ঢাকা, রবিবার,১৬ জুন ২০১৯

উপসম্পাদকীয়

শিক্ষকেরা সম্মানের জন্য লড়ছেন

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

০৮ জানুয়ারি ২০১৬,শুক্রবার, ১৯:৪৯


প্রিন্ট

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। একজন নাছোড়বান্দা বীমা দালালের কবলে পড়েছিলাম। কিস্তি দিতে পারছিলাম না। এবার সে বাসায় এসে হাজির। বাসা থেকেও কিস্তির ব্যবস্থা হলো না। তাকে নিয়ে বিভাগে যাচ্ছিলাম। পথে পথে সে বিড়বিড় করছিল। ‘কী চাকরি করেন, এই সামান্য টাকা দিতে পারেন না, কী জন্য করেন। এর চেয়ে বরং আপনাকে একটা চ্যানেলে বড় চাকরি দিয়ে দেই। অনেক টাকা বেতন দেবে ওরা।’ আমি শুনেও শুনছিলাম না। বিভাগে গিয়ে আমার কক্ষে বসে সে ভিন্ন কথা বলল। ‘এবার বুঝতে পেরেছি, কী জন্য আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি করছেন। পথে পথে যে সালাম, সম্মান ও সমীহ আপনি পেয়েছেন, তা ওই সব উচ্চ বেতনের চাকরির চেয়ে অনেক শ্রেয়।’ এ ব্যক্তিগত নিবেদন এ জন্য যে, শিক্ষকদের চলমান আন্দোলন নিয়ে কেউ কেউ কটাক্ষ করছেন- এত টাকা দিলাম তার পরেও আন্দোলন! শিক্ষকেরা একটু ভিন্ন জাত। অর্থবিত্তের চেয়ে সম্মানই তাদের কাছে মূল্যবান। সমাজের আর সব পেশাধারীদের থেকে মর্যাদাকর এই চাকরি। বলা হয়ে থাকে, 'A profession with a difference' বাংলাদেশের সব পর্যায়ের সব শিক্ষক বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনক্রম নিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছে, তা নিছক অর্থবিত্তের জন্য নয়। সন্দেহ নেই আমাদের সমাজকাঠামোয় অর্থবিত্ত সম্মান ও সুবিধার একটি মানদণ্ড। তাই বেতনক্রম নির্ণয় করতে গিয়ে শিক্ষকদের যখন অবমূল্যায়ন করা হয়, তখন শিক্ষকেরা তাদের মর্যাদার জন্য লড়াই করতে বাধ্য। 

বর্তমান ঘোষিত পে-স্কেল বা বেতনক্রম নিয়ে অসন্তোষ সর্বত্র। এখন সাড়ে চার লাখ সরকারি কর্মকর্তা এবং পনেরো হাজার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আন্দোলনরত। রয়েছে আরো আশি হাজার বিশেষ পেশাজীবী কর্মকর্তারা। তারা হচ্ছেন- প্রকৌশল, কৃষিবিদ ও চিকিৎসকসহ (প্রকৃচি) অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা। তারা সবাই বিসিএস অর্থাৎ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তা। একমাত্র বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া সব ক্যাডারই আন্দোলনে শামিল রয়েছেন। এ ছাড়া আন্দোলনে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। পে-স্কেল বা বেতনক্রম-বিন্যাস এবং আন্দোলনরতদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে এটাই বোঝা যায় যে, এক বিশেষ শ্রেণী বিড়ালের পিঠা ভাগের দায়িত্ব নিয়েছে। ছলেবলে কলেকৌশলে বড় ভাগটা তাদের কাছেই রাখছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি অত্যন্ত পরিষ্কার। প্রজাতন্ত্রের দায়দায়িত্বে সমপর্যায়ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এবং ইতঃপূর্বের সব পে-স্কেলে নির্দিষ্ট উচ্চস্তরে বেতনপ্রাপ্তি সত্ত্বেও নতুন বেতন স্কেলে তাদের মর্যাদার এবং বেতনকাঠামোর অবনমন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের তরফ থেকে বলা হয়, সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল উঠিয়ে দেয়ার অর্থ হলো পূর্বতন পে-স্কেলে পাওয়া সুবিধাদির অবসান। পূর্বেকার পে-স্কেলে একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তা পদোন্নতি না পাওয়া সত্ত্বেও উচ্চতর বেতন স্কেলে উপনীত হতে পারতেন। বিধি মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক অংশ ইতঃপূর্বে সর্বোচ্চ বেতন স্কেল পর্যন্ত পৌঁছতে পারতেন। ঘোষিত পে-স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকই সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছতে পারবেন না।

পে-স্কেল ঘোষণার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের দাবিগুলো উপস্থাপন করে। সরকারকে তারা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পে-স্কেলের অসঙ্গতি এবং অসম্মানজনক অবস্থা নিরসনের আহ্বান জানায়। এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ে কয়েকটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আ স ম মাকসুদ কামাল অভিযোগ করেন যে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল অবদুল মুহিত বৈঠকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। মাকসুদ কামাল দাবি করেন ওই বৈঠকে টাইম স্কেল এবং সিলেকশন গ্রেড পুনঃসংযোজনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। অপর দিকে জনাব মুহিত দাবিগুলো স্বীকার না করে, ‘অজ্ঞতাবশত শিক্ষকেরা আন্দোলন করছেন’ বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, পে-স্কেলে কোনো গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য করা হয়নি। পে-স্কেল পুনর্বিবেচনার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে নিশ্চিত করেন। অবশ্য বিগত মন্ত্রিসভা বৈঠকে শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ স্বীকার করেন যে, সরকার ঘোষিত পরিপত্রে শিক্ষকদের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সমঝোতা প্রতিফলিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী অবশেষে অসঙ্গতি নিরসনের জন্য গঠিত ক্যাবিনেট কমিটিকে বিরোধ নিরসনের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশনার আগে মন্ত্রিপরিষদের নিয়মিত বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর যে মন্তব্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তা শিক্ষকসমাজকে আহত করেছে। শিক্ষকেরা সচিবের মর্যাদা চাওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে তিনি শিক্ষকদের সচিবের চেয়েও বেশি সম্মানীয় এ তুলনাও দিয়েছেন। শিক্ষকদের জন্য ভিন্ন বেতনকাঠামো হলে- এই তুলনাটি প্রযোজ্য হতো না; কিন্তু যখন প্রজাতন্ত্রের একটি কাঠামোয় সবাইকে একীভূত করা হয় বা অর্থের মানদণ্ডে মর্যাদা নিরূপিত হয়, তখন জ্ঞানসাধকদের আত্মসম্মানে লাগে বৈকি! পৃথিবীর ইতিহাস কখনোই ধনীদের এবং জ্ঞানীদের এক কাতারে দাঁড় করায়নি। অর্থবিত্ত বিলাসবসন সমাজকে চমৎকারিত্ব করলেও জ্ঞানীরা সমাজকে আলোকিত করার মাধ্যমেই নিজেদের সার্থকতা দেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী কোনো এক একুশে বইমেলার উদ্বোধন করতে গিয়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন করতে হলে জ্ঞানীদের সম্মান করতে হবে। দেশ-জাতি-রাষ্ট্রকে উচ্চমর্যাদায় আসীন করতে হলে দেশ গড়ার কারিগরদের যথার্থ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের বয়সসীমা সচিবদের সমান করতে বলেছেন। সচিবেরা একটি নির্দিষ্ট সময়কালে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন। আর শিক্ষকেরা সারাজীবনই জ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত থাকেন। সুতরাং শিক্ষকদের বয়স ৫৯ কিংবা ৬৫ তা বিবেচ্য নয়। শিক্ষকদের অফিসের সময়সীমার মতো কাজ করতে বলেছেন তিনি। শিক্ষকেরা তো ৯টা থেকে ৫টা অফিস করেন না। তার জ্ঞানসাধনা অব্যাহত থাকে দিন-রাত সব সময়। শিক্ষক গবেষকেরা গভীর রাতে গবেষণাগারে সময় অতিবাহিত করেন। অনেক শিক্ষক রাত জেগে জেগে পড়াশোনা করেন- পেশাগত প্রয়োজনে এবং জ্ঞানের আনন্দে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, শিক্ষকদের সেই জ্ঞানসাধনায় অনেক ভাটা পড়েছে। তার বড় একটি কারণ, সব শাসকদলের দলীয় প্রবণতা। প্রধানমন্ত্রীর আর একটি অভিযোগ সত্য। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশ পার্ট টাইম চাকরি করেন। সেটি করেন এ জন্য যে, বেতনকাঠামোয় তিনি বসবাস করেন তা অপ্রতুল। যাদের বড় সংসার তাদের কষ্ট করা ছাড়া উপায় থাকে না। শিক্ষকেরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আশস্ত করতে চান যে, তাদের উপযুক্ত বেতন দিলে তারা পার্ট টাইম চাকরি করবেন না। এটা সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুধাবন করতে হবে, আমলাতন্ত্র তার নিজস্ব ক্ষেত্রে অবশ্যই দক্ষ, নিষ্ঠাবান, মেধাবী এবং পরিশ্রমী। শিক্ষকেরা আমলাদের গুরু। সঙ্গতভাবেই শিক্ষকেরা সমাজের সবচেয়ে মেধাবী অংশ। নিজ নিজ ক্ষেত্রে উভয়ই মহিয়ান। সুতরাং বিরোধ অর্থহীন। জাতির প্রয়োজনে পরিপূরক ভূমিকাই কাম্য। ১২ বছরে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন বলে উষ্মা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। এখানে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় করা হয়। কোনো কোনো শিক্ষক ২০ বছরেও অধ্যাপক হন না। বিষয়টি শুধু সাধনানির্ভর। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আরো উৎকর্ষ অর্জনের জন্য ব্যবস্থা নেয়া যায়। তাদের অধ্যাপনা ও গবেষণা নিয়ে সন্দেহ করা যায় না। শিক্ষকেরা ঠিকমতো ক্লাস করেন না- প্রধানমন্ত্রীর এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, ‘সিস্টেম’ লস সব ক্ষেত্রেই আছে। কতিপয়ের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠকে দায়ী করা যায় না। প্রধানমন্ত্রী আরো ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, বেতন ডাবল করে দেয়ার পরও তাদের ক্ষোভ কেন? প্রথমত, তথ্য পরিসংখ্যান বলে যে প্রতিটি বেতন কমিশন পরবর্তী বেতনভাতাদি ডাবল করেছে। আসলে বেতনভাতা ডাবল না চার গুণ সেটি বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হলো জীবনযাপন ও বাজারদর ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা। দ্বিতীয়ত, দৃশ্যত বেতন ডাবল হলেও তা যেভাবে সমায়ন্তরে এবং মারপ্যাঁচে দেয়া হচ্ছে তা থেকে লাভবান হওয়া কষ্টকর। তৃতীয়ত, সবপর্যায়ের শিক্ষকেরা বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা টাকার অঙ্কে তাদের জীবনকে হিসাব করেন না। নবঘোষিত পে-স্কেলে শিক্ষকদের যে মর্যাদাহানি হয়েছে তাই তাদের শিরোপীড়ার কারণ। আগের তুলনায় কয়েক ধাপ নিচে নেমে গেছে শিক্ষকদের বেতন। বর্তমান পে-স্কেলে যে দু’টি সুপার স্কেলের সংযোজন ঘটেছে- তা অসঙ্গতির একটি উদাহরণ। অপর দিকে অধ্যাপকদের বেতন সচিবদের সমান না করে আর একটি অবনমন ঘটানো হয়েছে। শিক্ষকদের অন্যান্য স্তরেও অপমানজনক অবমূল্যায়ন ঘটেছে। জাতীয় অধ্যাপকদের মতো মর্যাদাকর পদকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়াই শিক্ষকদের দাবি। শিক্ষকদের আরো দাবি, সিনিয়র সচিবদের সমমর্যাদায় সিনিয়র প্রফেসর পদ সৃষ্টি করে প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সম্মানিত করা হোক।

আমাদের সমাজের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা মুখে খই ফোটানো। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘লিপ সার্ভিস’। প্রচলিত একটি গল্প এ রকম- একজন মান্যগণ্য ব্যক্তি বা মন্ত্রী শিক্ষকদের মধ্যে বক্তৃতা দিচ্ছেন। তিনি শিক্ষকদের, ‘ক্রিম অব দ্য সোসাইটি’ বলে অভিহিত করলেন। উত্তরে একজন চতুর শিক্ষক বললেন, ‘ক্রিম ঠিকই আছে- তবে তা আইসক্রিম- এ লিটল ব্যাম্বো ইনসাইড’। আমরা শিক্ষকদের এ রকম মূল্যায়ন চাই না। চাই প্রকৃত সম্মান। অর্থ আর সম্মান নিয়ে আর একটি গল্প। শালিসিতে একজন অর্থপিশাচ লোকের এক শ’ জুতো এবং দশ হাজার টাকা জরিমানা হয়। অর্থগৃধ্নু ব্যক্তিটি বলে যে, টাকা মাফ করে আরো জুতোর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া যায় না? প্রধানমন্ত্রী যেন শিক্ষকদের সে রকম অর্থলোভী না ভাবেন। শিক্ষকেরা সম্মানের জন্য লড়ছেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫