ঢাকা, বুধবার,১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পাঠক গ্যালারি

আমন ধানের দাম পাচ্ছেন না কৃষক

প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী

২৮ ডিসেম্বর ২০১৫,সোমবার, ১৯:০৩


প্রিন্ট

২০১৩ সালে প্রতি কেজি আমন ধানের উৎপাদনে খরচ হয়েছিল ১৭ টাকা দুই পয়সা। গত বছর প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ব্যয় ছিল ১৮ টাকা। এ তথ্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের। এ হিসাবে প্রতি মণ ধান (৪০ কেজি) উৎপাদনে চাষির খরচ হয় ৭২০ টাকা। অথচ এ সময় প্রতি মণ ধান বিক্রি হয়েছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এ হিসাবে চাষি প্রতি মণ ধানের উৎপাদনে লোকসান দিয়েছেন ১২০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত। বাড়তি ব্যয়ে সেচ দেয়ায় বোরো চাষে কৃষকের লোকসানের পরিমাণ আরো বেশি। চলতি বছরে শ্রমিকের মজুরি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে ধানের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ার কথা। অথচ পোকার আক্রমণে এবার ফলন হচ্ছে কম। আমন ধান সংগ্রহের ভরা মওসুমে বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকার মধ্যে। তাই চাষির লোকসান আরো বেশি হবে। বোরোর পরও আমন ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষক এখন অনেকটা দিশেহারা। তারা কৃষিঋণ নিয়ে ধানচাষ করেছেন। এখন ঋণ শোধ করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। ধানচাষ যেন অনেকটা গলায় ফাঁস। জানা গেছে, ধানচাষে ক্রমাগত লোকসান দেয়ায় অনেকেই ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে বিগত কয়েক বছরে ধানের চাষ কমে আসছে। এটা জাতির জন্য অশনি সঙ্কেত। উল্লেখ্য, বর্তমানে খাদ্য উৎপাদনে দেশ প্রায় স্বয়ংসম্পন্ন। ধানের আবাদ কমে গেলে দেশ আবার চাল আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। তবে একই জমিতে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় হয়তো এখনই চাল উৎপাদন কমছে না। এ দিকে অতি উচ্চফলনশীল জাতের ধানের চাষ এবং প্রচুর সারের ব্যবহারে ক্রমেই জমির উৎপাদিকাশক্তি কমের দিকে। তাই জমির মাটি ঠিক রাখতে চাষিদের কেমিক্যাল সার কম ব্যবহার করতে হবে- অধিক ব্যবহার করতে হবে প্রাকৃতিক সার (গোবর, কম্পোজিট সার প্রভৃতি)।

দীর্ঘ দিন ধান উৎপাদনে কৃষকেরা লোকসান দিয়ে আর বেশি ধান উৎপাদন করতে পারবেন না বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। চলতি ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে দেশের খাদ্য-নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে তারা মনে করেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব মোতাবেক বিগত পাঁচ বছরে ধান উৎপাদনের খরচ প্রতি কেজিতে বেড়েছে পাঁচ টাকা ৪৬ পয়সা। সেচের জন্য বোরো ধানের উৎপাদন খরচ আরো বেড়ে দাঁড়ায় ছয় টাকা ৭৮ পয়সা। শতকরা হিসাবে ধানের ব্যয় বেড়েছে ২৯ থেকে ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত। ২০০৯ সালে আমন ধানের কেজিতে উৎপাদন ব্যয় ছিল ১৩ টাকা ৪০ পয়সা। ২০১৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১৮ টাকায়। ওই সালে বোরোধানের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৩ টাকা ৩২ পয়সা। ২০১৪ সালে ধান উৎপাদনে ব্যয় দাঁড়ায় ২০ টাকা। সরকার চাল ক্রয় করে প্রতি কেজি ২৮ টাকায়। কিন্তু সে চাল সরকারি গুদামে জমা দেয়ার ক্ষমতা নেই প্রান্তিক চাষিদের। স্থানীয় দলীয় ক্যাডার, টাউট, জোতদার, ধানের ব্যবসায়ী ও ধানকলের মালিকেরা সিন্ডিকেট করে সরকারি গুদামে চাল জমা দেন। সাধারণ চাষিরা গুদামের কাছেও ভিড়তে পারেন না। অধিকন্তু গুদামের কর্মকর্তারা চাষিদের কাছ থেকে চাল কিনতে আগ্রহী নন। কারণ তাদের থেকে তারা টুপাইস কামাই করতে পারেন না। তারা যা পাওয়ার তা সিন্ডিকেটওয়ালাদের কাছ থেকেই পেয়ে থাকেন। অসাধু কর্মকর্তা ও অসাধু ব্যবসায়ীরাই ধান-চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা অসহায় চাষিদের ঘামঝরা পরিশ্রমের ফসল পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য করেন। অন্য দিকে চাষিরা তাদের ঋণের টাকা শোধ করার জন্য ধান ধরে রাখতে পারেন না। ফলে উৎপাদিত খরচের চেয়ে কম দামেই ধান বিক্রি করতে হয়। সরকার এখনো এ অনৈতিক নিয়ম ভাঙতে পারেনি। এতে দলীয় ক্যাডারদের ‘টুপাইস’ কামাইয়ের পথ খোলা রাখছে। এ দিকে চাষিরা ধান চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় দেশ যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন হচ্ছে তা বাধাগ্রস্ত হবে এবং খাদ্য-নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তখন লাখ লাখ টন চাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের এখনই সজাগ হওয়া উচিত।
বিগত কয়েক বছরে আমন ধানের জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তবে একই জমিতে বছরে দু-তিনটি ফসল উৎপাদনে এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে অধিক ফলনশীল ধান উৎপাদন করায় এটি হয়তো আপাতত তেমন দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু জমির উৎপাদন শক্তি ও জমি আরো কমে গেলে ধানের উৎপাদনও কমে যেতে পারে। অপরিকল্পিত বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, বাজার নতুন নতুন তৈরি হচ্ছে। তার সাথে আছে নদীভাঙন। তদুপরি ছোট্ট দেশে মানুষের অস্বাভাবিক চাপের জমি কমে গেছে।
ধানের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায়, আমন মওসুমে দৈনিক কৃষিশ্রমিকের মজুরি ছিল ২৮০ টাকা। তা বেড়ে ২০১৪ সালে দাঁড়ায় ৩০০ টাকা। তা ছাড়া বীজ, সার, বিদ্যুৎ প্রভৃতির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। বীজের দাম বেড়েছে কেজিতে দুই টাকা। বোরো উৎপাদনে পানি সেচের জন্য প্রতি বিঘায় খরচ হয় ৭০০ টাকা। বিদ্যুতের মূল্য প্রতি ইউনিটে বেড়েছে ১ টাকা। ধারাবাহিকভাবে নানা ব্যবহারে জমি কমে যাচ্ছে। গত বছর আমন ধানের চাষ হয়েছে ৫৫ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর আগের বছর ৮০ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে আমন চাষ হয়েছিল। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৪৮ লাখ ১০ হাজার হেক্টরে বোরোধানের চাষ করা হয়েছিল। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টরে বোরোধানের চাষ হয়েছে। ২০১৩-১৪ সালে মাত্র ২০ হাজার হেক্টর বাড়িয়ে ৪৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টরে বোরোধানের চাষ হয়।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, অনেক জেলায় ধানচাষের জমি কমে গেছে। অবশ্য সেসব জমি অনাবাদি ছিল না। শাকসবজি উৎপাদনে লাভ বেশি হওয়ায় চাষিরা সেই দিকে আগ্রহী হন। ২০১৪ সালের প্রথম দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় চাষিরা তাদের উৎপাদিত শাকসবজি বিক্রি না করতে পারায় তা মাঠেই নষ্ট হয়ে যায়। এ বছর অসময়ে প্রবল বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও শাকসবজি ভালো হওয়ায় এবং চাষিরা ভালো দাম পাওয়ায় তাদের মুখে হাসি দেখা যাচ্ছে। তবে এখানেও দালাল, ফড়িয়া ও আড়তদারেরা অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এসব সিন্ডিকেটওয়ালাকে দমন না করতে পারলে চাষিদের ভাগ্য ফিরছে না। ঋণের টাকায় চাষবাস করতে হয় বলে সুদ-আসল শোধ করতেই চাষিরা সর্বস্বান্ত হয়ে যান। এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতিবিদ ড. শামসুল আলম বলেন, কয়েক বছর ধরে খাদ্যশস্যের বিশেষ করে চালের মূল্য স্থিতিশীল থাকায় মানুষ কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে। দেশে ৩৫ শতাংশের বেশি দরিদ্র মানুষ। তাদের জন্য এটি স্বস্তিদায়ক বটে। তবে বাস্তবতা হলো, এ সময়ে খাদ্য উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাই স্বল্পমেয়াদি খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের সহায়তার জন্য উৎপাদনের ওপর ভর্তুকি বাড়িয়ে দিতে হবে। জাপান ৭০ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র ৪৫ শতাংশ ৗ ইউরোপীয় দেশগুলোতে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি তাদের কৃষিপণ্যে দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে সেখানে ভর্তুকি মাত্র ২০ শতাংশের নিচে। সরকার ক্রয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এনে চাষিদের কাছ থেকে তাদের উৎপাদিত পণ্য কিনেও তাদের সহায়তা করতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে ধানের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে মতামত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক মুক্তবাজারে, আমাদের কৃষি খাতেও ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে। শুধু বাড়ালেই হবে না, তার সুফল যাতে প্রান্তিক চাষির হাতে পৌঁছে, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমদানি করা খাদ্যদ্রব্যের ওপর সিন্ডিকেট করে রমজানে পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করা হয়। এখন দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় পণ্যের ওপরও সিন্ডিকেট ব্যবসা চলছে। ফলে চাষিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। অথচ মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট ব্যবসা করে কোটিপতি হয়ে যাচ্ছে। এই অনৈতিক ব্যবসাচক্র না ভাঙতে পারলে কৃষকেরা কখনো তার পরিশ্রমের মূল্য পাবেন না। এ ছাড়া কৃষককে সার, বীজ, পানি সেচ, কীটনাশক ও বিদ্যুৎ স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করতে হবে, যাতে উৎপাদন খরচ কম পড়ে। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও উৎপাদন খরচ কমানো যেতে পারে। শাইখ সিরাজের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মতো কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে চালাতে পারলে দেশে চাষাবাদের বেশ কল্যাণ হবে। ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। ফলে উৎপাদন খরচ কম পড়বে। এ দেশের কৃষি টিকে আছে প্রান্তিক চাষিদের পারিবারিক শ্রম দেয়ায়, যে কোনো মূল্য পরিবারের সদস্যদের দেয়া হয় না।
বাংলাদেশের কৃষকেরা অক্ষরজ্ঞান পাননি। কিন্তু তাদের মননশীলতা ভালো। নতুন জ্ঞান তাদের বুঝিয়ে দিতে পারলে তাদের ফসলি জমিতে সোনালি ফসল ফলাতে পারেন। মাঠপর্যায়ে হাতেকলমে আধুনিক পদ্ধতির চাষবাস শেখালে তা তারা সহজেই আয়ত্ত এবং মাঠে তা প্রয়োগ করতে পারেন। সুন্দর জমি ও মিঠা পানির সরবরাহ ফসল উৎপাদনে খুবই সহায়ক। তবে এ দেশটি বেশ দুর্যোগপূর্ণ। বন্যা, ঝড়-বৃষ্টি, খরা, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন দুর্যোগ তাদের চাষবাসসহ অর্থনীতিকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। তখন নিজ পায়ে দাঁড়ানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এর কিছু লাঘব হতে পারে যদি কৃষি বীমা চালু করা যায়। এটি চাষির জন্য একান্ত প্রয়োজন। প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যায়, হাইব্রিড বীজের কথা বলে সরল-নিরীহ চাষিদের প্রতারিত করা হচ্ছে। সার, কীটনাশকেও ভেজালের অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়। বন্যা ও লবণাক্ত পানিতে বাঁচতে পারে এমন ধরনের ধান উদ্ভাবন করতে হবে। ভারত অভিন্ন নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পানি আসতে বাধার সৃষ্টি করছে। এ দিকে আমাদের এখন প্রধান উৎপাদন ইরি-বোরো। আর তা হয় শুষ্ক মওসুমে। তখন নদীর পানির একান্ত প্রয়োজন। অথচ গ্রীষ্মকালে পানির অভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মরুকরণ দেখা দিচ্ছে। ভারত থেকে যেকোনোভাবে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে; অন্যথায় আমাদের কৃষিতে মহাবিপর্যয় দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের এক কোটি ৮০ লাখ কৃষক পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। আমাদের দেশ এখনো কৃষিপ্রধান।

লেখক : পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫