ঢাকা, রবিবার,৩১ মে ২০২০

নারী

১০ হাজার মাইল হাঁটা নারী সারাহ মারকুইস

মো: আবদুস সালিম

০২ জুলাই ২০১৭,রবিবার, ১৮:২৭


প্রিন্ট

তাঁবুর চার পাশ ঘিরে রেখেছে চার-পাঁচটা নেকড়ে। তাও আবার ভোরের অন্ধকারে। এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে পড়লে কি কেউ ঠিক বা স্বাভাবিক থাকতে পারে? তার পরও স্বাভাবিক থাকতে হয়েছে সারাহ মারকুইসকে। কারণ তিনি একজন নামকরা দিগ্বিজয়ী নারী। তার মানে অনেক সাহস আর দৃঢ় মানসিকতা রয়েছে তার। মাঝে মধ্যে তাকে থাকতে হয়েছে পুরুষের ছদ্মবেশে। এমন সব পরিস্থিতির মধ্যে তাকে পড়তে হয়েছে দিগ্বিজয়ের পেশাগত কাজে।
বিশ্বের সবাই সারাহ মারকুইসকে চেনেন হাজার হাজার মাইল হাঁটা কোনো নারী হিসেবে। যে দেশে নারীর অধিকার কম, সেখানেও গিয়েছেন এবং সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। কারণ তিনি জানেন, নারীর বেশে পুরুষের সাহসিকতা দেখাতে গেলে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অনেকে তার কাছে জানতে চেয়েছেন, আপনি সাধারণ দৌড়, ম্যারাথন দৌড় ইত্যাদিকে বেছে না নিয়ে হাঁটাকে বেছে নিলেন? এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি চাই বিশ্বের মানুষ আমার মাধ্যমে ব্যতিক্রম কিছু দেখুক, যা অনেক সময় পুরুষের মাধ্যমে সম্ভব নয়। মনের শক্তিই আমাকে হেঁটে দু’টি মহাদেশ অতিক্রম করার শক্তি জুগিয়েছে।’ অ্যাডভেঞ্চার, এক্সপ্লোরার হিসেবে এই হাঁটাবিদের নাম উঠেছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে। এটা মারকুইসের শুধু শখেরই নয়, পাশাপাশি এ অ্যাডভেঞ্চার তার পেশাও। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, তিনি প্রায় তিন বছর হেঁটেছেন এক যাত্রায়। তাও আবার একেবারে একা। সুদীর্ঘ এই যাত্রাপথে হাঁটতে গিয়ে নষ্ট করেছেন সাত-আট জোড়া জুতা। মাঝে মধ্যে যাত্রাবিরতিতে পান করেছেন চা। তাতেই তিনি ফের হাঁটার শক্তি ফিরে পান। বলা যেতে পারে তার শৈশবের এমনি একটি স্বপ্ন ছিল, যা বাস্তবে রূপ নিলো।
মারকুইস জন্মগ্রহণ করেন সুইজারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের যুরা পর্বতমালার ছোট্ট এক গ্রামে। যে কারণে ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে উঠেছেন। তিনি সব সময় থকাতেন পাখির, গাছপালা, পল্লী এলাকার প্রকৃতি ইত্যাদি নিয়ে। যখন মনে হতো তখনই ছোটাছুটি করতেন এদিক-সেদিক। অর্থাৎ ছিলেন দুরন্তপনার। দূর-দূরান্তে চষে বেড়িয়েছেন। নিউজিল্যান্ড ঘুরে যুক্তরাষ্ট্র অতিক্রম করেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতে পেঁৗঁছেছেন অস্ট্রেলিয়া থেকে। এর দূরত্ব প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার। এর বেশির ভাগ পথই ছিল জনমানবহীন। এ ভ্রমণ ছিল তিন বছরের, যা সাইবেরিয়া থেকে শুরু করেছিলেন সারাহ মারকুইস। সেখান থেকে চীন, লাওস ও থাইল্যান্ডে পৌঁছেছেন গোরি মরুভূমি পার হয়ে। থাইল্যান্ড থেকে চড়েন একটি মালবাহী নৌযানে, যা অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনগামী একটি যান। পরে ব্রিসবেন থেকে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ পাড়ি দেন। মরুভূমির একটি বৃক্ষতলায় তার ভ্রমণ শেষ হয়। অবশ্য এটি তার বেশ পরিচিত জায়গা। প্রায় এক যুগ আগে মারকুইস প্রথম খুঁজে পান এই জায়গা। মারকুইস একজন দক্ষ শিকারিও। তিনি এতে পারদর্শী হন তার ১০ বছর বয়স থেকে। অর্থাৎ তিনি কেবল হাঁটাহাঁটিই করেন না, শিকারিও। যাত্রাপথে কিছু কিছু স্থান ছিল তার জন্য খুবই কষ্টকর। তাই ভেবেছিলেন, হয়তো পশু শিকার করে খেয়ে জীবন বাঁচাতে হবে। আর এটিই তার জন্য একটি বড় অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ। তবে এমন সময়ে তিনি মনের দিক থেকে ফিরে যান হাজার হাজার বছর আগের ইতিহাসে। ওই সময়ের অধিবাসীদের বাঁচাতে হতো পশু বধ করে আগুনে পুড়িয়ে খেয়ে। তার পরও খাবার কি আর সহজে পাওয়া যায়? তিনি বলেন, এতে বোঝা যায় হাজার হাজার বছর আগে মানুষ বাঁচার জন্য মানুষ কত কঠিন সংগ্রাম করেছে। ধীরে ধীরে তারা ঠিকই সভ্যতায় ফিরে এসেছে। মারকুইস বলেন, ‘যাত্রাপথে আমার কত ধরনের সমস্যা যে হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। মন ও শরীর কী করে ঠিক রাখা যায় তা-ই ভাবতাম এবং সে অনুযায়ী কাজ করেছি। এত কিছুর পরও আমার লক্ষ্য ছিল চূড়ান্ত। চলার গোটা বিষয় ভাগ ভাগ করেছি। তারপর এগিয়েছি ধাপে ধাপে। চোখে ঘুম একবারেই ছিল না বলা যায়। গোসল, বিশ্রাম ইত্যাদির কষ্টও মেনে নিতে হয়েছে। ক্যাম্প করে থাকতে হয়েছে গোবি মরুভূমিতে। সব জায়গাতেই সইতে হয়েছে শারীরিক ধকল।’ একবার মারকুইস সশস্ত্র মাদক ব্যবসায়ীদের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন লাওস জঙ্গলে। বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি তা থেকে মুক্ত হন। তিনি আরো বলেন, ‘পুরুষের মতো আমাদের পেশিশক্তি না থাকলে কী হবে, মনের সাহস তো আছে।’ সফলতার পেছনে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। যদিও বিশ্বের অনেক স্থানে নারীদের অধিকার ছোট করে দেখা হয়, যা একেবারেই অনুচিত। তিন বছরের যাত্রা শেষে একটি আত্মজীবনীমূলক বইও প্রকাশ করেন সারা মারকুইস। সেখানে তিনি ভ্রমণের নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, ভ্রমণের ইচ্ছা বা নেশা থাকে প্রায় সব মানুষের মনে। তা থাকে সুপ্ত বা লুকানো অবস্থায়। মানুষ যখন প্রকৃতি যেমন- নদী, সাগর, পাহাড়, বন প্রভৃতি মনোরম স্থানে যান তখন তিনি ঠিকই খুশি ও আবেগে আত্মহারা হয়ে ওঠেন। অনেকে রীতিমতো উদাসীন হয়ে যান। দিগ্বিজয়ী এই নারীর জন্ম ২০ জুন ১৯৭২ সালে। সেই হিসাবে তার বয়স এখন ৪৫ বছর। এখনো তিনি বিভিন্ন স্থান চষে বেড়ানোর প্রবল মানসিকতা রাখেন, যা সত্যিই বিরল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫