বাবাই আমার আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি

ফারজানা রহমান

আমি জীবনে অনেক অনেকবার আহ্লাদী করে মাকে বলেছি “মা, তোমাকে অনেক ভালবাসি”, কিন্তু এমন একটি দিনও মনে পড়ে না যখন আমি বাবাকে বলতে পেরেছি “বাপি, তোমাকে আমি অনেক ভালবাসি”, বলতে পারিনি তার সুদৃঢ় ব্যক্তিত্বের কারণে। আমার পৃথিবীতে আমার বাবা এমন একজন মানুষ, যাকে আমি অনুভব করি আমার ভিতর থেকে, যিনি মিশে আছেন আমার অস্তিত্বে।
আমার বাবার নাম বজলুর রহমান, তিনি পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। মা সাহিনা রহমান ছিলেন খুলনা বেতারের একজন নিয়মিত সংগীত শিল্পী, ১৯৮৫ সালের দিকে তার তিনটি ছানার জন্য সব ছেড়ে দিয়ে হয়ে যান পুরোদস্তর গৃহিণী। আমরা দুই বোন ও এক ভাই। বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান হওয়ার কারণে পরিবরের আশা-আকাংখা, স্নেহ-মমতা যেন আমাকেই ঘিরে ছিল। মার কাছে শুনেছি, আমার ছোট্টবেলায় বাবা আর সন্তান নিতে চাননি পাছে আমার প্রতি স্নেহ-মমতার অভাব হয়ে যায়।
আমার বাবা একজন দূরদর্শী, অভিজ্ঞ, জ্ঞানী, বুদ্ধিমান এবং অত্যন্ত বাস্তববাদী একজন মানুষ। ছোটবেলা থেকেই আমি দেখে এসেছি ছেলে বা মেয়ে আলাদা কোনো অস্তিত্ব হিসেবে বিশ্বাস করতেন না, তিনি মনে করতেন মানুষ হিসেবে আমরা সবাই সমান তাই আমাদের বাসায় আমি আর আমার ভাই একই রকম খেলনা দিয়ে খেলতাম। যেমন সাইকেল, গাড়ি, ট্রেন, পুতুল (ছেলে-মেয়ে দুধরনের পুতুলই ছিল), আমার মনে পড়ে না......আমি উপহার হিসাবে কোনদিন খেলনা হাড়িপাতিল পেতেছি। বাবা ছোট্ট বেলায়ই আমাদেরকে একটা নীল রঙের বাইসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। আমি দিব্বি ছেলেদের সাথে সাইকেল চালিয়েছি এবং খেলাধুলাও করেছি। একটু বড় হওয়ার পর বাবা আমাকে কখনো রান্নাঘরে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো রকম উৎসাহ দেননি। তিনি বলতেন রান্নাঘরে সময় নষ্ট না করে বরং পড়াশুনায় মন দেয়া জরুরি। আমার বিয়ের পর আমার স্বামী আকতার মাহমুদও এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ কখনো দেখাননি। তাই এখনো আমাকে কোনোরকম রান্না করতে হয় না আর এই কাজটা আমি ভাল পারিও না। আর তাই সারা জীবনই আমার কন্সেন্ট্রেশনটা একদম রয়ে গেছে পড়াশুনা, এক্সটা কারিকুলার এক্টিভিটিজ খেলাধুলা এই সব কিছুতেই। ছোট্টবেলায় ইন্টার স্কুল বেডমিন্টন টুর্নামেন্ট, অন্যরা পারমিশন পেত না অথচ মা-বাবা কিন্তু আমাকে পারমিশন দিয়ে দিয়েছেন। গান-বাজনা আবৃত্তি, নাটক করা সব কিছুতেই আমার কোনো বাধা ছিল না। আমি গল্পের বই পড়তে ভালবাসি, গল্পের বই আর বছরের শুরুতে একটা ডায়রী ছিল তার কাছ থেকে পাওয়া আমার প্রিয় উপহার।
আমার জন্ম খুলনায়। আমার পড়াশুনার হাতেখড়ি আমার মায়ের কাছে হলেও, আমার বাবার কাছে শিখেছি পড়ার বই এর বাইরে অনেক কিছু, কি করে ওয়ার্ল্ড ম্যাপ দেখতে হয়, বিভিন্ন দেশের রাজধানী-মুদ্রার নাম, ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাবলী, বিশ্বরাজনীতির অবস্থা, কিভাবে খবরের কাগজে গুরুত্বপূর্ণ লেখা খুঁজে পেতে হয়, কিভাবে রোড সিগন্যাল বুঝতে হয়, গাড়ী চালানো, কিভাবে উচ্চাশা ম্যানেজ করে চলতে হয় (তিনি সবসময় বলতেন, অনেকের অনেক কিছু থাকতে পারে কিন্তু আমাকে খুশি থাকতে হবে আমার যা কিছু আছে সেটা নিয়েই)। আমি কখন তাকে দেখিনি অনর্থক মানুষের সমালোচনা করতে, তিনি এটা একেবারেই পছন্দ করেন না।
ছোট্ট বেলায় বাবা-মায়ের ‘বিবাহবার্ষিকী’ মানেই খুব আনন্দের দিন। বাবা আমদের সবাইকে বড় কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যেতেন আর এই দিন আমরা পরিবারিক ছবি তুলতাম। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আমাদেরকে খুলনার বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেতন, কি যে মজা হতো সেই দিন গুলাতে।
আমার বাবা খেলা পাগল মানুষ। তার সাথে সাথে আমাদের ভাইবোনদের মধ্যেও এটা আছে। আবাহনী-মোহামেডানের খেলা বাসার সবাই একসাথে দেখা, ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল, ক্রিকেট, শচীন টেন্ডুলকার আর ইমরান খানের খেলা গ্যালারিতে বসে দেখা, বাবার সাথে আমার স্মরণীয় কিছু স্মৃতি। এখানে বলে রাখা ভালো, আমাদের দুজনেরই প্রিয় দল মোহামেডান আর আর্জেন্টিনা।
আমি যখন ফাইভ সিক্সে পড়ি তখন থেকেই বাবা ঘরে না থাকলে বাবার ব্যবসায়িক যত ফোন কল আসত আমি কল রিসিভ করতাম। ব্যবসায়িক হিসাব-কিতাবের তিনি এর সব কিছুরই আমাকে লিখে রাখতে বলতেন। কত টাকা পেয়েছেন কে কত পাবে? কত পেইন্ডিং ইত্যাদি এ থেকে আমার সংসার জীবনে চাকরি-বাকরি করেও বাসার হিসাব-কিতাব রাখা এগুলো করে নেয়া আমার জন্য খুব সহজ হয়ে গিয়েছে। কারণ এগুলো বাবা আমাকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছেন। সব কিছু মিলিয়ে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে একটা মেয়ে সন্তান যখন বড় হচ্ছে ছোট্টবেলা থেকে তার জীবন-বোধ সম্পর্কে ধারণা যদি একটু একটু করে ভেতরে চলে আসে তাহলে পরবর্তী জীবনে তার ভেতরে দায়িত্ববোধের বিষয়টা নতুন করে বোঝাতে হয় না। আর নিজের অধিকার ও সচেতনা সম্পর্কে ‘মতামত’ দেয়ার সাহসও একটি মেয়ের ভেতরে চলে আসে। কি সংসার জীবনে কি কর্ম জীবনে। যে সাহস আমার ভেতরে বাবা তৈরি করে দিয়েছেন সেই ছোট্ট বেলায়ই। আমার জীবনের বিভিন্ন সময়ে সঠিক মতামত দিতে আমি পিছপা হইনি।
এব্যাপরে একটি ঘটনা মনে পড়ছে, ২০১০ সালে আমি দ্বিতীয়বার প্রেগনেন্ট হলে আমার অফিসকে একটা নারী মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যাপারে পশ্চিমা দেশগুলোর উদাহরণ টেনে কতগুলো যুক্তি দাঁড় করিয়ে বোঝাতে চাই যে আমরা বাঙালি নারীরাও সেই সুযোগটা গ্রহণ করতে পারি। আমার যুক্তি পরামর্শ, সব বিচার বিশ্লেষণ করে কর্তৃপক্ষ ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি ঘোষণা করে। তারপর বাংলাদেশের সংসদে ব্যাপারটা নিয়ে প্রস্তাব উত্থাপন হলে মাতৃত্বকালীন সরকারি ছুটি হিসেবে ছয় মাস কার্যকরী করা হয়। যেটা বর্তমানে চাকরিজীবী নারীরা পাচ্ছে।
আর একটি ঘটনা আজ মনে পড়ছে, তখন আমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী, নগর ও গ্রামীন পরিকল্পনা বিভাগের। সেই সময় আমার জুনিয়র ছাত্রীর সাথে চরম অন্যায়ের ঘটনা ঘটে। বিষয়টা নিয়ে আমি ও আমার বন্ধু-বান্ধবীরা ন্যায্য ভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। আমরা বলেছিলাম এর বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্লাসে ফিরব না। আমরা ক্লাস বর্জন করলাম। বিষয়টা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হলে তারা আমাকে ডেকে আপস মীমাংসা করতে বলে। আমি আমার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ছিলাম অনড়। বাবা-মা কেউই আমাকে এ ব্যাপারে নিরুৎসাহী করেনি। কিন্তু এই প্রতিবাদের ফলাফল আমার জন্য ভাল হল না। বাবার ভীষণ ইচ্ছা ছিল আমি যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হই কিন্তু সেই ঘটনার কারনে আমার নাম ব্ল্যাক লিস্টে উঠে গেল আর একারনে আমার জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে ফার্স্ট ক্লাস থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার আর হয়ে ওঠা হয়নি। যতবারই আমি নগর পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক হবার জন্য ইনটারভিউ এর ডাক পেয়েছি, ভাইবা বোর্ডে আমাকে শুনতে হয়েছে, "তুমি সেই ১৩ জন ব্ল্যাক লিস্টেডের মধ্যে ছিলে না?" অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমাকে ফিরে আসতে হয়েছে, আমি শেষের দিকে অনেকটা হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম, নিজের থেকেও আমার বেশি কষ্ট ছিল আমার বাবার জন্য। এক পর্যায়ে আমার মা আমাকে বলেছিল, "বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরী ছাড়াও পৃথিবীতে আরো অনেক চাকরী আছে, তোমার আর ইন্টারভিউ দেবার দরকার নেই"। আজ এতবছর পর এসে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরী আমার হয়ত হয়নি, কিন্তু ওইসময় অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে নিজের কাছে সারাজীবন অপরাধী হয়ে থাকতাম, আর এ শক্তি আমি আমার পরিবার থেকেই পেয়েছি। আমার স্বামী আকতার মাহমুদ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, একজন সৎ এবং নীতিবান মানুষ। আমি সৌভাগ্যবান যে বাবা-মা এর পর যাকে আমি পাশে পেয়েছি সে আমার মতই একজন স্পষ্টবাদী, আর একারনে আমাদের বোঝাপড়াটা খুব সুন্দর। আমাদের সংসার জীবনের সকল চাওয়াপাওয়া মিলেমিশে হয়।
গত সপ্তাহে, খুলনা ঘুরে আসলাম, এর মধ্যে একটা দিন আমরা বাবা মেয়ে ঘুরে বেড়ালাম। সে তার কাজ করে, বন্ধুদের সাথে দেখা করে, আর আমি তার সাথে সাথে ঘুরে বেড়াই ছোটবেলার মত। সে সবার সাথে আমাকে নিয়ে গল্প করে, আকতারকে নিয়ে গল্প করে, আমার চাকরী নিয়ে গল্প করে, আর আমি আত্মতৃপ্তির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকি, আমাকে নিয়ে তার যে সন্তুষ্টি, এটাই আমার জীবনের পরম পাওয়া।
অনুলিখন : আনজুমান আরা
* হেড অব রিটেইল গভর্নেন্স অ্যান্ড অপারেশন, গ্রামীণফোন

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.