ঈদুল ফিতর : দ্বিতীয় মাত্রা

ড. মীজানূর রহমান শেলী 

ঈদুল ফিতর বিশ্বের মুসলমানদের জন্য আনে সবচেয়ে বড় উৎসবের শুভ সওগাত। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ইসলাম ধর্মের অনুসারী। সেদিক থেকে একে বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় উৎসব বললে অত্যুক্তি হবে না। পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত দেশের মতোই বাংলাদেশেও বহু শতাব্দী ধরেই এই খুশির উৎসব পালিত হয়ে আসছে। বিজ্ঞ ও ন্যায়পর নৃপতির আমলে যেমন, তেমনি স্বৈরাচারী শাসকের নির্যাতন ও শোষণের কালেও মুসলমানেরা শ্রেণী নির্বিশেষে যার যার সাধ্যমতো এই উৎসব পালন করে এসেছে। আজো তারা বিভিন্ন দেশে-অঞ্চলে নানা প্রতিকূলতা, অভাব অনটনের মধ্যেও বছরের এই দিনটিকে আনন্দে পরিপূর্ণ করার চেষ্টায় ব্রতী হয়।জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই লিখে গেছেন : ‘শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো,কত বালুচরে কত আঁখি-ধারা ঝরায়ে গো,বরষের পরে আসিলে ঈদ!ভুখারীর দ্বারে সওগাত্ ব’য়ে রিজ্ওয়ানের,কণ্টক-বনে আশ্বাস এনে গুল্-বাগের,সাকীরে “জা’মের” দিলে তাগিদ।’তিনি আরো লেখেন, “আজি ইস্লামী ডঙ্কা গরজে ভরি’ জাহান,নাই বড় ছোট-সকল মানুষ এক সমান, রাজা প্রজা নয় কারো কেহ।কে আমীর তুমি নওয়াব বাদ্শা বালাখানায়?সকল কালের কলঙ্ক তুমি; জাগালে হায়  ইসলামে তুমি সন্দেহ ॥ইসলাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,সুখ-দুখ সম-ভাগ করে নেব সকলে ভাই, নাই অধিকার সঞ্চয়ের!কারো আঁখি-জলে কারো ঝাড়ে কি জ্বলিবে দীপ?দু’-জনার হবে বুলন্দ্-নসীব, লাখে লাখে হবে বদ্-নসীব? এ নহে বিধান ইস্লামের ॥’বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের চিরন্তন শিক্ষার মাঝে খুঁজে পেয়েছেন সাম্যের সর্বজয়ী বাণী। সে জন্যই বারবার তার রচিত পঙ্ক্তিমালায় ফুটে উঠেছে সীমাহীন পুঁজিবাদ ও মুনাফালোভী সমাজের বিরুদ্ধে ইসলামের জ্বলন্ত দ্রোহ।ইতিহাসের বেশির ভাগ যুগেই আসলে হতভাগ্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বর্ণযুগ ছিল না। গোলাভরা ধান আর গোয়ালভরা দুধেল গরুর স্বপ্ন সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরেই রয়ে গেছে। তাদের সন্তান কোনো দিনই থাকতে পারেনি ‘দুধে-ভাতে’। এদের জীবনে তেমনভাবে ঈদ আসেনি, আসেনি অকৃত্রিম আনন্দের উৎসব।বর্তমান পুঁজিবাদ প্রধান, দারুণভাবে ভোগবাদী বিশ্বে বৈষম্য হয়ে উঠেছে আরো প্রকট। ধনী হয়েছে আরো ধনী। গরিব হয়েছে আরো গরিব। হতদরিদ্র এবং নিঃস্ব। অন্ধ কায়েমী স্বার্থের কঠোর নিয়ন্ত্রণে বলগাহীন ধনতন্ত্র বারবারই প্রমাণ করেছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মর্মস্পর্শী পঙ্ক্তিমালার সত্যতা।‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরিভূরি,রাজার হস্ত করে সমস্তকাঙ্গালের ধন চুরি।’সে জন্যই বুঝি অতি সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা যায় যে, মহাসমৃদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দুঃসহ বৈষম্য মহা আনন্দে সম্প্রসারণবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সেখানে সবচেয়ে ধনী এক শতাংশের ১০ ভাগের এক ভাগের কাছে সে সম্পদ রয়েছে তা ৯০ ভাগ মার্কিন নাগরিকের মোট সম্পদের সমান। আবার ঐ সবচেয়ে ধনী এক শতাংশ নাগরিকের হাতে যে অর্থবিত্ত রয়েছে তা বাকি ৯৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের মোট সম্পদের সমান। আজকের দুনিয়ায় সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের অবস্থান প্রায় বিলুপ্ত বললেই চলে। অসাম্য ও বৈষম্য সাম্প্রতিক পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেরই বিধিলিপি, তা তারা উন্নত হোক বা উন্নয়নশীল, স্বল্পন্নত বা অনুন্নত। বেশির ভাগ সমাজ আজ এমন এক স্বয়ংক্রিয় বিষচক্রের শিকার যা ধনীকে করে আরো ধনী, গরিবকে করে আরো গরিব ও সর্বহারা। ঐশ্বর্যশালীরা ক্রমেই হয়ে ওঠে ক্ষমতাবান ও পরাক্রমশালী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়। পোহালে শর্ব্বরী / বণিকের মান দণ্ড /দেখা দিল / রাজ দণ্ড রূপে।অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে যেমন করে একটি বিদেশী বাণিজ্যিক সংস্থা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্য করতে এসে ছিনিয়ে নেয় রাজ্য শাসনের ক্ষমতা। তেমনি করে আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখি শত শত কোটি ডলারের অধিকারী রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে তারই মহাধনী শ্রেণীর শত, হাজার কোটির মালিকেরা বনে গেছেন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক শাসক। অন্যান্য দেশও তা উন্নত হোক বা উন্নয়নশীল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বা অমুসলিম তাদের ক্ষেত্রেও এ ধারার ব্যতিক্রম দেখা যায় না। রাজা, আমীর, ওমরা শাসিত তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যায় প্রাচুর্যের মধ্যেও রয়েছে দারুণ দারিদ্র্য, রাজা রাজেই রয়েছেন, হয়েছেন আরো সম্পদশালী এবং হতোভাগ্য প্রজা রয়ে গেছেন দরিদ্র প্রজাই।যেসব মুসলিমপ্রধান দেশে রাজতন্ত্র নেই সেখানেও দেখি আজ যারা শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তারা এবং তাদের আশীর্বাদ আনুকূল্যপুষ্ট যারা, তারা সবাই দ্রুতগতিতে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক শ’, কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ পরিবার ছলে বলে কৌশলে করায়ত্ত করে সমাজের বেশির ভাগ ধন দৌলত।এই বৈষম্যলাঞ্ছিত সমাজে তাই এক দিকে যেমন ভোগ-বিলাশের অন্ত থাকে না, অন্য দিকে, তেমনি খুৎপীড়িত থাকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষ। ধনীর দুলাল দুলালিরা এক দিকে যখন লাখ লাখ টাকার লেহেঙ্গা, শাড়ি ও গহনা ও কয়েক হাজার টাকার পাঞ্জাবিতে সুসজ্জিত হয়ে হতোভাগ্য মানুষের চোখ ঝলসে দেয়, তখন গরিবেরা নগণ্য মূল্যে শাড়ি, পাঞ্জাবি, জামা, জুতা কেনার সাধ্যও রাখে না। মূল্যস্ফীতি এবং পরোক্ষ কর ও শুল্কের চাপে নিষ্পেষিত হয়ে তারা হন জীবনমৃত। এরকম দৃশ্য দেখেই বুঝি কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেন তার দুঃখ জাগানিয়া কবিতা :‘বেলাল, বেলাল / হেলাল উঠেছে / পশ্চিম আসমানে /লুকাইয়া আছো / লজ্জায় কোন / মরুর গোরস্থানে।’ঈদের দিনের কথা, নামাজে আগত দুই মাত্রার মানুষের কথা লেখেন নজরুল। জরির পোশাকে শরীর ঢাকিয়া ধনীরা এসেছে আজ।অন্য দিকে কিছু দিন আগেই দারিদ্র্যের কশাঘাতে যার শিশুপুত্রের অকাল মৃত্যু ঘটে এবং ‘সেই শিশু পাজরের হাড়’ যেন শাওয়ালের চাঁদ হয়ে আকাশে ফোটে, সেই কৃষক যখন ঈদগাহে যায় তখন সমানুভূতির কবি নজরুল লেখেন :‘হের ঈদগাহে / চলিছে কৃষক / যেন গো মৃতের প্রায় /বেলাল তোমার কণ্ঠে বুঝিবা / আযান থামিয়া যায়।’রুদ্ধবাক হজরত বেলালের মতো কোটি কোটি হতদরিদ্র মুসলমানের কাছে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পরে ঈদ আসে সেই একই প্রাচীন প্রশ্ন নিয়ে :জীবনে যাদের/ হর রোজ রোজা / খুধায় আসে না নিদ /আধমরা সেই কৃষকের ঘরে / এসেছে কী আজ ঈদ?’  

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.