ঢাকা, মঙ্গলবার,০৭ এপ্রিল ২০২০

উপসম্পাদকীয়

ট্রাম্পের পাগলামি সহনীয় করার উপায়

গৌতম দাস

১২ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ১৬:৪৬


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

আপনি যদি পাগলা ক্ষমতাবান প্রেসিডেন্ট হন, তবে আপনার প্রয়োজন একজন বুঝমান জামাই থাকা। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেলায় কথাটা সম্ভবত এক কঠিন সত্যি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বড় মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প আর তার স্বামী জেরাড কুশনার। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার শুরু থেকেই আমেরিকান মিডিয়া ট্রাম্পের তৃতীয় ও বর্তমান স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প আর প্রথম স্ত্রীর ঘরের মেয়ে ইভানকা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবনকাহিনী টেনে এনে পেরেশান করে ছেড়েছে। এ দিকে মেলানিয়া ফার্স্টলেডি বলে আখ্যায়িত হলেও তিনি একমাত্র ১০ বছরের সন্তানকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের পুরনো বাসায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্টের সাথে মানে বাবার সাথে তার আবাসস্থলে বসবাস করছেন বড় মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প ও তার স্বামী কুশনার। সেখানে ইভানকা কার্যত ফার্স্টলেডির ভূমিকা নিয়েছেন, বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের অতিথিদের আপ্যায়িত করার ভূমিকা নেন তিনি। ওদিকে তার স্বামী কুশনারও শ্বশুরের মতোই হাউজিং ডেভেলপার ব্যবসায়ী হলেও তিনিও এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একজন সিনিয়র অ্যাডভাইজার। মিডিয়ায় যদিও শুরুর দিক থেকেই কুশনারের ইহুদি পরিচয়টা কখনোই মুখ্য করতে ভোলে না। প্রথম দিকে মিডিয়ায় মেয়েজামাইয়ের ব্যাপারটাকে কোনো ধান্ধাল জামাইয়ের কাণ্ডকারখানা হিসেবে ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু ইদানীং অন্তত দুটো ঘটনায় ইভানকা-কুশনার ভূমিকা নিয়ে খুবই ইতিবাচক রিপোর্ট আসতে দেখা যাচ্ছে।
অনেকে জানেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবেশবিষয়ক অবস্থান ও নীতি খুবই বিতর্কিত। ট্রাম্পের পরিবেশনীতি যা দুনিয়ার কারো সাথে একমত নয়। এমন নীতি যারা ঘিরে রেখেছে এরা হলেন- তার পরিবেশমন্ত্রী (পরামর্শক), এনার্জি মন্ত্রী (পরামর্শক) রিক পেরি, এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন কর্তৃপক্ষের প্রধান স্কট প্রুরিট এবং জেফ সেশন যাকে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছে আর সেক্রেটারি অব স্ট্রেট রেক্স টিলারশন যিনি এক্সন-মোবাইল তেল কোম্পানির সাবেক প্রধান নির্বাহীÑ এমন সব মার্কামারা লোক তারা। এরা মনে করেন, কার্বনডাই-অক্সাইডে দুনিয়ার তাপ বেড়ে যায় এবং পরিবেশ ধ্বংস হয় এর প্রমাণ কী? পরিবেশ ধ্বংসের আলাপ তোলাটা আসলে চীনা প্রচারণা মাত্র। আমেরিকান ব্যবসায়ের ওপর চীনকে সুবিধা দিতে এই মিথ্যা প্রচারণা চলছে। এই হলো তাদের সারবক্তব্য। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের মেয়ে ইভানকা ও জামাই কুশনার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছেন। পরিবেশবিষয়ক পত্রিকা ইকোওয়াচ জানাচ্ছে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সূত্রে খবর হলো, পরিবেশ বিষয়ের ট্রাম্পের এক এক্সিকিউটিভ অর্ডারে ‘প্যারিস ঐকমত্য’কে সরাসরি নিন্দা-সমালোচনা করে কোনো কথা বলছে না।
দ্বিতীয়ত, যেখানে ট্রাম্পের পাগলামি অবস্থান সিদ্ধান্তকে ঠাণ্ডা করার ক্ষেত্রে জামাই কুশনার ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা যাচ্ছে তা হলো- চীন ইস্যু। আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন তিনি। ফলে ইনফরমাল আলাপে গঠনমূলক পথে চীনা-আমেরিকান স্বার্থবিরোধের সব ইস্যুতে উত্তেজনা নামিয়ে আনতে নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন কুশনার। এ ব্যাপারে যেমন প্রথম ব্রেকথ্রু বা বাদাম ভাঙার কাজটা ছিল, ট্রাম্পকে একচীন নীতি মানতে ফেরত আনা। শপথ নেয়ার পর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথম চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেন। ট্রাম্পের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর থেকে বাস্তবে চীনের সাথে সব যোগাযোগ স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। ট্রাম্পের বক্তব্য, চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে, চীনা পণ্য প্রবেশ ঠেকাতে ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাবো, দুনিয়ার তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে বলে পরিবেশবাদীদের হইচই আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনা প্রপাগান্ডা, একচীন নীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে আমেরিকানদের বাধ্যবাধকতা নেই ইত্যাদিতে ট্রাম্পের এসব রেটরিক বাকোয়াজে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে রুটিন কূটনৈতিক সম্পর্ক কাজ চালিয়ে নিতে যেসব তৎপরতা লাগে ট্রাম্পের প্রশাসন তাও চালিয়ে রাখতে পারছিল না দিকনির্দেশনার অভাবে। ফলে জামাই কুশনার আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে অনানুষ্ঠানিক আলাপ করুন, এ সম্মতি ট্রাম্পের দিক থেকে ছিল। বিপরীতে চীনা অবস্থান ছিল খুবই ইতিবাচক ও ঠাণ্ডামাথায় পরিচালিত। ফলে ট্রাম্পের ওই ফোনালাপে লক্ষ্য ছিল কুশল বিনিময়ের পরে ট্রাম্প তার প্রশাসনের একচীন নীতির পক্ষে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করবেন, আর বিনিময়ে চীন বলবে চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধ পারস্পরিক বসে আপস আলোচনায় মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। আর সব শেষে এর পর থেকে নিজ নিজ পক্ষের কূটনীতিকেরা বসে কাজ-সম্পর্ক এগিয়ে নেবে এ ব্যাপারে একমত প্রকাশ করে আলাপ শেষ হবে। এই ছিল কুশনার ও চীনা রাষ্ট্রদূত তাদের একমত পরিকল্পনা। সুন্দরভাবে সম্পর্কের এই প্রথম পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। এবার দ্বিতীয় পর্বেও উভয়ের একমত টার্গেট হলো শি-ট্রাম্পের এক শীর্ষ বৈঠক আয়োজন করা। এই লক্ষ্যে কুশনার ও চীনা রাষ্ট্রদূত কাজ করছেন। আসলে বাইরে থেকে যেটাকে কোনো দুই রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ বৈঠক বলে আমরা দিনক্ষণ দেখি সে দিনটা আসলে উভয়ের একমত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের দিন। অর্থাৎ কী কী ইস্যু আসবে আর তাতে উভয়ে কোথায় একমত হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই দীর্ঘ দিন ধরে আলাপ ও বোঝাবুঝি নেগোসিয়েশন সবই আগেই চলতে থাকে। চীন-আমেরিকার ক্ষেত্রেও এই কাজটাই বর্তমানে চলছে। এরই কাজে চীনের দিক থেকে প্রভাবশালী কূটনীতিক প্রতিনিধি ইয়াং জিচি দুই দিনের সফরে আমেরিকা সফর করে গেলেন। ইয়াং জিচির সফরের প্রধান লক্ষ্য হলো আগামী এপ্রিলে না হলেও যেন মে মাসের মধ্যে শি-ট্রাম্পের শীর্ষ সফর আয়োজনের ভিত্তি স্থাপন করে যাওয়া। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক এক থিংকট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর প্রধান মাইকেল গ্রিনের উদ্ধৃতি দিয়ে হংকংয়ের পত্রিকা সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানাচ্ছে, সম্ভবত আগামী মাসে এই শীর্ষ সফর হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ইয়াং জিচির সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ বৈঠকে ট্রাম্পের অ্যাডভাইজার হিসেবে কুশনারও ওই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। আসলে আগামী জুলাইয়ে এবারের জি২০-এর মিটিং আয়োজিত আছে জার্মানিতে। ওই মিটিংয়ে সাক্ষাতের আগেই উভয় পক্ষই শি-ট্রাম্পের শীর্ষ সফর শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে আগাচ্ছেন। সেই লক্ষ্যে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়েন নিজে যেচে বাণিজ্যবিরোধ বিতর্কগুলো আলাপ-আলোচনায় মিটিয়ে ফেলা সম্ভব বলে বক্তব্য রেখেছেন। চীনা বাণিজ্যমন্ত্রী গাও এ নিয়ে বিস্তর কথা বলে আশাবাদ রেখেছেন। অর্থাৎ চীনের দিক থেকে একটা প্রস্তুতি হোমওয়ার্ক করা আছে যে কী কী বিষয়ে ছাড় দিলে আপস এ যাত্রায় ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে একটা রফায় পৌঁছানো সম্ভব।
এখানে একটা তুলনামূলক ছবি আঁকা যায়। ভারতের সাথেও আমেরিকার স্বার্থবিরোধ রয়েছে। ভারত আমেরিকানদের কাজ খেয়ে ফেলছে বলে। চীনের বিরুদ্ধেও ঠিক একই অভিযোগ করছে। কিন্তু ফারাক একটা জায়গায়। ভারতের বেলায় এক দিকে ভারতের কূটনীতিক বা বিদেশসচিবদের সাথে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে আমরা শুনছি, কিন্তু একই সাথে বাস্তবে দেখছি চাকরি ঠেকানোর পক্ষে নতুন নতুন আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে অথবা আইন জারি করা হচ্ছে। যেমন ভারতের কল সেন্টার বসিয়ে আমেরিকায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস দেয়ার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। ফলে অভিমুখ হিসেবে দেখলে ভারতের বেলায় ট্রাম্প প্রশাসন মতানৈক্যের দিকেই যাচ্ছে। ওদিকে চীনের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ একটা আপসরফার সম্ভাবনা উজ্জ্বল যতটুকুই হোক, অন্তত প্রতিরোধমূলক আইন প্রণয়ন চীনের বেলায় আপাতত হচ্ছে না তা বলা যায়।
এসব তৎপরতা দেখে পাগলা ট্রাম্পের জন্য একজন ঠাণ্ডা মাথার জামাই থাকা খুব জরুরি সমাধান, অ্যান্টিডোট বলে হাজির হয়েছে।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫