ঢাকা, শুক্রবার,২৯ মে ২০২০

আলোচনা

কাবিনটি সোনার নয় সোনালি

ড. ফজলুল হক সৈকত

০৬ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:১২


প্রিন্ট

এই বস্তুবিশ্বে সৃষ্টিশীল কবির রচনাশিল্পে কোনো কিছুই স্বতঃস্ফূর্ত বা প্রাকৃতিক নয়। কবির আবেগের সঙ্গে সংহত হয়ে তাকে তার অভিজ্ঞতার জগৎ আর কল্পনা ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞানের রূপ রচিত হয়ে ওঠে কবির সৃষ্টিরাজিতে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ (জন্ম : ১১ জুলাই ১৯৩৬) কাব্যরচনায় কল্পনা আর বাস্তবজীবনকে বিবেচনায় রেখেছেন সচেতনভাবে। কবিতাচর্চায় তার পরিণতি অর্জনও বেশ দ্রুত। তার সোনালি কাবিন বহুল পঠিত ও প্রশংসিত কবিতাগ্রন্থ। ওই গ্রন্থের নাম কবিতা ‘সোনালি কাবিন’ কবিতাটি শিল্পশ্রী ও জীবনের অন্তরঙ্গ অন্বয়ে মিলেমিশে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। বাস্তব জীবনের সঙ্গে কাব্যের গভীরতর যোগ এবং জীবনের অন্তর্গূঢ় অনুভবকে শব্দে সমর্পিত করার প্রগাঢ় চেষ্টার সাফল্য এখানে লক্ষ্য করা যায়। আল মাহমুদ তার সমূহ কথামালা প্রগাঢ় অনুভূতির শব্দে গ্রথিত করেছেন।
কবিতা-শিল্পে মৌলিকতার প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, অগণন কবির ভিড়ে প্রকৃত কবি খুঁজতে গিয়ে আমরা প্রভাব ও স্বকীয়তার দিকে নজর দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। কবি হয়ে কেউ জন্ম নেয় না; কবিকে হয়ে উঠতে হয়। আপন ভঙ্গিতে কবি সাজাতে থাকেন তার চেতন-বিলোড়ন। কেউ কেউ যে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হন না সে কথা বলছি না। কিন্তু ‘কবি’কে প্রভাবিত হলে চলে না। এতে কবিতারই অবমাননা হয় আর কবির তো জন্ম হওয়ার আগেই মৃত্যু ঘটে। একজন কবি তার মননে এবং প্রকাশের স্বতন্ত্র এটাই স্বাভাবিক ও সত্য। তবে তার ভাষাকে, বক্তব্যকে পাঠকের চিনে নিতে কখনো কখনো কিছুটা সময় লেগে যায়। আবার এ কথাকে সরলীকরণ করাও বোকামি হবে। প্রায় শুরু থেকেই কোনো কোনো কবি নিজস্বর উপস্থাপন করতে পারেন অবচেতনে কিংবা সতর্কতায়। বাংলা কবিতায়, খুব অল্প সময়ের মধ্যে, পাঠকের কাছে যারা নিজের ভাষাভঙ্গিকে পরিচিত করতে পেরেছেন তাদের সারিতে আল মাহমুদ একটি আলোচিত নাম।
কবিতার পাঠক কম এ কথা শুনতে পাওয়া যায়। আবার অনেকে কবিতা পড়তে গিয়ে বুঝে উঠতে পারেন না। যেহেতু এখানে জ্ঞানের চেয়ে ভাবের ভার বেশি, আর ভাবের প্রকাশ এবং পাঠোদ্ধারের নির্দিষ্ট কোনো ছক নেই, তাই পাঠকের কাছে তা সব সময়ই রহস্যময়তা নিয়ে উপস্থিত হয়। ‘মানুষের বুদ্ধি সাধনার ভাষা আপন পূর্ণতা দেখিয়েছে দর্শনে, বিজ্ঞানে। হৃদয়বৃত্তির চূড়ান্ত প্রকাশ কাব্যে। দুইয়ের ভাষায় অনেক তফাৎ। জ্ঞানের ভাষা যতদূর সম্ভব পরিষ্কার হওয়া চাই; তাতে ঠিক কথাটার ঠিক মানে দরকার, সাজসজ্জার বাহুল্যে সে যেন আচ্ছন্ন না হয়। কিন্তু ভাবের ভাষা কিছু যদি অস্পষ্ট তাকে, যদি সোজা করে না বলা হয়, যদি তাতে অলঙ্কার থাকে উপযুক্ত মত, তাতেই কাজ দেয় বেশি। জ্ঞানের ভাষায় চাই স্পষ্ট অর্থ; বাবের ভাষায় চাই ইশারা, হয়তো অর্থ বাঁকা করে দিয়ে।’ বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের কবিতায়ও ইঙ্গিতময়তা বিশেষভাবে প্রযুক্ত। তার কবিতা পাঠে আনন্দ, রহস্য ও বিস্ময় জাগ্রত হয় সহজ সমীকরণে। ‘বাংলা কবিতায় তিনি নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছেন।...আঞ্চলিক ভাষা, অভিজ্ঞতা, রূপাবলীকে তিনি নাগরিক চেতনায় সন্নিবিষ্ট করে প্রাকৃত অথচ ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ এক কাব্যজগৎ গড়ে তুলেছেন। জসীমউদ্দীন এবং জীবনানন্দ উভয়ের থেকেই তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির কবি। কারো প্রতিধ্বনি নয়, নির্মীয়মাণ স্বকীয়তাই তাকে আধুনিক জগতে বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী করেছে।’ আল মাহমুদের বড়ত্ব-বিশেষত্ব আপন কথারীতি প্রবর্তনে এবং অদ্ভুত, সুন্দর ও বিচিত্র চিত্রকল্প বিনির্মাণে।
গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে (তার ছাত্রাবস্থায় কলকাতার ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায় ‘বেপরোয়া’ নামক গল্প প্রকাশিত হয়) এবং বর্তমানে গল্প-ভুবনে শব্দচয়ন অব্যাহত রেখেও আল মাহমুদ মূলত কবিখ্যাতিই অর্জন করেছেন। তার কবিতায় পাণ্ডিত্যের প্রগলভতা নেই, আছে দেশীয় লোকজ উপাদান-ঐতিহ্য, গ্রামবাংলার পরিচিত বিষয়, প্রযুক্তির প্রয়োগ-চাতুর্য এবং সহজবোধ্যতা। তিনি সবুজ-নিটোল অরণ্যে কবিতাকে খোঁজেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থেই (লোক লোকান্তর : ১৯৬৪) তার এ বোধ প্রকাশিত-
আমার চেতনা যেন শাদা এক সত্যিকার পাখি
বসে আছে সবুজ অরণ্যে এক চন্দনের ডালে;
মাথার ওপরে নিচে বনচারী বাতাসের তালে
দোলে বন্য পানলতা, সুগন্ধি পরাগে মাখামাখি
...মনে হয় কেটে যাবে, ছিঁড়ে যাবে সমস্ত বাঁধুনি
সংসার সমাজ ধর্ম তুচ্ছ হয়ে যাবে লোকালয়।
লোক থেকে লোকান্তরে আমি স্তব্ধ হয়ে শুনি
আহত কবির গান। কবিতার আসন্ন বিজয়। (‘লোক লোকান্তর’ : লোক লোকান্তর)
অবশ্য প্রচলিত হয়ে গেছে পল্লী বাংলার কবি জসীমউদ্দীন। কিন্তু আল মাহমুদের কবিতায় পল্লী-প্রকৃতি, লোকজ জীবন ধরা পড়ে ভিন্ন আঙ্গিকে স্বতন্ত্র তাৎপর্য নিয়ে। তিনি অবহেলিত গ্রামীণ জীবনের খুঁটিনাটি প্রসঙ্গকেও অনায়াসে উপমা-চিত্রকল্পে স্থাপিত করেন অনন্যতায়। মূলত, ‘আল মাহমুদের ভাষা একান্তভাবে তার নিজস্ব। যে মগ্নচৈতন্য থেকে ভোরের সহজ আলোর মতো তার অনুভূতি ঝরে পড়ে, তারই উপযোগী ভাষা তার আয়ত্তাধীন। আলো-আঁধারী ভাষায়, আভাসে-ইঙ্গিতে তিনি তার হৃদয়ের কথা আধখানা ব্যক্ত করেন, বাকি আধখানা পূরণ করে নিতে হয় পাঠককে। পল্লীর শব্দ ও প্রবাদ-প্রবচনকে আধুনিক কোনো কবি সম্ভবত এমন নিপুণ ও শৈল্পিক ভঙ্গিতে ব্যবহার করেননি। পল্লীর উপাদান থেকে তিনি নির্মাণ করেন তার উপমা ও চিত্রকল্প। প্রকৃতপক্ষে, তিনি কাব্যের ভাষাক্ষেত্রে এক অপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছেন। জসীমউদ্দীন যেখানে লোকসাহিত্যের উপাদানের ওপর তার কুটির তৈরি করেন, আল মাহমুদ সেখানে আধুনিক এক প্রাসাদের কারুকার্যে লৌকিক উপাদান ব্যবহার করেন। কেননা, আল মাহমুদ অত্যন্ত সংবেদনশীল, সচেতন ও বিদগ্ধ শিল্পী, তার উপলব্ধির গভীরতা জসীমউদ্দীনের তুলনায় অতলস্পর্শী।’
নারীভাবনায় আল মাহমুদ অগ্রসরচিন্তার ধারক। ফর্সা কিংবা সাদা রঙের নারীকে সুন্দরী বলার প্রতি আমাদের যে স্বাভাবিক প্রবণতা, তার অবস্থান সেখান থেকে অনেক দূরে; তিনি নারীর মর্যাদাকে চিহ্নিত করতে চান সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তিতে; তার সৌন্দর্য নির্ধারণ করতে চান মানবমনকে টানার- আকর্ষণ করার সামর্থ্যরে আলোকে; সেখানে কালো রঙের মেয়েরাও অনায়াসে হয়ে ওঠে সুন্দরী। যে নারীকে কেউ কখনো ভালোবাসার কথা বলেনি, শোনায়নি কোনো আশার বাণী, তাকেও কবি দিতে চান প্রাপ্য সম্মান আর পাওয়ার অধিকার। তার নারীরা সমাজ-পরিবারের জন্য এক একটি বিরাট প্রেরণা আর শক্তির আধার; উৎপাদনমুখী কৃষিব্যবস্থার সাথে নারীর উৎপাদন ক্ষমতাকে তুলনা করেছেন কবি আল মাহমুদ। নিরূপণ করেছেন নারীর সৌন্দর্যের প্রতিরূপ ও বাস্তবতা; সমস্ত ভালোলাগার অনুভূতির সাথে তিনি সম্পৃক্ত করতে চেয়েছেন নারীর অবস্থান আর অভিপ্রায়কে।
‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় মাহমুদ লিখছেন- ‘চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ।’ এই উপমার মধ্য দিয়ে প্রিয়তমা নারীকে বুনো হংসীর আদলে কল্পনা করেছেন কবি। পালক উদোম করে এই বুনো হাঁসের অঙ্গের আরাম কামনা করেছেন এবং উপর্যুক্ত উপমায় তিনি প্রেমিকার সঙ্গে প্রত্যাশিত মিলন কামনা করেছেন। নারী-শরীর এখানে চরের মাটির মতো নরম সোঁদা উপমান পেয়েছে। সাধারণ জীবন কথাকেই আল মাহমুদ কল্পনার জটিল বুননে অসাধারণ করে তুলেছেন।
বৈষয়িকভাবে সফল হয় না কবি-শিল্পীরা- এমন ধারণা আমাদের সামনে আছে। সত্যিকার অর্থেও যারা শিল্পপ্রবণ, তারা অন্য আর দশজন মানুষের মতো টাকা-পয়সার প্রতি মোহাবিষ্ট নয়। অবশ্য ব্যতিক্রমও রয়েছে। তবে, অনেকে মনে করেন- যারা আর্থিকভাবে সাফল্য লাভ করতে পারে না, তারা প্রকৃত অর্থে জীবনপথের যাত্রায় ব্যর্থ মানুষ। আল মাহমুদ এ ধারণাকে স্বীকার করেন না। তিনি জানাচ্ছেন: ‘পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা;/দারুণ আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা’ সব প্রতারণা আর প্রলোভনের বাইরে ভালোবাসার ভবন নির্মাণ করতে চান কবি। মনের সব কালিমা মুছে হৃদয়ের উত্তাপ আর আগ্রহ নিয়ে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কবি এক কামুক প্রেমিকের জবানিতে-
হাত বেয়ে উঠে এসো হে পানোখী, পাটিতে আমার
এবার গোটাও ফণা কালো লেখা লিখো না হৃদয়ে;
প্রবল ছোবলে তুমি যতটুকু ঢালো অন্ধকার
তারও চেয়ে নীল আমি অহরহ দংশনের ভয়ে।
সভ্যতা তো আর একদিনে তৈরি হয়নি; সংস্কৃতির আলোকও সৃষ্টি হয় না সামান্যতম সময়ে। কালচার্ড হতে গেলে মানুষকে অবশ্যই ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা, কৃষি, মানবিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহী ও মনোনিবেশ হতে হয়। আর মনে রাখতে হবে, সভ্যতার দাগ যেমন বদলায়, তেমনি সমাজের গায়ে লাগে নতুন নতুন চিহ্ন। পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরন্তন নয়; ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবীতে মানুষের অনুভূতিকে মূল্যায়নের শিক্ষা নিতে হবে। বিশাল বিস্তৃত সবুজের উদারতা আমাদেরকে সে পাঠ নিতে সহায়তাও করতে পারে। মাহমুদ বলছেন-
নিসর্গের গ্রন্থ থেকে, আশৈশব শিখেছি এ-পড়া
প্রেমকেও ভেদ করে সর্বভেদী সবুজের মূল,
চিরস্থায়ী লোকালয় কোনো যুগে হয়নি তো গড়া
পারেনি ঈজিপ্ট, গ্রিস, সেরাসিন শিল্পীর আঙুল।
বিষের আতপে নীল প্রাণাধার করে থরো থরো
আমারে উঠিয়ে নাও হে বেহুলা, শরীরে তোমার,
প্রবর বাহুতে বেঁধে এ-গতর ধরো, সতী ধরো,
তোমার ভাসানে শোবে দেবদ্রোহী ভাটির কুমার।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উৎপাদনমুখর কৃষিব্যবস্থা, পশু-পাখি-ফলফলাদি, অফুরন্ত বাতাস আর প্রেমের শপথে বলীয়ান হওয়ার উদাত্ত আহ্বান আছে আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায়। জাগতিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা কিংবা কোলাহলে মিশে না গিয়ে আত্ম অনুভবে আলোকময় হয়ে জীবনকে উপলব্ধি করতে হবে। ভোগে নয়; উপভোগের আনন্দে ভরিয়ে তুলতে হবে জীবনকে। কবির আহ্বান-
বৃষ্টির দোহাই বিবি, তিলবর্ণ ধানের দোহাই
দোহাই মাছ-মাংস দুগ্ধবতী হালাল পশুর,
লাঙল জোয়াল কাস্তে বায়ুভরা পালের দোহাই
হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর।.. .
আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। শব্দের খেয়াল প্রবহমান তার জীবন তরী। তিনি স্বপ্ন দেখেন কবিতায়, শিল্প লেখেন কবিতায়। তার গল্পও কবিতা অনেক কবিতার যোগফল যেন এক একটি গল্পের শরীর। লোকজ উপাদান, নারী, রাজনীতি-সচেতনতা, আশাবাদ, ছন্দ ও অলঙ্কার, শব্দ-বয়ন-কৌশল তার কবিতার অনন্য শক্তি-সম্পদ। তিনি কবিতায় গভীরভাবে খোঁজেন জীবনকে, মানুষকে, প্রেম আর প্রকৃতিকে।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫