ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৮ মে ২০২০

নারী

বাবা তোমাকে খুব ভালোবাসি

সামিনা নাফিজ

১১ জুন ২০১৭,রবিবার, ১৪:৪৮


প্রিন্ট

বাবা শব্দটি শুনলেই মনের মাঝে ভেসে ওঠে মাথার ওপর আকাশের মতো বিস্তৃত এক ছায়া পরম নির্ভরতায়, নিশ্চিন্তে যার হাত ধরে চলতে শেখা। শৈশব থেকে কৈশোর, যৌবন এভাবে মেয়ে যত বড়ই হোক না কেন সেই ছেলেবেলার মতো বায়না অভিমান বাবার সাথে থেকেই যায়। বাবাকে ঘিরে স্মৃতির শেষ নেই। জীবনের প্রতিটি ধাপে হোঁচট খেলে বাবাই সাহস জোগান। অনুপ্রেরণা, স্নেহ ভালোবাসা জোগাতে বাবার তুলনা বাবাই। আমার বাবা নাফিজউদ্দিন হাওলাদার ছিলেন হ্রাসভারী গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তার স্নেহমমতা উপর দিয়ে বোঝা যেত না। আমার কৈশোর বয়সে মা মারা গেলে বড় বোনদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় উচ্ছল, চঞ্চল, দুষ্ট ডানপিটে মেয়ে হিসেবে পরিচিত এই আমাকে ঘরমুখো আর পড়াশোনায় মনোযোগী করতে বাবার নাভিশ্বাস অবস্থা। মধ্য বয়সে স্ত্রীহীন বাবা আমার একদম একলা হয়ে গেলেন। চাকরি ঘরসংসার দেখাশোনা আমাকে পড়াশোনায় মনোযোগী করার জন্য বাবার চাকরিস্থলের কোয়ার্টারে উঠলাম। এতে স্কুল থেকে ফিরে এলে দুপুরে বাবাও খেতে আসতেন, তখন আমি বাবার নজরদারিতে থাকতাম। এমনি করে বাবা আমার মানসিক পরিবর্তনের জন্য কথাবার্তা শেয়ার করতেন। আমি খুব দুরন্ত প্রকৃতির ছিলাম বলে বাবার বশে আসতে আসতেই এসএসসি পাস করলাম। বাবা আমাকে চট্টগ্রাম চারুকলায় ভর্তি করে দিলেন যেটাকে প্রি-ডিগ্রী স্টেজ বলে। সেখান থেকে সেকেন্ড ক্লাস ফার্স্ট হয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হলাম। বাবার সাথে ঈদ- কথাটা মনে হতেই মনে পড়ে গেল একটা ঘটনা। আমার বয়স তখন ৮-৯ বছর। বাবা গোদনাইলে পদ্মা অয়েল কোম্পানিতে চাকরি করেন। আমরা তখন গোদনাইল এলাকায় বাবার কোম্পানির কোয়ার্টারে বাস করতাম। মা তখন বেঁচে ছিলেন। ক’দিন পর ঈদ, তাই মা আমাকে খুব সুন্দর ১টি ফ্রক বানিয়ে দেন। একদিন বাসায় সুইপার কাকু ঘর পরিষ্কার করতে এলে আমি নাচতে নাচতে তাকে আমার জামাটা দেখাই। তিনি জামা দেখে খুবই খুশি হয়ে আর আমার বয়সী তার মেয়েকে এই জামাটার গল্প বলেন। সে মেয়ে তো বাবার কাছে জামার গল্প শুনে বায়না ধরে সেই জামা তার চাই-ই-চাই। আমি মাঝে মাঝে সুইপারপাড়ায় খেলতে যেতাম, তখন আমি বাপ-বেটির কথোপকথন শুনি। গরিব বাবা মেয়েকে এত সুন্দর দামী জামা বানিয়ে দেয়ার সাধ্য কি? তাই পরদিন মাকে অনুরোধ করি মা যেন আবার এই একই কাপড় কিনে আর একটি নতুন জামা তাকে বানিয়ে দেন। বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে মা তাই করেন। আমার ভাবতে অবাক লাগে মা-বাবা এই মেয়েটির জামা বানিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কোনো দ্বিধা দেখাননি। আমি ছোটবেলায় জাতের ভেদাভেদ বুঝতাম না। সবার সাথেই চলত আমার সখ্য। পড়াশোনা ছাড়া বাকি সব কাজেই আমার আগ্রহের অন্ত ছিল না। দিনভর দৌড়ঝাঁপ, গাছের নিচ থেকে মগডাল পর্যন্ত চড়ে বেড়ানো, বনে বাঁদাড়ে পাখির ছানা খোঁজা, মার্বেল, গুলি খেলা, ঘুড়ি উড়ানো, চিঁ বুড়ি খেলা, লংজাম্প, হাইজাম্প, ফুটবল, গোল্লাছুট- এ সব খেলা খেলতে খেলতে কখন যে সকাল, দুপুর, সন্ধ্যায় গড়াত আমি টেরই পেতাম না। মা-মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেও আমার হাত ধরে বলেছিলেন, ‘পরীক্ষায় ভালো করাটা কোনো ব্যাপার নয়, চাইলেই ভালো করা যায়।’ তখন মনে হচ্ছিল মা যেন আমার দুঃখেই ১৯৭৬ সালে হঠাৎই সামান্য ফুড পয়জনিং হয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। মা চলে যাওয়ার পর আমি যেন আরো স্বাধীন হয়ে গেলাম। বাবা, বড় ভাই-বোনেরা আমার চিন্তায় অস্থির। বাবা তখন আমার প্রতি বেশি মনোযোগী হলেন। আমি আস্তে আস্তে একের পর এক স্কুল পাল্টিয়ে পড়াশোনায় কিছুটা মনোযোগী হলাম। তারপর এসএসসিতে পাস করার পর বুঝলাম- আসলেই তো মার কথাই সত্যি, পাশ করাতো কঠিন কিছু নয়।
আমার মা খুব ভালো সেলাই জানতেন। কেমন করে যেন আমিও তা রপ্ত করে ফেলেছিলাম। তখন মা নেই। বাবা ঈদে আমাকে খুব সুন্দর একটি শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন। শাড়ির সাথে ম্যাচ করে ব্লাউজের কাপড়ও দিলেন। আমি একদিন স্কুল থেকে ফিরে ব্লাউজটা কেটে রেখেছি। কয়েক দিন পর তা সেলাই করতে বসে মহাবিপদে পড়লাম। কারণ ব্লাউজের একটি হাতা কোথায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত পাওয়াও যায়নি, তাই আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। আমার অবস্থা দেখে বাবা বললেন, একটা হাতা পাওয়া যাচ্ছে না তো কী হয়েছে! তুমি বরং এক হাতাওয়ালা ব্লাউজই বানাও। আর এটা হচ্ছে ফ্যাশন। ঠিক তাই। আজ থেকে ৩৫-৪০ বছর আগে বাবা যা বলেছিলেন এখন তা ফ্যাশন। এই তো সেদিন ইন্ডিয়ান এক প্রোগ্রামে দেখলাম খুবই নাম করা একজন শিল্পী এক হাতাওয়ালা ব্লাউজ পরেছেন। এটা দেখে মনে হয়েছে বাবা আমার কত দূরদর্শী ছিলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। স্কুলের বড় আপুরা আন্দোলন করবেন বলে রেডি হচ্ছেন আর আমিও তাদের সাথে মিছিলে চিৎকার করে বলেছিলাম- ‘আইব মোনায়েম দুই ভাই এক দড়িতে ফাঁসি চাই’। এভাবে সারা খুলনার শহর টহল দিলাম। এই স্লোগানের অর্থ কি সেটা বোঝার ক্ষমতা কিন্তু আমার তখন ছিল না। পরদিন নিউজ পেপারের প্রথম পাতায় স্লোগান দেয়ার একটি ছবি ছাপা হলো। বাবা-মা তো রেগে অস্থির। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বলে দিই- বড় আপুরা বলেছিলেন তাই আমিও তাদের সাথে আন্দোলন করি। মা সেদিন আমাকে বুঝিয়ে বলেছিলেন- মিছিলের প্রথম সারিতে ছোট্ট শিশুদের রাখার অর্থই হচ্ছে- বিপক্ষ দলের লোকেরা গুলি চালাবে না। আবার গুলি চালাতেও পারত। এই যে সেদিন ভয় পেয়েছিলাম আর কোনো দিন মিছিলে যাইনি। আমার দাদা বাড়ী বরিশাল জেলার ঝালকাঠি এলাকার লাটিম সাড়ে। বাবার চাকরির সুবাদে আমার যে কত স্কুল পাল্টাতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। শহর বন্দরে বাস করা সত্ত্বেও বছরে একবার আমরা গ্রামে বেড়াতে যেতাম।
বড় দুলাভাই হামিদুর রহমানের (অ্যামেচার আর্টিস্ট) উৎসাহে আমি চিত্রকলার প্রতি আগ্রহী হয়ে পরে চিত্রশিল্পী হই। পরবর্তী সময়ে চারুকলায় আমি পেইন্টিং-এ মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হই। অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করি। কর্মজীবনের শুরুতে আমি সালেহ কার্পেটের ডিজাইনার হিসেবে কাজ শুরু করলেও সেখানে দেড় বছর, বাটা মাল্টিনেশন কোম্পানিতে সাড়ে ছয় বছর এবং বহুদিন বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে কাজ করি। বর্তমানে লোকজ শিল্প সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার কাজে নিয়োজিত। একটি বেসরকারি কোম্পানিতে। আমার স্বামী আফজালুর রহিম ও ছেলে আকিফ আফজালকে নিয়ে আমার সংসার। এখনো প্রতি বছর ঈদ হয়। স্বামী-সন্তানের জন্য ঈদে পোলাও-সেমাই জর্দাসহ নানা খাবারে টেবিল ভরে দেই। অথচ দুঃখ একটাই, বাবাকে আমি কোনো দিন কিছু রান্না করে খাওয়াতে পারিনি। কারণ তখন আমি রান্না করতে জানতামই না। এ ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহও ছিল না। খুব খারাপ লাগে যখন বাবার কথা মনে হয়। আহারে কত কষ্টই না বাবাকে আমি দিয়েছি। ১৩-১৪ বছরের এত্ত বড় মেয়ে হয়েও আমার আচরণ ছিল ছোট্ট শিশুর মতো, যা বাবা সব সহ্য করতেন। শুধু আমার যেন কষ্ট না হয়, তাই বাবা দ্বিতীয় বিয়ে পর্যন্ত করেননি। কী অসীম ধৈর্য নিয়ে বাবা আমাকে লালনপালন করেছেন। এখন বুঝি বাবারা বুঝি এমনই হর। সন্তানের জন্য নিজের সব সাধ-আহলাদ জলাঞ্জলি দিতে কুণ্ঠা বোধ করেন না। বাবার কথা মনে হলেই খুব কষ্ট হয় আমার। ভীষণ কান্না পায়, ইচ্ছে করে আবার সেই শৈশবে ফিরে যাই। বাবার গলাজড়িয়ে বলি, ‘বাবা আমি আর দুষ্টমি করব না।’
সামিনা নাফিজ : শিল্পী ও গবেষক লোক শিল্পকলা
অনুলিখন : রুমা ইসলাম

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫