ঢাকা, মঙ্গলবার,১৯ মার্চ ২০১৯

পাঠক গ্যালারি

ইসি নিরপেক্ষ নির্বাচনে বদ্ধপরিকর!

মো: গোলাম হোসেন

২১ ডিসেম্বর ২০১৫,সোমবার, ১৮:২৪


প্রিন্ট

নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আর নির্বাচন বলতে ছল-চাতুুরহীন অবাধ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনায় ‘গণ-অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিই’ বোঝায়। আমাদের পবিত্র সংবিধানে নির্বাচন শব্দটি নিঃসন্দেহে এ ধরনের চেতনারই প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং ‘গণ-অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিহীন’ আক্ষরিক অর্থে নির্বাচন সাংবিধানিক চেতনা অনুযায়ী কোনো নির্বাচনই নয়, বরং সংবিধান লঙ্ঘন ও প্রতারণার শামিল। স্বৈরাচার শব্দটি নির্বাচিত সরকারের বিপরীত অবস্থা বোঝাতেই যদি ব্যবহার হয় তবে গণতন্ত্রের নামে অনৈতিকভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণকে স্বৈরতন্ত্রের নিকৃষ্টতম উদাহরণ বলা চলে। হোক না তা গণতন্ত্র রক্ষা বা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে। জেনারেল এরশাদকে এ জন্যই ‘স্বৈরাচার’ তকমাটা জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই দেয়া হয়েছিল বলা চলে।

গণতান্ত্রিক বিশ্বের সব দেশেই নির্বাচন হয়, নির্বাচন নিয়ে টেনশনও হয়, সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশও একটি গণতান্ত্রিক দেশ। আর সংবিধান মোতাবেক দেশটার মালিক মোখতারও জনগণই। সুতরাং জনগণের মালিকানা ও দখলদারিত্ব স্বপ্নমানে নির্বাচনও হয়। আস্থা ও বিশ্বাসে আমরা গণতন্ত্রের প্রতি এতটাই অবিচল যে, ‘রোজ কিয়ামত পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার ঐকান্তিক প্রত্যাশা ও সুযোগ হাতের মুঠোয়’ এমনটি মনে হওয়ার পরও আমরা ‘নির্বাচনমুখী’। নীলনকশার নির্বাচনে অবধারিত বিজয়ের পরও নির্ভেজাল গণতন্ত্রের মতোই দেশ ও জাতির স্বার্থে ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা দিই। গণতন্ত্রের কফিনের ওপর দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করি বিবেক ও ব্যক্তিত্বের পরাজয় উপেক্ষা করেই। ভেজাল-ফরমালিনের যুগ বলেই কিনা, আবার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম কারচুপির এমনকি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘গণতন্ত্র গণধর্ষণ’- এর মতো জঘন্য অভিযোগ তুলি।
গণতান্ত্রিক বিশ্বের সব দেশেই নির্বাচনকে ঘিরে টেনশন থাকে। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই টেনশনের ধকল অনুভূত হয় দেশের সীমা গড়িয়ে বহির্বিশ্বেও। তবে আমাদের দেশে নির্বাচনী টেনশন ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের টেনশনে ফারাক আসমান-জমিন। ওসব দেশে টেনশন দেখা যায় ফলাফল নিয়ে, অর্থাৎ কে জিতবে সেই বিষয়ে। সময় সময় বাজিও ধরতে দেখা যায় এই প্রশ্নে। কিন্তু এই দেশে ক্ষমতাসীনদের জয় এতটাই নিশ্চিত যেকোনো বদ্ধপাগলও সরকারি দলের বিপক্ষে বাজি ধরতে রাজি হওয়ার কথা নয়। আর হবেই কেন, যখন ক্ষমতাসীনদের জয় অনেকটা আগামী দিনের সূর্যোদয়ের মতোই নিশ্চিত। এই মহৎ কাজটি করে যাওয়ার জন্য বিচারপতি খায়রুল হককে যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে জাতি। কিন্তু তাই বলে আমাদের এখানে নির্বাচন ঘিরে আদৌ যে টেনশন অনুভূত হয় না, তা কিন্তু নয়। টেনশন এখানেও যে কম নয় পত্রপত্রিকায় চোখ বুলালেই তা বোঝা যায়। তবে এখানে টেনশন নির্বাচনের ফলাফল তথা কোন দল জিতবে বা কে হারবে তা নিয়ে নয়, কারণ বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত। এখানে টেনশনের কারণ প্রধানত নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, কারচুপি, কেন্দ্র দখল বা পাইকারি সিলমারা হারটা কত হবে তা নিয়ে। এখানে টেনশন এ কারণেও যে, ফলাফল ঘোষণায় ৪ শতাংশ ৪০ শতাংশ হবে, না ইংরেজি-বাংলার বিভ্রান্তিতে ৮৪, ‘৪৮’ হয়ে যাবে তা নিয়ে? খুন-খারাবি, আর হামলা-মামলায় জনজীবন কতটা বিপর্যস্ত হবে, নিরাপত্তাবাহিনীর ছত্রছায়ায় কর্মকর্তাদের ব্যালটে সিলমারার অবাধ সুযোগ কতটুকু থাকবে তা নিয়ে। টেনশন এই কারণেও যে, খোদ প্রার্থীদের অনেকেই সেখানে মনোনয়নপত্র জমা দিতেই পারেননি, সে ক্ষেত্রে ভোটাররা অবাধে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, কেন্দ্রে যেতে পারলেও ভোট দেয়ার আগেই ভোট দেয়া হয়ে যাবে কি না? আর ভোট দিতে সক্ষম হলেও তা বাতিল না হয়ে কাউন্ট হবে কি না বা নির্বাচন কমিশনের কম্পিউটার ভাইরাস মুক্ত থেকে তা সঠিকভাবে প্রকাশে সমর্থ হবে কি না?
আশার কথা নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করেই বলেছে ‘নির্বাচন হবে আইন অনুযায়ী’ তবে ৫ জানুয়ারি বা তৎপরবর্তী নির্বাচনগুলোর মতোই আসন্ন পৌর নির্বাচনও ‘অবাধ, নিরপেক্ষ ও আইনানুগ’ হবে কি না সেই বিষয়টি নিশ্চিত করে না বললেও নির্বাচনপূর্ব আবহাওয়ার দেশে প্রায় শত ভাগ নিশ্চয়তা দিয়েই বলে দেয়া যায় যে, পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর মতোই আর একটি ‘অবাধ, নিরপেক্ষ ও আইনানুগ’ নির্বাচনই উপহার দিতে যাচ্ছে আমাদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন কমিশনের দোয়ার বরকতে এরই মধ্যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতোই বিপুলসংখ্যক মেয়র-কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ খ্যাত ফেনীতে তো ঘটে গেল ৫ জানুয়ারির মতোই আরেক অবিশ্বাস্য এবং গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন কাণ্ড। আসন্ন পৌর নির্বাচন কেমন হবে নির্বাচন কমিশনের ‘কঠোর’ অবস্থান আর ক্ষমতাসীনদের অবাধ স্বাধীনতা থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
তবে আশার কথা, নির্বাচন নাকি আরেক অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেয়ার জন্য এবার আরো শক্ত করে কোমর বেঁধেছেন যার আলামত এরই মধ্যে দৃশ্যমান। ‘নির্বাচন হবে আইন অনুযায়ী’ কমিশনের এই প্রতিশ্রুতি অনেকের মনে সাহস ও আসার আলো জ্বালিয়ে থাকবে, যদিও তার আমলের বিগত নির্বাচনগুলোর মতোই আসন্ন পৌর নির্বাচনও ‘অবাধ-নিরপেক্ষ ও আইনানুগ’ হবে কি না তিনি তা স্পষ্ট করে বলেননি। ‘পতিত স্বৈরাচার’ জেনারেল এরশাদ ’৮৮-এর সংসদ নির্বাচন কেমন হবে সেই বিষয় আগাম ধারণা দিতে বঙ্গভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। নির্বাচন ’৮৮-এর কারচুপিমুক্ত অবাধ ও নিরপেক্ষ করার ব্যাপারে তার দৃঢ়প্রত্যয় ঘোষণা শুনে একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন, ‘মাননীয় রাষ্ট্রপতি, আসন্ন নির্বাচন ’৮৮ বিগত নির্বাচন ’৮৬-এর মতোই অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি?’ কিংকর্তব্যবিমূঢ় এরশাদ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কোন মিডিয়ার সাংবাদিক?’ উত্তরদাতা, ‘বিবিসি’। এরশাদ ক্রুর হাসি হেসে বললেন, ‘ও বিরোধী ব্রডকাস্টিং করপোরেশন, তাই না?’ তবে মুখের ওপর এমন জটিল ও কঠিন প্রশ্নবাণ ছুড়ে দেয়ার জন্য প্রশ্নকারীকে গণতন্ত্রের শত্রু, রাজাকার-আলবদর, স্বাধীনতাবিরোধী বা জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করেননি জেনারেল এরশাদ। গুম বা ক্রসফায়ারের মতো ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়েও চিন্তা করেননি, বা মাহমুদুর রহমানের মতো জেলে পচাবার কথাও ভাবেননি, দুই স্বৈরাচারে এ যা পার্থক্য।
দুনিয়ার অনেক দেশে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বাজি ধরার প্রচলন দেখা যায়। বর্তমান আওয়ামী আমলে এমন দুঃসাহসী কেউ কি আছেন যিনি ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে বাজি রাখতে আগ্রহী হবেন? জোর দিয়েই বলা যায় অসম্ভব!
কারণটা একেবারেই স্পষ্ট। ‘আওয়ামী লীগ নির্বাচনমুখী দল, পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখলে বিশ্বাসী নয়’ বলেই কি গণতন্ত্রের এই শ্মশানযাত্রা? নির্বাচন মানেই জেতা, সে ‘যে কোনো উপায়’ এই যখন দর্শন হয়ে ওঠে ক্ষমতাসীনদের তখন রোজ কিয়ামত হয়ে গেলেও ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখা একেবারেই স্বাভাবিক।
সুতরাং আসন্ন পৌর নির্বাচনেও ‘হারবে গণতন্ত্র জিতবে আওয়ামী লীগ’ এই ধারণার বিপক্ষে বাজি ধরার মতো কাউকে পাওয়া যাবে কি?

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫