ঢাকা, শনিবার,১৬ নভেম্বর ২০১৯

ধর্ম-দর্শন

ইসলামবিহীন বিশ্ব-০৫

গ্রাহাম ই ফুলার

০৫ জানুয়ারি ২০১৬,মঙ্গলবার, ১৯:৪২


প্রিন্ট

ইসলাম ও মুসলিম এখনকার বহুল আলোচিত দু’টি শব্দ। সমাজতন্ত্র পতনের পর ইসলামকেই পাশ্চাত্যের সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের অনেকেই ইসলামকে বর্তমান সভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে অভিহিত করছে। অনেকে তো ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের প্রতিশব্দ হিসেবেও উল্লেখ করছে। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাশ্চাত্যের আগ্রাসন, ভুলনীতির কারণেই ক্ষুব্ধ হচ্ছে মুসলিমরা। এমন এক প্রেক্ষাপটেই গ্রাহাম ই ফুলারের ‘এ ওয়ার্ল্ড উইথআউট ইসলাম’ বইটি অনুবাদের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। লেখক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, র‌্যান্ডের সাবেক সিনিয়র রাজনীতিবিজ্ঞানী এবং বর্তমানে সাইমন ফ্রেসার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাজাঙ্কক্ট প্রফেসর। তিনি প্রায় দুই যুগ মুসলিম বিশ্বে বসবাস করেছেন, কাজ করেছেন। এ বইয়ের প্রতিটি বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। তার ব্যাখ্যা ভিন্ন এক ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তি ইসলামকে সমসাময়িক পরিপ্রেক্ষিতে কিভাবে দেখেছেন সে বিবেচনায় মূল্যায়ন করতে হবে। এর সাথে দ্বিমত পোষণের অনেক অবকাশ থাকবে। এরপরও লেখকের মূল দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য কোন ব্যাখ্যা ছাড়া এখানে কেবল অনুবাদ করা হয়েছে। এর ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ

(গত সংখ্যার পর)
ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্ম প্রশ্নে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
তিন ইব্রাহিমি ধর্মের শেষ ধর্ম হওয়ায় ইসলাম আগের ধর্ম দু’টির বিবর্তনের দিকে ফিরে তাকাতে সমর্থ হয়েছে। পবিত্র কুরআন অনুযায়ী, ওহি লাভের সময় ইহুদিরা বেশ কিছু মারাত্মক ভুল করেছিল : ইহুদিরা নিজেদের আল্লাহর একমাত্র মনোনীত জাতি হিসেবে দেখেছিল, তারা এক আল্লাহকে ইহুদিদের আল্লাহ হিসেবে মনে করেছিল, তারা ধরে নিয়েছিল, ইহুদি ধর্মের বার্তা কেবল ইহুদিদের জন্য। কিন্তু পবিত্র কুরআন বলে- না, আল্লাহর কোনো মনোনীত জনগোষ্ঠী নেই : ‘যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, দয়াময় তাদের জন্য সৃষ্টি করবেন ভালোবাসা।’ (কুরআন ১৯ : ৯৬)। এটা অবশ্যই সেন্ট পলের বক্তব্য (আল্লাহ কেবল ইহুদিদের জন্য নয়, সব মানুষের জন্য- যিশুর এই বাণী) এবং একই সাথে ইহুদি ধর্মের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ। অর্থাৎ ইসলাম তার ইহুদি পূর্বসূরিদের থেকে সংশোধনমূলক অবস্থান গ্রহণ করে এবং যিশু সর্বজনীনতার দাবি করেছিলেন বলে যে কথা সেন্ট পল ভাষ্যে রয়েছে, ইসলাম তা দ্বারা সম্ভবত প্রভাবিত।

আবার খ্রিষ্টধর্মের কিছু ব্যাপারে সমালোচনায় ইসলাম ও ইহুদি ধর্ম অভিন্ন অবস্থানও গ্রহণ করে। উভয়েই আল্লাহর কোনো ‘পুত্র’ থাকাটা এক আল্লাহর ধারণার (আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি, তাকে আরো ভাগে ভাগ করা যায় না) প্রতি ব্ল্যাসফেমি মনে করে। তাদের মতে, ত্রিত্ববাদ বহু ঈশ্বরবাদেরই নামান্তর, যা ইহুদি ও মুসলিম উভয়ের কাছেই খারাপ কাজ বিবেচিত। ইসলাম অনুযায়ী, যিশু ক্রসে মারা যাননি, তাকে আল্লাহ বেহেশতে নিয়ে গেছেন। আর হজরত মুহাম্মদ সা: নন, বরং এই যিশুই খ্রিষ্টবিরোধীদের দমাতে, ইসলামের শত্রুদের শাস্তি দিতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে কিয়ামতের আগে দুনিয়ায় ফিরে আসবেন।

যদিও সময়ের পরিক্রমায় ঐতিহাসিক বিবর্তন ধর্ম সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি বদলে দিয়েছে; এই বাস্তবতা বিভিন্ন ধর্মের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে। মুসলমানেরা এই বাস্তবতা প্রায়ই স্বীকার করে, যদিও তা কিছুটা নিজেদের সুবিধাজনক হওয়ার কারণে। একাধিকবার মুসলমানেরা আমাকে বলেছেন, “তিনটি ধর্মই আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে, তবে মানব ইতিহাসের বিবর্তনের নানা সময়ে সেগুলো তারা লাভ করেছে। আল্লাহ সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি প্রতিবারই আরো উন্নত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিগত পরিভাষায়, আমরা ইহুদি ধর্মকে ওয়ার্ড ২.০ বিবেচনা করতে পারি, ওই সফটওয়্যারটি ওই সময়ে খুবই যথাযথভাবে কাজ করত, তবে এখনো ইচ্ছা করলে তা দিয়ে কাজ চালানো সম্ভব। আর খ্রিষ্টান ধর্মের ব্যাপারে বলা হয়, এটা ওয়ার্ড ৫.০, সেটা আল্লাহর বাণী উপলব্ধিতে সফটওয়্যারের অনেক আপগ্রেডিং। এর পর ছয় শ’ বছর পর ইসলাম যা নিয়ে এলো তা অনেকটা ওয়ার্ড ৮.০-এর মতো। এটা আল্লাহ এবং তাঁর সব বাণী সম্পর্কে সবচেয়ে অত্যাধুনিক ধারণা। প্রতিটি ‘ভার্সন’ই কাজ করে, সবই গ্রহণযোগ্য, অবশ্য সময়ের পরিক্রমায় আপগ্রেড হয়েছে।”

মাইক্রোসফটের উপমা মেনে নিলেও কিছু নন্দিত মুসলিম চিন্তাধারার ধর্মীয় বিবর্তনের এই সংজ্ঞা গ্রহণ করা আমাদের জন্য বলতে গেলে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ধর্মের বিবর্তন উপলব্ধির এই একই ধারণা ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। কারেন আমর্স্টং তার ‘হিস্টরি অব গড’ গ্রন্থে সময়ের পরিক্রমায় ধর্ম উপলব্ধির ক্ষেত্রে মানুষের চলমান বিবর্তনের সুস্পষ্ট মাইলফলকগুলো শনাক্ত করেছেন।
উচ্চতর প্রযুক্তিগত নিজস্ব উপমাটি দিয়ে মুসলমানেরা যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন সৃষ্টির যে দরজাটি খুলে দিয়েছেন, সেটা ইসলামে সত্যিই ধর্মভ্রষ্টতা : তাহলে কি আরো নতুন ওহি তথা ওয়ার্ড ৯.০ আসার কোনোই সম্ভাবনা নেই? মুসলমানরা বিশ্বাস করে, নবী হজরত মুহাম্মদ সা: চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ বাণী নিয়ে এসেছেন, যা আর উন্নত করা যায় না; আর কোনো বৈধ নবীর আগমন ঘটবে না। এ কারণে হজরত মুহাম্মদ সা: ‘নবুওয়াতির সিলমোহর’। এ বিশ্বাসটি ইসলামকে বেশ অদ্ভুত স্থানে রেখেছে : ধর্মীয় ইতিহাসের পেছনের দিকে তাকালে তারা বেশ সহিষ্ণু, তবে সামনের দিকে তাকালে তথা মুহাম্মদ-পরবর্তী নতুন ওহি-সম্পর্কিত সম্ভাব্য যেকোনো ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অসহিষ্ণু। পরবর্তীকালে আসা আহমদিয়া, শিখ বা বাহাই ধর্মের সাথে ইসলামের তীব্র উত্তেজনার উৎস এখানেই নিহিত। এসব ধর্মের কিছু ভিত্তি ইসলামে রয়েছে, তবে বাস্তবে পরবর্তী নবীদের প্রচারিত ‘আপডেট’ ইসলাম। অসহিষ্ণুতার কারণেই এ তিনটি আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুসলিম আলেমরা প্রবলভাবে সোচ্চার। এসব ধর্মের অনুসারীরা বিভিন্ন মুসলিম দেশে নির্যাতনের শিকার হয়।
(চলবে)

অাগের পর্বগুলো দেখুন নিচের লিংকে-

ইসলামবিহীন বিশ্ব-০৪

ইসলামবিহীন বিশ্ব-০৩

ইসলামবিহীন বিশ্ব-০২

ইসলামবিহীন বিশ্ব-০১

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫