Naya Diganta

কালজয়ী কবি মির্জা গালিব

কাওসার আহ্মেদ

২৭ এপ্রিল ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


ঊনবিংশ শতাব্দীরর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার সময়কালে যখন মোগল যুগের পতন ঘটতে থাকে তখন উর্দু ও ফার্সি ভাষার প্রভাবশালী কবি মির্জা গালিবের খ্যাতি পৃথিবীব্যাপী ছড়াতে থাকে। তাঁর পুরো নাম মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ খান গালিব।
এই অদম্য মেধাবী কবির জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৭৯৭ খ্রি:-এ ভারতবর্ষের দারিয়াগঞ্জের আগবরাবাদে। (বর্তমান ভারতের আগ্রার কলা মহলে) ডাকনাম ছিল ‘আসাদ’। খ্যাতির স্পর্শে ডাকনাম হয়ে যায় ‘গালিব’। যার অর্থÑ সর্বোচ্চ।
যদিও সাহিত্যে তাঁর বিপুল অবদানের জন্য তাঁকে পরে উপাধি দেয়া হয়েছিলÑ ‘দাবির-উল-মালিক’ ও ‘নাজিম-উদ-দৌলা’।
গালিবের পূর্বপুরুষেরা আগ্রার আদি বাসিন্দা ছিলেন না। প্রথমত, তুরস্কের আইবাক থেকে সমরকন্দে (উজবেকিস্তান) এবং পরে ভারতবর্ষে অভিবাসী হন। বাবা মির্জা আবদুল্লাহ বেগ খান ছিলেন একজন সৈনিক।
গালিবের বালক বয়সেই বাবা যুদ্ধেেত্র মারা যান। শেষে সৈনিক চাচা নাসরুল্লাহ্ খান ভাইয়ের পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
মির্জা গালিবের পিতা আগ্রার এক অভিজাত পরিবারে বিয়ে করেছিলেন। সৈনিক জীবনের অনিশ্চয়তার কারণে মা ও ছেলে নানার বাড়িতেই থাকতেন।
শৈশবে পিতা ও চাচার মৃত্যুতে তাঁর মধ্যে বঞ্চনার স্থায়ী প্রভাব পড়েনি। বংশের ঐতিহ্যের কারণে অহঙ্কারী বালকের মধ্যে তাঁর মায়ের পিতৃগৃহে অবস্থানের প্রভাব নেতিবাচক ছিল। কিন্তু তাঁর সৌভাগ্য এমনই ছিল যে শৈশবে তাঁর শিা, তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ব্যাহত হয়নি। বালক বয়সেই আগ্রার খ্যাতিমান পণ্ডিতদের তত্ত্বাবধানে ও সংস্পর্শে পরে এই বালকই যে হয়ে উঠবে কবিতার জাদুকর তা কে জানত!
মাত্র ৯ বছর বয়সেই গালিব কবিতা লিখতে শুরু করেন। পুরো জীবন ধরে তিনি ফার্সিকে তাঁর প্রথম প্রেম বলে বর্ণনা করেছেন। ওই বয়সেই তিনি উর্দুতেও মসনবি কবিতা লিখতে থাকেন।
জীবনের প্রথম থেকেই তিনি ছিলেন আত্মাবশ্বাসী, তাই শুরুতেই তাঁর লেখায় তিনি নিজেকেই নিজে সতর্ক করেন এভাবেÑ
হে গালিব কভু
ভাগ্য দেখো না
হাতের তালুর রেখায়!
চেয়ে দেখো বহু
হাতহীন সুখী
নিত্য তোমাকে শেখায়!
১৮১০ সালের ৮ আগস্ট মাত্র ১৩ বছর বয়সে গালিব নওয়াব ইলাহী বখশ্ খানের কন্যা ‘ওমরাও বেগম'কে বিয়ে করেন। তারপর আগ্রা থেকে দিল্লির চাঁদনি চকে বসবাস শুরু করেন।
পারিবারিক জীবনে গালিব অতটা সুখী ছিলেন না। স্ত্রী ‘উমরাও বেগম’ ছিলেন অসম্ভব রকমের খোদাভীরু ও ধার্মিক, অন্যদিকে গালিব ছিলেন কিছু কিছু েেত্র ধর্মে উদাসীন, যদিও তাঁর লেখায় ধর্ম উঠে এসেছে প্রকটভাবে এবং কোথাও কোথাও তা অতিমাত্রায় জটিল ও প্রতীকী।
স্বার্থের জিব মেলা দুনিয়ার মানুষের লোক দেখানো ধর্মকে তিনি অতি কটা করে লিখেছেনÑ
দুনিয়াতো আছে
স্বার্থের মেলে জিব,
কার কথা তুমি
বলবে-যে, হে গালিব!
জানাজায়-ও আসে
মানুষেরাÑ কিছু নেবে
আগামীর সুখ,
সওয়াবের কথা ভেবে!
মানুষের আচার আচরণ এবং জীবনযাপনের অসামঞ্জস্যতায় তিনি খুব ব্যথিত হয়েই মনুষকে এক অদ্ভুত প্রাণী বলে আখ্যায়িত করে লিখেছেনÑ
এমনভাবেÑ যে জীবন যাপন
অদ্ভুত মানুষের,
যেনবা রেখেছে অমরতা দিয়ে
আপন মরণ ঘের!
যেনবা আদৌÑ
মরবে না কোন দিন,
আবারÑ এমনভাবেই মরে
যেন বাঁচার ছিল না চিন্ !
শোনা যায়Ñ গালিব সুরাপান করার সময় লিখতেন এবং তা সন্ধ্যাবেলা। তাঁর সৃজনশীলতা ও কল্পনার েেত্র সুরা সহায়ক ছিল বলে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সুরার প্রতি আসক্তিকে গালিব মনে করতেন আশীর্বাদ।
অতি শক্তিমান ও বহুভাষী এই খ্যাতনামা কবির লেখার ধারা ছিলÑ গজল, কাসিদা, রুবাই ও অন্যান্য এবং লিখার বিষয় ছিল জীবনবোধ, দর্শন, প্রেম, ধর্ম এবং অতীন্দ্রিয়তা।
তাঁর গজলে উঠে এসেছে দর্শন, জীবনবোধ ও রহস্যময়তা আবার কোথাও কোথাও বাস্তববাদ, ভোগবাদ ও প্রেম।
তাঁর কবিতায় প্রেম এসেছে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় প্রতীকী হয়ে আবার কখনো কখনো প্রেম শুধুই মৃত্যুর দ্বার খুঁজে বেড়ায়Ñ
তার সে চোখে ডুব দিয়ে তো
মরতে পারি বারংবার,
সে চোখ নামায়, মরতে থামায়,
দেয় না খুলে মৃত্যু দ্বার !
তাঁর ফার্সি লেখা গজলগুলো থেকে প্রথম ইংরেজিতে ‘খড়াব ংড়হহবঃ ড়ভ এযধষন’ অনুবাদ করেন- 'ঝধৎভধৎধু কযধহ ঘরধুর,' ঢ়ঁনষরংযবফ নু জঁঢ়ধ ্ ঈড়. ওহফরধ. ধহফ 'ঋরৎড়ু ঝড়হ'ং রহ চধশরংঃধহ.

 

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫