Naya Diganta

একদিন প্রতিদিন

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

০৯ জুন ২০১৭,শুক্রবার, ২০:১৫


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

একদিনের কথা। সে দিন আমি গিয়েছিলাম কারওয়ানবাজারে। বসেছিলাম প্রথমা প্রকাশনীতে। দুপুর গড়িয়ে যায় তখন। হঠাৎ করে এক যুবক এক রকম দৌড়ে প্রবেশ করল সেখানে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলল, ‘ভাই, আমাকে বাঁচান, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ সিকিউরিটির লোকেরা বিব্রত হলো। তারা ঝামেলাঝক্কি নিতে চায় না। লোকটি কাতরস্বরে মিনতি জানায়। বাইরে দেখলাম চার-পাঁচজন মাস্তানগোছের লোক গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। তারা বলছে, ‘ও, হাইজ্যাকার, ওকে বের করে দিন।’ লোকটি কান্না করে বলছে, ‘আমাকে ওদের হাতে দেবেন না, ওরা ভুল বুঝছে, আমি আসলে কোনো টেন্ডার ড্রপ করিনি, করেছে অন্য কেউ, ওরা এখন মিছেমিছেই আমাকে মারধর করছে।’ এতক্ষণে সিকিউরিটির লোকেরা বিপাকে পড়ে তাদের বসের সাথে ফোনালাপ করলেন। বোঝা গেল কী করে লোকটি ঢুকল, এখন তাদের আপদ হয়েছে। মাস্তানেরা ঢুকলে বিপদ হতে পারে। নির্দেশ এলো ‘পুলিশে খবর দাও’। লোকটি আবার কান্না করে বলল, ‘আমাকে পুলিশের হাতে দেবেন না, পুলিশ ওদের লোক।’ তখন সিকিউরিটির লোকদের মনোভাব ‘ভ্যালা হলো দেখি ল্যাঠা’। অবশেষে কর্তৃপক্ষ পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে একজন ইন্সপেক্টর পদের কাউকে নিয়ে এলো। লোকটিকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে তার হাতে সোপর্দ করে দিলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও লোকটি পুলিশের অনুগমন করল। লোকেরা ঘটনার ঘনঘটা বোঝার চেষ্টা করল। অবশেষে জানা গেল ‘তারা সরকারি দলের লোক’। এই ব্যাটা নচ্ছড় তাদের ডিঙিয়ে ওখানকার এক করপোরেশনের টেন্ডারে অংশ নিয়েছিলেন।
খ. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। সবেমাত্র আসরের নামাজ পড়ে বের হয়েছি। সাথে আরো কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন। একটি ছেলে, একটি মেয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়াল। অসহায় সুরে বলল, ‘স্যার, আমাদের বাঁচান।’ ঘটনা বুঝতে না বুঝতেইÑ ওদের তেড়ে আসা দুই-তিনজনের মুখোমুখি হলাম আমরা। তারা বলল, ‘স্যার, এরা ক্যাম্পাস কলুষিত করছে, বাইরের লোক, আপত্তিজনক অবস্থায় পাওয়া গেছে।’ ছেলে ও মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়ল। বলল, ‘একদম মিছে কথা’। ছেলেটি বলল, মেয়েটি আমাদের পাড়ায় থাকে, সাভারে। আমি এখানে এসেছিলাম এক বন্ধুর কাছে। হঠাৎ করেই দেখা। ওকে দেখে দু-এক মিনিট কথা বলায়, ওই লোকেরা কেস ধরেছি, কেস ধরেছি বলে চিৎকার করল। আর আমাদের টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করল। আমরা চিৎকার করায় আমাদের তাড়িয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। সত্য-অসত্য বোঝা কঠিন। আমরা ইতস্তত করছি। পাশে দাঁড়ানো দু-একজন বলল, ‘স্যার, আমি ওদের চিনি।’ ওদের অত্যাচারে পাড়ার লোকেরা অতিষ্ঠ। মাস শেষে গার্মেন্টের মেয়েরা যখন বেতন নিয়ে ঘরে ফেরে তখন এরা নানান অপকৌশলে তাদের টাকা হাতিয়ে নেয়। ততক্ষণে তেড়ে আসা ছেলেগুলো ভেগে গেছে। পরে জানা গেল ‘তারা সরকারি দলের লোক’।
গ. একাডেমিক কাজে রাজশাহী গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে ব্রিজ নেই অথচ ব্রিজের টোল দিতে হলো। দেখা গেল যে, নদী শুকিয়ে গেছে তারই এক প্রান্তে বাঁশের অপরোধ সৃষ্টি করে দু-চারজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদা দিতে হলো ২০ টাকা। কোনো রসিদ নেই, কোনো আইনানুগতা নেই। বাসের ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করায় সে ওদের বাপ-দাদা, চৌদ্দগুষ্ঠী উদ্ধার করে গালাগালি করল। পরে বলল, ‘এদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ’। খোলাখুলিই সে জানাল, ‘তারা সরকারি দলের লোক’।
ঘ. আমার অভিজ্ঞতার বাইরে এবার চেনাজানা দু-একজনের কথা। মুজিবর রহমান সাহেব রাজধানীর একটি কলেজে পড়ান। পদে অধ্যাপক না হলেও তিনি অধ্যাপক নামেই পরিচিত। তিনি থাকেন মোহাম্মদপুর এলাকায়। বিকেলে হাঁটতে বেরোতে বেরোতে এসে পড়েছেন ধানমন্ডি লেকের কাছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কিছু বুঝতে না বুঝতেই চারটে শান্ডা পদের ছেলে তাকে ঘিরে ধরল। সব কিছু নিয়ে নিলো। সব কিছু মানে একরকম খালি থাকা মানিব্যাগ, হাতের ঘড়ি, এমনকি চশমাটাও। অধ্যাপক মুজিবর এমনিতেই নরম ভালো মানুষ। অল্পতেই তুষ্ট, অল্পতেই রুষ্ট। মানিব্যাগে কেন মানি নেইÑ এ কারণে কটূক্তি এবং গলাধাক্কার পর যখন তার চশমা নিয়ে নিচ্ছে তখন তিনি অসহায়ভাবে বললেন, ‘ওটা তোমাদের কোনো কাজে আসবে না’। তারা চশমাটা ছুড়ে ফেলল লেকের পানিতে। ভদ্রলোক চশমা ছাড়া চলতে পারেন না। রিকশা চড়ে বাসায় এসে হাউমাউ করে কাঁদলেন। আশপাশে অধ্যাপকের ছাত্ররা থাকে। ঘটনার ঘনঘটা শুনে, হাইজ্যাকারদের চেহারার বর্ণনা শুনে তার ছাত্ররা বলল, ‘স্যার ওদের আমরা চিনি। আমাদের সাথেই পড়ে। সরকারি দল করে।’
ঙ. একটি অজ পাড়াগাঁয়ের গল্প। বরগুনার বতলবুনিয়া গ্রামে বাস করেন হোসেন শিকদার। পাশের খাসজমি বন্দোবস্ত নিয়ে তিনি সেখানে একটি ছোট মাছের ঘের তৈরি করেছেন। নিজে সারাক্ষণ পড়ে থাকেন মাছের ঘেরে। ভাবখানা এই ‘মৎস্য মারিব, খাইবো সুখে।’ কিন্তু সুখ তার সইল না। সরকার বদলের পর তিনি বারবার জিজ্ঞাসিত হয়ে থাকলেন ‘কিভাবে তিনি এই ঘেরের অনুমতি পেলেন’। একদিন তার ডাক পড়ল নেতার আস্তানায়। নেতা বললেন, ‘সরকারি জমি, সরকারি দলের লোকেরাই ভোগদখল করার অধিকার রাখে। আপনি আর ঘেরে আসবেন না।’ হোসেন শিকদার মেম্বার- চেয়ারম্যান, থানা-পুলিশ করে করে ক্লান্ত হলেন। অনেকে উপযাচক হয়ে তার উপকার করতে চাইলেন। বেশ কিছু টাকা তারা হাতিয়ে নিলেন। অবশেষে আশা ছেড়ে দিয়ে ঘরে উঠলেন। তাকে বলা হলো ‘এভাবে বিরোধী দলের খাতায় নাম থাকবে আর সরকারের জমি নেবেন তা হয় না’। এসব যারা বললেন, তারা সরকারি দলের লোক।
চ. এবার কিছু পত্রিকার খবর। এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণের অভিযোগে গ্রেফতার এক যুবক। পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় হাতকড়া পরা অবস্থায় ট্রাকের নিচে চাপা পরে মারা গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। দৈনিক প্রথম আলোর বগুড়া ও গাইবান্ধা প্রতিনিধির পাঠানো এবং ৩ জুন, ২০১৭ প্রকাশিত খবরে এ কথা বলা হয়। তবে নিহত যুবকের পরিবারের টাকা না পেয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। গাইবান্ধার পলাশবাড়ির কুমরপুরে ১ জুন এ ঘটনা ঘটে। নিহত রিপনচন্দ্র দাস গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের হাতিয়া মাঝিপাড়ার বাসিন্দা। একই ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে রিপন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।
ছ. দৈনিক ডেইলি স্টারের ৮ জুন প্রকাশিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধির একটি খবর। পুলিশ বলেছে এক ব্যক্তি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। তার নাম ইব্রাহিম মিয়া (৩৫)। তার বাড়ি লাটুয়ামোড়া গ্রামে। পুলিশি ভাষ্যে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চান্দিদার এলাকায় গভীর রাতে তার সহযোগীরা তাকে ছিনিয়ে নিতে চায় এবং তাদেরই গুলিতে নিহত হয়। পুলিশ এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে ওই গ্রামের ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে।
ঝ. বিশ্ববিদ্যালয়ের টি-স্টলে চা খাচ্ছিলেন কয়েকজন ছাত্র। তাদের দু’জন পায়ের ওপর পা তুলে বসেছিলেন। সেখানে পরে এলেন তাদের কয়েকজন বড় ভাই। তারা আসার পরে পা কেন নামানো হয়নি সে জন্য তাদের মারধর করা হয়। পরে জানা যায় বড় ভাইরা শাসকদলের লোক।
ঞ. ৭ জুন প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর একটি খবরের অংশবিশেষ এ রকমÑ মঙ্গলবার বিকেল ইফতারির আগমুহূর্ত। প্রচণ্ড যানজট। রাজধানীর ওয়্যারলেস মোড় থেকে মগবাজার পথে উল্টো দিক থেকে আসছে একটি প্রাইভেট কার। দায়িত্বরত পুলিশের উপপরিদর্শক কারটি আটকালেন। গাড়ির যাত্রী বেরিয়ে এসে শুরু করলেন গালাগাল। একপর্যায়ে বললেন, ‘আমি রঙ সাইডে যাব। তুই আটকাবার কে?’ কারের যাত্রীর নাম মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান। তিনি রমনা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি।
আমাদের দৈনিক জীবনের খানিকটা অংশ তুলে ধরা হলো, যা ঘটছে তা বর্ণনার অসাধ্য। শুধু প্রতীকী অর্থে অভিযোগগুলো গ্রহণ করলে দেখা যাবে যে, সারা দেশে একই চিত্র। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া একই মহড়া। শহরের জীবনযাত্রা আনুষ্ঠানিক। গ্রামের ‘ইয়েস, প্লিজ’ সংস্কৃতি এখনো প্রবেশ করেনি। তবুও অপরাধের মাত্রা, দলীয়করণের স্বরূপ এক ও অভিন্ন। বিচারপতি মরহুম হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘দেশটি বাজিকরের হাতে চলে গেছে’। নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের মাত্রা কত বেড়েছে তা গণমাধ্যমে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। এক দিনের চিত্র দিয়েই অন্য দিনকে বোঝা যায়। মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে তার জীবন। নিজ জীবনের পর তার সম্মান। সম্মানের পর সম্পদ নিয়ে মানুষ ব্যাপকভাবে চিন্তা করে। যার হাতে সম্পত্তি নিরাপদ নয়, তার কাছে সম্মানও নিরাপদ নয়। সুতরাং এক দিনের জীবনহানি আমাদের কাছে প্রতিদিনের জীবনহানি। প্রতিদিনের জীবনহানি মানেই হচ্ছে দুঃখ, কষ্ট ও ব্যথা-বেদনার ইতিকথা। কোনো আবেদন, নিবেদন ও জনগণের অভাব-অনুভূতি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। অর্থ, ক্ষমতা ও প্রবৃত্তিই তাদের সম্বল। ‘এবার তারা ঔদ্ধত্যকে অভিহিত করে আভিজাত্য বলে অরাজকতাকে বলে স্বাধীনতা এবং অপব্যয়কে মহানুভবতা আর মূর্খতাকে বলে বিক্রম’। (প্ল্যাটো : রিপাবলিক : ৫৬০)
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫