ঢাকা, মঙ্গলবার,২১ মে ২০১৯

আলোচনা

বাঙালির প্রাণের গায়কপাখি আব্বাসউদ্দীন

ড. নাসের হোসেন

২৪ ডিসেম্বর ২০১৫,বৃহস্পতিবার, ১৭:০৭


প্রিন্ট

ভারতের অনগ্রসর সমাজের মানুষ, বিশেষ করে শ্রমিক, মাঝি, গাড়োয়ান, মজুরদের সামনে যখন বিনোদনের কোনো প্রশস্ত পরিসর ধরা দেয়নি, সেই প্রত্যুষে গানের পাখি হয়ে আনন্দ ও বিনোদনের ডালি হাতে হাজির হয়েছেন বাঙালির প্রাণের শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। আর কেবল শ্রমিক-মাঝি প্রভৃতি পিছিয়ে পড়া সামাজিক সম্প্রদায়ের কথাই বা বলি কেন- বাঙালি মুসলমান সমাজ যখন গানবাজনাকে সংস্কৃতির উপাদান বা বাহন হিসেবে ভাবতে ও গ্রহণ করতে ঠিক অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি, তখন এক প্রতিকূল পরিবেশে সঙ্গীতের সুন্দর সাধনা ও প্রয়োজনীয় প্রচারণার প্রাথমিক ধাপটি ব্যক্তিগত ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় নির্মাণ করেছিলেন আব্বাসউদ্দীন। সমাজে প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাসের বিপরীতে মানবিক এবং বৈশ্বিক অনুপ্রেরণা জাগরণ প্রতিষ্ঠা ছিল সাধনার মূল বিষয়। সমাজ-রূপান্তরের আধুনিক ও প্রাগ্রসর এই রূপকার কাজ করেছেন নিবিড় নিষ্ঠা আর প্রাতিস্বিক ভাবনাবলয়ের আভিজাত্যে। মানুষের সরল জিজ্ঞাসার জায়গাটিতে সমাধানের সোনালি ও সম্ভবপর সব প্রলেপ লাগানোর সফল কারিগর এই সঙ্গীতসাধক। তিনি সঙ্গীত প্রচারক এবং প্রসারকও বটে।
বাংলা গানের অভিভাবকসম ব্যক্তিত্ব তিনি; বাংলার লোকসঙ্গীত-সংসারের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। পুরো নাম আব্বাসউদ্দীন আহমদ। আব্বাসউদ্দীন নামেই সমধিক পরিচিত। বিশেষত পল্লীগীতির শিল্পী হিসেবে সারা বাংলায় খ্যাত ও সমাদৃত। আদি নিবাস ভারতের কুচবিহারের তুফানগঞ্জ এলাকায়। পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন জোতদার এবং পেশায় অ্যাডভোকেট। পারিবারিক আবহে, স্বাভাবিকভাবেই, তিনি সামাজিক সঙ্কট ও বিভ্রান্তি অবলোকনের সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর মানস গড়ে উঠেছিল সমাজ-রূপান্তরের সমাগত পরিপ্রেক্ষিতের ভেতর দিয়ে। এই স্বভাবশিল্পী তাঁর চার পাশের জীবনাচার, মানুষের প্রাণের তাগিদ, সমাজের গতি ও প্রগতির দিকে প্রসারিত রেখেছিলেন অনুসন্ধানী দৃষ্টি। শৈশব থেকেই আব্বাসউদ্দীন গানবাজনার প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলেন সরল ও স্বাভাবিক প্রাণময়তায়। অদ্ভুত সুন্দর ছিল তাঁর কণ্ঠ; দারুণ আকর্ষণীয় ছিল গানের গলা। গান আয়ত্ত করার বা মনে রাখার ক্ষমতাও ছিল অবিশ্বাস্য রকম; যেকোনো গান দু-একবার শুনেই অবিকল সুরে গাইতে পারতেন তিনি।
ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণেই তিনি সমকালে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন এবং উত্তরকালেও নিজের প্রভাব ও অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন কেবল শৈল্পিক সাফল্যের ওপর ভর করে। এই সাধক সঙ্গীতশিল্পী কখনো কোনো শিক্ষকের বা গুরুর কাছে শিক্ষা বা তালিম নেননি। নিজের প্রচেষ্টায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে নিখুঁতভাবে গান গাওয়ার রীতি ও কৌশলাদি আয়ত্ত করেছেন মেধা আর কণ্ঠের কারুকাজ কাজে লাগিয়ে। সঙ্গীতে পারফর্ম ও পাবলিসিটিতে অনন্যসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ এবং বাংলাদেশ সরকার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করে। তবে পুরস্কার দু’টি ছিল মরণোত্তর। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগেই মারা গেছেন তিনি; কিন্তু পাকিস্তান সরকার তাঁকে জীবিতকালে সম্মাননা জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই মনে হয়। গুণীজনকে জীবিতকালে সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে আমাদের পিছিয়ে-পড়া স্বভাব কিংবা প্রফেশনাল জেলাসির কথাও এ প্রসঙ্গে খানিকটা সামনে এসে পড়ে। সবকিছুর ভেতরে ও আড়ালে আমাদের বিবেচনা হলো- এসব সামাজিক-রাষ্ট্রীয় সম্মাননার গণ্ডির অনেক উপরে শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অবস্থান; যে জায়গাটাকে ঠিক সীমিত পরিসরের পুরস্কারের কাঠামোয় আঁকা যায় না। আর এ কথাও ঠিক যে, মরণোত্তর পুরস্কার দেয়ায় তিনি আলোকিত হননি; বরং আমরা আনন্দিত হয়েছি; প্রসারিত হয়েছে আমাদের সংস্কৃতির উঠান ও সাধনার শোভা।
চাকরিতে প্রবেশের অল্পকাল পরেই কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে প্রফেশনালি সঙ্গীতভুবনে প্রবেশ করেন। কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানি হিজ মাস্টার্স ভয়েস থেকে নজরুলের ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে’, ‘স্মরণ পারের ওগো প্রিয়’; শৈলেন রায়ের ‘আজি শরতের রূপ দীপালি’; এবং জীতেন মৈত্রের ‘ওগো, প্রিয়া নিতি আসি’- এ চারখানি গান রেকর্ড করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তিনি তখনকার কলকাতায় গানের ভুবনে জনপ্রিয়তা সৃষ্টিকারী একজন অনবদ্য ও অনুকরণীয় কণ্ঠকারিগর। আব্বাসউদ্দীনের তারুণ্যভরা ভরাট কণ্ঠ তখনকার বাঙালি শ্রোতার কাছে ছিল আনন্দঘন অধীর অপেক্ষার বিষয়। নজরুলসঙ্গীতের রেকর্ড প্রকাশে তাঁর সাফল্য আজো আমাদের সঙ্গীতের ইতিহাসে উজ্জ্বল ইশারা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ‘বেণুকার বনে কাঁদে বাতাস বিধুর-/সে আমারি গান প্রিয় সে আমারি সুর’, ‘অনেক ছিল বলার’, ‘গাঙে জোয়ার এলো’, ‘বন্ধু আজো মনে রে পড়ে’- নজরুলের এসব গানের রেকর্ড প্রচারে চার দিকে প্রবল সাড়া পড়ে যায়। অতঃপর এই সঙ্গীতসাধক নজরুলকে দিয়ে ইসলামি গান লিখিয়ে তাতে কণ্ঠ দেন। আর এভাবে, সরলভাবনাকে সম্বল করে, বৃহৎ ও অনগ্রসর মুসলমান সমাজে সঙ্গীতের প্রবাহ প্রচলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। সেদিন তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন- বাঙালি মুসলমানের মনে কী ধরনের জীবন-জিজ্ঞাসার বীজ ও বাতাস প্রবাহিত এবং তাতে কোনো কায়দায় আনন্দ ও বার্তা প্রবেশ করানো যেতে পারে। তৎকালীন মুসলমান সমাজের অধিকাংশ প্রতিনিধি ও সদস্য সঙ্গীতের প্রতি ছিল ভীষণ বীতশ্রদ্ধ। বিশেষত জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে-থাকা এবং যুগের বাণীকে আত্মস্থ করতে না-পারার বিষয়াদিই ছিল এর মূল কারণ। গান গাওয়া ও গান শোনা- উভয়ই ছিল তাদের কাছে অধর্মের কাজ। এমন একটি ভীষণ প্রতিকূল প্রতিবেশে সাধারণভাবে মুসলিম সমাজের এবং বিশেষভাবে সব ধর্ম-শ্রেণীর সাধারণ মানুষের প্রাণের চাহিদা অনুযায়ী সঙ্গীত-সরবরাহ করার প্রতি তাঁর অভিনিবেশ সত্যিই আজ নিবিড় গবেষণার বিষয়। আজ এতদিন পরেও অনুমান করা যায়, অনুসন্ধিৎসা ও সমাজ-রূপান্তরের অভিজ্ঞান ও আন্তরিকতাই ছিল তাঁর সমূহ সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। এ প্রসঙ্গে মনে করা যায়- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ’, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ/এল রে দুনিয়ায়/আয় রে সাগর আকাশ বাতাস, দেখবি যদি আয়’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’ প্রভৃতি দারুণ শ্রোতাপ্রিয় নজরুল সঙ্গীতের কথা। এসব ইসলামি গান শুনে সঙ্গীতের প্রতি তখনকার অনগ্রসর মুসলমান সমাজের আগ্রহ জেগেছিল- যা ছিল সমকালীন সমাজে রীতিমতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫