ঢাকা, মঙ্গলবার,০৭ এপ্রিল ২০২০

উপসম্পাদকীয়

এক চীন নীতিতে ফিরছে ট্রাম্পের পর ভারতও

গৌতম দাস

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৮:৩০ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ১৮:৫৮


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

গত সপ্তাহে ‘এক চীন নীতি’ মেনে নিয়ে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ করেছেন, সে খবর জেনে দুনিয়া হাঁফ ছেড়ে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়েছিল। কিন্তু এ খবর শুনে কেউ কেউ দুঃখে হতাশও হয়েছিল। সম্ভবত তেমন রাষ্ট্র হলো ভারত। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে আর বিশেষ করে জয় লাভের পরে আরো শক্ত করে চীনবিরোধী ‘রেঠরিক’, যেমন- আমেরিকায় চীনা পণ্য প্রবেশে ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাব, চীন আমেরিকানদের চাকরি নষ্ট করছে, পরিবেশবাদীদের পরিবেশ ক্ষতির আওয়াজ আসলে চীনা প্রচারণা, এক চীন নীতি মানতে আমরা বাধ্য নই ইত্যাদি হাজির করেছিল। এভাবে এক কথায় বললে ‘চীন-লড়ানি’ বক্তব্য দিয়ে ট্রাম্প দুনিয়াকে উদ্বিগ্নতায় মাত করে ফেলেছিলেন। বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেসব তৎপরতা ও বোলচালে সবচেয়ে বেশি আস্থা স্থাপন করেছিল ভারত। ট্রাম্পকে সামনে আড়াল হিসেবে রেখে তাকে ব্যবহার করার সুযোগ দেখেছিল ভারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমেরিকার ট্রাম্পের ওপর ভারতের আস্থা রাখা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। মানুষ অন্যের মাথায় কাঁঠাল রেখে খায়, কথা সত্য। কিন্তু বুদ্ধিমানেরা কেবল এই সুবিধার দিকটিই দেখে না, অসুবিধা বা ক্ষতির দিকেও চোখ রাখে। মনে হচ্ছে, ভারত সেটা রাখতে পারেনি। ট্রাম্প ‘পল্টি’ দিলে কী হবে, সেটা নিয়ে কমই ভেবেছিল ভারত। তাই ভারত তাইওয়ানের এক সরকারি প্রতিনিধিদলকে (তিনজন এমপিসহ ব্যবসায়ীরা) তিন দিনের সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে সফরের আয়োজন করেছিল ভারত।
’৭০-এর দশক থেকে এক চীন নীতি মেনে চলার আমেরিকান প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করে ট্রাম্প তা মানতে না চাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন- এই মাসল ফুলানো দেখে ভারত সেটাকে নিজের মাসল মনে করে বসেছিল। ভুলে গিয়েছিল যে ভারতও এক চীন নীতি মেনে এই শর্তেই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ও আছে। ফলে স্বভাবতই ভারত তাইওয়ানকে স্বাধীন সরকার গণ্য করতে পারে না। এক কথায় তাইওয়ানের সাথে ভারতের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে, যেটা চীন সরকারও আপত্তি করে না।
যেমন তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে ভারতের ‘কার্যত এক অ্যাম্বেসি’ আছে যেটার আনুষ্ঠানিক নাম হলো ইন্ডিয়া-তাইপে সমিতি (ভারত-বাংলাদেশ সমিতির মতো)। কারণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি সম্পর্ক নেই বলে অ্যাম্বেসি খোলা সম্ভব নয়। তবে লক্ষ করার বিষয় রাষ্ট্র পরিচয়ে ইন্ডিয়ার সমান্তরাল ‘তাইওয়ান’ বলা হয়নি, ধরা হয়নি। তাইওয়ানকে রাষ্ট্র বিবেচনা করা হয়নি। ফলে এখানে নামের লজিকে মিল নেই, ইচ্ছা করে রাখা হয়নি। কারণ বলতে হতো ইন্ডিয়া-তাইওয়ান, না হলে দিল্লি-তাইপে। এর কোনোটাই না হয়ে নাম রাখা হয়েছে ইন্ডিয়া-তাইপে অ্যাসোসিয়েশন (সমিতি)। আর ওদিকে দিল্লিতে তাইওয়ানের সমিতি অফিসের সমতুল্য অফিসটির নাম রাখা হয়েছে- ‘তাইপে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’, মাত্র ১৯৯৫ সালে যা প্রতিষ্ঠিত। চীনের সাথে যেকোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিনিময়ের শর্ত হলো তাইওয়ান চীনের অংশ, এটা মানতে হবে। ফলে তাইওয়ানের সাথে কোনো রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখা যাবে না। তবে ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’ সম্পর্ক রাখা যাবে। তাইওয়ানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’। কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। আসলে এটাই কোনো রাষ্ট্রের একই সাথে তাইওয়ান ও চীনের সাথে সম্পর্ক রাখার একমাত্র উপায়- চীন খুলে রেখেছে। আমেরিকা, ভারত বা বাংলাদেশসহ সবাই তাই এই পথের পথিক।

যেটা বলছিলাম ভারত ট্রাম্পের আড়ালে সুযোগ নিতে চেয়েছিল। তাইওয়ানের সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিন এমপিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং গত সপ্তাহে তাদের ভারত সফর সমাপ্ত হয়। এরপরই চীনা কড়া প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিশ্রুত এক চীন নীতি থেকে ভারতের সরে যাওয়ার কথা চীন স্মরণ করিয়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কড়া’ আপত্তি জানায়। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের আপত্তি তোলাকে ‘সলমন রিপ্রেজেন্টেশন’ বলে। দু’টি উৎস থেকে এই আপত্তির খবর জানা যায়। এক. চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র থেকে প্রশ্ন-উত্তরে। আর দুই. চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা থেকে। এটা ‘বিশেষ’ এক সরকারি পত্রিকা। চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় যেসব কথা, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া বা মনোভাব যেটা তাদের মনের আসল কথা কিন্তু নানান জটিলতা এড়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাইরে বলতে চায় না অথচ চীনা সরকারি অবস্থান কী, কী ভাবছে তারা এটা দেশে-বিদেশে সবাইকে জানাতে চায়, সেই সব পাঠকের কথা চিন্তা করে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে। দেশী-বিদেশী মিডিয়া পাঠকেরা তাই এই চোখেই গ্লোবাল টাইমস পাঠ করে থাকে। বিশেষ করে এই পত্রিকার নিয়মিত সম্পাদকীয় এর মাধ্যমে চীনা সরকারি অবস্থান অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়। গ্লোবাল টাইমস ১২ ফেব্রুয়ারিতে লেখা এক সম্পাদকীয়তে তাইওয়ানিজদের ভারত সফর সম্পর্কে চীনের বিস্তারিত মনোভাব ও আপত্তির দিক জানিয়েছে। এর শিরোনাম হলো- ‘নয়াদিল্লি তাইওয়ান কার্ড খেললে হারার ক্ষতিতে ভুগবে।’ ইতোমধ্যে চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেছেন, ‘আমরা আশা করি, এক চীন নীতি চীনের মুখ্য স্বার্থ এটা ভারত জানে। ফলে তা ভারতের বোঝা ও সম্মান করা উচিত। অতএব বুদ্ধিমানের মতো করে সে তাইওয়ান সম্পর্কিত ইস্যু নাড়াচাড়া করবে এবং চীন-ভারতের সম্পর্ককে নিস্তরঙ্গে ও ধারাবাহিকতায় বিকশিত করবে।’ ওই মুখপাত্র এক চীন নীতিতে তাইওয়ান সম্পর্কিত ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমরা সব সময় (তাইওয়ানের সাথে) সরকারি যোগাযোগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা কোনো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ার বিরোধিতা করে এসেছি।’ এ বিষয়ে মিডিয়ায় সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে এসেছে ভারতের হিন্দুস্তান টাইমসের বেইজিং প্রতিনিধি- সুতীর্থ পত্রনবীশের এক বিস্তারিত রিপোর্টে। যেটা হিন্দুস্তান টাইমসসহ অন্যান্য বিদেশী পত্রিকাতেও কপি ছাপা হয়েছে।
চীনা গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে লেখা প্রথম বাক্য হলো- এক চীন নীতিতে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টে গেছেন তখন ভারত উসকানিদাতা হতে চাচ্ছে। এ সফর আয়োজনে ভারতের মতলব কী ছিল, সে সম্পর্কে চীন কী মনে করে তা জানা যায় পরের প্যারা থেকে। এখানে তা অনুবাদ করে তুলে আনছি : ‘কিছু ভারতীয় তাইওয়ান প্রশ্নকে চীনের গোড়ালিতে কাঁটা মনে করে। এরা দীর্ঘ দিন ধরে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ও দালাই লামা ইস্যুকে চীনের বিরুদ্ধে দরকষাকষিতে ব্যবহার করতে চেয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর [প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প; পাকিস্তানের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে দক্ষিণ-উত্তর সারা পাকিস্তানের বুক চিরে যে সড়ক চীনের ল্যান্ড লকড পশ্চিমাংশে প্রবেশ করেছে] প্রকল্পের অগ্রগতিতে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের স্ট্রাটেজিক সন্দেহ বাতিকতা বাড়ছে। ভারত জেনেশুনে গোঁয়ারের মতো চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে, যেটা আসলে যেসব রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে যাবে তাদের সবাইকে সুবিধা দেবে- এমনকি ভারতকেও একইভাবে (যদি ভারত চায়)। ওই অর্থনৈতিক করিডোর যেহেতু পাকিস্তান কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে কিছু অংশ যাবে (কাশ্মিরের পাকিস্তান অংশ তুলনায় রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হলেও ভারতের চোখে যেহেতু পুরো কাশ্মিরই বিতর্কিত) ফলে সেটা বিতর্কিত ভারতের কিছু কূটবুদ্ধিদাতা এই যুক্তিতে মোদি সরকারকে তাইওয়ানিজ কার্ড খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হলো, ভারত চীনের এক চীন নীতি মেনে চীনের সাথে সম্পর্ক করেছে তাই এর বিনিময়ে (পুরো কাশ্মির ভারতের এই) ‘এক ভারত’-এর পক্ষে চীন সমর্থন চেয়ে বসুক। কিন্তু তাইওয়ান প্রশ্নে চীনকে চ্যালেঞ্জ করে ভারত আসলে আগুন নিয়ে খেলছে। এই দ্বীপ (তাইওয়ান) ভারতের কোনো কাজে আসবে না, না তাকে ব্যবসা বিনিয়োগের উন্নতিতে, না মেনল্যান্ড চীনকে ঠেকিয়ে দিতে। ওদিকে স্টিল, টেলিকম ও আইটি ব্যবসায় মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে তাইওয়ানিজ বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে মেনল্যান্ড-চীন ভারতের এক মেজর ট্রেডিং পার্টনার আর এই সম্পর্কের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও কিছু পুরনো ঝগড়ার কারণে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সময়ে কঠিন হয়ে যায়।’
এত দূর বলে সম্পাদকীয় এবার দুটো বাক্যে, একটি সাবধান বাণী আরেকটি পরামর্শ রেখেছে। সাবধান বাণী হলো, তাইওয়ান ও মেনল্যান্ড চীনের বিবাদে ভারত যেন ব্যবহৃত না হয়ে যায়, তাইওয়ানের এমন উদ্দেশ্য আছে। আর পরামর্শ হলো- ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে [যেটা এশিয়া (পাকিস্তান) থেকে ইউরোপ পর্যন্ত এক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, যার বিভিন্ন স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দরের কানেকশন থাকবে] যোগদানের সুবিধা নিয়ে ভারত চীন থেকে প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারে।
এ তো গেল চীনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ট্রাম্পের পিছু হটার পর এবং চীনের শক্ত আপত্তি তোলার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? চীনের একটা শক্ত আপত্তির পয়েন্ট ছিল তাইওয়ান-ভারতের সম্পর্ককে কখনোই সরকারি ছাপ দেয়ার চেষ্টা বা সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা অতীতে করা হয়নি। এখন কেন ভারত দাওয়াত দিচ্ছে? এ প্রশ্নে বাস্তবতা কী তা সহজে সবচেয়ে ভালোভাবে আমরা জানতে পারি হিন্দুস্তান টাইমসের পত্রনবীশের লেখা রিপোর্ট থেকে। তিনি জানাচ্ছেন এই গত বছর মে মাসের কাহিনী, সময়টা ছিল এখনকার তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্টের নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ অনুষ্ঠানের। তিনি ভারতকে সরকারি পর্যায়ে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত সেখানে কোনো প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়নি। এই উদ্ধৃতি দেয়ার পর পত্রনবীশ প্রশ্ন তুলে বলছেন, তাই এখন ‘তাইওয়ানিজ ডেলিগেশনকে দাওয়াত দেয়ার অর্থ ভারত তার নীতি থেকে সরে গেছে।’ অর্থাৎ পত্রনবীশের চোখেও ভারতের আচরণ অস্বাভাবিক ও বেমিল।
ভারতের দিক থেকে এর জবাবে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপের সাফাই অনুবাদ করে বললে তা এ রকম : ‘ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে এমন বেসরকারি (ইনফরমাল) ভারত সফর এর আগেও হয়েছে। আমার জানা মতে তারা এমন সফরে চীনেও যায়। তাই এই সফরের মধ্যে নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু নেই। আর এর ভেতরে রাজনৈতিক মানে খোঁজারও কিছু নেই।’ কূটনীতির ভাষা হয় ক্যালকুলেটিভ, আগেভাগে হিসাব-কিতাব করে বলা কথা। বিকাশ স্বরূপ তাই করেছেন। তার বক্তব্যের মূল অর্থ বহনকারী শব্দগুলো হলো- ‘ইনফরমাল’, ‘নতুন বা অস্বাভাবিক’, ‘রাজনৈতিক মানে’ ইত্যাদি। তিনি প্রথমেই সব কিছু ঠাণ্ডা করতে এই সফর বা দাওয়াত সরকারি নয়, ‘ইনফরমাল’- এই অস্ত্র চেলে দিয়েছেন। যদিও ডেলিগেশনে ‘সংসদীয় প্রতিনিধি কেন’ এই প্রশ্নে তিনি কিছু বলতে না পারায় এটা তার সাফাইকে একটু দুর্বল করেছে। তাই ‘সংসদীয় এমপি’ এ পরিচয়টি উহ্য রেখে আড়াল করে তিনি বলতে ছেয়েছেন- ওরা ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে আসা লোকজন। এই বলে পরিচয়টি হালকা করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তাইওয়ানিজরা চীন সফরে যায় এ কথাও সত্য। এমনকি তারা চীনে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য যে নতুন ব্যাংক হয়েছে, তারও আলাদা সদস্য তাইওয়ান। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ কথাগুলো সত্ত্বেও একটাই ফারাক যে, এ সফরের একটাও সরকারি পর্যায়ে দাওয়াত নয়। চীনা নীতি হলো রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বা স্বীকৃতি না হলেই হলো। মূলত ব্যবসায়ী যোগাযোগ, এটা করা জায়েজ। বিকাশ স্বরূপ তাই ব্যবসার কথা এনে সবশেষে তাইওয়ানিজদের সাথে এই যোগাযোগের কোনো ‘রাজনৈতিক মানে’ নেই দাবি করছেন। অর্থাৎ এটা রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক নয়, তাই তিনি বলছেন। ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ার অনেকে এটা ভারতের নীতি পরিবর্তন বলে অভিযোগও করেছেন। আবার অনেকে এটাকে চীনা দাবি ভারতের ‘উড়িয়ে দেয়া’ এমন বিশেষণ লাগিয়ে হাজির করেছেন। স্বভাবতই ‘উড়িয়ে দেয়া’ বিশেষণ এটা জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা। কিন্তু আসলেই কি এটা বিকাশ স্বরূপের চীনকে ‘উড়িয়ে দেয়া’?
অবশ্যই নয়। প্রথমত, ভারতের বক্তব্যের সারকথা হলো আমরা এক চীন নীতি ভাঙিনি, বাইরে যাইনি, নতুন কিছু করিনি। এটা আগের মতোই। এ কথার সোজা অর্থ হলো ভারত এক চীন নীতিকে দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে চায়, চলেছে এবং মেনে চলা দরকার মনে করে। অমান্য করতে চায় না। তাইওয়ানের সাথে সরকারি যোগাযোগ করতে চায় না। অর্থাৎ আমি আইন মানা ভারত- এটাই বলতে চাওয়া। ভারত চীনকে চ্যালেঞ্জও করছে না। ট্রাম্পের মতো উড়িয়ে দেয়া নয় এটা।
অতএব এটা ট্রাম্পের মতো অবস্থান নয়। ভারত বলছে না এক চীন নীতি মানতে হবে কেন? অথবা মানব কি না তা নিয়ে দরকষাকষি করতে চাই; অথবা আমাকে অমুকটা দিলে তাহলে মানব- এমন অবস্থান এটা নয়। তাহলে এটা উড়িয়ে দেয়া হয় কী করে?
আরো স্পষ্ট করে বললে ভারত মনে করে, মেনল্যান্ড চীনের সাথে সম্পর্ক ভারতের কাছে তাইওয়ানের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাবটাই ভারত প্রকাশ করেছে।
আসলে ব্যাপার হলো, চীনের সাথে এক চীন নীতি মানতে না চাওয়ার মানে হলো ওই রাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতে পরোয়া করে না। ক্ষেপাটে ট্রাম্প চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন অনেক কথা বলতেই পারেন। কারণ তা একেবারেই সহজ। কিন্তু সম্পর্ক ছিন্নের অর্থ চীনে আমেরিকার যেসব ছোট-বড় ব্যবসায়ী, ওয়ালস্ট্রিট বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে ভালো বোঝেন। যারা টিকে আছেন চীনে ব্যবসা করে, এখন তাদের সবাইকে চীনের সাথে সম্পর্কহীন হতে হবে। এটা কি সম্ভব? এটা কেউ কি রাজি হবেন? অর্থাৎ এখানে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেয়ার আসলে কেউই নন। আর ভারতের ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কম-বেশি এমন নয়? চীনের বিনিয়োগ, ভারতে শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ভাইটাল। অবশ্যই চীনের কাছেও সম্পর্ক কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। ছয় মাস আগে ভারতের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল চীনা বিনিয়োগ আনতে চীন সফরে গিয়েছিল। চীনের সাথে ভারতের বিনিয়োগ আনার সম্পর্ক এটা রিয়েলিটি। সবচেয়ে বড় উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ পুঁজি, সক্ষমতা যেখানে যে রাষ্ট্রে আছে, বিনিয়োগ সেখান থেকেই আসবে। এটাই স্বাভাবিক। তবুও ট্রাম্পের কোলে চড়ে কিছু যদি বাড়তি হাতে লেগে যায়- এমন ব্যর্থ প্রচেষ্টার ব্যতিক্রমও আমরা দেখতে পাবো।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫