Naya Diganta

গরু হোক, গাধা হোক...

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

৩০ জুন ২০১৭,শুক্রবার, ১৮:৪৫


 ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মাঝে মধ্যেই অপ্রিয় সত্য কথা বলেন। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে তার নিদারুণ ভয়। কথা বলে অনেক সময় আবার কায়দা করে গুটিয়ে নেন। যদি তিনি তার অবস্থানে দৃঢ় থাকতে পারতেন, তাহলে তার নিজের ও দেশের জন্য অনেক ভালো হতো। যা হোক, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তিনি যা বলেছেন, তা ১০০ ভাগ হক কথা। জাতীয় সংসদে শিক্ষাব্যবস্থার কথা আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ হচ্ছে- গরু হোক, গাধা হোক সবাইকে পাস করিয়ে দিতে হবে। পুরনো আমলে শিক্ষকেরা অসম্ভব খারাপ ছাত্রকে গাধা-গরুর সাথে তুলনা করতেন, আর বলতেন এরা কখনো পাস করবে না। এখন সময় পাল্টেছে। ক্ষমতাসীনদের কল্যাণে গাধা-গরু এখন পাসের খাতা বেশ সরগরম করছে।
১৯৭২ সালে শুধু গাধা-গরু নয়, চেয়ার-টেবিলও পাস করেছিল। ’৭২-এর এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৯.৯ শতাংশ, সে পরীক্ষায় কেউ ‘নকল’ করেনি! সবাই বই দেখে লিখেছে। মাইক লাগিয়ে প্রশ্নের উত্তর বলার প্রতিযোগিতা লক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে সে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। সুতরাং শিক্ষাব্যবস্থার সর্বনাশ হওয়াই স্বাভাবিক। আগের সর্বনাশটি ছিল শিক্ষার্থীদের দিয়ে আর এখন সর্বনাশ হচ্ছে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে। বহির্বিশ্বে নাম ফুটোনোর জন্য সরকার শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত সর্বনাশ ঘটিয়ে পরিসংখ্যানগত উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এই উন্নয়ন! এর বাহক হচ্ছেন আমাদের শিক্ষামন্ত্রী। তিনি শিক্ষাব্যবস্থায় ‘হাই জ্যাম্প’-‘লং জ্যাম্প’ ঘটানোর জন্য এসব করেছেন। তিনি বুঝে বা না বুঝে অথবা তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে যে সর্বনাশ সাধন করেছেন, তা সহজে অপনোদন করা সম্ভব নয়।
প্রথমত, তিনি কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন বাস্তবায়নের নামে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষার বিদায় দিয়ে তথাকথিত প্রগতিশীলতার নামে বস্তুবাদী তথা আধুনিক শিক্ষার প্রবর্তন করেছেন। তিনি শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে নীতিকথা ও ধর্মীয় বিষয়াদি বিতাড়ন করেছেন। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে নবী-রাসূলদের জীবনকথাও বাদ দেয়া হয়েছে। পরে অবশ্য হুজুরদের ঠেলায় পড়ে সামান্য পরিবর্তন ঘটানো হয়। দ্বিতীয়ত, এত দিন ধরে চলে আসা কাঠামো আমূল পরিবর্তন করতে গিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার বারোটা বাজিয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রবর্তন করে স্কুলগুলোকে শিক্ষালয়ের পরিবর্তে পরীক্ষালয়ে পরিণত করেছেন। ভালো রেজাল্টের প্রতিযোগিতায় শিক্ষকেরা না পড়িয়ে পরীক্ষার হলে অসৎ উপায় অবলম্বনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন। তৃতীয়ত, এই শিক্ষকদের দিয়ে সারা বছর এমন সব কাজ করানো হয় যাতে শিক্ষার সময় বেশ সঙ্কুচিত হয়। যেমন আদমশুমারি, গাছশুমারি, মাছশুমারি ইত্যাদি। চতুর্থত, রাজনৈতিক নিয়োগের ফলে শিক্ষা ও শিক্ষকের মান সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। পঞ্চমত, প্রাথমিক শিক্ষাসহ সর্বত্র দুর্নীতি একটি অনিবার্য মাধ্যম হওয়ায় সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অধিদফতরগুলো সম্পর্কে সংবাদপত্রে যে প্রতিবেদন প্রায়ই প্রকাশিত হচ্ছে, তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। এসব ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেয়া হয়েছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের আগেই ‘সৃজনশীলতা’ নামের বিষয়টি অসহায়ত্বের প্রমাণ রেখেছে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে রীতিমতো তুঘলকি কাণ্ড চলছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের একটি তামাশায় পরিণত হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রমকে বিকেন্দ্রীকরণের নামে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। এই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদবির করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দেয়। শিক্ষাকার্যক্রমে প্রবল সেশনজট এবং স্থবিরতা দূরীকরণে কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা আরো হাস্যকর-ক্ষতিকর। এক রকম না পড়িয়ে অথবা মাত্র তিন মাস পড়িয়ে সিলেবাস শেষ করা হয়। এ যেন না পড়িয়ে সার্টিফিকেট দেয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এমন মন্তব্য করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রতিবাদ করলে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের দেউলিয়াত্ব প্রাকাশ্য রূপ নেয়। বিকেন্দ্রীকরণের সর্বশেষ ধাপে শুধু ঢাকা মহানগরীর কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। এতে করে এসব কলেজের পড়াশোনা এক রকম বন্ধ হয়ে যায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টানাপড়েনে এসব কলেজের ছাত্ররা এখন উলুখাগড়ায় পরিণত হয়েছেন।
এসব সিদ্ধান্ত ও সিদ্ধান্তহীনতার চেয়েও আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক লেখাপড়ার প্রভূত উন্নতি প্রদর্শনের জন্য পরীক্ষকদের এই মর্মে নির্দেশ দেয়া যে, খাতায় লেখুক আর না লেখুক, ভুল কি শুদ্ধ লেখুকÑ যাই হোক না কেন নম্বর দিতেই হবে। যেসব পরীক্ষক শিক্ষার্থীদের কম নম্বর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বোর্ড তাদের ডেকে গালমন্দ করেছে। আরো মজার বিষয়Ñ আন্তঃবোর্ড প্রতিযোগিতা। কে কত সর্বোচ্চ পাস দেখিয়েছে সে পরিসংখ্যানের ওপর তাদের কৃতিত্ব নির্ভর করে। শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এসব বিষয়ে বাহবা লাভ করেন। আসলে বিষয়টি ছিলÑ ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট। পরীক্ষার হলগুলোতে দৃশ্যমান ডাটফাট বজায় রাখা হয়। ভেতরে ভেতরে চলে নকলের নিশ্চুপ-নিঃশব্দ মহোৎসব। সোনালি-রুপালি প্লাসে ভরে যায় দেশ, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাওয়া যায়নি কৃতিত্বের কোনো ছাপ।
প্রশ্নপত্র ফাঁস মহামারী আকার ধারণ করে। গত আট বছরে এমন কোনো পরীক্ষা পাওয়া যায়নি, যার প্রশ্নপত্র আউট হয়নি। প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে সরকারি দলের ক্যাডাররা এ কাজটি করেছে। আরো দেখা গেছে, কোচিং ক্লাস নামের শিক্ষার দুর্নীতিকেন্দ্রগুলো তাদের স্বার্থে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। জনগণকে ব্লাফ দেয়ার জন্য তদন্ত কমিটি হয়েছে। প্রতিবেদন কখনোই প্রকাশিত হয়নি। রাঘব বোয়ালেরা ধরা পড়েনি। সঙ্গতভাবেই শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করেছে, ‘যদি হবে প্রশ্ন ফাঁস, পড়বো কেন বারো মাস?’ শিক্ষামন্ত্রী হাস্যকরভাবে কাকনীতি অনুসরণ করেছেন। কাক যেমন কোনো কিছু চোখ বুজে লুকিয়ে রাখে আর ভাবে কেউ কিছু দেখেনি! শিক্ষামন্ত্রী অনলাইনে বা অন্যত্র প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পাওয়ার পরও বলেছেন, ‘সব ঝুট হায়’! সব মিথ্যে। কিন্তু সত্য শাশ্বত। একটি সত্যকে অসংখ্য মিথ্যা দিয়েও লুকানো যায় না।
শিক্ষামন্ত্রী কি জেগে জেগে ঘুমাচ্ছেন? প্রেসিডেন্ট এরশাদ এর শ্লেষ বাক্যের আগেও দেশের সব মত ও পথের শিক্ষাবিদ এবং নানা মতের বুদ্ধিজীবীরা শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন। সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আরো সর্বনাশ হওয়ার আগে সরকারের আশু পদক্ষেপ প্রয়োজন।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫