ঢাকা, শুক্রবার,২৯ মে ২০২০

উপসম্পাদকীয়

আমেরিকার চোখে ‘ফরাসি রাজনৈতিক কালচার’

গৌতম দাস

১০ এপ্রিল ২০১৬,রবিবার, ১৯:৩০


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

আজ এক তামাশার স্টাডি রিপোর্ট নিয়ে কথা বলব। আমেরিকার ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ নামের দ্বিমাসিক পত্রিকায় এক স্টাডি রিপোর্টের ফলাফল নিয়ে একটা লেখা ছাপা হয়েছে গত ২৪ মার্চ, ২০১৬। যারা পশ্চিমা নেতা ও পশ্চিমা রাষ্ট্র চালান, নীতিনির্ধারক এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চিন্তার অলিগলি মতিগতি পাঠের জন্য জরুরি হচ্ছে এই ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ জার্নাল, এমনটা মনে করা হয়। ফরেন অ্যাফেয়ার্সে চলতি এই লেখার শিরোনাম, ‘দুনিয়াজুড়ে সুন্নি জঙ্গিতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করে এমন ফরাসি সংযোগ-সূত্র’। ইংরেজিতে ‘ফ্রেঞ্চ কানেকশন এক্সপ্লেনিং সুন্নি মিলিট্যান্সি অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’। এই রচনার সারকথা হলো, অন্য সব কিছুর চেয়ে ‘ফরাসি কালচার’- এতে এমন আলাদা কিছু আছে যে জন্য অন্য দেশের চেয়ে ‘ফরাসি ভাষাভাষী’ দেশে ‘সুন্নি মিলিট্যান্সি’ বেশি। কথাগুলো সাম্প্রতিককালে ইউরোপের দুই রাজধানী প্যারিস ও ব্রাসেলসে কয়েক মাসের ব্যবধানে পরপর আইএস হামলার কথা স্মরণ করেই বলা হয়েছে। 

বলা বাহুল্য, এটা সুই আর চালুনির কুতর্কের মতো যারা পরস্পর পরস্পরকে পেছনে ফুটা থাকার কারণে খোঁটা দিচ্ছে- এই জাতীয়। যেন আমেরিকা ফরাসি ভাষাভাষীদের পেছনে ফুটা থাকার জন্য অভিযোগ করছে। এই অর্থে এই পত্রিকার রিপোর্ট বেশ তামাশার তা বলতেই হবে।
এখানে আগেই বলে নেয়া হয়েছে এটা ‘এম্পেরিক্যাল স্টাডি’ মানে অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা, সংখ্যাবাচক প্রাপ্ত তথ্য থেকে ব্যাখ্যা করে বলা, এভাবে পাওয়া ধারণা। গত ২০০১ সাল থেকে দুনিয়ায় হাজির হওয়া আলকায়েদা ফেনোমেনার সর্বশেষ প্রভাবশালী রূপ হলো আইএস (আইএসআইএল)-এর খলিফা রাষ্ট্র, এর তৎপরতা। আলকায়েদার সাথে আইএসের অন্তত একটা ভিন্নতা হলো পশ্চিমা দেশ বিশেষত ইউরোপ থেকে তরুণদের এতে যোগদানের হিড়িক। আর সেই সাথে ‘কেন তরুণেরা আকৃষ্ট হয়ে এই যুদ্ধে যাচ্ছে’ এ নিয়ে গবেষণা স্টাডিরও পাল্লা দিয়ে কমতি নেই। কিন্তু সেই স্টাডির তথ্য থেকে সব দোষ ফরাসি ভাষাভাষীদের এ কথা বলে আমেরিকার কেটে পড়ার চেষ্টা। এ দেখে অন্তত আমাদের মেতে ওঠার কোনো কারণ নেই।
এখানে এই স্টাডির মূল বিষয়টি ছিল, ‘ইউরোপের কোন দেশ থেকে কতজন বিদেশী যোদ্ধা হিসেবে আইএসে যোগ দিতে গেছে আর সে দেশ কয়টি আইএস হামলা খেয়েছে এই তথ্য থেকে ওই দেশে সুন্নি রেডিক্যাল ও সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার মাত্রাকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে এমন তত্ত্বটা কী’Ñ এর খোঁজ করা। এভাবে, ‘খুঁজতে গিয়ে +যা পেলাম তাতে আমরাই আশ্চর্যান্বিত। বিশেষত যখন আমরা বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠার প্রসঙ্গে গেলাম। দেখা গেল, বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠার কারণ একটা দেশের সম্পদ কেমন তা নয়। এমনকি এর নাগরিকেরা কেমন কী মাত্রায় শিক্ষিত অথবা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তাও নয়। বরং আমরা দেখলাম বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠা কিসের ওপর নির্ভর করে এ বিষয়টিকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে তা হলো যে, ওই দেশটা ফরাসি ভাষাভাষী কি না, তা দিয়ে। যেমন ওই রাষ্ট্রের ঘোষিত জাতীয় ভাষা (ন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ) আগে অথবা এখন ফরাসি কি না! অদ্ভুত ব্যাপারটা দেখা গেল, সবচেয়ে বেশি সুন্নি রেডিক্যাল হয়ে উঠেছে এমন পাঁচটা দেশের মধ্যে চারটাই ফ্রাঙ্কোফোন, মানে ফরাসি ভাষাভাষী, যার মধ্যে আবার ইউরোপের প্রধান এমন দুই দেশ হলো ফ্রান্স ও বেলজিয়াম।’
ইংরেজি ভাষাভাষী যুক্তরাজ্য যেমন ফরাসি ভাষাভাষী বেলজিয়ামের চেয়ে অনেক বেশি বিদেশী যোদ্ধার জন্ম দিয়েছে। এবং এটা সৌদি যোদ্ধাদের চেয়েও সংখ্যায় কয়েক হাজার বেশি। কিন্তু এভাবে সংখ্যাগুলোর দিকে তাকালে তা বিভ্রান্তিতে ফেলবে। বরং আমরা যদি কোনো দেশের জন্ম দেয়া বিদেশী যোদ্ধাদের সংখ্যা ওই দেশের মোট মুসলিম জনসংখ্যার শতকরা কত ভাগÑ এ দিক থেকে দেখি তাহলে আসল ছবিটা আমরা পাবো। প্রত্যেক মুসলিম বাসিন্দাপিছু কতজন বিদেশী যোদ্ধা জন্মেছে এই হিসাবের বিচারে বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য বা সৌদি আরবের চেয়েও অনেক বেশি বিদেশী যোদ্ধার জন্ম দিয়েছে।
এখন ফরাসি ভাষাভাষী বলতে ঠিক কী বুঝব বা কী বোঝানো হয়েছে? ফরেন অ্যাফেয়ার্সের রচনা এর জবাব দিচ্ছে। বলছে, ফরাসি ভাষাভাষী বলতে বোঝানো হচ্ছে, ‘ফরাসি রাজনৈতিক কালচার’। এরপর ফরাসি রাজনৈতিক কালচার কথাটাকেই আরো ব্যাখ্যা করে দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ‘ফরাসি কায়দার সেকুলারিজম ব্রিটিশ কায়দার সেকুলারিজমের চেয়েও বড় আগ্রাসী। যেমন- ইউরোপের মাত্র দু’টি দেশ পাবলিক স্কুলে বোরখকা নিষিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া ইউরোপের বিচারে এরাই সেই দুই রাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্রের মান বা মাত্রা সবার ওপরে নয়।’
এককথায় বললে, ফরেন অ্যাফেয়ার্সের রচনার মূল পয়েন্টটা হলো ফ্রান্সের সেকুলারিজম ব্রিটিশদের সেকুলারিজমের চেয়েও খারাপ। এটা ছাড়া বাকি সবই চর্বিত চর্বণ। আবার খুব কৌশলে আমেরিকার এই জার্নাল ফরাসিদের তুলনা করেছে আর অন্য ইউরোপীয় দেশের সাথে। সচেতনে নিজেদের, মানে আমেরিকার সাথে তুলনা করেনি।
আসলে এটা ব্রিটিশ আর ফরাসিদের মধ্যকার ভালো বা খারাপ সেকুলারিজমের তর্ক নয়। এ প্রসঙ্গটা এর আগে এনেছিলাম ‘মাল্টিকালচারালিজম বনাম অ্যাসিমিলিয়েশন’ শিরোনামের লেখায়। বলেছিলাম, ‘মাল্টিকালচারালিজম বলতে ব্রিটিশ বুঝটা হলো ব্রিটিশ সমাজটাকে সে নানা কমিউনিটির সহযোগে এক বড় কমিউনিটি হিসেবে রাখতে চায়। কলোনি মাস্টারের দেশ ও সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্ত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগোলিক ইত্যাদি পরিচয় বজায় রেখেই আবার এক বৃহত্তর ব্রিটিশ সমাজে এক ব্রিটিশ পরিচয়ে তবে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে বড় হোক। বিপরীতে ফরাসি পছন্দের অ্যাসিমিলেশন। শুনতে ভালো কিন্তু আসলে এখানে অনেক বেশি বলপ্রয়োগে জবরদস্তি করে সব নাগরিক সবাইকে বাধ্য করে এক রকম করার প্রচেষ্টা এটা। অর্থাৎ ফরাসি কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্ত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগোলিক ইত্যাদি পরিচয়ের স্বীকৃতি নেই। সব ভুলে যেতে হবে, বাদ দিতে হবে। এ জন্য বাধ্য করা হবে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার দিকটা আড়াল করে ‘সুন্দর’ ইউনিফর্মভাবে এক রকম করার নামে (ইংরেজি সিমিলার বা এককরণ থেকে অ্যাসিমিলিয়েশন) আসলে জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে, ফরাসি কালচারই একমাত্র চর্চার কালচার হতে, করতে বাধ্য করা।
কিন্তু এরপরও ওই লেখায় এই প্রশ্ন সেখানে তোলা হয়েছিল যে, ফরাসিরা ব্রিটিশদের মতো মাল্টিকালচারালিজমের বদলে অ্যাসিমিলিয়েশনের পথ ধরল কেন? এর ব্যাখ্যায় বলেছিলাম ঘটনাচক্রে ফরাসিদের ভাগে যেসব কলোনি পেয়েছিল সেই জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই মুসলমান জনসংখ্যার। কলোনি-পূর্ব থেকেই এরা তাই, বিশেষত আলজেরিয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকা পুরোটাই মুসলমান। আর এ অঞ্চল থেকেই নিজ মাস্টারের দেশ ফ্রান্সের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক সে এনেছিল। ফলে মাল্টিকালচারের লাইনে থাকলে আফ্রিকার মুসলমানদের ধর্মসহ কালচারাল বৈশিষ্ট্য জিইয়ে এবং ডমিনেটিং থেকে যেত। আর সাদা চামড়ার জনসংখ্যা কমতির দিকে, যেখানে কালো এবং মুসলমান আফ্রিকান জনসংখ্যা বাড়তির। তাই নিজ কালচারাল ডমিনেন্সির খাতিরে অ্যাসিমিলিয়েশনের লাইন বা জবরদস্তি ফরাসি কালচার চাপিয়ে রাখাটাই ফরাসিরা উত্তম মনে করেছিল। আর সেটাকেই এই রচনায় ব্রিটিশ সেকুলারিজমের থেকে ফরাসিরা ভিন্ন বলে চেনাতে চেয়েছে।
এখানে আর একটা মৌলিক তথ্য মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নির্বিচার হত্যা ও সন্ত্রাস শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে আফগানিস্তানে হামলা দিয়ে এবং এই হামলার পক্ষে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও সম্মতি পকেটে রেখে এবং একাট্টা সারা ইউরোপকে পাশে নিয়ে। কিন্তু পরে ইরাক হামলার সময় ২০০৩ সালে ঘটনা একই রকম থাকেনি। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের হাতে মানব বিধ্বংসী মারণাস্ত্র (ডব্লিউএমডি) আছে এই মিথ্যা ও অপ্রমাণিত অভিযোগ তুলে এই হামলা চালানো হয়েছিল। কিন্তু সেই জাতিসঙ্ঘের চোখেই এবার বুশ-ব্লেয়ারের জোট ইরাকে দখলদার বাহিনী বলে পরিচিত হয়েছিল। কারণ এই হামলার পক্ষে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও সম্মতি বুশ-ব্লেয়ার জোগাড় করতে পারেনি। বরং বুশ-ব্লেয়ারের বিপক্ষে সোচ্চার থেকে ভোট দিয়েছিল ফরাসি ও জার্মানি। ফলে ইরাক হামলায় ফরাসিরা অংশগ্রহণ করেনি। তবে অংশগ্রহণ করেনি সম্ভবত দ্’ুটি জিনিস চিন্তা করে। এক, কে আগে এবং কত বেশি আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠ তা নিয়ে ব্রিটিশদের সাথে ফরাসিদের প্রতিযোগিতা বহু পুরনো। আর এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা বেশির ভাগ সময়ে জিতেছে। ফলে এটাকে টনি ব্লেয়ারের উল্টো অবস্থান নিয়ে আমেরিকান তোয়াজ পাওয়ার চেষ্টা বলা যেতে পারে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে যাওয়া মানে স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা আর তা থেকে নিজ দেশের অসাদা চামড়া ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর সম্ভাব্য রোষের মধ্যে পড়া। এটা ফ্রান্স এড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু পরের পাঁচ বছরের মধ্যে ফ্রান্স বুঝে যায় যে, ইরাকের তেলের খনি বা অবকাঠামো প্রজেক্ট আর ফরাসিদের ভাগে কিছুই আসছে না। ফলে ২০০৮ সালের পর থেকে আবার ফরাসি সৈন্য ন্যাটো নামের আড়ালে অংশগ্রহণ করেছিল। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওঁলাদের আমলে আমেরিকান সক্ষমতার ঘাটতি মেটাতে একাই মালিতে ‘ইসলামি জঙ্গি’দের বিরুদ্ধে ফ্রান্স যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। আর এখন আছে জাতিসঙ্ঘ বাহিনী নামের আড়ালে। যেন ইরাক হামলায় অংশগ্রহণ না করাটা পুষিয়ে নিতে সে একাই মালিতে লড়তে গিয়েছিল। গাদ্দাফির পতন ঘটিয়ে এই ইসলামি গ্রুপটাই পরে নিজেদের আইএস বলে পরিচিতি দেয়। আর পরে ফরাসি বোমা আক্রমণের প্রতিক্রিয়ার পর ফরাসিরা প্যারিসে আইএসের হামলার শিকার হয়েছিল। তাহলে সার কথায় এটা সত্য যে, ইউরোপের মাত্র দু’টি দেশ ফ্রান্স ও বেলজিয়াম পাবলিক স্কুলে বোরকা নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু সেটা ফরাসি সেকুলারিজম ব্রিটিশের সেকুলারিজম থেকে বেশি আগ্রাসী, কারণটা এমন নয়। বরং তা অ্যাসিমিলিয়েশনের লাইনের জন্য, বা জবরদস্তি ফরাসি কালচার চাপিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে। 

১০ এপ্রিল ২০১৬
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫