ঢাকা, মঙ্গলবার,০২ জুন ২০২০

আলোচনা

লিটল ম্যাগাজিনের এদিক-সেদিক

আফতাব চৌধুরী

০১ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৫৫


প্রিন্ট

সাহিত্যের সৃজনশীলতার শক্তিশালী মাধ্যম লিটল ম্যাগাজিন। তাকে নানা নামে, নানা অভিধায় অভিহিত করা হয়। কেউ বলেন, অব্যবসায়িক কাগজ, কেউ বলেন অপ্রাতিষ্ঠানিক, কেউ বলেন ছোট পত্রিকা বা ক্ষুদ্র সাময়িকী আবার কারোর মতে প্রতিবাদের বারুদশালা। বন্দুকের যে জায়গাটায় টোটা বা গুলি ভরা থাকে, তাকে বলে ম্যাগজিন। এই ম্যাগজিন শব্দ থেকে ম্যাগাজিন নামকরণ বলেও কারো কারোর অভিমত।
লিটল ম্যাগাজিন যে প্রতিবাদের বারুদশালা, তা বারবারই প্রমাণিত হয়েছে। এর উদাহরণ রয়েছে অনেক। আর আগামীতেও যে তার পুনরাবৃত্তি হবে না, তারই বা কী নিশ্চয়তা আছে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। প্রেক্ষাপট পশ্চিমবঙ্গ। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। তখনকার পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিল্পগোষ্ঠীকে সিঙ্গুরে কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে দিতে পদক্ষেপ নেয়। এর সাথে নন্দীগ্রামে এসইজেড প্রকল্পের জন্য একই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তখন ছিল বামফ্রন্ট সরকার। এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা পশ্চিমবঙ্গ। তার প্রভাব কিছুটা হলেও এসে পড়ে আসাম ও অন্যান্য রাজ্যে। কৃষকদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সামিল হন লিটন ম্যাগাজিন সম্পাদকরা। সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে প্রতিবাদী-প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করায় পুলিশ দুটো লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক-কর্মীকে গ্রেফতার করেছিল, যদিও সম্পাদক-কর্মীদেরই চাপে তাদের ছেড়ে দিয়েছিল।
উদাহরণ বাড়িয়ে নিবন্ধের কলেবর স্ফীত না করলেও লিটন ম্যাগাজিন যে প্রতিবাদের বারুদশালা, তা সবারই জানা ও স্বীকৃত বিষয়। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। একটি ম্যাগাজিন ছিল ঢাকার নুর হোসেন, অন্যটি ছিল রাজশাহীর জসিম উদ্দিন ও জালাল উদ্দিন সম্পাদিত চম্পাকলি। প্রগতিশীল গল্প ছাপানোর ‘অপরাধে’ এক শ্রেণীর লোকের রোষের মুখে পড়েছিল কাগজ দু’টি। সে যা হোক, লিটল ম্যাগাজিন শব্দবন্ধ থেকে প্রাথমিক ধারণা হতে পারে, ছোটখাটো কাগজ বলে। সবুজপত্র সম্পাদক কুদুছ হালদারের কথায়, কেন লিটল ম্যাগাজিন নাম! আকারে ছোট বলে! প্রচারসংখ্যা সীমিত বলে! হবেও বা। কিন্তু তার কাজ উল্লেখ করা ঘটনাগুলো অজ¯্র উদাহরণের মধ্যে মাত্র দু-একটি উদাহরণ। হ্যাঁ, প্রতিবাদধর্মিতা এবং প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনা লিটল ম্যাগাজিনের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
লিটল ম্যাগাজিনকে সাহিত্যের আঁতুড়ঘর বলা হয়ে আসছে অনেকদিন থেকে। সত্যিই কি আঁতুড়ঘর? নতুন লেখকদের হাত পাকাবার মাধ্যম! কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্ণধার সন্দীপ দত্ত কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনকে আঁতুড়ঘর বা হাত পাকাবার জায়গা বলে মানতে নারাজ। তার স্পষ্ট অভিমত, আঁতুড়ঘর নয়, লিটল ম্যাগাজিন সাহিত্যের সৃজনমঞ্চ। নতুন সম্ভাবনাকে আবিস্কার করবে, কিন্তু আবোল-তাবোল লেখা ছাপা হবে না। লিটল ম্যাগাজিনের একটা নিজস্ব দিক আছে। তার কাজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত অন্বেষণ। সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত ও মননশীল সহিত্যচর্চার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে লিটল ম্যাগাজিন, যদি বলি বাংলা সাহিত্যের প্রধান বাহনের ভূমিকা পালন করছে, তবে হয়তো কেউ কেউ নাক কুঁচকে বলবেন-তবে অন্যেরা করছেটা কী! অন্যেরা মানে প্রাতিষ্ঠানিক কাগজ, যারা সাহিত্যকে পণ্যবস্তুতে পরিণত করে বাণিজ্যে বিশ্বাসী। আর বলাবাহুল্য এসব কাগজ বৃহত্তর পাঠক মনকে শাসন করে চলেছে। সাহিত্যের মোড়কে খাদ্য-অখাদ্য সবই গেলানো হচ্ছে সুকৌশলে। আর পাঠক রচনাগুলো পড়ছেন না, গিলে চলেছেন। তাই পাঠক-রুচি সেভাবেই গড়ে উঠেছে।
পাঠক মনে সাহিত্যের রুচিবোধকে জাগরূক রাখতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাগজে সাহিত্যের নামে বাণিজ্যমূলক রচনা ছাপানোর ছড়াছড়িতে বাংলা সাহিত্যের যে বন্ধ্যাদশার সূত্রপাত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া লিটল ম্যাগাজিনের অন্যতম দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। অথচ তার পুঁজি নেই, বিপণনের ব্যবস্থাও ভীষণ নড়বড়ে। পাঠক আছেন, তবে সেই পাঠক খুঁজে বের করা কঠিন। অধিকাংশ পাঠক বিনিময় ছাড়া পত্রিকা পেতে আগ্রহী। কিন্তু এসব পাঠক একবারও ভেবে দেখেন না, একটি কপির যে বিনিময় মূল্য ধার্য করা হয় তা কি মুদ্রণ মূল্যের থেকে কম বা বেশি পড়ল কি না। বিনামূল্যে কাগজ পেলে সেই কাগজের স্থায়িত্ব দীর্ঘ হবে কী করে! সমস্যা এখানেই শেষ নয়।
আমাদের দেশে সাহিত্যচর্চায় লিটল ম্যাগাজিন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। বাণিজ্যিকভাবে প্রকাশন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় এখানকার কবি-সাহিত্যিকরা লিটল ম্যাগাজিন-নির্ভর হয়ে আছেন। সে অর্থে দেশে কবি-সাহিত্যিকদের ‘লিটল ম্যাগাজিনের লেখক’ বলা যায়। এখানকার প্রতিভার পরিচয় বৃহত্তম বাংলা সাহিত্যে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও খুব সীমিত। এছাড়া কলকাতার কবি-লেখকদের কাছে ব্রাত্য হয়ে আছেন ওখানকার কবি-লেখকরা। তারা মোটেই এখানকার লেখক-কবিদের মেনে নিতে পারছেন না। তার পরিচয়ও পাওয়া যাচ্ছে সময়ে অথচ গত শতকের ষাটের দশকে ঢাকার স্বতন্ত্র পত্রিকা কলকাতার কবি-পাঠকদের নজর কাড়তে সমর্থ হয়েছিল। ব্যস, এ পর্যন্তই। এরপর আর তেমন কোনও পত্রিকা নজর কাড়তে পেরেছে কি না জানা নেই। সম্প্রতি দেশের মফস্বল শহরের পত্রিকা বেশ নজর কেড়েছে বলা যেতে পারে। এটা কম কথা নয়।
বেশির ভাগ লিটল ম্যাগাজিনেরই নিত্য অনটন লেগে আছে। চাল নেই, চুলো নেই, দু’বেলা নিশ্চিত আহারের ব্যবস্থা নেই, এমন দরিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের মতোই তার অবস্থা। সাংগঠনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখাও নেই বেশির ভাগ লিটল ম্যাগাজিনের। যাত্রাপথ তার নিয়ত বন্ধুর তাই। লিটল ম্যাগাজিনকে এসব প্রতিকূলতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে কেউ কেউ কর্মবিভাজনের সূত্রের কথা বলেন। যেমন- প্রকাশনা বিভাগ, প্রচার বিভাগ, বিক্রয় বা বিপণন বিভাগ প্রভৃতি ভাগে কর্মবিভাজন করা যেতে পারে। ওই সূত্রের মতামত অনুসারে প্রকাশনা বিভাগের কাজ হবে রচনা সংগ্রহ, সম্পাদনা, প্রেসে নিয়ে যাওয়া, প্রুফ সংশোধন ইত্যাদি, প্রচার বিভাগের কাজ হবে বিজ্ঞাপন ও অর্থ সংগ্রহ ইত্যাদি, বিপণন বিভাগের কাজ হবে বিভিন্ন বিক্রয় স্থানে পৌঁছে দেয়া এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ সংগ্রহ করা ইত্যাদি। এভাবে এক-একটি বিভাগে এক বা একাধিকজনের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে নিতে হবে। এতে সম্পাদকের চাপ অনেকটা হ্রাস পাবে এবং কাগজও চলবে। কিন্তু এটি প্রাতিষ্ঠানিকতার রূপ হয়ে যায় না! লিটল ম্যাগাজিনের পক্ষে এভাবে কর্মবিভাজন সূত্র বা ফর্মুলা সম্ভব? এখানে লিটল ম্যাগাজিন করা ‘ঋঁষষ ঞরসব ঔড়ন’ হয়ে ওঠেনি। তাই এর সঙ্গে জড়িতদের জীবন-জীবিকার তাগিদে উপার্জন করতে হয়। এ কারণে লিটল ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রে কর্মবিভাজনের সূত্র সফল হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। দেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ঢাউস মাপের যে ম্যাগাজিন আমরা পেয়ে থাকি তা বোধহয় ওই কর্মবিভাজন সূত্রের ফসল। লিটল ম্যাগাজিনের আদর্শ, চরিত্র, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য বজায় রেখে সাংগঠনিক তৎপরতার প্রয়োজনীয়তাকে একেবারে উপেক্ষা করা না গেলেও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, লিটল ম্যাগাজিনের নাম নিয়ে বেনোজলও ঢুকে পড়েছে। ঢাউস মাপের সব ম্যাগাজিন বাজারে দাপটের সঙ্গে ছড়ি ঘোরাচ্ছে। তাদের বিজ্ঞাপনের বহর আর প্রচ্ছদ ও মুদ্রণের চাকচিক্য লিটল ম্যাগাজিনের সংজ্ঞাকে দ্বন্দ্বে ফেলে দেয়ার মতো। এসব কাগজ দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে ওঠার অভিমুখে চলেছে বলেও মনে হয়। এসব কাগজ সাহিত্য নিয়ে যত না যত্নশীল, তার চেয়ে বেশি বাণিজ্য সফল হওয়ার তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। ওই যে একটু আগে বললাম- লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, চরিত্র ও আদর্শের কথা। এসব অক্ষুণ্ন রেখে যদি প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে এগিয়ে চলে তবু তার সীমারেখা থাকা প্রয়োজন। ব্যতিক্রম হলেই প্রাতিষ্ঠানিক আর লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে ব্যবধান থাকবে না।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫