ঢাকা, শুক্রবার,২৯ মে ২০২০

আলোচনা

আল মাহমুদের জন্মদিনে...

আসাদ চৌধুরী

১০ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ১৭:৫৯


প্রিন্ট

আল মাহমুদ কবি, আগাপাছতলা কবি, অন্য পরিচয় বিলক্ষণ আছে; সে পরিচয় একেবারেই মূল্যহীন এমন মনে করার কোনো কারণও নেই। তবে, সবকিছু ছাপিয়ে যে পরিচয় বাংলা বর্ণমালার সাথে টিকে থাকবে সে পরিচয় অবশ্যই তার কবিতা-অবিস্মরণীয় অজর অমর পংক্তিমালা।
আজকে তার জন্মদিনটিকে সামনে রেখে সঞ্জয় ঘোষ তার কিছু কথা, ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতেই বলা, ‘আমি কবিই হতে চেয়েছি’ শিরোনামে ছেপেছেন, সেখানে কবি আল মাহমুদ বলেছেন, আমার কাছে প্রেম কবিজীবনের এক অপরিহার্য সম্পদ। আর একটা দেশের সাথে, তার প্রকৃতির সাথে, মাটি ও নদীর সাথে একজন কবির রক্ত-মাংস জড়িত। দেশ যেমন থাকে, একজন কবিও তেমনি থাকেন। তার চোখে কোনো ভালো-মন্দ নেই। দেশবোধ তো থাকবেই। এটা আসলে মানুষের একটা আকাক্সক্ষা। এ আকাক্সক্ষা থাকেই। এ আকাক্সক্ষা কখনো কাজে লাগানো যায়, কখনো যায় না। কিন্তু সৃজনবেদনা যেটাকে বলে- তৈরি করার জন্য, সৃষ্টি করার জন্য মানুষের মনে একটা অ্যাগনি, পেইন থাকে, যাকে সৃজনের বেদনা বলি। কবির মধ্যে তা থাকবে সবচেয়ে বেশি। সেই বেদনাকে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে, এর মধ্যে কী আছে।
শুধু আমি নই, আমার মতো বাঙলা কবিতা যারা ভালোবাসেন, কবিতার মধ্যে নিজের অস্তিত্বের অদৃশ্য সঙ্কেত, ঐশ্বর্য্য ও সম্ভাবনা অন্বেষণ করেন, তাদের কাছে আল মাহমুদের কথাগুলো যে মূল্যবান বলে মনে হবে এতে সন্দেহ নেই। এমনকি তার কবিতার বিচারেও এই কথাগুলো বিবেচনার দাবি করবে।
আমার লেখালেখি শুরু হওয়ার অনেক আগ থেকেই তার কবিতার সাথে আমার পরিচয় এবং মুগ্ধতা, পরে ব্যক্তিগতভাবে পরিচয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়, তারও আগে যখন আমি ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হলে থাকতাম, কবি রফিক আজাদও সে সময় ঢাকা হলে, তিনি প্রায় সময় কাজে ও অকাজে আসতেন; আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়ে যায়। তার স্মৃতির শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, তিনি অসঙ্কোচে লুঙ্গি পরিধান করে আমার বাসায় চলে আসতেন। নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান আর আল মাহমুদ সে-কি আড্ডা। রাজনৈতিক কারণেই তার বিপর্যয় জেলে-যাওয়া আবার রাজনৈতিক কারণেই উঁচু মহলে যাতায়াত। এসব কারণে তার খ্যাতি কিছুটা ম্লান হয়েছে, সন্দেহ নেই। তবে, বলতে বাধ্য- পরচর্চায় ও নিন্দায় উৎসাহী আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতা কাব্য-বিচারকে যে বারবার প্রভাবিত করেছে সন্দেহ নেই।
একাডেমিক পড়াশোনা নিয়ে কথা বলতে চাই না। এমনিতেও তার পড়াশোনা বাঙলা বইয়ের মধ্যেই সীমিত, আর গত দুই দশক ধরে ডিকটেশন দিয়ে তাকে লিখতে হচ্ছে, এমন কি ছড়া-কবিতাও অধ্যয়ন তো দূর অস্ত। আমার একটি কবিতায় দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কথাটি ছিল; আল মাহমুদকে অভিভূত হতে দেখে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম।
বাংলার নদ-নদীকে এমনভাবে আর কোনো কবি দেখেছেন? তেরো শ’ নদীর মধ্যে কয়টি বেঁচে-মরে আছে, কী জানি! আমাদের প্রথম আধুনিক কবি আহসান হাবীবও লিখেছিলেন
দু’পাশে ধানের ক্ষেত
সরু পথ
সামনে ধূ ধূ নদীর কিনার
আমার অস্তিত্বে গাঁথা তেমনি এই উদাত্ত নদীর
মুগ্ধ এক অবোধ বালক
আর মোহাম্মদ রফিক তো ‘কীর্তিনাশা’ লিখে প্রমাণ করে দিয়েছেন, আমাদের ঠিকানাটি ঠিক কোথায়।
পঞ্চাশের কবিদেরকে শুধু তিরিশেরই নয়, চল্লিশের কবিদেরও চৌকাঠ পেরোতে হয়েছে। দ্বিজাতিতত্ত্বের পাকিস্তানেই বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ, তার পতাকা, সোনালী কাবিন তো আল মাহমুদেরই হাতে ছিল। কিন্তু এখন, উন্নয়নের এই রমরমার যুগে এবং একই সাথে মূল্যবোধের প্রবল বিপর্যয়ের যুগে সেই পতাকাটা তার হাতে নেই কেন?
না কি আছে, আমরাই শুধু দেখতে পাইনে। মানুষের সাধ্যমতো ঘরবাড়ির পরিবর্তন ঘটেছে, বৈধ-অবৈধভাবে বিত্তবৈভবের ছড়াছড়ি। শিক্ষার হার বেড়েছে, গড় আয়ু বেড়েছে; মেয়েরাও শিক্ষা, ক্রীড়া ও রাজনীতিতে অনেকটা এগিয়েছে। অগ্রজ কবিরা একে একে চলে যাচ্ছেন। আর আল মাহমুদ কানে কম শোনেন, চোখে খুবই কম দেখেন, অসুস্থতায় অমর কবি ফেরদৌসীর মতো দিন কাটাচ্ছেন।
আজ তার জন্মদিন, শুভ জন্মদিন কবি, শুভ জন্মদিন কবি আল মাহমুদ।
লেখক : কবি, উপস্থাপক ও সাহিত্য গবেষক

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫