ঢাকা, রবিবার,৩১ মে ২০২০

অবকাশ

যাপিত জীবন

রায়হান রাশেদ

০৫ নভেম্বর ২০১৭,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

‘এই মামা, হাউজ বিল্ডিং যাইবা’।
‘ওঠেন স্যার’।
কসাইবাড়ি রেলগেট থেকে প্রতিদিন রিকশায় চড়ে হাউজ বিল্ডিং যাতায়াত করেন রাজিব। তিনি একটি বহুজাতিক প্রাইভেট কোম্পানির সহকারী ম্যানেজার। ভালো মাইনে পান। দুই সন্তানকেই পড়াচ্ছেন উত্তরার হাই স্কুলে। বড় মেয়ে নাইনে আর ছেলেটা ক্লাস সিক্সে। দামি ফ্ল্যাটে থাকেন। দামি দামি রেস্তোরাঁয় খেতে যান হপ্তা পরপর। ভালোই চলছে সাংসারিক জীবন। অথচ রাজিব অন্তরের চোখ দিয়ে দেখে এসেছেন একটা সংগ্রামী মানুষের জীবন। টানাপড়েনের এক সংসার। বাবার সামান্য ক’টা টাকা রোজগারে চলত ছয়জন মানুষের জীবন। ভাইবোনদের চাহিদাগুলো পূরণ হতে সময় লাগত বেশ। দুই মাস, তিন মাস, কখনো ছয় মাস। আর আজ তার সন্তানদের চাহিদা এক-দুই দিনের ভেতরেই পূরণ হয়ে যায়। আহ্, মানুষ এক জীবনে কত জীবনের সাক্ষী হয়! কত কিছুর পালাবদল দেখে!
টুংটাং শব্দ করে রিকশা এগিয়ে চলছে। রাস্তায় গাছের ছায়াগুলো আলপনা আঁকছে। কয়েকটা লোক হাঁটছে। কোথাও কোথাও ছাত্ররা বসে আছে রাস্তার পাশের উঁচু জায়গাতে। সারি বাঁধা বিল্ডিংয়ের ভেতরের রাস্তায় ধীরে ধীরে রিকশা চলছে। প্যাডেলে পড়ছে মন্থর গতিতে এক বয়স্ক পা। পায়ের চামড়ায় ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। মুখে সাদা কাশফুলের মতো লম্বা দাঁড়ি। রাজিব নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করেন মামার অবস্থা। মামার নাম মহব্বত আলী। নোয়াখালীর বাসিন্দা। এক বছর ধরে ঢাকায় আছেন। কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছেন রিকশা চালানো। অন্য কাজ ঢাকা শহরে মেলানো বেশ কঠিন। রিকশা চালানো সহজে মেলানো যায় ঢাকার এই টাকার শহরে। থাকেন একটি সিএনজি গ্যারেজে। গ্যারেজের পাশের খালার সস্তা হোটেলে ৪০ টাকায় রোজ তিন বেলা ডাল-ভাত খান। মাস দুয়েক পর বাড়িতে যান। বাড়িতে প্রিয় গিন্নি আর দুই সন্তান নিয়ে বিধবা মেয়ে আছে। গত বছরের এক বৈশাখ মাসে ট্রেনকাটায় মারা গেছেন জামাতা। সেই থেকে মেয়েটা তার কাঁধে। ছেলে একটা যা ছিল, সে এখন বউয়ের করতলে। ভিটেবাড়ি করেছে নতুন বাবার বাড়ি। মানে শ্বশুর মহাশয়ের বাড়ি। আর এ দিকে আমাদের মহব্বত মিয়া বেছে নিলেন রিকশায় প্যাডেল মারা। এভাবে দিন দিন বৃদ্ধ মানুষটাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে সাধের রিকশা। শেষ বয়সে মানুষের শরীরে শক্তিই বা কতটা থাকে। কেমন যেন শিশুদের মতো হয়ে যায়। সময়ের সাথে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে জীবনে বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলো।
মহব্বত আলীরা সংগ্রাম করে চলছেন দেশের বিভিন্ন পথে পথে। যে জীবনে তাদের অবসরে সময় কাটানো অপরিহার্য, সেই সময়ে তারা যুদ্ধ করছেন জীবনের সাথে জীবন দিয়ে। অথচ এই সহজ-সরল মানুষগুলোর সাথে আমাদের দেশের সন্তানরা খারাপ আচরণ করছে। উপহাস করছে তাদের নিয়ে। কখনো হাত তুলতেও দ্বিধা করে না।
রাজিব ১৫ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা দিয়ে অফিসের পথে নামেন। ফুটওভার পার হতেই অফিসের বিল্ডিং। মহব্বত মিয়া তাকিয়ে থাকেন টাকার দিকে। দীর্ঘশ্বাসে হৃদয়ের খুব গভীর থেকে উচ্চারণ করে ‘ হায়রে টাকা’।
রাজিবের মনটা ‘মনে’ নেই। উদাস উদাস লাগছে। পায়চারি করছেন ছোট কামড়ার ভেতর। এই হাঁটছেন, এই বসছেন। আর মনে পড়ছে বাবার কথা। সেই রোদে পোড়া কৃষক বাবার কথা। আচ্ছা, রাজিবের বাবা যদি বেঁচে থাকতেন মাটির পৃথিবীতে, তাহলে তিনি কী করতেন? অবসর জীবন কাটাতেন নাকি এখনো ক্ষেতেখামারে কাজ করতেন? রাজিব কি চাকরির অজুহাতে বউয়ের হাত ধরে ঢাকা চলে আসতেন? নাকি এমনটা করতেন না! তাহলে মহব্বত আলীকে দেখে বাবার কথা মনে পড়ছে কেন?

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫