ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৮ মে ২০২০

মাহে রমজান

আব্বাসউদ্দীনের স্মৃতি ও রমজান মাস

ডা: মো: নজরুল ইসলাম আখন্দ

১৫ জুন ২০১৬,বুধবার, ১৭:৩৪


প্রিন্ট

স্মৃতি একটি মজার ব্যাপার। স্মৃতি একটি শক্তি, যাকে আমরা স্মৃতিশক্তি বলে থাকি। অনেকে আছেন, যারা ছোটবেলার অনেক কথা-কাহিনীই স্মরণে রেখেছেন। আবার অনেকে আছেন, যারা সকালের কথা দুপুরবেলাতেই মনে রাখতে পারেন না। ব্যক্তিবিশেষের স্মৃতিশক্তির তারতম্যের জন্যই এমনটি হয়ে থাকে। দূর অতীতের এক দিনের একটি স্মৃতিচারণ করতে যাচ্ছি। ঘটনাটি সেই ১৯৪৬ সালের। দেশ বিভাগেরও এক বছর আগের কথা। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলো, ভাঙল। পরে জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশের। সেটাও আজ থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কথা। আমিও বাল্যকাল অতিক্রম করে ক্রমান্বয়ে কৈশোরে, কৈশোর থেকে যৌবন, যৌবন থেকে প্রৌঢ়ত্বে এবং বর্তমানে বৃদ্ধকালেরও শেষ পর্যায়ে। যখনকার কথা বলছি, তখন আমি বগুড়া জেলার সোনাতলা (বর্তমানে একটি উপজেলা) উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র। বয়স মোটে চৌদ্দ। নেহায়েতই বাল্যকাল বটে। মাসটার কথা মনে নেই, তবে দিনটা যে সে বছরের রমজান মাস শুরুর আগের দিন, সেটা স্পষ্ট মনে আছে।

গ্রীষ্মকাল। আমাদের স্কুলের পবিত্র রমজানের ছুটি শুরু হবে। স্কুলের নিয়ম ছিল, লম্বা ছুটির আগের দিন ক্লাসে পড়াশোনা হবে না। স্কুল বসবে সকাল ৭-৮টায়। ছাত্ররা নিজ নিজ সাধ্যানুযায়ী ফুলের মালা নিয়ে আসবে। এখনকার মতো তখন বাজারে ফুল কিনতে পাওয়া যেত না। গ্রামে ফুল সংগ্রহ করাও একটা কঠিন ব্যাপার ছিল। ফুল সংগ্রহ করা হতো বনজঙ্গলে বা কোনো শৌখিন লোকের নিজ বাড়িতে লাগানো ফুলগাছ থেকে। নিদেনপক্ষে কাগজের মালা। সেজন্য মালার সংখ্যা হতো কম। বাস্তবে মালার সংখ্যা কম হলেও ছাত্রদের মনের আনন্দের কমতি ছিল না।
স্কুল শুরু হওয়ার ঘণ্টা পড়ত যথারীতি। ছাত্ররা নিজ নিজ ক্লাসে অন্যান্য দিনের মতোই বসত। শিক্ষক আসতেন। অমনি শিক্ষককে মাল্যদান শুরু হয়ে যেত। ছাত্ররা সামনের হাইবেঞ্চ চাপড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করত। সে আনন্দ কী যে স্বতঃস্ফূর্ত, তা হৃদয়ঙ্গম করা ছাড়া ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মাল্যদান শেষে শিক্ষক কিছু উপদেশমূলক কথা বলতেন। ছুটির নোটিশ এলে তিনি পড়ে শোনাতেন। যথারীতি ছুটির ঘণ্টাও বাজত। তখন সব ছাত্র বারান্দায় সারিবদ্ধভাবে বসে পড়ত। কারণ লম্বা ছুটির শুরুতে স্কুলের পক্ষ থেকে ছাত্রদের হালকা নাশতা, অর্থাৎ মুড়ি-মুড়কি খাওয়ানোর রেওয়াজ ছিল। নাশতা শেষে ছাত্ররা স্কুলচত্বর থেকে বেরিয়ে পড়ত।
নাশতা পরিবেশন ও খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে অতীত ঐতিহ্যের মতোই একটা সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। সেটা এই- সব উদ্যোগী ও উৎসাহী ছাত্র মিলে রেল ভ্রমণে কুচবিহার শহর দেখতে যাওয়া। এরূপ ভ্রমণ এই স্কুলের একটা প্রথাও ছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভ্রমণ ইচ্ছুক ছাত্ররা সোনাতলা রেলস্টেশনে জড়ো হয়ে লালমনিরহাটগামী প্যাসেঞ্জার ট্রেনে বিনা টিকিটে উঠে পড়ল। বিনা টিকিটে গাড়িতে ওঠার কারণ, ছাত্রদের একটা দৃঢ়বিশ্বাস ছিল যে, ট্রেনে কর্তব্যরত পরিদর্শনকারীরা স্কুলের ছোট ছেলেদের একটু মায়া-মমতা দেখাবেন এবং বিনা টিকিটে ভ্রমণকারী ছাত্রদের এই অভিযোগে অভিযুক্ত করবেন না এবং এজন্য নির্দিষ্ট মাশুলও আদায় করবেন না। বাস্তব ঘটনাও তাই ছিল। আমরা লালমনিরহাট হয়ে কুচবিহার রেলস্টেশনে পৌঁছে গেলাম বিকেল আনুমানিক ৪-৫টায়। রেলস্টেশন গেটে কর্তব্যরত টিকিট সংগ্রহকারী আমাদের অনায়াসে বেরিয়ে যেতে দিলেন।
রেলগাড়িতে ভ্রমণের এই দীর্ঘ সময় কামরায় বসে বসে আলোচনার মাধ্যমে কয়েকটা সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। সেগুলো নিম্নরূপ :
১. যেহেতু আমরা অপরিচিত স্থানে আগন্তুক অল্পবয়সী ছাত্র এবং সংখ্যায় বেশি, সে জন্য আমরা খুব সুশৃঙ্খলভাবে চলব। ২. প্ল্যাটফর্ম পার হয়েই আমরা রাস্তার উভয়পাশে সারিবদ্ধ হয়ে চলব। ৩. সবাই একই পরিচয় দেবো, অর্থাৎ আমরা বগুড়া জেলার সোনাতলা স্কুলের ছাত্র। ৪. সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য মাত্র একটাই- কুচবিহার শহর দেখা। থাকব কেবল এক রাত, মসজিদে মসজিদে, দলগতভাবে। ৫. প্রধান উদ্দেশ্য কুচবিহারের রাজবাড়ী দেখা। দ্বিতীয়টি হলোÑ ভাওয়াইয়া গানের সম্রাট বিখ্যাত গায়ক আব্বাসউদ্দীন (মরহুম) সাহেবের নিজ কণ্ঠে একটি গান শোনা। ৬. পরের দিন সকালে লালমনিরহাটগামী প্রথম গাড়িতেই আমরা ফিরতি যাত্রা করব।
সিদ্ধান্ত মতো সন্ধ্যার আগে শহরে আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা শুরু করলাম। উৎসুক জনতা আমাদের একটাই প্রশ্ন করা শুরু করল, হঠাৎ কেন এত ছাত্র একসাথে কুচবিহারে এসেছি। জিজ্ঞাসার কারণও যথার্থ। কারণ সে সময়ে দেশ বিভাগের তোড়জোড় চলছিল; সারা ভারতবর্ষে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর্মচাঞ্চল্য। এরই মধ্যে সেখানে আমাদের হঠাৎ আগমন। তাই বিষয়টি তাদের ভাবিয়ে তুলেছে; উৎসুক করে তুলেছে। এটাই স্বাভাবিক।
কুচবিহারে ভ্রমণকারী এই ছাত্রদলের সম্বল ছিল মাত্র পরনে একটি কাপড় আর গায়ে একটি জামা। তাই এই ভ্রমণকে দুঃসাহসিক বলা যেতে পারে। রাতে মসজিদে শোয়ার উন্মুক্ত শেঝের অভাব হয়নি। এই অসহায় অবস্থায় মশককুল কিন্তু আমাদের ছেড়ে কথা কয়নি। তাদের ‘কর্তব্য’ তারা পালন করেই চলল। এর মধ্যে তারা আমাদের দু-একটা চড়-থাপ্পড় খেয়ে কী আনন্দ পেল, জানি না। মশককুলের প্রতি আমাদের বিরামহীন চড়-থাপ্পড় আর ফিস ফিস গল্পগুজব করে নিদ্রাহীন রাতটা আনন্দেই কাটল। তখনকার বয়স বিবেচনায় পুরো একটি রাত নির্ঘুম কাটানো কিছুই মনে হয়নি, তবে বর্তমান বয়সে এমন হলে ‘খবর ছিল’!
পরের দিন সকালে প্রথমে রাজবাড়ী দেখতে গেলাম। কেমন লেগেছিল, কতটা আনন্দ পেয়েছিলাম, আজ তা স্মৃতির অতল তলে তলিয়ে গেছে। মনে আছে শুধু যাওয়া-আসার স্মৃতিটুকু। পরের ধাপে বিখ্যাত গায়ক মরহুম আব্বাসউদ্দীন আহমদের বাড়িতে গিয়ে তার নিজ মুখে গান শোনার পালা। যথারীতি সাক্ষাৎও পাওয়া গেল। আমাদের উদ্দেশ্যের কথা তাকে জানালাম। বললাম, এত দিন আমরা আপনার গাওয়া গান কেবল গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ারেই শুনেছি। আজ আমরা আপনার কণ্ঠে একটি মাত্র গান শোনার জন্য সুদূর বগুড়া থেকে বুকভরা আশা নিয়ে এসেছি। নিশ্চয়ই আপনি এ আশা পূরণ করবেন। প্রত্যুত্তরে তিনি যা বললেন তা হলো- ‘আজ পয়লা রমজান। রোজা রেখেছি। রোজা রেখে গান গাই না। এ জন্য আমি দুঃখিত। তবে আমার ছেলেমেয়েরা গান গেয়ে শোনাবে। তারা ভালোই গায়। আশা করি তোমাদের ভালো লাগবে।’
শ্রদ্ধেয় মরহুম আব্বাসউদ্দীনের ছেলেমেয়েরা তখন যে গান গেয়েছিলেন, তাদের কার কী নাম তা আমাদের শোনা বা জানা হয়নি। তবে এখন তারা নিজগুণে কর্মক্ষেত্রে বহু সুনাম অর্জন করেছেন এবং দেশবাসীর কাছে সুপরিচিত। তাই তাদের নাম আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
লেখক : প্রভাষক (সাবেক), বগুড়া হোমিওপ্যাথি মেডিক্যাল কলেজ ও চিকিৎসক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫