ঢাকা, শুক্রবার,২৯ মে ২০২০

উপসম্পাদকীয়

ভারত-আমেরিকা সামরিক লজিস্টিক চুক্তি

গৌতম দাস

১৭ এপ্রিল ২০১৬,রবিবার, ১৮:০৭


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামার ডিফেন্স সেক্রেটারি অ্যাস্টন কার্টার এবং তার ভারতীয় কাউন্টার পার্ট, ভারতের মোদি সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর গত বুধবার যৌথভাবে ঘোষণা করেন যে, দুই দেশ সম্প্রতি কিছু প্রতিরক্ষা ইস্যুতে ‘নীতিগতভাবে’ একমত হয়েছে। বিষয়টি হলো, এরপর উভয় দেশ উভয়ের বাহিনীকে একে অপরের সাথে ‘লজিস্টিক স্থাপনা ব্যবহার বিনিময় চুক্তি’ করতে পারবে। তা এমন ভাবে করবে, যাতে একে অপরের সামরিক ঘাঁটি, ব্যারাক, বন্দর ও সম্পদ ব্যবহার করে তাদের প্রত্যেকের সরবরাহ মজুদ খালি হলে তা আবার পূরণ করে নিতে পারে। কোনো মেরামতের কাজ করতে ও বিশ্রামস্থল হিসেবে তা ব্যবহার করতে পারবে। এতে খরচ হয়ে যাওয়া অর্থ বা পণ্য তারা আবার সমতুল্য অর্থে বা পণ্যে অপরকে পরিশোধ করে দেবে। তবে এতে কোনোভাবেই ভারতের মাটিতে আমেরিকান সৈন্য পা রাখবে না অথবা এটা আমেরিকার সাথে কোনো সামরিক চুক্তি বা ন্যাটোর মতো কোনো সামরিক জোটে অন্তর্ভুক্তির মতো হবে না। 

কোনো সহযোগিতা চুক্তিতে যেমন হয় একপক্ষ কিছু সুবিধা পেলে বিনিময়ে অপর পক্ষও সমতুল্য সুবিধাদি পায় বা নিশ্চিত করা হয়; কিন্তু এখানে চুক্তিটি তেমন নয়। যেমন এখানে আমেরিকা যদি কোনো সামরিক ঘাঁটি বা বন্দর থেকে ভারতকে কোনো সুবিধা দেয় তবে ভারতকেও সমতুল্য একটি সুবিধা আমেরিকাকে দিতেই হবে ব্যাপারটা তেমন নয়। কারণ আমেরিকা যদি ভারতকে নিজ সামরিক সহযোগিতা জোটে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে আর তা যদি আমেরিকার পকেট থেকে সুবিধাদি ঢেলে দিয়েও তা হাসিল করতে পারে, তাতেও আমেরিকা রাজি হবে। কারণ এতেও তার নিজের স্ট্র্যাটেজিক প্রপ্তি হবে। আবার বিপরীতে ভারতের ভয় হলো, সে আমেরিকার সাথে কোনো সামরিক জোটচুক্তি বা ন্যাটোতে যেতে চায় না। আমেরিকার কাছ থেকে সামরিক লজিস্টিক সুবিধা সে পেতে চায়, কিন্তু আমেরিকার কাছে সে কোনো বাধ্যবাধকতায় পড়ে যেতে চায় না। অন্য ভাষায় বললে চীনের সাথের মূল প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে আমেরিকার মূল লক্ষ্য হলো চীন ও ভারত যেন নিজের বিপরীতে জোটবদ্ধ (সামরিক তো নয়ই, এমনকি অর্থনৈতিক যেমনÑ পাল্টা কোনো আইএমএফ ধরনের প্রতিষ্ঠান খাড়া করে এটাকে আমেরিকার বাইরে দুনিয়ার মূল ও নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফেলে) হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে না খাড়া হয়ে যায়। আমেরিকার কর্তৃত্বের দুর্বল ও পতনশীল হয়ে পড়া অবস্থাকে আরো পতন না ঘটায়। দুনিয়ার ওপর চালানো রুস্তমি তার হাত থেকে এরা দু’জন জোটবদ্ধ হয়ে কেড়ে না নিয়ে যায়। দুনিয়া জুড়ে নতুন ব্যবস্থাদি কায়েম না করে ফেলে ইত্যাদি।
এখন যে নতুন লজিস্টিক সুবিধা বিনিময় চুক্তি ভারত আমেরিকার সাথে করতে চায়, এর নাম Logistics Exchange Memorandum of Agreement (LEMOA। মূলত এটা সামরিক লজিস্টিক্যাল বিষয় নিয়ে। ২০০৪ সাল থেকে এমন চুক্তি করা বা আমেরিকার সাথে চুক্তিতে আসার জন্য আমেরিকা ভারতকে অফার দিয়ে রেখেছিল, প্রলুব্ধ করে চলেছিল। এর আগে তাই তখন এই চুক্তির নামের মধ্যে ‘বিনিময়’ শব্দটির জায়গায় অন্য শব্দ ছিল ‘সাপোর্ট’ অর্থে সহযোগিতা। ব্যাপারটি অনেকটা এমন যেন আমেরিকা ভারতের সামরিক বাহিনীকে সাপোর্ট করে যেতে চায়। এখন অভ্যন্তরীণ সমালোচনার ভয়ে ‘সাপোর্ট’ শব্দটি বদলে ‘এক্সচেঞ্জ’ শব্দটি নেয়া হয়েছে। কারণ এক্সচেঞ্জ শব্দটির মধ্যে যে দুই দেশ ‘সমানে সমানে’ ভাবটা আছে, সেটা ‘সাপোর্ট’ শব্দের মধ্যে নেই। বরং এতে অন্যের মাগনা সহযোগিতা নিচ্ছি অন্যের স্বার্থে এমন ভাব ও অর্থ আছে। এত দিন কংগ্রেসের ইউপিএ জোট এই ‘লজিস্টিক বিনিময় চুক্তি’ করতে রাজি হয়নি, আটকা পড়ে যায় কি না এই ভয়ে। এখানে এখন একটা সাধারণ দাগ টেনে বলা যায়, বিজেপিসহ আরএসএস পরিবার, প্রো আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক বিষয়ক বিশ্লেষক উদয় শঙ্করের মতো কিছু প্রফেশনালরা চায় আমেরিকার সাথে ডিল করে ফেলতে, তাতে ন্যাটো ধরনের জোট বা চুক্তিতে যেতে হলেও করতে। বিপরীতে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা তেমন কোনো বন্ধন প্রতিশ্রুতিতে আটকে যেতে হয় এমন চুক্তির ভেতরে থাকতে চায় না এরা। কিন্তু তাতে সব সময় এক অনিশ্চয়তার টেনশনে তারা ভোগে, ঠিক কী করা উচিত এ ব্যাপারে দ্বিধা অস্পষ্টতা তাদের থেকেই যায়। আর এই দুই ধারার মাঝে আছেন ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান ভি পি মালিক ধরনের কেউ কেউ। এরা সীমিত ও আগাম গোনায় ধরা কিছু রিস্ক নিয়ে চুক্তি করে আগানোর পক্ষপাতী। তার অবস্থান হলো, তিনি দু’টি জিনিস করতে চান না। এক এমন চুক্তির ফলে আমেরিকান সৈন্য ভারতের মাটিতে ঘাঁটি গাড়ুক, এটা চান না। আর দ্বিতীয়ত, আমেরিকান সৈন্য ও জাহাজ ভারতের মাটি থেকে লজিস্টিক সুবিধাদি ভরে নিয়ে যাওয়ার পরে অন্য কোথাও গিয়ে হামলা করলে বা না করলে সেখানে আমরা সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়তে চাই না। আমি আশা করি, এই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ আপত্তির দিকে খেয়াল রেখে নতুন করে তৈরি করা খসড়ায় এখন চুক্তিটি হবে।
এসবের বিপরীতে কেন এই চুক্তি করা মোদির সরকার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে, এর সপক্ষের খুব কিছু ব্যাখ্যা তারা করেনি। যেমন- মোদির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পারিকর যেভাবে যুক্তি সাজিয়েছেন তাতে তিনি বলছেন, যেহেতু আমেরিকার সাথে আমাদের সংশ্লিষ্টতা গভীর হচ্ছে তাই এই সহযোগিতা সংশ্লিষ্টতা ধরে রাখার উপায় হিসেবে এই চুক্তি করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মোদি সরকারের গত সপ্তাহে চুক্তি করার সপক্ষে তাদের নীতিগত ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত জানানোর পর আরো জানিয়েছে মধ্যপূর্ণ চুক্তির ড্রাফট উভয় পক্ষ আগামী এক মাসের মধ্যে শেষ করে ফেলবে আর তার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান করা হবে।
মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কংগ্রেস ও বাম সংগঠনগুলো খুবই কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কংগ্রেসের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি। তিনি বলছেন, মোদির এনডিএ জোট সরকারের আমেরিকার সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত হবে ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও স্ট্র্যাটেজিক প্রশ্নে স্বশাসন ভোগের শেষ দিনের শুরু। তাই এটা খুবই ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত হবে। সরকার এই চুক্তিসহ এমন আরো মৌলিক চুক্তিগুলো করা থেকে পিছিয়ে আসা উচিত। বাম দলগুলো এই চুক্তিকে ‘ভয়ঙ্কর এবং অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ বলে চিহ্নিত করেছে।
আর সিপিএম বলেছে, সরকার দেশকে আমেরিকার পরিপূর্ণ সঙ্গী বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনির একটা মন্তব্য খুব আগ্রহ জাগানোর মতো। তিনি বলছেন, এই চুক্তি হলে ভারত ক্রমেই আমেরিকান সামরিক জোটে (ন্যাটোর কথা বলছেন তিনি) অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে। এই চুক্তি করলে ভারত আমেরিকান মিলিটারি বিশেষ করে মেরিনের কাছে তাদের নিজের অপারেশনগুলো আরামে চালানোর জন্য উন্মুক্ত করে দেবে। ভারত এতে সুবিধাদি যত কিছুই পাক, যেহেতু সে মূলত নিজের উপকূলের বাইরে খুব বেশি যায় না; ফলে এসব সুবিধার পুরাটাই আসলে আমেরিকারই ভোগে লাগবে। আর এ কথা সত্যি হবে, বিশেষত আগামী তিন বছরের মধ্যে আমেরিকা নিজের সামরিক সক্ষমতার ৬০ ভাগ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে এসে জড়ো করবেÑ এমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে। এই চুক্তি ছাড়াও ভারতের দিক থেকে আরো দু’টি চুক্তি করার পক্ষে লোভ আছে, বিশেষত সামরিক সুবিধাদি ব্যবহার যারা করবে, এমন পেশাজীবীদের দিক থেকে লোভ আছে। এমন দুই চুক্তি হলো- CISMOA ও BECA।
স্বাধীন নিরপেক্ষ বিবেচনার যে কেউ কংগ্রেস ও বামদের ওপরের এসব আপত্তিকে দেখে এর সবই কংগ্রেস নিজে ক্ষমতায় থাকলে করত না- এমনটি তার পক্ষে হলফ করে বলা মুশকিল হতো। কারণ কংগ্রেস ও বামের এই বিরোধিতা কতটা জেনুইন আর কতটা ভোট নির্বাচনী রাজনীতির স্বার্থে বিরোধিতা, তা আলাদা করা মুশকিল। মোদি সরকারকে নিন্দা করে আগামীতে নিজের পক্ষে ভোট জোগাড় করার জন্য কতটা তারা এমন করছে, তা বেছে আলাদা করা মুশকিল।
বিশেষত বামদের বিরোধিতার মূল কারণের দিকে তাকালে এর হদিস করা আরো কঠিন। একটা রাজনৈতিক চুক্তি করার সিদ্ধান্ত কেন নেয়া উচিত আর কেন নয়, এ ব্যাপারে বাম কমিউনিস্টদের কাছে এখনো মূল বিচার্য বিষয় হলো- কে তথাকথিত বাম অথবা ডান সে আলোকে সিদ্ধান্ত নেয়া। এর বাইরে কোনো স্বাধীন বিচার্য ক্রাইটেরিয়া দিয়ে বিচার-বিবেচনা বামেরা এখনো করতে পারে না। অথবা কোনো চুক্তির প্রস্তাবিত নিজ শর্তগুলোর ভালো-মন্দ দিক, সম্ভাব্য প্রভাব প্রতিক্রিয়া নিজে বুঝতে পারে না। এ ছাড়া বামপন্থীদের বিরুদ্ধে মূল সমালোচনা হলো তাদের বাম বা ডান বোধ এগুলো কথার অর্থ হতো যখন দুনিয়াতেও কোল্ড ওয়ার চালু ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে বা বিপক্ষে দিয়ে ডান-বাম বিবেচনার একটা অর্থ থাকত তখন। কিন্তু এখন সোভিয়েত ইউনিয়নই ভেঙে গেছে। সারা দুনিয়াই এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনস্থ। ফলে কাকে ডান আর বাম বলব সব অর্থহীন হয়ে গেছে। তবুও এখনো বামেরা একটা ভাব করে যেন, কোল্ড ওয়ারের বাম বা ডান কথাটির অর্থ এখনো আছে। এখন দুনিয়ার সব রাষ্ট্রই যেন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনস্থ সব দেশ হয়নি। এর কোনো খবর তারা পেয়েছে তা মনে হয় না। ফলে এখনো আমেরিকার সাথে কোনো চুক্তি বিরোধিতা আমাদের মতো দেশের করতে হতেই পারে, কিন্তু তা আমেরিকা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রÑ এই ক্রাইটেরিয়ার কারণে তা করতে হবে এটা অর্থহীন কথা।
এই বিচারে ভারতের বামদের কোনো আপত্তি বা পক্ষে বলা কোনোটাই গুরুত্বের সাথে নেয়ার যুক্তি দেখতে পাওয়া মুশকিল। তবে ভারতের দিক থেকে মূল একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক আছে। তা হলো, আমেরিকান অবস্থান ভারতের আগামী নয়। সে ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। বিশেষত পুরনো গ্লোবাল ব্যবস্থাদি ভেঙে নতুন ব্যবস্থা কায়েম করার দিক থেকে। আর নতুন ব্যবস্থাদি কায়েম করা আর নিজের তাতে ভালো অবস্থান নেয়ার দিক থেকে চীন আমেরিকার বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গী। তাতে সেই চীনের সাথেই আবার তার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্পর্কও প্রবল- এই সত্যতা থাকার পরও। কারণ মনে রাখতে হবে, এখনকার দুনিয়ায় আমরা সবাই একই গ্লোবাল এক অর্ডারের মধ্যে অবস্থিত। ফলে এর মধ্যে সহযোগিতা আর বিরোধিতা দু’টিই প্রবল সবল আছে, থাকবে। কেবল কোনটা কী ইস্যু তা ঠিক করে দেবে তা কখন সহযোগীর আর কখন চরম বিরোধিতার।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর তাতে ভারতের প্রভাবের কথা মনে রেখে অনেকে সন্দিহান হয়ে উঠতে পারেন এই ভেবে যে, ভারত-আমেরিকা চুক্তির ফলে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা এক জোট এক স্বার্থ হয়ে যাবে কি না। আপাতত আমার মনে হয় না তা হবে। আসলে বাংলাদেশ ইস্যুতে দুই দেশের স্বার্থের বেমিল এখনকার মতো একই থেকে যাবে। তাতে ভারত-আমেরিকার নিজস্ব পারস্পরিক সামরিক স্বার্থে পরস্পরের ভেতর কোনো কমন স্বার্থ দেখতে পেল কিংবা না পেল তাতে কিছুই আসবে যাবে না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫