ঢাকা, বুধবার,০৩ জুন ২০২০

আলোচনা

সেলিনা হোসেনের কালকেতু ও ফুল্লরা

জান্নাতুল পারভীন

০৮ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২৪


প্রিন্ট

তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ঘরের একদল লোকের জন্য সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের নাগপাশ ছিঁড়তে পারছে না। ওদের জনগণের দুই ধরনের শত্রু- ভেতরে এবং বাইরে। এসব দেশের শাসকেরা চায় গোটা জাতিকে হয় ভিক্ষুকে পরিণত করতে, নয় ক্রীতদাস বানাতে। তাহলেই ওদের সুবিধে। কিন্তু এসব শাসক ভুলে যায় যে, এক মাঘে শীত যায় না।
- এভাবেই শেষ হয়েছে সেলিনা হোসেন (জন্ম: ১৪ জুন ১৯৪৩)-এর ২১টি পরিচ্ছেদে নির্মিত রাজনৈতিক উপন্যাস কালকেতু ও ফুল্লরা (প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ১৯৯২)-র দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। এই কথাগুলো কাহিনীর এক চরিত্র মজিদের দিনপঞ্জির অংশবিশেষ। মজিদের অনুভবের মধ্য দিয়ে প্রসারিত হয়েছে উপন্যাসটির ভেতর-ক্যানভাস। সেলিনা হোসেন সমাজলগ্ন ও ইতিহাসনিমগ্ন কথানির্মাতা। তিনি সামাজিক বিবর্তন, মানুষের পরিবর্তন প্রভৃতিকে ইতিহাসের পাটাতনে রেখে বিবেচনা করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। রাজনীতিকে তিনি উপন্যাসের বিষয় করেছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে। মানুষ যে রাজনীতির ভোক্তা এবং অসহায় শিকার, তার নিবিড় পর্যবেক্ষণ সেলিনার কথাসাহিত্যের বিশেষ প্রবণতা। আর পরিবেশনকৌশলের দিক থেকেও তার স্বাতন্ত্র্য পাঠকের চোখে পড়ে। যা বলতে চান, তা কিভাবে প্রকাশ ও পরিবেশন করলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবেÑ সেই বিষয়ে তিনি সাবধানী শিল্পী। নারীর উ্ন্নয়ন, জেন্ডার সমতা, নাগরিক অধিকার, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মর্যাদা, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রভৃতি বিষয়ে সেলিনা হোসেন সরবকণ্ঠ সাহিত্যিক।
কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের তিন খণ্ডের দ্বিতীয় খণ্ড হচ্ছে কালকেতু-ফুল্লরার উপাখ্যান। গুজরাটে নগর পত্তন, নানান ধর্ম ও বৃত্তির মানুষের সমাজবিন্যাস, নাগরিক সুখ-শান্তি, ক্ষমতা-লোভ-কপটতা- এইসব ঘিরে আবর্তিত হয়েছে কালকেতুর কাহিনী। একটি প্রশ্ন মাঝে মধ্যে উঁকি দেয়- সেলিনা হোসেন কি এ কালের- আধুনিক বাংলা সাহিত্যের, মঙ্গলকাব্য লিখেছেন? সমাজের অমঙ্গল দূর করে মঙ্গল প্রতিষ্ঠাই কি তার লক্ষ্য?
মুকুন্দরামের কালকেতু উপাখ্যানে উপন্যাসের যে সম্ভাবনা, আধুনিকতার যে আভাস- তা থেকে আমাদের উপলব্ধি এই যে, উপন্যাসের বিরাট-ব্যাপক পরিপ্রেক্ষিত কালকেতু উপাখ্যান-এ আছে। কেবল সময়ের তাগিদ বা চাহিদার জন্য ছিল পাঠকের প্রবল প্রতীক্ষা। তাহলে সেলিনা হোসেন কি সেই সম্ভাবনা ও সত্যটিকেই প্রতিষ্ঠিত করলেন তার কালকেতু ও ফুল্লরার মধ্য দিয়ে? এটিকে কি মধ্যযুগের কোনো উপাখ্যানের নবরূপ বা উপন্যাসকরণ কলা যেতে পারে? আবার এমনও তো হতে পারে- এই কালের একজন লেখক পূর্বসূরি কাহিনীকারের অভিব্যক্তির সাথে তার সমাজ ও রাষ্ট্রভূমিবিষয়ক চিন্তাকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। নির্মাণ করে তুলেছেন বহমান সমাজ-রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চিরন্তন ধারা। সমাজে শাসকের, শাসকের সহযোগীর যে চরিত্র, তা যে সব সময় একই, কেবল ব্যক্তির হাতবদল মাত্র- এই কি কাহিনীকারের অনুভব? এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে সতর্ক পর্যবেক্ষণের পথ ধরে অগ্রসর হতে হয় কাহিনীপাঠে।
শাসকের অসীম ক্ষমতা, স্বেচ্ছাচারিতা, জনগণের শান্তিপ্রতিষ্ঠার চেয়ে নিজের ও আত্মীয়-পরিজনের সুখ-সমৃদ্ধির দিকে প্রবল নজর; অন্য দিকে মেরুদণ্ডহীন-ব্যক্তিত্ববর্জিত সুবিধাভোগী সম্প্রদায়ের জালিয়াতি-ভণ্ডামি- এইসব প্রবণতার কারণে আমাদের রাজনীতি যে বিনষ্ট হয়েছে, তার স্বরূপ ধরতে চেষ্টা করেছেন সেলিনা হোসেন। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকেরা কিভাবে রাজনীতির কালো ছোবলে আক্রান্ত, তার বিবরণ পাওয়া যায় এখানে।
কালকেতু ও ফুল্লরার কাহিনীতে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র কালকেতু দেবীর আশীর্বাদে তার পূর্ববর্তী শিকারি-জীবন ও সমূহ ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে কলিঙ্গ নগরের প্রশাসক হয়ে ওঠে। তবে তার দুঃখ- নিন্দুকেরা তার কাজের কোনো প্রশংসা করে না; বলে নগরের আইনশৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়েছে। আর আরেকটি কষ্ট তার রয়েছে- সে আর তার স্ত্রী ফুল্লরা আজ অবধি সন্তানের মুখ দেখেনি। ফুল্লরা রানী হওয়ার পর থেকে সারাক্ষণ সৌন্দর্যচর্চায় নিমগ্ন থাকে। তবে তার হাসি যেন কৃত্রিমতায় ভরা- তাতে প্রাণের কোনো সাড়া নেই। কালকেতু সাধারণ মানুষ থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছে। নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য অনেক টাকা খরচ করেছে। বিদেশীদের জন্য বিলাসবহুল ‘অতিথি ভবন’ নির্মাণ করেছে।- এসবের ব্যাপক প্রচারও চায় সে। কিন্তু নগরের মানুষের ঘরে খাবার নেই; যদিও ডাস্টবিনে উপচে পড়ছে খাদ্য। কালকেতু অনেক দিন বাঁচতে চায়। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে সে শরীরচর্চা করে, গলফ খেলে, বুকভরে শ্বাস নেয়। ‘ও দীর্ঘজীবী হতে চায়। ক্ষমতায় টিকে থাকার ওর খুব খায়েশ।’ কাহিনী-নির্মাতা সেলিনা হোসেন সম্ভবত ক্ষমতালোভী স্বৈরাচারী কোনো শাসকের কথা বলছেন। অবশ্য আমরা যে গণতান্ত্রিক চর্চায় খুব একটা অগ্রসর হতে পেরেছি কিংবা রাজনৈতিক কোনো স্থিতি অর্জন করতে পেরেছি, তা নয়। এক ব্যক্তি- একদল- একজোট সবসময় আমাদের রাজনীতিকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে। মরেছে কেবল সাধারণ মানুষ!
স্বার্থান্ধ-চাঁদাবাজ, লুটেরা আর চাটুকার পরিবেষ্টিত কালকেতুর স্বপ্ন- ‘নগরীকে তিলোত্তমা নগরী করবে। আরো ফোয়ারা তৈরি হবে, উদ্যান হবে, রাজপথ আলোকিত হবে। পুষ্পময় তরুলতায় ছেয়ে যাবে রাস্তার দু’পাশ। বিভিন্ন রঙে রঞ্জিত হবে নগরের ভবনগুলো।’ কিন্তু এইসবই তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ লোক-দেখানো; লেখক জানাচ্ছেন-
এই চমৎকার নগরীর দুটো অংশ। এক দিকে আছে সোডিয়াম লাইট শোভিত কার্পেটিং করা রাজপথ, প্রাসাদোপম অট্টালিকা, লেক, উদ্যান, ফোয়ারা। অন্য দিকে রয়েছে অপ্রশস্ত সড়ক, ঘিঞ্জিমারা বস্তির বিস্তার, খোলা ম্যানহোল, আবর্জনার স্তূপ, মশার কামড়, সরু গলি, আলো বাতাসহীন মানুষের বসত।
তিলোত্তমা নগরী ঢাকার বাস্তব ছবি আঁকতে চেষ্টা করেছেন সেলিনা হোসেন। এই নগরীর সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থান এবং অর্থনীতির পাশাপাশি শাসকের নারীপ্রীতি ও ক্ষমতাপ্রীতির কথাও প্রকাশ করতে চেয়েছেন। আমাদের দেশের সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানরা রাষ্ট্রপরিচালনার ‘দায়িত্ব’ না ভেবে ‘ক্ষমতা’ মনে করে যে ভুলের ভুবনে প্রবেশ করেছেন- যার দায় ও জ্বালা ভোগ করছে সাধারণ জনতা- সেই সত্যটুকু সাহিত্যের মোড়কে তুলে ধরেছেন ঔপন্যাসিক। কালকেতুর নগরে বেড়ে উঠছে ভবন, ভেসে যাচ্ছে মানুষ। এখানে কেউ ভালো কিছু করার চেষ্টা করলে তাকে প্রকট যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। ধূর্ত মানুষের চোখে সে সহজেই গর্দভ হয়ে যায়! সেলিনা হোসেনের নগর-ভাবনায় জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতার ছায়া পড়ে সম্ভবত অনিবার্যভাবেই! জীবনানন্দ কতকাল আগে লিখেছিলেন- ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;/ যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই/ পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।/ যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,/ এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়/ মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা/ শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।’- জীবনানন্দের দেখা ওই আঁধার থেকে কি আমরা আজও মুক্তি পেয়েছি?
ক্ষমতা কেউ ছাড়তে চায় না।- প্রকৃতপক্ষে, লাভ ও লোভের পথ থেকে ফেরা কঠিন ব্যাপার। ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে তারা প্রয়োজনে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মানুষ হত্যার জন্য লেলিয়ে দেয়। অস্ত্র ঠেকিয়ে টিকিয়ে রাখতে চায় ক্ষমতা। অটুট রাখতে চায় রাজত্ব। সাধারণ মানুষের বুকের রক্তের রঙে নির্মাণ করতে চায় নগরের শোভা ও সমৃদ্ধি! কিন্তু সময়ের গতিতে বদলে যায় সব কিছু। অসীম ক্ষমতাবান কালকেতুদের দিন শেষ হয়ে আসে। তবে কালকেতুর মতো শাসকরা তা কিছুতেই মেনে নিতে চায় না। অবশ্য এইসব প্রবল প্রতাপশালী শাসককেও কখনো কখনো বিপন্ন হতে দেখা যায়।
যেমন জনতার আদালতের কাছে হার মানতে হয় স্বৈরশাসক কালকেতুর। কাহিনী নির্মাতা দেখিয়েছেন শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রবল ঘৃণা আর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের শিকার হয় শাসক কালকেতু ও সুবিধাভোগী ফুল্লরা। জনতার বিচারে প্রকাশ্যে ওদের ফাঁসি কার্যকর হতে দেখা যায় কাহিনীর ক্যানভাসে। আর তারই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের অবসান কল্পনা করেছেন- স্বৈরশাসকের পতনের কালক্রমিক ইতিহাস তুলে ধরেছেন। কল্পনা ও ইতিহাসের মিশেলে, শেষ পর্যন্ত, এখানে তৈরি হয়েছে অনন্য কথামালা।
মধ্যযুগের কালকেতু থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের শাসক পর্যন্ত- অপরিসীম ব্যক্তিক ও গোষ্ঠীগত সুখ-শান্তি আর জনগণের দোহাই দিয়ে প্রহসনের যে রাজনীতি চলমান, তার প্রতি প্রবল জনসচেতনতা সৃষ্টিকারী এই কাহিনী সমকালে এবং উত্তরকালে পাঠকের কাছে প্রেরণার বিষয় হয়ে থাকবে।- কালকেতু ও ফুল্লরার রাজনীতি-বীক্ষণ সমাজ-পর্যবেক্ষণের একটি দিক। অন্য একটি দিকও আছে- সময়ের পরিক্রমায় যদি দেখা যায়, গণতন্ত্রের থলের ভেতরে স্বৈরাচারের বিড়াল লুকিয়ে আছে- অবাধে দম্ভ করে বেড়াচ্ছে, তখন নিরীহ ও সাধারণ জনগণ পরিহাসের পাত্র হয়ে ওঠে মাত্র! তখন সেলিনা হোসেনের মতো কথাসাহিত্যিকদের জীবনদর্শনও হয়তো নতুন কোনো পথের সন্ধানে উৎসাহী হয়ে ওঠে! আর এভাবেই হয়তো সময়ের গাড়িতে গড়ায় উপন্যাসে রাজনীতি কিংবা রাজনীতির উপন্যাস!

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫