে ইসলামের সরব অবস্থান নীরবতায় পর্যবসিত হয়। পীরবাদ ও ‘ইলমে তাসাউফ’-এর মধ্যে তারা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন। জিহাদের বাণী ও অনুশীলন পরিত্যক্ত হয়। অবশ্য ইসলামের ইতিহাসে প্রথম থেকেই একদল সুবিধাবাদী সব সময় রাজা-বাদশাহর তোষণকারী আলেম সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। এরা ‘ওলামায়ে ছু’ বলে পরিচিত। কথায় আছে ‘হিস্ট্রি রিপিডস ইট সেল্ফ’। বাংলাদেশের রাজনীতি বিশেষ করে ইসলামি রাজনীতি অবস্থাদৃষ্টে সম্ভবত এ মন্তব্য প্রাসঙ্গিক।
আসলে আমাদের জনগণের বর্তমান রাজনৈতিক বিমুখতা বিশ্লেষণের জন্যই এই দীর্ঘ তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশ ইতিহাসে বিদ্রোহের দেশ বলে পরিচিত। ভ্রমণকারীরা আমাদের জনগোষ্ঠীকে আয়েশি, আমুদে, অলস, অরাজক ও সুবিধাবাদী বলে অভিহিত করেছেন। বিগত এক শতকে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের নেতিবাচক ওই দৃষ্টিভঙ্গিকে অতিক্রম করে আধুনিকতার প্রমাণ রেখেছে। ব্রিটিশ আমলে বলা হতো, ‘হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে, ইন্ডিয়া থিংকস টুমরো।’ পাকিস্তান আমলে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আমাদের জনগণের আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাস অনন্য। লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এতটাই প্রাবল্য অর্জন করে যে, কোনো কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী একে ‘অতিমাত্রিকতা’ ও ‘অধিকতর অংশগ্রহণ’ দুষ্ট বলে অভিহিত করেন। জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা পরিমাপের কয়েকটি মানদণ্ড হলোÑ নির্বাচন, আন্দোলন, রাজনৈতিককার্যক্রম প্রভৃতি ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ। মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলো (১৯৭১) থেকে এ পর্যন্ত (২০১৫) যদি জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে গরিষ্ঠ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় স্বাধীনতার অব্যবহিত পরপরই জাসদের অভাবিত উত্থান। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন তথা এরশাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান। তৎপরবর্তী নির্বাচনগুলোয় জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিকপ্রক্রিয়া ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’-এর মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছিল। জনগণের এই স্বাভাবিক অংশগ্রহণ প্রথমবারের মতো বাধাগ্রস্ত হয় অযাচিত সামরিক হস্তক্ষেপে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তারা জরুরি আইন জারি করে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে। আশা করা গিয়েছিল ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তারা গণতন্ত্রকে পরিপূর্ণতা দেবে। মানুষ ফিরে পাবে তার হারানো মৌলিক অধিকার। নির্বাচনপূর্বক্ষণে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হলেও কার্যত মানুষ ক্রমান্বয়ে জরুরি অবস্থার মতো পরিবেশের মধ্যে নিপতিত হয়।


তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে ব্যবস্থাটি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে সংযোজিত ছিল তা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়। পরবর্তী নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের নেতৃত্বে হওয়ার মানে হলো- পাতানো ফাঁদে পা দেয়া। জনগণ এই প্রথমবারের মতো তাদের এক দিনের ভোট দেয়ার অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলল। প্রতিষ্ঠিত হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সিডো ডেমোক্র্যাসি’ বা কপট গণতন্ত্র। মানুষ দেখল নির্বাচন হয়; কিন্তু তাদের ভোট দিতে হয় না। নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও প্রার্থিতা বহাল থাকে। সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যায়। ব্যাঙের ছাতার মতো পার্টি গজায় এবং
বিরোধী দলে থেকেও মন্ত্রী হওয়া যায়


 

বলা হয়ে থাকে সরকার নির্বাচিত হলেই গণতান্ত্রিক হয় না। গণতন্ত্র যদি হয় একটি জীবনবোধের নাম তাহলে আমরা দেখতে পাবো আমাদের শাসককুলে গণতন্ত্রের নামগন্ধও নেই। আর যদি বলা হয় গণতন্ত্র হচ্ছে একটি শাসনব্যবস্থা তাহলে স্বীকার করতেই হবে আমাদের দেশে ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ অন্তত খাতাপত্তরে বহাল রয়েছে। ১৯৯০ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর মানুষ তাদের ইচ্ছামতো ভোট দিয়েছে। হয়েছে ক্ষমতার পালাবদল। একবার এক দল, আরেকবার অন্য দল; কিন্তু জনগণের কথিত ‘এক দিনের গণতন্ত্র’ও কপালে সইল না। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যখন বুঝতে পারল যে, জনগণের ভোটের মাধ্যমে তাদের আর ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ হবে না তখনই তারা অবাধ গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সুযোগটি চিরতরে বন্ধ করে দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে ব্যবস্থাটি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে সংযোজিত ছিল তা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়। পরবর্তী নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের নেতৃত্বে হওয়ার মানে হলো- পাতানো ফাঁদে পা দেয়া। জনগণ এই প্রথমবারের মতো তাদের এক দিনের ভোট দেয়ার অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলল। প্রতিষ্ঠিত হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সিডো ডেমোক্র্যাসি’ বা কপট গণতন্ত্র। মানুষ দেখল নির্বাচন হয়; কিন্তু তাদের ভোট দিতে হয় না। নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও প্রার্থিতা বহাল থাকে। সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যায়। ব্যাঙের ছাতার মতো পার্টি গজায় এবং বিরোধী দলে থেকেও মন্ত্রী হওয়া যায়। সাংবিধানিক নিয়ম বা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন চিরস্থায়ী হয়ে যায়। জনগণ আরো দেখল যে দুই বৃহৎ নগরীর নির্বাচনও ভোটার ছাড়া হয়ে যায়। সুতরাং জনগণের ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া যাওয়া’ অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু ক্ষেপিয়া গিয়ে আন্দোলন বা আস্ফালন করার কোনো সুযোগ নেই। কিল খেয়ে কিল হজম করা ছাড়া উপায় নেই।
জণগণের ভোটাধিকার হারানোর সাথে সাথে সভা-সমিতি, মিটিং মিছিল এবং আন্দোলন সংগ্রাম করার মৌলিক অধিকার ক্রমেই উবে গেছে। এক সময়ে বাকশাল ব্যবস্থা এবং লালঘোড়া দাবড়ে দেয়ার ঘোষণা প্রকাশ্যেই করা হয়েছিল। এবার অঘোষিত বাকশালব্যবস্থা এবং অপ্রকাশ্য গুম, খুন, মামলা, হামলা দিয়ে সারা বাংলাদেশকে কারাগারে পরিণত করা হলো।
দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ এলোÑ যা পাকিস্তানি বর্বর আমলে কেবল কারফিউর সময়ে প্রয়োগযোগ্য ছিল। নিপীড়ন, নির্যাতন এবং পাশবিকতা এতটাই ব্যাপক হলো যে, লাখ, লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়া হলো। আন্দোলন তো দূরের কথা মানববন্ধনও পিটিয়ে দেয় পুলিশ। গণতন্ত্র (!) এতটাই অবাধ (!) হলো যে, সিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পোস্টার লাগালেও গ্রেফতার। বিরোধী দল সভা-সমাবেশ ডাকলে সরকার হরতাল কায়েম করে। গাড়িঘোড়া যানবাহন এমনকি খেয়াপারের নৌকাও বন্ধ করে দেয়। বিরোধী দলের শীর্ষ সব নেতাকে গ্রেফতার করে। সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীকে দৃশ্যত গৃহবন্দী করে রাখে। ইট বালু ট্রাকের তলায় পৃষ্ঠ হয় গণতন্ত্র। গণতান্ত্রিক সহনশীলতার মাত্রা এ রকম যে, প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করার অপরাধে শুধু চাকরিচ্যুত নয়, বছর বছর জেলজুলুম খাটতে হয়। সম্প্রচার বিধিমালার নামে গণযোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সত্য কথা বলার অপরাধে সম্পাদক গ্রেফতার হন। টিভি চ্যানেল বন্ধ হয় বা জবর দখল হয়ে যায়।
বিগত বছরগুলোয় এই যখন রাজনৈতিক হালচাল, তখন রাজনীতির প্রতি কোনো মানুষের কোনো আগ্রহ থাকার অবকাশ থাকে কি? আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ সতত রাজনীতিপ্রবণ। শিক্ষার হার কম, দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিষ্পেষিত জীবন এবং সন্ত্রাসের বেড়াজালে অতিষ্ঠ নিত্যদিন, তবুও কথা বলতে চায় মানুষ। প্রকাশ করতে চায় তার সুখ-দুঃখ কষ্ট-বেদনার কথা। আর বিরোধী দল তাদের এসব ক্রোধ ও ক্ষোভ প্রকাশের বাহন। অবশিষ্ট ছিল স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের খুশিমতো নেতৃত্ব স্থাপন। এখন আর সেটিও বাকি নেই। সর্বত্র ‘এক দল, এক নেতা, এক দেশ’-এর প্রতিষ্ঠা। সুতরাং পুরো দেশে সৃষ্টি হয়েছে রাজনীতিবিমুখতা।
সন্দেহ নেই এই রাজনীতিবিমুখতা এখন মহামারী আকারে আবির্ভূত হলেও শুধু এ সরকারই এ জন্য এক ’শ ভাগ দায়ীÑ এ কথা বলা যাবে না। বস্তুত ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে যে প্রত্যাশা তুঙ্গে পৌঁছেছিল তাই এখন অন্তে পৌঁছার কারণ। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, যে স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রের শুভ সূচনা হলো, সেই গণতন্ত্রের সময়কালটি জনগণের ভাষায় স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও নিকৃষ্টতর প্রমাণিত হলো। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অবাধ অর্থনেতিক লুটপাট এবং রাজনৈতিক স্বৈরাচার আগের যেকোনো সরকারকে হার মানিয়েছে। এরপরও কোন আশায় জনগণ রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হবে! প্রতিষ্ঠানিকভাবে বলতে গেলে প্রথমত ’৯০-পরবর্তী রাজনৈতিক এলিটদের আচারÑআচরণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি তথা গণতন্ত্রের প্রতি অবজ্ঞা হেতু মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজনীতির নামে যে দুর্বৃত্তায়ন তথা সন্ত্রাস, ভায়োলেন্স এবং শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে তা জনগণকে রাজনীতির প্রতি ভীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। তৃতীয়ত, রাজনীতির নামে সম্পদ কুক্ষীগতকরণে যে প্রতিযোগিতা লক্ষ করা গেছে তা রাজনীতির প্রতি মানুষের সতত শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট করেছে। রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে মানুষ রাজনৈতিক সেবার বদলে রাজনৈতিক শোষণের শিকার হয়েছে। চতুর্থত, রাজনীতির প্রতি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নিপীড়ন এবং নির্যাতনের নীতি মানুষের মধ্যে ভয়ঙ্কর ভীতির সৃষ্টি করেছে। জনগণের মধ্যে ক্ষমতাসীনদের সম্পর্কে তীব্র অসন্তোষ থাকা সত্ত্বেও হামলা মামলা, জেল-জুলুম, মানুষকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে বর্তমান সরকার বিরোধীদের প্রতি, ‘দেখামাত্র গুলি’ যে ঘোাষিত-অঘোষিত জারি রেখেছেÑ তা মানুষকে চরম বিপন্ন অবস্থায় নিপতিত করেছে। পঞ্চমত, রাজনীতিতে নৈতিকতা ও নিয়মতান্ত্রিকতার বদলে যে অন্যায়-অনৈতিকতা, অনাচার-অরাজকতা দেখা দিয়েছে তা ভালো মানুষকে রাজনীতি থেকে চিরতরে বিতাড়ন করেছে। রাজনীতি বা পলিটিক্স এখন চাণক্য এবং মেকিয়াভেলির কপটতায় পর্যবসিত হয়েছে। ষষ্ঠত, রাজনীতি জনগণের প্রত্যাশিত সুশাসন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সপ্তমত, দুর্নীতি রাজনীতির বাহন হওয়ায় মানুষ এ রাহুগ্রাস থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছে।
এমতাবস্থায় ‘ছল বল কল কৌশল’ বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহমান রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করতে হলে তদানুরূপ অথবা তদাপেক্ষা কার্যকর অনৈতিক রণকৌশল প্রয়োগ করতে হবেÑ যা কোনো নৈতিক মানুষের কাম্য হতে পারে না। এরিস্টটল তার বিখ্যাত বিপ্লবতত্ত্বে গণবিপ্লবের জন্য যে পরিবেশ ও পরিস্থিতির উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে এক্ষণে হুবহু তা বর্তমান। এরিস্টটলের ভাষায়, ‘স্বৈরাচারীদের উগ্র ও অত্যাচারী শাসনের ফলে শাসিতদের মনে যে ঘৃণা ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয় তা বিপ্লবের আকারে বিস্ফোরণের সূচনা করে। ভিন্ন চরিত্রের কোনো রাষ্ট্র যদি স্বৈরতন্ত্রের প্রতিবেশী হয় তবে এই বিপ্লব আরো বেশি ত্বরান্বিত হয়।’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫