ঢাকা, শুক্রবার,২৯ মে ২০২০

আলোচনা

কবি আবদুল হালীম খাঁ

আবদুল হাই ইদ্রিছ

২০ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৫৬


প্রিন্ট

অন্তরের আলোকে উদ্ভাসিত এক নিমগ্ন পথিক সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধক কবি আবদুল হালীম খাঁ।
আধুনিক বাংলা কাব্যে আবদুল হালীম খাঁ একটি অনন্য নাম। আমাদের কাব্য কলায় বিশ্বাসের পক্ষে, শিকড়ের সন্ধানে, ঐতিহ্যের শাশ্বত পথে যে কাব্য ধারা বিকাশমান আবদুল হালীম খাঁ কাব্যবিশারদের কবিতা তাতে নবসংযোগ। আবদুল হালীম খাঁ অনেকের ভিড়ে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। প্রতিভার বহু মাত্রিকতায় তাঁর রয়েছে এক স্বতন্ত্র অধিষ্ঠান। তিনি একাধারে কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, জীবনীকার, সম্পাদক ও সংগঠক।
আবদুল হালীম খাঁ ১৯৪৪ সালের ১৭ জুলাই প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য আর লোক-সাহিত্য ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী টাঙ্গাইল জেলার ভূঁয়াপুর উপজেলার বামনহাটা গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম বাহাদুর আলী খাঁ ও মাতা মরহুমা মরিয়ম বেগম।
কবি আবদুল হালীম খাঁ বিশ্বাস ও মূল্যবোধের স্বপক্ষে সাহিত্যাঙ্গনে যাত্রা শুরু করেন। ১৯৬১ সালে টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক হৃতকরী পত্রিকায় প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম কবিতা ‘বর্ষার আনন্দ’। এরপর তিনি আর থামেননি। একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে তার লেখা। তিনি কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বিচরণ করতে থাকেন সাহিত্যের সবক’টি শাখায়। আজও তার কলম চলছে দুর্বার গতিতে।
কবি আবদুল হালীম খাঁ বিপ্লবের স্বপ্নলালিত এক সাহসী যোদ্ধা। তিনি লিখেছেন-
যুদ্ধই এক্ষণে একমাত্র মহৎ শিল্পকর্ম
যোদ্ধারাই মহান দেশপ্রেমিক
আজকাল দেশের সব কষ্ট পরিত্রাণের জন্য
যুদ্ধ ছাড়া আমার হাতে আর কোন কর্মসূচী নাই।
(আমি একটা যুদ্ধ চাই)
কবি আবদুল হালীম খাঁ সত্য ও সুন্দরের জন্য নীরব সংগ্রামে জীবনের ৭২টি বসন্ত পেরিয়ে এসেছেন। এখনও তিনি শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সমাজ রাষ্ট্র তথা আমরা তাকে কী দিয়েছি। ব্যথায় কাতর কবি লিখেছেন-
পাথর ভাঙতে ভাঙতে
কবে যে ভেঙেছে শিরদাঁড়া
তবু আজো কোথা থেকে কেউ
দিলো না একটু সাড়া।
(প্রতিদিন আমার পৃথিবী)
কিন্তু তবুও কবি হতাশ নন। ছুটে চলছেন দুঃসাহসিকতার সাথে। সংগ্রাম করছেন সত্য ও সুন্দরের পথে। পাহাড় কেটে কেটে মাঠ গড়ে সেখানে সতেজ বৃক্ষের চারা রোপণ করছেন। স্বপ্ন দেখছেন নতুন এক পৃথিবীর। কবি লিখেছেন-
জানি ফুলের মালা কেউ দেবে না
এ গলে আমার,
তবু সারা জীবন চাষ করবো
ফুলের খামার।
(প্রতিদিন আমার পৃথিবী)
কবি আবদুল হালীম খাঁর লেখা নিয়মিত বাংলাদেশ ও কলকাতার পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত তাঁর কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, জীবনী, নাটকসহ প্রায় ৪২টি গ্রন্থ প্রকাশ হলেও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে অনেক মূল্যবান পাণ্ডুলিপি। যা প্রকাশ হচ্ছে না বা তিনি প্রকাশ করতে পারছেন না। তিনি সম্পাদনা করেছেন মাসিক রেনেসাঁ, মাসিক প্রতিভা, পাক্ষিক ভূঁইয়াপুর বার্তাসহ বেশ কিছু পত্রপত্রিকা।
কবির প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : কবিতা- ও জীবন ও সুখ, দাঁড়াও বাংলাদেশ, বুকের ভেতর প্রতিদিন, প্রতিদিন আমার পৃথিবী, আমি একটা যুদ্ধ চাই ইত্যাদি। উপন্যাস- শাহজালালের জায়নামায, স্বপ্ন দিয়ে গড়া, কাশ্মীরের পথ প্রান্তরে, খেদাও ইত্যাদি। কিশোর উপন্যাস- কালো ছেলের অবাক কাণ্ড, দোয়েল পাখির বিশ্বভ্রমণ, নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন ইত্যাদি। জীবনী- আল কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক মৌলভী নইমউদ্দিন, ছোটদের ওমর ইবনে আবদুল আজিজ, জন মানুষের বন্ধু প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ ইত্যাদি।
আবদুল হালীম খাঁ সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে কবি মুফাখ্খারুল ইসলাম লিখেছেন- ‘যত কম কথায় যত বেশি ভাব জড়ানো যায় ততই কবির কবিত্ব। যত কম শব্দে পাঠককে বেশি ভাবিয়ে তোলা যায় ততই কবির মুনশিয়ানা। তেমন লেখাপড়ার সৌভাগ্য আর আমাদের এখন হচ্ছে না। হঠাৎ যেন কবি আবদুল হালীম খাঁর লেখা পড়ে তেমন কথার চমৎকারিত্ব ও ভাবের সৌকর্ষ্য আবিষ্কার করলাম। এমন প্রতিভা তো ইদানীং কায়েমিরা সহজে উঠতে দেয় না। তবু যারা এমন হাসনাহেনার গুচ্ছের মতো কবিতা ক’টি নিয়ে রাত পালিয়ে এসে আমার দুয়ারে এ মন মাতানো খুশবু বিলিয়ে গেলেন, কবির সঙ্গে তাদের জন্য অনেক শুকরিয়া। অনেক সহমর্মিতা।
কবি আবদুল হালীম খাঁর জীবন গড়ে উঠেছে সরলতা, উদারতা, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সহনশীলতাকে কেন্দ্র করে। তাঁর চরিত্র ও মেজাজ নম্রতা-ভদ্রতার আবহে পরিশীলিত। সাহিত্যের পেছনে কাটিয়েছেন সারাটি জীবন কিন্তু বৈরী স্রোতের আবর্তে হারিয়ে যাননি। তাঁর কাব্যসাহিত্যে আছে জীবনের জয়গান। আছে প্রেমের উদ্দীপনা ও যৌবনের প্রাণপ্রাচুর্য্য।
কবি জীবনের বাহাত্তরটি বসন্ত সুকর্মে সগৌরবে অতিক্রম করে এসেছেন। আমাদের প্রত্যাশা তাঁর কাছ থেকে আরো পাওয়ার। তাঁর সৃজন সাধনায় আমাদের সাহিত্যভুবন সমৃদ্ধ হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫