ঢাকা, মঙ্গলবার,০৭ এপ্রিল ২০২০

উপসম্পাদকীয়

মোদি গরুর গোশতের রাজনীতির ফাঁদে

২৬ মার্চ ২০১৭,রবিবার, ১৬:১৬


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

গরুর গোশতের রাজনীতি। হা, গরুর গোশতের রাজনীতি শুরু হয়েছে ভারতের উত্তর প্রদেশে। যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন, ফলে এমনটা তো সবার আগে হওয়ার কথা ছিল। এবারের রাজ্য নির্বাচনের আগে প্রচারণা মিছিল মিটিংয়ে গরুর গোশত প্রসঙ্গ এসেছিল, এনেছিলেন তারা। এনেছিলেন খোদ বিজেপি সভাপতি, মোদির খারাপ-ভালো সব কাজের ডানহাত অমিত শাহ। বক্তৃতায় তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, তাদের দল উত্তর প্রদেশে জিতলে মুখ্যমন্ত্রীর শপথের দিনের রাত ১২টার মধ্যে রাজ্যসরকারের এক অর্ডিন্যান্স ঘোষণার মাধ্যমে সব কসাইখানাসহ গরু জবেহ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হবে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি দেয়া তার এই বক্তৃতার ভিডিও ক্লিপ ইউটিউবে এখনো সহজেই পাওয়া যায়। দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা বলছে, উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির নির্বাচনী মেনিফেস্টোতেও লেখা ছিল যে দল জিতে ক্ষমতায় এলে অবৈধ কসাইখানা উঠিয়ে দেয়া হবে। যদিও সেখানে একটা কিন্তু ছিল, যেমন সাধারণত থাকে। খুব বিতর্কিত কোনো বিষয় বিজেপির মেনিফেস্টোতে থাকলে তার সাথে এমন একটা ‘কিন্তু’ জুড়ে দেয়া থাকে। যেমন উত্তর প্রদেশের ওই মেনিফেস্টোর বাক্যে একটা বাড়তি বিশেষণ লাগানো আছে ‘অবৈধ’। অর্থাৎ সব কসাইখানা না, কেবল যেগুলো ঠিকঠাক মতো লাইসেন্স নেয় নেই, অথবা রিনিউ করা নেই ফলে সেগুলো অবৈধ। আর ওই অবৈধগুলোই কেবল রাজ্যসরকার তৎপরতায় বাধা দেবে। ঠিক এইভাবেই আসামের নির্বাচনে গরম ইস্যু ছিল কথিত বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী প্রসঙ্গে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। আর কিন্তু হিসাবে ওখানে কম গুরুত্বপূর্ণভাবে লেখা ছিল ‘যারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে’ কেবল তাদেরকে। আসলেই যারা বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আসামে গিয়েছে কিন্তু ফেরত আসে নাই এরা মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুসারে অনুপ্রবেশকারী হলেও আসামের রাজনীতিতে বিজেপির মতো অনেক দলের আকার-ইঙ্গিতে দাবি হলো, আসামে কোনো মুসলমান মাত্রই বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী। এ ছাড়া আসাম সংসদের সিদ্ধান্ত হলো, কাউকে অনুপ্রবেশকারী বলে ফেরতের আগে একটা কমিশনের মাধ্যমে তার কাগজপত্র পরীক্ষা করা হবে সে ‘১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে’। পরীক্ষায় যদি সে তথ্য কেবলমাত্র তখনই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রশ্ন, এর আগে নয়। কিন্তু নির্বাচনের সময় বিজেপি প্রচার-প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল সব ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ ফেরত পাঠানোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিজেপির মেনিফেস্টো।
একটা সরাসরি প্রশ্ন করা যাক। বিজেপি আসলেই কি গরু জবাই দেয়ার ও গোশত বিক্রির বিরোধী? কেন বিরোধী সে প্রশ্ন না হয় নাই তুললাম! জবাব হলো না বিজেপি বিরোধী নয়। এমনকি আমাদের সীমান্তে বাংলাদেশে গরু পাচারকারীদের ব্যাপারে বিজেপি খড়গহস্ত এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজে ভারত সীমান্তে বিএসএফ ক্যাম্প সফর করে গরু বাংলাদেশে পাচার না হওয়ার পক্ষে বিএসএফ সদস্যদের উদ্বুদ্ধ-প্রপাগান্ডা করে গেলেও। তাহলে বিজেপি গরু জবাই দেয়ার ও গোশত বিক্রির বিরোধী নয় এই বক্তব্যের প্রমাণ কী? প্রমাণ খুবই সহজ। ভারতের রফতানির পরিসংখ্যান তালিকা বলছে, ভারত দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় গোশত রফতানিকারক দেশ। ২০১৫ সালের (থিতু হওয়া ফাইনাল ফিগার) গোশত রফতানি বাজার থেকে আয় করা অর্থ হচ্ছে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার। আনন্দবাজারসহ নিউ ইয়র্ক টাইমস ও অন্যান্য ভারতীয় ইংরেজি পত্রিকার খবর এটা। আর গোশতসহ চামড়া ও অন্যান্য রফতানিপণ্য ধরলে এটা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার শিল্প-বাজার। আর অনেক সময় আইনি আড়াল দেয়ার জন্য এগুলো গরুর গোশত না বলে মহিষের গোশত বলে রফতানি হয়। এগুলো সব মোট ভারতের রফতানির ফিগার। আর গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সংখ্যা-ফিগারের অর্ধেকের বেশি অবদান একা উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের। যেমন সারা ভারতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত অটোমেটিক আধুনিক স্লাটারহাউজ (যেখানে কাটা ধোয়া বাছাই ও প্যাকেজিং সবই হয়) আছে। এমন কসাইখানার সংখ্যা ৭৫টি। এমন কসাইখানার মধ্যে ৪১টিই হলো উত্তর প্রদেশে। তা-ও আবার এটা শুধু লাইসেন্সপ্রাপ্তগুলোর হিসাব। লাইসেন্সহীনেরা এই হিসাবের বাইরে। সাময়িক লাইসেন্স দেয়া হয় দুই বছরের জন্য। আর লাইসেন্স দেয়া হয় কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে। কিন্তু ফিল্ড ভিজিট করে তথ্য পাঠিয়ে দেয় রাজ্যসরকার। যেসব তথ্য যাচাই করে তা হচ্ছে, অনলাইন সিস্টেম, পলিউশন, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, ফায়ার সেফটি, লেবার ল ইত্যাদি ব্যবস্থাগুলো স্টান্ডার্ড মতো আছে কি না। মজার কথা হলো মোদির বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের গোশত রফতানি আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর অন্যতম কারণ মোদি সরকার গোশত রফতানিকে ‘শিল্প বলে ঘোষণা’ দিয়েছে আর রফতানি করলে ৫০ ভাগ সরকারি প্রণোদনা সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এক কথায় বললে খোদ মোদি সরকার গোশত রফতানিকে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রফতানিপণ্য হিসেবে দেখা তার সরকারের নীতি বানিয়েছে। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না গরু বা মহিষ জবাই করার পরই তা রফতানি করা হয়। অর্থাৎ মোদি নিজেই পশু জবাই দেয়ার উৎসাহদাতা।
অর্থাৎ গোশত রফতানিতে উত্তর প্রদেশের একাই অর্ধেকের বেশি ভূমিকা সত্ত্বেও শপথ নেয়ার পরদিন থেকেই ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে। অনেকগুলো লাইসেন্সহীন কসাইখানা সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। পাড়ার কসাইখানা আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। আর এর ভয়ে প্রথম তিনদিন সব কসাইখানাই বন্ধ ছিল। অর্থাৎ এ পর্যন্ত চলছে আইওয়াশ। আইওয়াশ বলছি এ কারণে যে গরু জবাই কিংবা গোশত রফতানি প্রসঙ্গে বিজেপির ভূমিকা দু’মুখী। একদিকে সে এগুলো বন্ধ করতে হবে মুখের এই বোলচাল চাপাবাজি থেকে সরে আসবে না। আবার দুনিয়ার সর্বোচ্চ বড় রফতানিকারক রাষ্ট্র হবে, রফতানিতে প্রণোদনা উৎসাহ সহায়তা দেবে ইত্যাদি। উত্তরপ্রদেশের এখন চলছে আইওয়াশ পর্ব। ঠিক একই রকম ঘটেছিল গুজরাটে। এরপর গোশত রফতানি পর্ব জোরদারভাবে চলবে। ঠিক যেমন আনন্দবাজার বলছে গুজরাটে এখনো রফতানি বন্ধ হয়নি। আগের মতো চলছে।
এবার উত্তরপ্রদেশ সবচেয়ে বড় রফতানিকারক রাজ্য বলে এর সাথে শুরু হয়েছে নতুন উদ্বিগ্নতা। রফতানি কমে গেলে রাজ্যের রাজস্ব আয় কমে যাবে। রাজস্ব কমে গেলে রাজ্যসরকারের খরচ নির্বাহের উৎস কী হবে। ইতোমধ্যেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন এমন রাজস্ব আয়ের ঘাটতির জন্য কোনো অনুদান তিনি বরাদ্দ করতে পারছেন না।
এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমস গত বছর এক দীর্ঘ গবেষণা প্রতিবেদন ছেপেছিল উত্তর প্রদেশে অটোমেটিক কসাইখানা বসানোর ফলে এর সামাজিক ইমপ্যাক্ট বা অভিঘাত তৎপরতা কি পড়েছিল তা নিয়ে। রিপোর্টটা ছিল গ্রামের নারীদেরকে ওই কারখানায় কাজ নিতে সমাজ নেতাদের বাধাদান, একঘরে করে দেয়ার ভয় দেখানো। আর সেগুলো উপেক্ষা করে ওই কসাইখানায় কাজ নেয়ার লড়াই সংগ্রাম নিয়ে। তারা এবার বলছে, এই অটোমেটিক কসাইখানা বসানোতে তারা কাজ পেয়েছিল, সংসারের খরচ যুগিয়ে একটু সচ্ছলতার মুখ দেখছিল। এক্সপোর্ট আইটেম বলে নিয়মিত কাজও পেত। ওই মহিলারা এখন তারা উদ্বিগ্ন যে তাদেরকে আবার সেই সীমাহীন দারিদ্র্যজোনে বোধ হয় ফেরত যেতে হয়। আনন্দবাজার বলছে এমনিতেই উত্তরপ্রদেশে বেকারের হার অন্য প্রদেশের তুলনায় বেশি। পশু জবাই আর গোশত রফতানির ওপর বাধা আসলে বেকারের সংখ্যা আরো ভারসাম্য হারাবে।
এ দিকে গত ২১ মার্চ স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট দুই ব্যক্তিকে গরু জবাই দেয়ার জন্য হঠাৎ করে পাঁচ বছর করে সাজা দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন মোদি ও যোগী আদত্যনাথ তাদের দ্বিমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবেন কী না! 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫