ঢাকা, শুক্রবার,২৯ মে ২০২০

উপসম্পাদকীয়

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কার জন্য কী আনবে

গৌতম দাস

০২ মে ২০১৬,সোমবার, ১৮:৩২


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন অর্থাৎ তাদের প্রাদেশিক বা বিধানসভার নির্বাচন-২০১৬ চলছে। মোট ছয় পর্বে তবে সাতটা আলাদা আলাদা দিনে এক গুচ্ছ করে আসনে নির্বাচন হচ্ছে। এভাবে মোট ২৯৪ আসনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ৩০ এপ্রিল পঞ্চম পর্বের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এতে মোট ৫৩ আসনে নির্বাচন সম্পন্ন হলো। এর ফলে মোট আসন ২৯৪ এর মধ্যে আগামী ৫ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা শেষ পর্বের কেবলমাত্র ২৫টা আসনে নির্বাচন হওয়ার বাকি থাকল। অর্থাৎ ইতোমধ্যে ২৬৯ আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ২৫ আসনে আগামী ৫ মে নির্বাচন হলেই সব আসনের নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যাবে। যদিও সব আসনের ফলাফল একসাথে আগামী ১৯ মে ঘোষণা করা হবে। এই হলো নির্বাচন সম্পর্কে কিছু মৌলিক তথ্য। আর এটা চলতি নির্বাচন বিষয়ে আমার দ্বিতীয় লেখা। গত মাসের শুরুতে আগের প্রথম লেখাটা ছাপা হয়েছিল।
ইতোমধ্যে এই নির্বাচন উপলক্ষে কে চায় কোন দল জিতে আসুক অথবা তার বিশ্লেষণে যে দল জিতবে বলে সে মনে করে, এমন অনুমিত বা আকাক্সিক্ষত নাম তা সবার নিজের মত প্রকাশ শুরু হয়ে গেছে। তবে দেখা যায়, এসব মতামতের কিছু বিষয়ে সবাই একমত। যেমন অংশগ্রহণকারী শীর্ষ চারটা দলের নাম করতে বললে সেগুলো হবে তৃণমূল কংগ্রেস, বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও বিজেপি; কিন্তু এদের মধ্যে কে জিততে পারে এই প্রশ্নে সবাই হয় বলবে তৃণমূল নয়তো বামফ্রন্ট (এবার বামফ্রন্ট বলতে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোট বুঝতে হবে), এই দুইয়ের মধ্যে থাকবে। অর্থাৎ কংগ্রেস বা বিজেপি এই দুই দল জিতবে এ কথা এক অলীক বাস্তবতা। সমর্থক নির্বিশেষে সবাই ইতোমধ্যে তা স্বীকার করে নিয়েছে। এখন তৃণমূল ও বামফ্রন্টের মধ্যে কে জিতবে এটাই হলো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তৃণমূল একাই না বামফ্রন্টের জোট- কে একাই ১৪৮ আসনের চেয়ে বেশি আসন নিজের ব্যাগে ভরতে পারবে? স্বভাবতই ১৯ মে ফলাফল ঘোষণার আগে কেউই নিশ্চিতভাবে এর জবাব জানে না। আর ঠিক তত দিন নির্বাচনী আলোচনার বাজার সরব হয়ে থাকবে এক্সিট পোল বা অপিনিয়ন পোল থেকে পাওয়া আগাম অনুমিত বয়ানের ফলাফল নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে পাঁচটি আলাদা আলাদা কোম্পানি বা জোটের এক্সিট পোলের আগাম বক্তা হয়ে মাঠে উপস্থিত আছে; কিন্তু মজার ব্যাপারটা হলো, পাঁচটি এক্সিট পোলই তৃণমূলকে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত দল বলছে। আর ওই পাঁচ এক্সিট ফলাফলের মধ্যে তৃণমূলের সম্ভাব্য প্রাপ্ত আসন সংখ্যা, যা ওখানে দেখানো হয়েছে তা হলো ১৬০, আর সর্বোচ্চ ২০১। মনে করিয়ে দিই এখানে (হাফ ক্রস মার্ক) বা মোট ১৪৮ আসনের বেশি আসন পেলেই সে বিজয়ী ও সরকার গঠনে সক্ষম বলে বিবেচিত হবে। এর অর্থ পাঁচটি এক্সিট পোল কোম্পানির ফলাফলেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল নিরঙ্কুশ আসন পেতে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত আছে সেখানে; কিন্তু বাস্তবতা হলো এক্সিট পোল কোনোভাবেই আসল ফলাফল নয়, এটা যেন আমরা না ভুলি। আর প্রতিটি পোল কোম্পানিরই নিজের এজেন্ডা আছে, পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি বিষয় আছে। থাকবেই। অতএব ইঙ্গিতে দেখা কথাটা বলা মানে সেটাই সত্যি হবেই তা মোটেও এখানে দাবি করা হচ্ছে না।
এ দিকে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোটের অদ্ভুত কিছু আচরণ ও তৎপরতা নজর করার মতো। যেমন চার পর্বের নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরে গত ২৭ এপ্রিল বুধবার বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোটের যৌথভাবে এক নির্বাচনী জনসভা ডেকেছিল, যেখানে একই মঞ্চ শেয়ার করেছেন কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী আর সিপিএমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। আসরে তারা পরস্পর কোলাকুলি করেছেন, পরস্পরকে মালা পরিয়ে দিয়ে শোডাউন করেছেন। এগুলোর কোনোটাই হয়তো অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু প্রশ্ন হলো এটা ‘বিয়ে ফুরালে এরপর বাজনার আয়োজনের মতো’ কেন? যখন ২৯৪ আসনের মধ্যে মাত্র ৭৮টা আসনের নির্বাচন বাকি, তখন এই হাই প্রফাইল আয়োজন কেন তারা ডাকল- এর কোনো ব্যাখ্যা বা জবাব কোথাও তারা কেউ দেয়নি। গত ২৯ এপ্রিলের ভারতের ইংরেজি ওয়্যার পত্রিকার ভাষায়, ‘দুই দলের জোটের ঘনিষ্ঠতা জনগণের সামনে এমন হঠাৎ করে তুলে ধরার দ্বিতীয় নজির আর কোথাও নে। এরা ভোটপর্ব শুরুর আগে আয়োজন করল না কেন এই প্রশ্ন এখন মুখে মুখে।’
ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ফার্স্ট পোস্ট’-এর শিরোনাম হলো, পশ্চিমবঙ্গে ‘সোনিয়ার সভা এবার প্রমাণ করেছে যে তিনি মমতার চেয়ে বিজেপিকে বেশি ভয় পেতে শুরু করেছেন।’ পত্রিকা কেন এমন শিরোনাম করেছে এর ব্যাখ্যায় বলছে, এক দিনের মাথায় কংগ্রেসপ্রধান সোনিয়া গান্ধী অবস্থান বদল করেছেন। গত ২৭ তারিখে তিনি সরাসরি বামফ্রন্টের ‘লাল পতাকায় ভোট দিতে’ আহ্বান জানিয়েছেন। অথচ আগের দিনের সভায় তিনি এমন কথা বলেননি। বরং সরাসরি মমতার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন, মোদির সাথে মমতার গোপন আঁতাত আছে, এমন কথা তুলেছিলেন। এরপর আরো ব্যাখ্যা দিয়ে পত্রিকাটা বলছে, নির্বাচন রেলিতে মোদি বলে গিয়েছেন কংগ্রেসের ভোটপ্রাপ্তির হার এবার আরো কমবে। ফলে সোনিয়া সম্ভবত ভয় পাচ্ছেন যে, ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতোই হয়তো বিজেপি আবার আরো বেশি করে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোটের ভোট আরো কাটবেন। এই ভয়ের এক অদ্ভুত প্রতীকী প্রভাব দেখা গেছে। কংগ্রেসের ফ্ল্যাগ বইতে দেখা গেছে বামফ্রন্টকে আর বামফ্রন্টের লাল ফ্ল্যাগ বইছে কংগ্রেস। এসব ঘটনার আরো জটিল দিক তুলে ধরেছে কলকাতার প্রাচীন ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ। লিখেছে- কংগ্রেস ও লাল ঝাণ্ডাওয়ালা পার্টিকে ভোট দিয়ে জিতাতে সোনিয়া আহ্বান রেখেছেন। বলেছেন, ‘আমি আপনাদের কাছে নিবেদন করছি যে, কংগ্রেস ও লাল ঝাণ্ডাওয়ালা পার্টিকে ভোট দিয়ে আমাদের বিজয় নিশ্চিত করুন।’
টেলিগ্রাফ বলছে, একটা গুজব উঠেছিল যে সোনিয়া ব্যক্তিগতভাবে সিপিএম-বামফ্রন্টের ওপর খুশি নন। কারণ গত কংগ্রেস সরকারের সময় তাদের সরকার আমেরিকার সাথে নিউক্লিয়ার চুক্তিতে যাওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে কংগ্রেসের সাথে থাকা জোট ত্যাগ করে সিপিএম-বামফ্রন্ট বেরিয়ে গিয়েছিল। অনেকে বলছেন, এই গুজব চাপা দিতেই সোনিয়ার এই লাল ঝাণ্ডা প্রীতি দেখানোর আদিখ্যেতা; কিন্তু টেলিগ্রাফ বলছে, এতেও সমস্যা যাচ্ছে না। যেমন পশ্চিমবঙ্গের সাথে এবার আরো সাত রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণের কেরালা রাজ্য। আর সেখানে মুখোমুখি প্রধান দুই টপ প্রতিদ্বন্দ্বী হলো কংগ্রেস ও সিপিএম-বামেরা। সোনিয়া পশ্চিমবঙ্গে লাল ঝাণ্ডার পক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানানোর পর কেরালা যাবেন, সেখানে দলের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইতে। আর সেখানে গিয়ে সিপিএম নেতা প্রকাশ কারাত আর তার লাল ঝাণ্ডার বিরুদ্ধে ভোট দিতে বলবেন। এই তামশাটা কেমন লাগবে। মানুষ কেমনভাবে নেবে। শুধু তাই নয়, অনেকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর সিপিএমের নেয়া প্রস্তাব, যা এখনো তাই আছে তা হলো, কংগ্রেস ও বিজেপি থেকে দল দূরে থাকবে এবং বলা বাহুল্য ২০১৬ তে এসে কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট গড়ে ফেলা সিপিএমের ওসবের প্রস্তাব ধারে কাছে নেই।
এই অবস্থাটা ভারতের রাজনৈতিক দলের দুর্দশাটাকেই তুলে ধরে। আর প্রমাণ করে, আর কোনো রাজনৈতিক দলই ন্যূনতম কোনো দলীয় নীতি অবস্থান টিকিয়ে রাখছে না। বরং যা করলে দল ভোট বেশি পাবে সেটাই সুপ্রিম। বাকি সব বিবেচনা খুবই তুচ্ছ বিষয়। সিপিএমও এই ক্যাটাগরির বাইরের দল নয়।
এ কথা ঠিক- মোদি বা বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের লক্ষ্য হলো, সিপিএমকে সরকারে ফিরে আসতে না দেয়া। আর যেহেতু বিজেপির সাংগঠনিক অবস্থা এখনই সবল নয়, ক্ষমতায় যাবার মতো নয়, তাই সিপিএম ঠেকানোর লক্ষ্যের ব্যবহারিক অর্থ দাঁড়িয়ে যায় (না চাইতে হয়ে যাওয়া লক্ষ্য) মমতাকে রেখে দেয়ার পক্ষে কাজ করা। বিজেপির এমন হিসাবের কারণ হলো, এর পরের বারের নির্বাচনে জয়লাভকে টার্গেট করে আগানো। তা সে চায় এবার যদি বামফ্রন্টের ক্ষমতায় ফিরে আসা আটকে দেয়া যায়, তবে পরপর দুই বার ক্ষমতা হারানোর শোক বাম নেতাকর্মীরা সামলাতে পারবে না, আর সংগঠন ধরে রাখতে পারবে না। এই শোকে হতাশ হয়ে কর্মীরা দল ছাড়বে। ফলে এককালের কংগ্রেসকে একনাগাড়ে ৩৪ বছর যেভাবে কাঁদিয়ে সিপিএম ক্ষমতায় ছিল, তেমন অবস্থা সৃষ্টি হবে। বিজেপির এই পরিকল্পনা হয়তো সফল হবে, হয়তো না; কিন্তু আপাতত এর বেনিফিট তৃণমূলের মমতার ভাগে আসছে, তাই দেখা যাচ্ছে। সেই সাথে বিজেপির আর এক লক্ষ্য দিদির ভোট রিগিংয়ে ওস্তাদ হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করা।
ওদিকে মমতা দিদির তৃণমূলের ভাগ্য দাঁড়িয়ে আছে মুসলমান ভোটের ওপর। ২৭-২৮ শতাংশ মুসলমান ভোটার কি দিদির দল তৃণমূলের পক্ষে ভোট দেবে? এতে কিছু সংশয় আছে, সন্দেহ নেই। তবু গত ২০১৪ সালের শেষে বিজেপি সভাপতি সেভাবে তথাকথিত জঙ্গি, বাংলাদেশ থেকে তথাকথিত অনুপ্রবেশকারী এবং অর্থ সরবরাহকারী, জেএমবি এগুলো প্রপাগান্ডায় যে মুসলমানবিদ্বেষের আবহ সৃষ্টি করেছিল, তা এখন ঢিলা হয়ে গেলেও সেসব স্মৃতি যদি মনে রাখে তবে কিছু ব্যতিক্রম বাদে মুসলমান ভোটারের প্রধান অংশ মমতার পক্ষে কাস্ট হওয়ার কথা। দিদির তৃণমূলের ওপর বড় ধরনের কোনো অসন্তোষ মুসলমান ভোটারদের পক্ষে আছে, এমন শোনা যায়নি। যদিও এসব বিষয়ে আসল তথ্য একমাত্র ভোটের ফলাফল দেখার পরই হয়তো জানা যাবে।
সবশেষে একটা বিষয় স্বীকার করতেই হবে, বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোট উপযুক্ত আসন পেয়ে সরকারের আসুক আর না-ই আসুক এই জোট জনগণের মনে একটা হাওয়া উঠাতে বা তৈরি করতে পেরেছে যে, এই জোট ক্ষমতায় আসতে সক্ষম, এসে যেতেও পারে। তবে এটা অবশ্যই একটা পারসেপশন মাত্র। এই পারসেপশন বা ধারণা আর বাস্তবতা পুরোপুরি আলাদা হতেও পারে। তবু সেসব বিষয়ে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস জোট যে আলোচনা করে রেখেছে তারই ইঙ্গিত রেখেছেন প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি অধীর চৌধুরী। আনন্দবাজারকে তিনি বলেছেন, উপমুখ্যমন্ত্রীর একটা পদ সৃষ্টি করা হবে। এ কথা বলেই আসলে নিজের জোটের ক্ষমতায় এসে যেতে পারে এমন আওয়াজটাকে তিনি সত্যতা দিতে, আবহ সৃষ্টিতে কাজে লাগিয়েছেন।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫