ঢাকা, মঙ্গলবার,০৭ এপ্রিল ২০২০

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের সাবমেরিন ও চীন-ভারতের সাথে সম্পর্ক

গৌতম দাস

১৫ জানুয়ারি ২০১৭,রবিবার, ১৮:৩৩


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

গত ২৫ ডিসেম্বর প্রথম আলো এক সাক্ষাৎকার ছেপেছিল। সাক্ষাৎকারটি ছিল সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহানের, যিনি এখন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী। এ ধরনের ইনস্টিটিউটগুলোকে আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি বা নীতিনির্ধারণী বিষয়ে স্থানীয় চোখ, প্রচারক বা কখনো ফ্যাক্টস কালেক্টর বলা যেতে পারে। এগুলো কাজ করে আমেরিকার কোনো থিঙ্কট্যাঙ্কের অধীনে অথবা আমেরিকান ফান্ডে পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়ে; অথবা আঞ্চলিক পড়শি দেশে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের স্থানীয় শাখা বা এক্সটেন্ডেড-অফিসের সহযোগী হয়ে। এই ইনস্টিটিউটের নামও কনজারভেটিভ আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’-এর সাথে মিল রেখে।
বাংলাদেশের কেনা চীনা সাবমেরিন ডেলিভারি নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘প্রতিক্রিয়ায়’ ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাদের তিন বাহিনী প্রধানকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সাবমেরিন কেনার ‘প্রতিক্রিয়ায়’ এই সফর, মিডিয়ায় এমন বয়ানের পক্ষে আমাদের সরকারি স্বীকারোক্তি কোথাও না থাকলেও এ সংক্রান্ত সব মিডিয়া রিপোর্টই এই অনুমানের ওপর সাজানো। ফ্যাক্টস হলো, সাবমেরিন কেনার প্রতিক্রিয়ায় এই সফর হতেই পারে না। এর কোনো সুযোগ নেই। এই বয়ান অচল। কারণ এখন হলো ডেলিভারি নেয়ার সময়, অর্ডার দেয়ার নয়। অর্থাৎ তিন বছর আগে ২০১৩ সালে অর্ডার দেয়ার সময় থেকেই ‘কাকাবাবু’রা সবই জানেন। জানতেন যে, বাংলাদেশ চীনা সাবমেরিনের অর্ডার দিয়েছে এবং সে সময় কোনো প্রতিক্রিয়া ভারত দেখিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। গত তিন বছরেও আমরা কখনো তা দেখিনি। অথচ সেটাই ছিল সঠিক ও মোক্ষম সময়। এর সপক্ষে আরো স্পষ্ট প্রমাণ আছে। সমুদ্রসীমানা বিরোধ মিটে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনীতে নতুন বিনিয়োগ করে একে সমুদ্রসম্পদ রক্ষার উপযুক্ত করে সাজাতে সাবমেরিন কেনাসহ তার পরিকল্পনার বিস্তারিত প্রথম জনসমক্ষে নিয়ে এসেছিলেন ২০১০ সালের এপ্রিলে। তিনি বলেছিলেন ‘ত্রিমাত্রিক সক্ষম’ করে নৌবাহিনীকে সাজানোর পরিকল্পনা করেছেন। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের প্রায় পুরোটাই ১২ এপ্রিল ২০১০ সালে প্রকাশ করেছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের চীনকে অর্ডার দেয়ারও তিন বছর আগে থেকে ভারতের তা জানা, আমরা ধরে নিতে পারি। কাজেই ডেলিভারি নেয়ার সময় আজ ছয় বছর পরে এ নিয়ে নতুন করে ভারতের প্রতিক্রিয়া দেখানোর কিছু নেই। ভারতের এমন গল্প কেউ কিনবে না।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ভারত এখন কেন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে? সম্ভবত এখন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে ভারত বাংলাদেশকে ক্রেতা হিসেবে চায়। এই চাওয়ার পক্ষে ভারতের সাফাই কী হবে, কেন বাংলাদেশ তা নেবে, সেই সাফাই জোগাড় করতেই এই সাবমেরিন কেনার বিপক্ষে ভারতের কথিত ‘প্রতিক্রিয়ার’ গল্প। এখানে দু’টি প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে। এক. ভারত এমন কী সামরিক সরঞ্জামের অধিকারী যে, বাংলাদেশকেই এর ক্রেতা হিসেবে পাওয়ার জন্য ভারত মরিয়া হয়ে উঠেছে? এর সম্ভাব্য জবাব হলো, চীন ঠেকানোর এক উন্মাদনার কথা ভারত ও (মূলত) আমেরিকার একই বয়ানে আছে, যা দু’দেশ মিলে প্রায়ই হাজির করে থাকে। আমেরিকার তৈরী বয়ান তারা নানান থিঙ্কট্যাঙ্কের মাধ্যমে নিয়মিতই ছড়িয়ে চলেছে। ভারতও ভাব করে যে, আমেরিকার এই বয়ান সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। কারণ এই ভাব ধরলে দক্ষিণ এশিয়ায় সে আমেরিকার চোখ ও হাত হয়ে বাহাদুরির ভাগ পাবে। পিছিয়ে পড়া ভারত চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন না করেও এর আগে নিজ সক্ষমতার ওপর না দাঁড়িয়েও দ্রুত শক্তিশালী হতে পারে কেবল এভাবেই। এই হলো ভারতের শর্টকাট ও এর লোভ। কিন্তু আসলেই কি এটা কার্যকর কোনো শর্টকাট? এ কাজ কি কোনো শর্টকাটে অর্জন সম্ভব?
ভারতের দিক থেকে ফাঁকিটা হলো- সে ভাব ধরে, দক্ষিণ এশিয়ায় সে নিজেই ‘রুস্তম’ হয়ে গেছে। ফলে পড়শি রাষ্ট্র সব তার প্রভাবাধীন হয়েই গেছে বলে ধারণা চালুর চেষ্টা করে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন আর ভারত দুই প্রভাবশালীর মধ্যে বাংলাদেশ যেন ভারতের ভাগের। আরো বড় কথা হলো, গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এর সরকার তো ‘ভারতেরই দান’। যেন এ কারণে বাংলাদেশ আরো বেশি করে ভারতেরই। ভারতের প্রভাবাধীন অর্থে ভাগের ধারণার চেয়েও এটা আরো এক ধাপ বেশি। সেই বাংলাদেশে কিনা চীন সাবমেরিন বিক্রি করে চলে গেছে! ভারতের ফাঁপা অহঙ্কার ফাঁপা বাহাদুরির দাবি সব এতে উদোম হয়ে গেছে। চীন জাহাজ বেচতে আসেনি, আমাদের সরকারই ওপেন বাজার থেকে খুঁজতে গিয়ে চীনা সাবমেরিন সস্তা পেয়েছে, তাই কিনেছে। এতে সব অর্থেই ‘বাংলাদেশ-ভারত’ এই ভ্যানিটি চোট পেয়েছে। এ অবস্থায় ভারত চাপ দিচ্ছে যেন আমরা ভারত থেকে সরঞ্জাম (সম্ভবত মিসাইল) কিনি।
চীনের অর্থনৈতিক উত্থান গ্লোবালাইজেশনের শর্তের মধ্যে। চীন সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছে, তার অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাব বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন দেশের ওপর অর্থনীতিগত ক্ষমতার ভাগীদার বা স্টেকহোল্ডার সে হয়ে উঠেছে; এটা না চাইতেই এবং স্বাভাবিকভাবে। সেই সাথে তার রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের ভাগীদার সে হয়ে উঠবে। কিন্তু চীন নিজের কাছে পরিষ্কার যে, এখন কোনোভাবেই কোনো পার্টনার দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার স্টেক অথবা সামরিক ক্ষমতার স্টেক চাওয়া বা নেয়াকে নীতি হিসেবে নেয়নি। চীনের এটা ঘোষিত নীতি যে, তাইওয়ান বা হংকংয়ের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার উদ্যোগ (এবং সাম্প্রতিককালে সাউথ চায়না সি ইস্যুতে) অর্থাৎ যেটা তার সার্বভৌমত্বের ইস্যু বলে চীন মনে করে, এ বিষয়টি ছাড়া চীন কোথাও বা কোনো পার্টনার দেশে, যেখানে সে আপনাতেই রাজনৈতিক অথবা সামরিক ক্ষমতার স্টেক ভাগীদার হতে চাইলে তা পারে, তা সত্ত্বেও তা নিতে তার আগ্রহ নেই। কারণ চীন আরো বড় অর্থনৈতিক শক্তি হতে চায় আগে। এ জন্য বাংলাদেশে যতই ক্ষমতার অস্থিরতা থাকুক, এখানে চীনের স্টেক বা ভাগীদারি এযাবৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ফলে গ্লোবালাইজেশন সম্পর্কের ভেতরে চীন এর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে আগ্রহী। এটা আমেরিকান অথবা পুরনো কলোনিয়াল স্টাইলে প্রভাব বিস্তার করে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিকসহ সব দিকের সুবিধা আদায়ের রাস্তা থেকে আলাদা। এটা উদারতা নয়, বরং এই পথকে চীনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি দ্রুত হওয়ার ক্ষেত্রে উপযুক্ত বলে সে বিবেচনা করে। চীন দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এটা সম্ভব হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত- গ্লোবালাইজেশনের যুগের অর্থনীতি; মানে এটা কোল্ডওয়ার নয়, বরং দুনিয়াজুড়ে গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের যুগ।
বাংলাদেশে সামরিক অথবা রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগ নেয়ার ক্ষেত্রে চীন আমেরিকা অথবা (আমেরিকার পক্ষে) ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তাই আমেরিকার চীন ঠেকানোর তত্ত্ব বা ভারতের চীনভীতি দেখানোর তত্ত্ব আসলে এক বিরাট ফাঁকি। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় ফাঁকির দিকটি হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে আমেরিকান বিনিয়োগ-পুঁজি আর বাজার ইত্যাদি আমেরিকা নিজে আগ্রহ করে চীনকে দিয়েছে এবং চীনের সস্তা শ্রমের সাথে মিশিয়েছে।
চীনা পণ্যে আমেরিকার বাজার ছেয়ে ফেলতে দিয়েছে বলেই তো চীন আজ এক নাম্বার অর্থনৈতিক শক্তি, সবচেয়ে বড় সঞ্চিত বাড়তি সম্পদের অর্থনীতি সে। চীন এমন হবে- সেটা জেনেও আমেরিকা চীনকে এ পর্যায়ে আসতে দিতে বাধ্য হয়েছে। একই ক্যাপিটালিজমের লজিকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান পূর্ণতা পেতে দিতে আমেরিকা বাধ্য হবে। এ জন্যই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের উত্থানে স্পষ্ট করে বলছেন, আমাদের উভয়ের (চীন-আমেরিকার) ভাগ্য এক সুতায় গাঁথা হয়ে গেছে, যেটা আমরা মানতে বাধ্য। ট্রাম্প বা কেউ অবুঝ হয়ে জবরদস্তি করতে চাইতেও পারেন। যুদ্ধ চাইলে সেটা বিশ্বযুদ্ধের দিকেও গড়াতে পারে। কিন্তু একালে দেখা যাচ্ছে, পুরনো সোভিয়েত ব্লক যুগ বা কোল্ডওয়ার কালের চেয়ে দুনিয়ায় ছেয়ে বসা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যুদ্ধের সম্ভাবনা সেকালের চেয়েও কম। তবে যুদ্ধ হতেই পারে না- তা বলা হচ্ছে না।
সার কথা হলো, একালের চীনের নীতি-অবস্থান হলো- আমাদের মতো দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতায় ভাগীদারি বা স্টেক না চাওয়া; কেবল অর্থনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। সে জন্যই ‘চীনের ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশে চীন সাবমেরিন বেচেছে; ফলে আমারও ভাগ চাওয়া,’ প্রভাব দেখানো বৈধ করার এই ভারতীয় তত্ত্ব ভিত্তিহীন। আসলে এই যুক্তি ও ধারণাই কোল্ডওয়ার-কালের। কারো সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভালো বলে সে সম্পর্ককে সামরিক সম্পর্কে রূপান্তর করে নিতেই হবে- এটা গ্লোবালাইজেশন যুগে আর অনিবার্য নয়। বাস্তবতা হলো, আমাদের সরকার নিজেই চীনা সাবমেরিন কিনেছে, কলোনি বা কোল্ডওয়ার যুগের কায়দায় চীন প্রভাব খাটিয়ে তা কিনতে বাধ্য করেনি।
যারা ভারতে পরিচালিত আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের পে-রোলে আছেন, তারা ছাড়া ভারতে যেসব কূটনৈতিক গবেষক একাডেমিকরা আছেন, যেমন সাবেক কূটনীতিক ভদ্রকুমার, তিনি চীন বাংলাদেশে সামরিক প্রভাব বাড়াতে সাবমেরিন বিক্রি করছে- এই বয়ান চ্যালেঞ্জ করেছেন। আবার মজার কথা হলো, আমেরিকান সাবমেরিন এক্সপার্ট অথবা রাশিয়ান স্পুটনিক পত্রিকা ভারতের মতো চীনের সামরিক প্রভাব বাড়ানোর তত্ত্ব হাজির করেনি। জাপানের ‘ডিপ্লোমেটিক’ ম্যাগাজিনে আমেরিকান সাবমেরিন গোয়েন্দা এক্সপার্ট বলেছেন- এটা কেনা ঠিক হয়নি, এটা বাংলাদেশের কোনো কাজে লাগবে না; তবে ভ্যানিটি শোভা বাড়াবে। তারা ইন্দোনেশিয়ায় রাশিয়ান সাবমেরিন কেনার পরিণতির কথা তুলে তুলনা করে বলছেন, সেখানে উপযুক্ত রাশিয়ান সার্ভিস আর ট্রেনিংয়ের অভাবে ইন্দোনেশিয়ার পয়সা নষ্ট হয়েছে। তেমন হতে পারে। লক্ষ করতে হবে, এগুলো ভারতের মতো ‘চীনের সামরিক প্রভাব বাড়ানোর’ যুক্তি মোটেও নয়। ফলে রাশিয়ান ও আমেরিকান উভয়ের শেষ সিদ্ধান্ত হলো, এই ক্রয়ে ভারতের চিন্তা করার কিছু নেই। তাহলে বাংলাদেশকে ভারতের কথিত ডিফেন্স প্যাক্টের মধ্যে আনার খায়েশ অথবা উচ্চমার্গীয় বোলচাল ‘ডিফেন্স কাঠামোর মধ্যে আসার চুক্তি’র কথা উঠেছে, সেগুলো তাহলে কী?
প্রথম আলোতে ফারুক সোবহানের ছাপানো সাক্ষাৎকারের ইংরেজি ভার্সন পাঁচ হাজার অক্ষরের। আর সেখান থেকে নিয়ে বাংলা ভার্সনটি ছাপা হয়েছে ১৩০০ অক্ষরে। সাক্ষাৎকারের মধ্যে
আন্তর্জাতিক কোনো ইস্যু বাদ নেই। তার চেয়েও বড় কথা, নাদান সব প্রশ্ন। সোবহান সাহেব এসব এড়িয়ে, আড়াল করে জবাব দিয়ে গেছেন। তবে সাক্ষাৎকারে ‘ডিফেন্স কাঠামোর মধ্যে আসার চুক্তির’ কথা তুলেছেন। এটাই ভারতের কৌতূহল মেটানোর কথা বলে মনে হওয়ার কারণ। বাংলাদেশ যত সামরিক সরঞ্জাম কেনার চুক্তি করেছে- কোথাও তা ‘ডিফেন্স ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’-এর মাধ্যমে করেছে; তাতে ক্রয় ও ব্যবহারবিধি, ইভেনট্রিবিধি, হস্তান্তরবিধি হয়তো আছে বা নেই। কিন্তু কেনার আগে ফ্রেমওয়ার্কের কথা গুরুত্ব দিয়ে মিডিয়ায় আসতে দেখা যায়নি। সাধারণত পারমাণবিক বা হাইটেক অস্ত্রসরঞ্জামের ক্ষেত্রে এমন চুক্তি থাকে। তখন এসব বিষয় মিডিয়ায় আসতে দেখা যায়। আমেরিকান পারমাণবিক বা হাইটেক অস্ত্রসরঞ্জামের কেনা এবং সেগুলোর কিছু যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি করার ক্ষেত্রে ভারতকে এসব চুক্তি করতে হয়েছিল। আমরা অবশ্য পারমাণবিক বা হাইটেক অথবা সাধারণ অস্ত্রসরঞ্জাম এখন কিনতে চেয়েছি ব্যাপারটা তা নয় বা ভারত থেকেই কিনতে মনস্থ করেছি, তা-ও নয়। অথচ এর আগেই এসব উচ্চমার্গীয় আলাপ। আর ভারতে তৈরি কিছু স্পেয়ার্স এসবের দুর্বল কোয়ালিটির কারণে এর ব্যবহারকারী খোদ ভারতীয় তিন বাহিনীর কাছে ত্রাস হিসেবে হাজির হয়ে আছে। এগুলো ভারতেরই মিডিয়ায় সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট। ফারুক সোবহান এসব ডিফেন্স চুক্তি প্রস্তাব তার তেমন জানা নেই বলেছেন বটে। কিন্তু আবার শর্তসাপেক্ষে যদি থাকে তবে, এভাবে বলছেন- ‘চীনের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘ ট্র্যাডিশনাল ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক আছে। ফলে তা ব্যালেন্স করতে বাংলাদেশ ভারতের সাথে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি করতে পারে’ বলে মত রেখেছেন। এখানে দেখা যাচ্ছে, তার দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে গেছে।
এখানে প্রশ্নকর্তা আর উত্তরদাতা দু’জনই ভুলে গেছেন, তারা কোনো পুরনো কোল্ডওয়ারের যুগে বসে নেই। এটা গ্লোবালাইজেশন যুগের চীন। এমনকি পাকিস্তানের আইয়ুব খানের সাথে যে চীনের সম্পর্ক ছিল এটা সেই চীনও নয়। চীন বাংলাদেশে সামরিক প্রভাব বাড়াতে মরিয়া- বাস্তবতা এর ধারেকাছে নেই। এমনটি কোল্ডওয়ার কালের মতো মুখস্থ ধরে নেয়া ভুল। এ ছাড়া ফ্যাক্টস হিসেবে এটা ভুল যে চীনের সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক আছে। বিশেষ করে ‘ট্র্যাডিশনালি’ বলাতে সেটা আরো ভুল। চীনের সাথে সম্পর্ক মূলত সামরিক সরঞ্জামের জন্য। মূল কারণ, এটা তুলনামূলকভাবে সস্তা। আর ট্রেনিং বা ওরিয়েন্টেশন এসব বিশেষ করে ওয়ার অন টেররের যুগে একচেটিয়া আমেরিকার দেয়া।
আসলে সামরিকসহ প্রায় সব বিষয়ে ভারতের ‘চীন-চুলকানি’ থাকতে পারে। কিন্তু আমরা কোনো পক্ষের সূত্রে এর অংশ নই। গত বছর চীনা প্রেসিডেন্টের সফর থেকে এই প্রথম বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ, বিশেষ করে উন্নয়ন অবকাঠামোতে প্রবেশ ঘটেছে। এর আগে চীনারা বড়জোর উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার ছিল, বিনিয়োগকারী নয়। এ জায়গাটা ট্র্যাডিশনালি ছিল বিশ্বব্যাংকের। কিন্তু পদ্মা সেতু ইস্যু আর আমেরিকার হাসিনা সরকারের ওপর চাপ ও প্রভাব সৃষ্টির মেকানিজম ভাঙতে সরকার এর বিকল্প খুঁজতে শুরু করায় চীনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। আর চীনের প্রবেশ যতই বাড়ছে ভারতের ততই ব্যাপারটায় অস্বস্তি শুরু হয়ে যাচ্ছে। ভারতের সমর্থনের ওপর সরকারের আয়ু এবং রিনিউয়াল নির্ভর করে বলে ধারণা করে ভারতের মন জুগিয়ে নিজেকে সন্দেহমুক্ত দেখাতে সরকার কী না করছে। এমনিতেই চীন এখন একই সাথে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প, যখন সে অবকাঠামো ঋণদাতা। চীনের অবকাঠামো ঋণ এই প্রথম হাসিনা নিতে যাচ্ছেন; আগে পারেননি। আর তাতেই ভারতের চোখ কপালে। তামাশার দিকটি হলো, এই চীনবিরোধী খোদ ভারত নিজেই কিন্তু চীনা অবকাঠামো ঋণগ্রহীতা। তখন তার সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা সে কোথায় লুকিয়ে রেখে ঋণচুক্তি করে?
ভারতের ওপর নির্ভরশীল হতে সব কিছু করেও সরকার ভারতের মন পাচ্ছে না। বাংলাদেশের সামরিক প্রসঙ্গে ভারতের কল্পিত লেভেলে চীনের সমান অ্যাক্সেস ব্যালেন্স করে ভারতকে সুযোগ দিতে হবে- এমন অনুমানের যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
ফারুক সোবহান মানছেন, ভারত বা এশিয়াতে ট্রাম্প ওবামা হবেন না, বরং প্রভাব গুটিয়ে নেবেন। এমনকি হঠাৎ ছেড়ে চলে যেতে পারেন, সোবহান বলছেন। এরপরও তিনিই আবার হাসিনাকে ভারতের চাপ মানতে পরামর্শ দিচ্ছেন কেন? এটা সত্যিই বিস্ময়!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫