ঢাকা, মঙ্গলবার,০৭ এপ্রিল ২০২০

উপসম্পাদকীয়

চীন-মার্কিন চলতি সম্পর্কের ভিত্তি

গৌতম দাস

০১ জানুয়ারি ২০১৭,রবিবার, ১৮:১৮


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

ট্রাম্পের বিজয়ে চীন-আমেরিকান সম্পর্কে নতুন সম্ভবত পালাবদল ঘটতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে চীন-আমেরিকান সম্পর্কের ভিত্তি কোথায় ও কী থেকে শুরু হয়েছিল, এর মূল্যায়ন দরকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) এশিয়ায় জার্মানির যুদ্ধজোট-পক্ষের শক্তি ছিল জাপান। তবে জার্মান ও জাপানের মধ্যে তফাৎ এটুকু যে জার্মান হলো ইউরোপে আগে থেকে কলোনি সাম্রাজ্যের মাস্টার ব্রিটিশ ও ফরাসিদের চ্যালেঞ্জ করে নতুন করে হতে চাওয়া সাম্রাজ্য বা হবু আম্পায়ার। অন্য দিকে জাপান ছিল এশিয়ার পরাশক্তি, যে আগেই হয়ে থাকা সাম্রাজ্যের মাস্টারদের কাতারে; যুদ্ধের সময় জাপান ছিল চীন ও কোরিয়াকে দখল ও কলোনি করে রাখা সাম্রাজ্য মাস্টার। আর সেই কলোনিগিরি ধরে রাখার লক্ষ্যে লড়াইয়ে রত ছিল এমন আম্পায়ার। আর ঠিক এদের সবার বিপরীতে আমেরিকা ছিল নতুন কলোনিমুক্ত দুনিয়া বানানোর স্বপ্ন দেখা নায়ক। তবে যার লক্ষ্য ছিল দুনিয়া কলোনিমুক্ত হলে এই মুক্ত রাষ্ট্রগুলো নতুন যে বিনিময় সম্পর্কের দুনিয়া গড়বে তাতে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিটের বিনিয়োগ পুঁজির খরিদ্দার বানানো। নতুন সম্পর্ক হলে কান টানলে মাথা আসার মতো এটা কেবল একপক্ষীয় ওয়ালস্ট্রিটের বিনিয়োগ পুঁজি ঋণ-খাতক হওয়া না, বরং পণ্য বিনিময়সহ টেকনোলজি, কাঁচামাল ইত্যাদির লেনদেন বিনিময় ব্যাপকভাবে বিস্তার হয়ে পড়া দুনিয়াব্যাপী এক বিনিময় সম্পর্কে জড়িত হয়ে পড়া। এভাবে এক গ্লোবাল বাণিজ্যে নির্ভরশীল হয়ে পড়া গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ব্যবস্থা কায়েম করা, এটাই ছিল আমেরিকার লক্ষ্য।
এই স্বার্থ-জোটের যুদ্ধে বিজয়ী নেতা আমেরিকা নতুন করে সাজিয়ে দেখতে চাওয়া দুনিয়ায় জাপানকে দাবড়ে এর পুরনো ভূমিকা খর্ব করে রাখা এক জাপান দেখতে চেয়েছিল। আর এতে তৈরি হওয়া এই গ্যাপ পূরণ করতে চীনকে লিফট দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এটাই ছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দেখা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের চীনপ্রীতি অথবা বলা যায় চীন-আমেরিকার সম্পর্কের প্রথম স্বপ্ন-পরিকল্পনা। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, নতুন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ‘জাতিসঙ্ঘ’ কায়েম করা হয় তাতে। যার পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধর সদস্যরাষ্ট্র থাকার কথা কল্পনা করা হয়। রুজভেল্টের ‘জাতিসঙ্ঘ’ গড়ার প্রস্তাবে এশিয়া থেকে জাপানের বদলে একমাত্র চীনকেই ভেটো সদস্য রাখা হয়েছিল। না, এর পর থেকে আমেরিকা জাপানকে ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলেছিল, ঠিক তা নয় কিন্তু। এক কথায় বললে সেটা ছিল দুনিয়ায় রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে জাপান যেন ক্ষমতার ডানা আর মেলতে না পারে সে ব্যবস্থা করা। তবে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে যাতে জাপান আবার হাজির হতে পারে সে জন্য যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের পুঁজি ধার-বিনিয়োগ দিয়ে সহায়তা করার কাজটা আমেরিকা করেছিল। জার্মানসহ সারা ইউরোপ ঠিক যেমন পেয়েছিল ঠিক তেমনি জাপানও পেয়েছিল। তবে এতে জাপান পুনর্গঠিত অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠে এলে এর সমান্তরাল রাজনৈতিক শক্তিগত দিকও তো তৈরি হবেই। হ্যাঁ তা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার দুনিয়া তা উপস্থাপিত হয়ে আসছে আমেরিকা রাষ্ট্রের নেতৃত্বের মাধ্যমে। সে জন্য আজ পর্যন্ত জাপানের কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক ভূমিকা নেই। যেমন এশিয়ায় প্রথম বিশ্বব্যাংকতুল্য প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মূল শেয়ারহোল্ডার জাপান ও আমেরিকা রাষ্ট্রের। সেই থেকে দুনিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে বা বিতর্কে আমেরিকার অবস্থান প্রায় চোখ বন্ধ করে অনুসরণ করা জাপানের নীতি।
কিন্তু দুঃখের বিষয় রুজভেল্টের আমেরিকা পরবর্তীকালে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের যে স্বপ্ন এঁকেছিল, তা বেশি দিন বাস্তবে রূপ পায়নি। মাত্র চার বছর; ১৯৪৯ সালে সংঘটিত মাও সে তুংয়ের কমিউনিস্ট বিপ্লব আমেরিকার সব স্বপ্ন-পরিকল্পনা ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিল। এতে বিপ্লবীদের আত্মপ্রসাদ লাভ করার খুব কিছু নেই। কারণ এটা আত্মপ্রসাদ লাভের ইস্যু না, কেবল সে দিক থেকে দেখাটা যথেষ্ট হবে না, ঠিকও নয়। কারণ বিপুল জনসংখ্যার চীন, বিপ্লবের পর এর অর্থনৈতিক বিকাশ কিভাবে অর্জন হবে সেটাই ছিল মূল ইস্যু, বিপ্লবের যা অর্জন তার আত্মপ্রসাদ নয়। অন্য দিকে আসলে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিটকে মাঝে ২০-৩০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
যদি আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার মূল লক্ষ্যটা মনে রাখি আর সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে ঘটনাবলিকে দেখি। ওই মূল লক্ষ্য ছিল, যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রগুলো যেন ওয়ালস্ট্রিটের বিনিয়োগ পুঁজির ক্রেতা-খরিদ্দার হয়ে হাজির হয়। চীনের বিপ্লব ঘটে যাওয়ার কারণে আমেরিকার সেই লক্ষ্য মাত্র চার বছরের মধ্যে ১৯৪৯ সালে হারিয়ে যায়। আর আমেরিকান সেই স্বপ্ন, ওয়ালস্ট্রিটের আকাক্সক্ষা সেটাই আবার পুনর্জাগরিত হয়ে ফিরে আসা শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালের পর থেকে। ১৯৭৯ সাল নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করছি কারণ, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় চালু হয়। আর এরপর বিদেশী বিনিয়োগ নেয়া, অবকাঠামো গড়া আর নিজ বাজার আমদানি ও রফতানির জন্য খুলে দেয়ার আগে প্রস্তুতিমূলক আইনগত দিক প্রস্তুতি শেষ করে বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক সর্বোচ্চপর্যায়ে উঠতে ১৯৯০ সাল লেগে গিয়েছিল। এর পরের ১৯৯০-২০১০ সাল এই ২০ বছরকে ধরা হয় একটানা ডাবল ডিজিটের অর্থনৈতিক উত্থানের কাল। অর্থাৎ এখন সামগ্রিক দিক থেকে দেখে বলা যায় যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার অর্জনের লক্ষ্য সারা দুনিয়ার মতো চীনকেও বিনিয়োগ বাজার হিসেবে পাওয়া, এটা সে মাঝে ২০ বছর অনির্দিষ্ট থাকলেও আমেরিকা তা পেয়েছিল। এটাই আমেরিকার দেখা স্বপ্নে চীন-আমেরিকান সম্পর্ক।
কেন এই ৩০ বছর (১৯৪৯-১৯৭৯) দেরি আর কেনই বা তা আমেরিকানরা না চাইতেও আবার ফিরে পেয়েছিল?
বিপ্লবের পরের বাস্তবতা মানে হলো যখন আর তত্ত্বীয় ধারণার নির্ভর করে নিশ্চিত থাকার দিন শেষ। আর সব কিছুই যখন বাস্তবে করে দেখানো, ফল পাওয়া ইত্যাদির সময়। চীনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ব্যতিক্রম ছিল না। তবে ব্যতিক্রম কেবল এক জায়গায় ছিল। তা হলো, ফল পাচ্ছি কি না সেটা নিয়মিত মনিটর করা আর একেবারেই পাওয়া আর সম্ভব না বুঝে গেলে বিকল্প পথ খোঁজা, সেটা এমনকি এর অর্থ তত্ত্বে বদল ঘটিয়ে দেয়া পর্যন্ত এই ব্যাপারগুলো তুলনামূলক দ্রুততার সাথে চীনে ঘটেছিল বলা যায়।
বিপ্লবের পরের প্রথম দশ বছরে মাওসহ চীনের নেতৃত্ব বুঝে যায় যে কাজ সৃষ্টি আর কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো তা আর ঘটানো সম্ভব হচ্ছে না। এই অভিজ্ঞতা লাভের পর ১৯৫৮ সালে চীনে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ শুরু হয়। এটা মূলত পার্টির প্রবল অভ্যন্তরীণ লড়াই-সংগ্রাম। অর্থাৎ নীতি-চিন্তা বদলের অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম। চিন্তার বদল কথাটাকে কৌশলগত এক শব্দ দিয়ে বাইরে বলা যে এটা ‘সংস্কৃতি বদলের’ সংগ্রাম। তাই নামের দিক থেকে এটা শুনে যা-ই লাগুক, এর সার কথা হলো- আজকের চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত উত্থান ঘটেছে, এর পক্ষে প্রথম কাজ পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শক্তিকে ঢেলে সাজানো। কিন্তু এই পথে দলকে আনতে সে সময়ে একে উপযুক্ত করে নিতে দলের আগাপাছতলা ঢেলে সাজানোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-লড়াই লড়ে পুনর্গঠন করার তৎপরতা ছিল সেটা। এক কথায় বললে, সেটা ছিল, চীন কী ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে’ এক ধরনের ক্যাপিটালিজমের পথে যাবে কি যাবে না- এই ছিল সেই তর্কের মূল বিষয়। ফলে চীন কি বিদেশী বিনিয়োগ নিতে যাচ্ছে? কান টানলে মাথার মতো এরই আরেক অংশ হলো- গ্লোবাল বাণিজ্য বাজারে পণ্য দেয়া-নেয়া লেনদেন বিনিময়ের সম্পর্কে চীন কি যুক্ত হয়ে পড়বে? পড়লে সেটা আবার কী শর্তে ও কী সতর্কতায়?
আজকের চীনের বাস্তবতা দেখে নির্দ্বিধায় বলা যায় ১৯৫৮ সাল থেকে শুরু হওয়া অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে- ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে’ এক ধরনের ক্যাপিটালিজমের পথে যাওয়ার ধারা বিজয়লাভ করেছিল সেই সময়। অভ্যন্তরীণ লড়াই চলার মোটামুটিভাবে দশ বছরের (১৯৬৮ সালের) মধ্যে মূল নতুন নেতৃত্ব কেন্দ্রে ক্ষমতা সংহত করে ফেলেছি। এই বুঝের ভিত্তি কী?
চীনের ক্যাপিটালিজমের বিকাশের পথে যাত্রা মানে- এ বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার ভালো প্রতিনিধি হলো গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতির নেতা শীর্ষদেশ আমেরিকার সাথে বোঝাপড়া। কিন্তু আমেরিকার সাথে চীনের পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিই ছিল না। তাই স্বীকৃতি পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে কাজ- পারস্পরিক মনোভাব বোঝা, কে কিভাবে, কী শর্তে সম্পর্ক চায় ইত্যাদি নেগোশিয়েট করার জন্যও পরোক্ষ একধরনের আলাপ শুরু করা। কারণ কোনো কারণে যদি তা আবার ব্যর্থ হয়, তবে দুনিয়ার কাছে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বড় ঝামেলা পোহাতে হতে পারে সে সম্ভাবনা ছিল। বিশেষ করে সেটা ছিল কোল্ড ওয়্যারের কূটনীতির যুগ, ফলে দুনিয়া নানা মতাদর্শে বিভক্ত। তাই কম দায় ও ঝামেলার পথ হলো প্রাথমিকভাবে পরোক্ষ আলাপ চালানো। আর সে প্রয়োজন মেটাতে গোপনে কাজ করা। আর সে কাজে অর্থাৎ পরোক্ষ মাধ্যম হিসেবে চীন-আমেরিকা উভয়ই সবচেয়ে উপযুক্ত দেখেছিল আইয়ুব খানের পাকিস্তানকে। এই প্রাথমিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করতে সম্মত হয়েছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানকেই বেছে নেয়ার পেছনে মূল কারণ চীন-আমেরিকা উভয়েরই ঘটনাচক্রে পাকিস্তানের সাথে আগে থেকেই নিজ নিজ নানা কৌশলগত কারণে ভালো সম্পর্ক ছিল। আর আইয়ুব খান নাম ধরে বলার কারণ- তার সময়ে ১৯৬৮ সাল থেকেই চীন-আমেরিকার প্রাথমিক আলোচনা চালাচালি শুরু হয়েছিল। সম্প্রতি আমেরিকান এক সরকার স্বীকৃত এক ইতিহাস-আর্কাইভ অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রাথমিক যোগাযোগ ঘটেছিল ১৯৬৮ সালে। এর অর্থ ১৯৬৮ সালের আগেই ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে’ একধরনের ক্যাপিটালিজমের পথে’ ধারার নতুন নেতৃত্ব কেন্দ্রে ক্ষমতা সংহত করে ফেলেছিল।
পরোক্ষ মাধ্যম হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে পাওয়ার পর চীন ও আমেরিকায় পাকিস্তানের অ্যাম্বাসি চীন ও আমেরিকার মধ্যে যোগাযোগের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। আর আমেরিকার দিক থেকে এ যোগাযোগ নেগোসিয়েশনের গুরু ছিলেন কিসিঞ্জার, যিনি ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। সাম্প্রতিক কালে আমেরিকার আটলান্টিক ম্যাগাজিনে তিনি এসবের বিস্তারিত বলেছেন। কিসিঞ্জার চীনের সাথে নেগোসিয়েশনের পর্দার আড়াল পর্ব শেষ করে পরের পর্যায় শুরু কিভাবে হবে সেটা চূড়ান্ত করতে গোপনে সরাসরি চীন সফর করেন ২১ জুলাই ১৯৭১। বাইরে প্রকাশ্যে সেটা ছিল কিসিঞ্জারের পাকিস্তান সফর। কিন্তু মাঝের দু’দিন তার কর্মসূচি কি মিডিয়া বা পাবলিকলি কেউ জানে না যে দুই দিন তিনি চীন সফর করেন।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রথমে আইয়ুব খান পরে আরো ঘোরতর সম্পর্কে ইয়াহিয়া খান চীন-আমেরিকা সম্পর্ক বুনে দেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত ধাত্রী বা কারিগর থেকেছেন; আইয়ুব-ইয়াহিয়া এরা কি নিজ-বুঝের রাষ্ট্রস্বার্থে বিনিময়ে কিছু চাননি? অবশ্যই চেয়েছিলেন। আমরা বলতে পারি হবু বাংলাদেশ এই স্বার্থকে বিক্রি করার বিনিময়ে চীন ও আমেরিকার
পাকিস্তানের সহযোগিতা কিনে নিজেদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের সূচনা করেছিল। কারণ চীন-আমেরিকার সম্পর্কের সূচনা করা (চীনের কাছে যার অর্থ ভেটো ক্ষমতাওয়ালা জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ প্রাপ্তি ) চীনের এই স্বার্থ হাসিলের জন্য তুলনায় চীনের দিক থেকে বিচারে হবু বাংলাদেশের স্বার্থকে আইয়ুব-ইয়াহিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয়া, উপেক্ষায় ফেলে রাখা এটা তো কোনো ব্যাপারই নয়। দুনিয়ার যেকোনো রাষ্ট্র-স্বার্থ এটা এমনই সঙ্কীর্ণ স্বার্থপর। নিজের স্বার্থ অন্যের সব স্বার্থের ওপর প্রধান বিবেচনা। এই বিষয়টাকে সবচেয়ে সাফাই গেয়ে নরমভাবে বললে দাঁড়াবে, আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়টা আমাদের হবু বাংলাদেশ রাষ্ট্র আর চীনা রাষ্ট্র এই দুই রাষ্ট্র-স্বার্থ একবিন্দুতে মিলতে পারেনি, পরস্পরবিরোধী অবস্থানে ছিল। তাই একাত্তরের যুদ্ধে এবং তার আগেও চীন আমাদের সাহায্য করতে পারেনি। আমাদের দেশীয় চীন-সমর্থিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর কোনো ধারাই স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিতে পারেনি। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান সফল করা ও সফল নেতৃত্ব দেয়া ভাসানী ন্যাপ কেন ওই সফলতার ফসল ‘গোলটেবিল’, সে ফসলের ভাগ নিতে অংশগ্রহণ করেননি সেটা আজো রহস্য হয়ে আছে। বাংলাদেশের চীনপন্থী দলগুলোর প্রতি চীনের এটাই (ফসল না নিতে যাওয়া) কি পরামর্শ ছিল না! আইয়ুব কি এটাই প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাইয়ের কাছ থেকে চেয়ে নেননি! এর আরো সবচেয়ে বড় প্রমাণ গোলটেবিল নিগোসিয়েশন থেকে শুরু করে এর সমাপ্তি, নির্বাচনে অংশগ্রহণ সব কিছুতে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ এককভাবে জড়িয়ে থেকেছে, নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। এই পুরো দুই বছরের প্রক্রিয়ায় ভাসানী ন্যাপ কখনো আওয়ামী লীগের এই তৎপরতার বিরোধিতা করেনি। এমনকি নির্বাচনের ফল আসা ও সংসদ না ডাকার দ্বিধাদ্বন্দ্বেরকালে ভাসানী ন্যাপ প্রকাশ্যে মুজিবের হাতে ক্ষমতা দিতে দাবি জানিয়েছে।
অবশ্য ১৯৭১ সালের মে মাসের আগে পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির (সোভিয়েত বা চীনা) কোনো ধারাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধীনতাকে সঠিক মনে করতে ও সমর্থন করতে পারেনি। কেন পারেনি সে ইস্যুটির ব্যাখ্যা আলাদা।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫