Naya Diganta

ধর্ষণের শিকার ৭০ শতাংশই শিশু

প্রশাসনের অসহযোগিতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় ঘটনা বাড়ছে ; গত তিন মাসে ১১৯ শিশু ধর্ষণ

শহিদুল ইসলাম রাজী

০৬ এপ্রিল ২০১৮,শুক্রবার, ২২:৫৯


ধর্ষণের শিকার ৭০ শতাংশই শিশু

ধর্ষণের শিকার ৭০ শতাংশই শিশু

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের দিনমজুর বাবার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে বিউটি আক্তারকে অপহরণ করে বখাটে বাবুল মিয়া ও তার সহযোগীরা। এক মাস মেয়েটিকে আটকে রেখে ধর্ষণ করে। এরপর তাকে কৌশলে বাড়ির পাশে রেখে পালিয়ে যায় বাবুল। এরপর গত ১ মার্চ মেয়েটির বাবা বাদি হয়ে বাবুল ও তার মা স্থানীয় ইউপি মেম্বার কলমচানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ধর্ষকদের ভয়ে মেয়েকে লুকিয়ে রাখেন। পরে ভয়ে মেয়েটি আশ্রয় নেয় নানা বাড়িতে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বর্বররা সেখান থেকে রাতে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে ফের ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে যায় শুকনো হাওরে। অন্ধকার যুগকে হার মানানো এ ঘটনা সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ওঠে খোদ পুলিশের বিরুদ্ধে। র্যাব গ্রেফতার করে অভিযুক্ত বাবুলকে। কিন্তু ফিরে আসবে কি বিউটি?

শুধু এ ঘটনাই নয়, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে আট বছরের মাদরাসাছাত্রী নুশরাত জাহান নুশুকে ধর্ষণের পর দুই দিন লাশ ঘরে রেখে দেয় চাচা শাহ আলম রুবেল। আইসক্রিম খাওয়া ও টিভি দেখার কথা বলে শিশু নুশরাতকে ঘরে ডেকে ধর্ষণ করা হয়। একপর্যায়ে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে লাশ চট দিয়ে বেঁধে ঘরের স্টিলের আলমারির ওপর রেখে দেয়া হয়। এভাবেই লাশ দুই দিন ঘরে ছিল। রাতে অটোরিকশায় লাশ নিয়ে খালের পানিতে ফেলে দেয় পাষণ্ড চাচা। চাচা কেন, বাবার হাতেও নিরাপদ নয় মেয়ে শিশুরা। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনা থেকে জানা গেছে বাবাই মেয়ের ধর্ষক। দেশে দিন দিন ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে। ধর্ষকদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশু কিংবা বয়স্করাও। গত ছয় বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ধর্ষণের শিকার বেশির ভাগই শিশুই মেয়ে। চলতি বছরের গত তিন মাসে ধর্ষণের শিকার ৭০ শতাংশই শিশু। এ তিন মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬৯ জন। এর মধ্যে শিশুই রয়েছে ১১৯ জন। ধর্ষণের পর বিচার পাচ্ছে না বেশির ভাগ ভুক্তভোগী। উপরন্তু প্রভাবশালী ও প্রশাসনের হাতে নাস্তানাবুত হচ্ছে। প্রশাসনের অসযোগিতা, পুলিশের গাফেলতি এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। ধর্ষকদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধান করা উচিত বলে মনে করেন সাধারণ মানুষ। সমাজকর্মী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ধর্ষণ থেকে রক্ষা পেতে আইনে তাৎক্ষণিক প্রয়োগ, বিভিন্ন ধরনের পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধ এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ধর্মীয় শিক্ষা ও অনুশাসন এবং নীতি নৈতিকতার অভাবকেও দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞেরা।

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, মানুষের নৈতিক স্খলন থেকেই এমনটা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ধর্ষণের ঘটনায় বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। যার কারণে ধর্ষকেরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এ ছাড়া বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার অভাব ও পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতার কারণে শিশু ধর্ষণের ঘটনা দিনদিন বাড়ছে। দরিদ্র শ্রেণীর শিশু, শ্রমজীবী বাবা-মা, যারা কাজের কারণে অধিকাংশ সময় বাইরে থাকেন তাদের একাকী থাকা সন্তান ও শ্রমজীবী শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বেশি। সামাজিক অবস্থান, লজ্জা ও ভয়ের কারণে ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ থানা পর্যন্ত যেতে পারছে না। ফলে বিচার না হওয়ায় এই ধরনের ঘটনা আরো বাড়ছে। বছরের পর বছর আদালতে মামলা চলায় ভুক্তভোগীরা বিচার পাওয়ার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়ছেন। অনেক প্রভাবশালী মামলা মিটমাট করে দিচ্ছে। এসব ঘটনার দ্রুত বিচার হয়ে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে অপরাধীরা ভয় পেত এবং ধর্ষণের মতো ঘটনা কমে যেতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্ট্যাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, এই পাশবিকতা বন্ধ করতে হলে আইনের সুশাসন নয়, তাৎক্ষণিক ব্যবহার দরকার। কিন্তু প্রচণ্ড পরিমাণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে আমাদের দেশে। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা হেরে যাচ্ছি। এক কথায় বলতে গেলে বিচারের নামে সময় নষ্ট হচ্ছে। সময় সাপেক্ষে যখনই আইনের ব্যবহার করা দরকার তখন ব্যবহৃত হচ্ছে না। যার কারণে অন্যায়কারীরা বারবার একই দোষ করতে সুযোগ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশে আইন যা আছে সেটার ব্যবহার অনেক দুর্বল। সাম্প্রতি এতগুলো ঘটনার মধ্যে রূপা হত্যার ঘটনাটি ক্লিয়ারলি আসছে। এর বাইরে তনু, আফসানা থেকে শুরু করে অন্যান্য ধর্ষণসংক্রান্ত ঘটনা আসতে পারে। এ বছরের বিচার সে বছর। সে বছরেরটা তার পরের বছর তারপর শেষ। যখন শাস্তির কোনো বিধান কমে যায়। তখন অন্যায়ের প্রবণতা বেড়ে যাবেÑ এটাই স্বাভাবিক। একটা ঘটনার বিচারের নামে যখন দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয় তখন বিচার এমনিই থেমে যায়। তখন আরো ১০টা মানুষ সেখান থেকে সাহস পায়। ফলে আইনে তাৎক্ষণিক ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া পরিবারকে বিশেষভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে তার সন্তানের ব্যাপারে।

তিনি বলেন, মোবাইলে ইন্টারনেটে বিভিন্ন ধরনের পর্নোগ্রাফি দেখার আসক্তি বেড়ে যাচ্ছে তরুণ ও যুবসমাজে, যা মাদকের আসক্তির চেয়েও ভয়াবহ। মূলত পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি থেকেই রেপের মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হচ্ছে ধর্ষকেরা। ফলে পর্নোগ্রাফি ঘটনাগুলো বন্ধে সরকারের বিশেষ নজর দেয়া উচিত। তা না হলে, নারীর প্রতি এই পাশবিকতা কখনোই নিমূল করা যাবে না।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, সমাজে নারীকে আমরা পণ্য হিসেবে দেখছি। দৈহিক আগ্রহ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সমাজে বিবাহ-পরবর্তী নারী-পুরুষের শারীরিক সম্পর্ককে আমরা উৎসাহিত করি। তবে বর্তমানে ছোট ছোট শিশু পয়সা তুলে মোবাইল কিনে তাতে পর্নোগ্রাফি দেখছে। সেখানে তারা আকৃষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ দিনের ধারাবাহিকতায় এর মাধ্যমে একটা প্রজন্ম গড়ে ওঠে। যারা বোঝে না যে দৈহিক চাহিদা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ফলে এগুলোর মাধ্যমে একটা আসক্ত প্রজন্ম সৃষ্টি হচ্ছে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতাহীনরা ধর্ষণের শিকার হন। আর যারা ধর্ষণ করে তারা সমাজে ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী। সে ক্ষেত্রে কেসটা অনেক সময় দুর্বল হয়ে যায়। এভাবে অনেক সময়ই বিচার থেকে দুর্বলরা বঞ্চিত হন। তা ছাড়া মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পক্ষে পুরো মামলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। এ জন্য বহুদিন থেকেই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করার কথা বলা হলেও তা নিশ্চিত হচ্ছে না। অনেক সময় অপরাধীদের এনকাউন্টারে ফেলে দেয়া হচ্ছে। ফলে পুরো ঘটনা উদঘাটন সম্ভব হয় না। তাদের আইনের অধীনে এনে বিচার করা জরুরি। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত ছয় বছরের চার হাজার ৬১৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে দুই হাজার ৩০৮ জন। ২০১২ সালে ধর্ষণের শিকার ৮০৫ জনের মধ্যে ৪৭৩ জন শিশু। ২০১৩ সালে ধর্ষণের শিকার ৮১৪ জনের মধ্যে ৪৫২ জন শিশু; ২০১৪ সালে ৬৬৬ জনের ৩৯৩ জন শিশু; ২০১৫ সালে ৭৮৯ জনের ৪৭৯ জন শিশু। ২০১৬ সালে ধর্ষণের শিকার ৭৫৭ জনের মধ্যে ৫১১ জনই শিশু। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৮৩ জন। চলতি বছরে জানুয়ারি মাসে ৪০ জন ধর্ষণের শিকার হয়, এর মধ্যে ২৮ জন শিশু। ফেব্রুয়ারিতে ৭০ জন ধর্ষণের শিকার হয়, এর মধ্যে ৪৮ জন শিশু। মার্চ মাসে ৫৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়, তার মধ্যে ৪৩ জনই শিশু।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত দুই বছরের (২০১৬-২০১৭) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে। গত দুই বছরে এক হাজার ৫৪২ জন। এর মধ্যে গত ছয় বছরের নিচে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১২২ জন শিশুকন্যা। ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে ৩২২ জন শিশু, ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ৪২৪ জন। ১৭ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ৬৩ জন। ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ৩০ জন ধর্ষণের শিকার হয়। এ ছাড়া ৩০ বছরের ওপরে ২৮ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪০৩ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৮৪ জনকে এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ১১ জন। এর মধ্যে বেশির ভাগই শিশুকন্যা।

মানবাধিকারকর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সিনিয়র উপপরিচালক রওশন জাহান পারভিন বলেন, ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে আইনের প্রয়োগ ঠিকমতো করতে হবে এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তিনি ধর্ষণের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ধর্ষণের শিকার নারী শিশুদের অধিকাংশেরই ঘাতক পরিবারের মধ্যে রয়েছে। অথবা ঘনিষ্ঠ জন। কোনো কোনো সময় বাবা বা ভাইও ধর্ষণ করছে। সম্প্রতি জামালপুরে বাবা মেয়েকে ধর্ষণের একটি ঘটনা মামলা করেছে আসক বলে জানান উপপরিচালক রওশন জাহান।

জানা গেছে, চলতি সপ্তাহে ঢাকা মেডিক্যালের ওসিসিতে দুই মাসের এক কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে ভর্তি হয়েছে। আর অভিযুক্তের বয়সও ১০ বছর। এটাই ওসিসিতে প্রথম ঘটনা বলে জানিয়েছেন সমন্বয়ক ডা: বিলকিস বানু। আপন বাবা, আপন মামার কাছেও শিশুরা নিরাপদ নয় বলে জানান তিনি। কয়েকদিন আগে ঢাকা মেডিক্যালের ফরেনসিকে পরীক্ষার জন্য এসেছিল দুই মেয়ে যারা নিজ বাবার হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়াও ধর্ষণের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ অভিযুক্ত হচ্ছে খালাতো ভাই, ফুফাতো ভাই, মামা ভাগ্নে, চাচাসহ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশী। গত মার্চ মাসে ৭৬ জন নারী ও শিশুকন্যা ঢাকা মেডিক্যালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩৮ জন। যার বেশির ভাই শিশু। চলতি মাসের এ ক’দিনে ৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়ে ভর্তি হয়েছে ঢাকা মেডিক্যালে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) সমন্বয়ক ডা: বিলকিস বানু বলেন, গড়ে প্রতিদিন দুইজন করে ঢাকা মেডিক্যালের ওসিসিতে ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়। এর বেশির ভাই শিশু। কারণ তারা কিছুই বলতে পারে না, অসহায় থাকে ধর্ষণের সময়। শিশুরা কেবল ঘরের বাইরেই নয়, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নিজ ঘরে, নিকটাত্মীয়-স্বজনদের হাত থেকেও রক্ষা পাচ্ছে না তারা। আগের চেয়ে মানুষ এখন সচেতন হওয়ায় এসব ঘটনার রিপোর্ট হয়। তার পরও অনেক ঘটনাই সামাজিক ও পারিবারিক বিষয় চিন্তা করে রিপোর্ট না করে মুখ বুঝে সহ্য করে নেয়। সম্প্রতিক শিশু ধর্ষণের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ওসিসির সমন্বয়ক ডা: বিলকিস বেগম বলেন, ইন্টারনেটে পর্নোগ্রফির সহজলভ্যতার কারণে এবং ধর্ষণের ঘটনায় বিচার না হওয়ায় শিশু ধর্ষণের হার বেড়েছে। শিশু থেকে শুরু করে ৮-১০ বছরের শিশুদের হাতেও স্মার্ট মোবাইল। যার কারণে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা হাতের কাছে নেট পেয়ে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হচ্ছে। এ কারণে অন্তত ১৬-১৭ বছরের আগে শিশুদের হাতে মোবাইল দেয়া যাবে না। প্রত্যেকটি মানুষ যদি সচেতন না হয়, তাহলে এই ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়াও পরিবারে বাবা-মায়ের সচেতনতার অভাবে ছেলেমেয়েরা বিপদগামী হচ্ছে। আমাদের সময়ে বাবা-মায়েরা খুবই সচেতন ছিল শিশুদের ব্যাপারে। ভাই বোনরাও। এখন শিশুদের প্রতি মনোযোগ কমে গেছে। কিছু কিছু আছে অতিরিক্ত কেয়ার নিচ্ছে আবার কিছু কিছু একদমই নাই। ধর্মীয় শিক্ষা ও পারিবারি অনুশাসন এবং নীতিনৈতিকতার অভাবে বিপথগামী হচ্ছে শিশুরা বলে দাবি করেন তিনি।

ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন বেড়ে যাওয়ার দুইটি কারণ উল্লেখ করে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মাওলানা মোক্তার আহমেদ বলেন, আমাদের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধ একে বারেই উঠে গেছে। মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ আসে ধর্ম থেকে বা ধর্মীয় শিক্ষা থেকে। সব ধর্মই মূল্যবোধ তৈরিতে উৎসাহিত করে। কিন্তু আমরা ধর্ম ও ধর্মীয় শিক্ষা, অনুশাসন এবং নীতিনৈতিকতার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এ জীবনের পরে পরকালে যে আরো একটি জীবন আছে, সেখানে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে এই বিষয়গুলো আমরা ভুলে গিয়ে পার্থিব আনন্দ উল্লাসকে প্রাধান্য দিচ্ছি। সাধারণত যাদের মধ্যে দ্বীনি শিক্ষা অথবা দ্বীনিমূল্যবোধ আছে, তাদের মধ্যে গুরুতর অপরাধগুলো খুবই কম। যারা ধর্মীয় শিক্ষা অনুশাসন থেকে দূরে তারাই মূলত এসব কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব এবং ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইটে এ জাতীয় অপরাধকে এমনভাবে ডিসপ্লে করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে ধর্ষণকে উসকে দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তিনি জানান, সম্প্রতি এক টেলিভিশনের টকশোতে অভিনেতা-অভিনেত্রি বলেছেন, ধর্ষণের দৃশ্যে অভিনয়ের সময় তারা বেশি মজা পেয়েছেন। যখন পাবলিকলি এ জাতীয় ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়, তথা কথিত আধুনিকতার নামে এ জাতীয় কর্তাবার্তা বলা হয় তখন আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াই। সেজন্য এসব ক্ষেত্রে এক ধরনের সেন্সরশিপ যদি তৈরি না করা হয়, তাহলে আমাদের একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির দিকে যেতে হবে।

গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ধর্ষণের প্রতিবাদে ‘আসুন ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি’ লেখাসহ বিভিন্ন লেখা প্ল্যকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিন বন্ধু। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র তারিকুল হাসান, নর্থ সাউথ বিশ^বিদ্যালয়ের রাকিবুল ইসলাম রাব্বি ও সানজিদুল হক ইমন। তাদের দাবি, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড করা হোক। পাশাপাশি এসব মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালের আওতায় এনে দ্রুতই শাস্তির বিধান করলে ধর্ষণ কমে যাবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র তারিকুল হাসান বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় শাস্তির পরিমাণ খুবই কম। ধর্ষণের ঘটনায় দৃশ্যমান দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না। এ ছাড়া বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রতার কারণে আইনে ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধী বেরিয়ে গিয়ে ভুক্তোভোগীকে ফের ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। এ কারণে অনেক ভয়েও বিচারের সম্মুখীন হয় না। ফলে অপরাধী আর একটা অপরাধ করতে সুযোগ পায় বা উৎসাহিত হয়। তাই ধর্ষণের শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে অপরাধীরা ভয়ে এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত থাকবে।

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫