ঢাকা, মঙ্গলবার,১৯ মার্চ ২০১৯

ধর্ম-দর্শন

ইসলামবিহীন বিশ্ব-০৪

গ্রাহাম ই ফুলার

০৪ জানুয়ারি ২০১৬,সোমবার, ১৯:১২


প্রিন্ট

ইসলাম ও মুসলিম এখনকার বহুল আলোচিত দু’টি শব্দ। সমাজতন্ত্র পতনের পর ইসলামকেই পাশ্চাত্যের সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের অনেকেই ইসলামকে বর্তমান সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে অভিহিত করছে। অনেকে তো ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের প্রতিশব্দ হিসেবেও উল্লেখ করছে। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাশ্চাত্যের আগ্রাসন, ভুলনীতির কারণেই ক্ষুব্ধ হচ্ছে মুসলিমরা। এমন এক প্রেক্ষাপটেই গ্রাহাম ই ফুলারের ‘এ ওয়ার্ল্ড উইথআউট ইসলাম’ বইটি অনুবাদের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। লেখক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, র‌্যান্ডের সাবেক সিনিয়র রাজনীতিবিজ্ঞানী এবং বর্তমানে সাইমন ফ্রেসার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাজাঙ্কক্ট প্রফেসর। তিনি প্রায় দুই যুগ মুসলিম বিশ্বে বসবাস করেছেন, কাজ করেছেন। এ বইয়ের প্রতিটি বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। তার ব্যাখ্যা ভিন্ন এক ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তি ইসলামকে সমসাময়িক পরিপ্রেক্ষিতে কিভাবে দেখেছেন সে বিবেচনায় মূল্যায়ন করতে হবে। এর সাথে দ্বিমত পোষণের অনেক অবকাশ থাকবে। এর পরও লেখকের মূল দৃষ্টিভঙ্গি বুঝার জন্য কোন ব্যাখ্যা ছাড়া এখানে কেবল অনুবাদ করা হয়েছে। এর ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ

(গত সংখ্যার পর)

খ্রিষ্টান ও ইসলাম সম্পর্কে ইহুদি দৃষ্টিভঙ্গি
ইহুদিদের খ্রিষ্ট ধর্মের সমালোচনা সুস্পষ্টভাবেই পরবর্তীকালের বিপুলসংখ্যক খ্রিষ্টানকে ধর্মভ্রষ্ট এবং একই সাথে ইসলামি ধর্মতত্ত্বকে প্রভাবিত করেছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বেশি স্পর্শকাতর প্রথম ও একক ইস্যু ছিল মসিহ (ত্রাণকর্তা) প্রকৃতি-সম্পর্কিত অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি : যিশু ছিলেন মসিহ, যাঁর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী ওল্ড টেস্টামেন্টে করা হয়েছে বলে খ্রিষ্টানেরা বিশ্বাস করলেও ইহুদিরা যিশুর মসিহ হওয়ার ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করেছে। অনেক খ্রিষ্টানের দৃষ্টিতে ইহুদিরা হলো সব ধরনের ধর্মভ্রষ্টদের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য, কারণ তারা মসিহর আগমন সম্পর্কে তাদের নিজেদের কিতাবের কথিত ভবিষ্যদ্বাণীই আসলে অস্বীকার করছে। ইহুদি পণ্ডিতেরা এই যুক্তি পুরোপুরি অস্বীকার করে দাবি করেন, এটা সুস্পষ্ট যে ওল্ড টেস্টামেন্টে মসিহ সম্পর্কে যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে, যিশু সে অনুযায়ী মসিহ নন। তারা দাবি করেন, সত্যিকারের মসিহকে মসিহ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে মসিহসংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ করতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে : তাকে রাজা ডেভিডের (হজরত দাউদ আ:) পুরুষ বংশধরদের ধারায় জন্মগ্রহণ করতে হবে (বলা হয়ে থাকে, আল্লাহ তাঁকে জন্ম দিয়েছেন); তাঁকে তাওরাতের বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে (যিশু কোনোভাবে তা করেননি, এবং বাস্তবিকই বিধানটি পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন)। সত্যিকারের মসিহ বিশ্বে শান্তির নতুন যুগেরও সূচনা করবেন; ঘৃণা, বিদ্বেষ থাকবে না। এমনটাও ঘটেনি। ওল্ড টেস্টামেন্টে প্রত্যাশা করা হয়, আগমনের সাথে সাথেই মসিহ এসব ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ করবেন, ‘দ্বিতীয় আগমনের’ (যার কোনো উল্লেখ নেই ওল্ড টেস্টামেন্টে) পর নয়। যিশু বা অন্য কারো কোরবানির বিনিময়ে মানবজাতির রক্ষা পাওয়ার ধারণাও ইহুদিরা স্বীকার করে না। তাদের মতে, ইহুদি বিধানে বর্ণিত নির্দেশিত সত্যনিষ্ঠ জীবনযাপনই মুক্তির একমাত্র উপায়।

ইহুদি ধর্মের একেশ্বরবাদ গ্রহণ এবং সেটাকে কলুষিত করা; ইহুদিদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি এবং ইহুদি ধর্মকে দুর্বল করার জন্যও ইহুদিরা যিশুর ভর্ৎসনা করে থাকে। মধ্যযুগের মহান ইহুদি দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ মাইমোনিদেস (মুসলিম স্পেনে বসবাস করেছিলেন) কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেছিলেন : এই পরিকল্পনা (ইহুদি জাতিকে কোনো চিহ্ন না রেখে পুরোপুরি বিলুপ্ত করে দেয়া) গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন নাজারানের যিশু, তার হাড় ধুলায় মিশে যাক...। তিনি তাওরাতের প্রতি সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং প্রতিটি ও সব ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তিনিই যে মসিহ, সেটা এবং তাকে নবী হিসেবে বিশ্বাস করতে লোকজনকে প্ররোচিত করেছেন। তিনি এমনভাবে তাওরাত এবং এর অনুশাসনের ব্যাখ্যা করতেন, যার ফলে সেগুলোর পুরোপুরি বাতিলের পথে, এর সব নির্দেশনা বিলোপের এবং এর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের দিকে তাদেরকে চালিত করত। রহমতপুষ্ট স্মরণশক্তিসমৃদ্ধ জ্ঞানী ব্যক্তিরা আমাদের জনগণের মধ্যে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার আগেই তার পরিকল্পনাগুলো সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলেন এবং তার জন্য যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন।

অর্থাৎ ইহুদি দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, এসব যুক্তি ওল্ড টেস্টামেন্টে মসিহ সম্পর্কে ইহুদিদের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করা থাকলেও তারা স্বেচ্ছাচারমূলকভাবে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করছে বলে খ্রিষ্টানেরা যে দাবি করে তা বাতিল করে দেয়। বরং এসব সমালোচনায় দেখা যায়, ইহুদি পণ্ডিতদের কাছে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ ছিল, তাদের কাছে থাকা ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী মসিহ হওয়ার যোগ্যতার জন্য যেসব শর্ত ছিল, যিশু তা পূরণ করতে পারেননি। ইসলাম এ ব্যাপারে আসলে মাঝামাঝি পথ গ্রহণ করেছে এই বলে যে যিশু ছিলেন আল্লাহর অন্যতম মহান নবী এবং তিনি সত্যিই কুমারি মরিয়মের (ভার্জিন মেরি) গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। পবিত্র কুরআনের উনিশতম সূরার নামকরণ করা হয়েছে ‘মরিয়াম’ বলে। পবিত্র কুরআনে তার সম্পর্কে অন্য যেকোনো নারীর চেয়ে বেশিবার উল্লেখ করা হয়েছে, এমনকি নিউ টেস্টামেন্ট (বাইবেল) থেকেও বেশিবার। ইসলামে তিনি সবচেয়ে পবিত্র নারী ব্যক্তিত্ব।

অবশ্য ইসলাম অনুযায়ী, যিশু নিজে খোদা নন কিংবা তিনি জৈবিক অর্থে আল্লাহর ছেলেও নন। তবে তিনি আল্লাহর রূহসমৃদ্ধ মানব নবী। আল্লাহ কঠোরভাবে একক। আর মুসলমানদের জন্য মহান নবী হিসেবে যিশুকে কোনো ধরনের অস্বীকার করাটা ইসলামি বিশ্বাসেরই লঙ্ঘন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মুসলমানেরা নিয়মিতভাবে যিশুর মর্যাদা অবমাননাকারী শিল্পকর্মকে ব্ল্যাসফেমি হিসেবে অভিহিত করে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে দৃঢ়ভাবে যিশুকে ‘আল্লাহর কালাম’ হিসেবে, ‘আল্লাহর রূহ’ হিসেবে এবং ‘আল্লাহর নিদর্শন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের কোথাও যিশু সম্পর্কে কোনো ধরনের অমর্যাদাপূর্ণ কথা বা মন্তব্য করা হয়নি। ফলে ইসলামবিহীন বিশ্বে যিশু সম্পর্কে ইহুদি ধর্মে বর্ণিত অনেক কঠোর ইহুদি সমালোচনা নিশ্চিতভাবে বিরাজমান থাকবে।

ইহুদি ধর্ম সেই সাথে হজরত মুহাম্মদ সা: নবী হিসেবে স্বীকার করে না। তবুও ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের মধ্যকার সম্পর্ক অবাক করা। মননশীলতার দিক থেকে খ্রিষ্টান ধর্মের তুলনায় ইহুদি ও ইসলাম ধর্ম দু’টির মধ্যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা অনেক বেশি। ইহুদি ও ইসলাম উভয় ধর্মই কঠোরভাবে একেশ্বরবাদী, উভয় ধর্মেই প্রতিদিন কয়েকবারের ইবাদতে আল্লাহর একত্বের কথা ঘোষণা করা হয়। ইহুদি ও আরব উভয়ই সেমিটিক জনগোষ্ঠী, তারা অনেক বেশি অভিন্ন ব্যাপ্তি, অভিন্ন ইতিহাস লালন করে, তারা যে ভাষায় কথা বলে, সেগুলো ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। ইসলাম ও ইহুদি উভয় ধর্মই কঠোরভাবে অনুশাসনভিত্তিক, ব্যক্তিজীবনে অনুশাসন অনুশীলনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত মুক্তির ধারণায় বিশ্বাসী। উভয়েরই ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী অনেক ইস্যু নিরসনের জন্য সামাজিক অনুশাসন আদালত রয়েছে। ইহুদি ধর্ম দৃঢ়ভাবে বলে, খোদাকে মূর্ত বা ব্যক্তি হিসেবে রূপায়িত করা যায় না, তিনি কোনো ধরনের মানবীয় আকার ধারণ করেন না। ইসলাম খোদাকে মানবীয় গুণে তুলে ধরার ওই ধারণা সম্পর্কে একই বিশ্বাস পোষণ করে। ফলে ইহুদি ও মুসলমান উভয়ের কাছেই খ্রিষ্টান শিল্পকলা (বিভিন্ন স্টাইলে- সাধারণত সাদা পোশাকে, সাদা দাড়িতে, শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধলোক হিসেবে ঈশ্বরকে এবং নানা অবয়ব এবং সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততায় ব্যাপক বৈচিত্র্যে যিশুর ছবি ছড়িয়ে দেয়া সংশ্লিষ্ট) ব্ল্যাসফেমিমূলক না হলেও বেদনাদায়ক বিষয়।

খাবারবিষয়ক রীতিনীতি, প্রাণী জবাই, শূকর নিষিদ্ধ করা, পাকপবিত্রতার নানা বিধিনিষেধের ব্যাপারে ইহুদি ও ইসলাম উভয় ধর্মই অভিন্নতা অনুসরণ করে চলে। ইসলাম এগুলোর বেশির ভাগ ইহুদিদের কাছ থেকে লাভ করলেও জটিল ইহুদি ‘কোশার’ আইন ব্যাপকভাবে সহজ করেছে। প্রাচ্যের ইহুদিরা (সেফারদিম) কয়েক শ’ বছর মুসলমানদের সাথে বাস করার মাধ্যমে তাদের ধর্মের অনুশীলনে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে বাস করার সময় মানবজাতির রক্তাক্ত ইতিহাসে ইহুদিরাও দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। কিন্তু তবুও ইহুদি পণ্ডিতেরা প্রায় একবাক্যে স্বীকার করেছেন, খ্রিষ্টান সমাজের চেয়ে মুসলিম সমাজেই ইহুদি সম্প্রদায় ও ধর্ম অনেক বেশি ভালোভাবে ছিল। ইউরোপে হলোকাস্টের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পর ইহুদিদের আবাসভূমি হিসেবে (ফিলিস্তিনিদের ভয়াবহ মূল্যে) ১৯৪৮ সালে ইসরাইল সৃষ্টির পর নাটকীয় ও দুঃখজনক অধ্যায়ে রূপান্তরিত হয়ে এখন ইহুদি ও মুসলমানদের মধ্যকার সম্পর্ক উত্তেজনাকর ও ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বস্তুত পারস্পরিক অবিশ্বাসপূর্ণ সম্পর্কটি এখন পুরোপুরি ভূ-রাজনৈতিক, ভূখণ্ডগত মালিকানা নিয়ে যুদ্ধ এবং নবগঠিত ইসরাইল রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।
(চলবে)

অাগের পর্বগুলো দেখুন নিচের লিংকে-

ইসলামবিহীন বিশ্ব-০৩

ইসলামবিহীন বিশ্ব-০২

ইসলামবিহীন বিশ্ব-০১

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫