ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৮ মে ২০২০

ইসলামী দিগন্ত

আমলনামা কেন গুরুত্বপূর্ণ

মাওলানা জাফর আহমাদ

২৬ জানুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

মৃত্যুর সময় থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত একজন নেককার মানুষের সাথে সম্মানিত মেহমানের মতো আচরণ করা হয়। কিন্তু একজন অসৎ ও বদকার মানুষের সাথে আচরণ করা হয় অপরাধে অভিযুক্ত কয়েদির মতো। এরপর কিয়ামতের দিন আখেরাতের জীবনের সূচনালগ্ন থেকেই নেককার মানুষের জীবন যাপনের ধরন-ধারণাই পাল্টে যায়। একইভাবে কাফের, মুনাফিক ও পাপিদের জীবন যাপনের ধরন ভিন্নরূপ হয়ে যায়।
মৃত্যুর সময় নেককার ও বদকারদের অবস্থা : এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, এমন মুত্তাকিদের, যাদের পবিত্র থাকা অবস্থায় ফেরেশতাগণ যখন মৃত্যু ঘটায় তখন বলে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম, যাও নিজেদের কর্মকাণ্ডের বদৌলতে জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (সূরা নাহল : ৩২) ‘হায়, যদি তোমরা সেই অবস্থা দেখতে পেতে, যখন ফেরেশতাগণ নিহত কাফেরদের রূহ কবজ করছিল! তারা তাদের চেহারায় ও পিঠে আঘাত করছিল এবং বলছিল, ‘নাও এখন জ্বালাপোড়ার শাস্তি ভোগ করো’। এ হচ্ছে সেই অপকর্মের প্রতিফল যা তোমরা আগেই করে এসেছ। নয় তো আল্লাহ তার বান্দাদের ওপর জুলুমকারী নন। (সূরা আনফাল : ৫০-৫১)
কবরের অবস্থা : এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘হ্যাঁ এমন কাফেরদের জন্য, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করতে থাকা অবস্থায় যখন ফেরেশতাদের হাতে পাকড়াও হয়, তখন সঙ্গে সঙ্গেই আত্মসমর্পণ করে এবং বলে, ‘আমরা তো কোনো দোষ করছিলাম না’। ফেরেশতারা জবাব দেয়, কেমন করে দোষ করছিলে না! তোমাদের কার্যকলাপ আল্লাহ খুব ভালো করেই জানেন। এখন যাও, জাহান্নামের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ো, এখানেই থাকতে হবে চিরকাল। সত্য বলতে কী, অহঙ্কারীদের এই ঠিকানা বড়ই নিকৃষ্ট।’ (সূরা নাহল : ২৯) ‘অন্য দিকে যখন মুত্তাকিদের জিজ্ঞেস করা হয়, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে কী নাজিল হয়েছে, তারা জবাব দেয়, সর্বোত্তম জিনিস নাজিল হয়েছে। এ ধরনের সৎকর্মশীলদের জন্য এ দুনিয়াতেও মঙ্গল রয়েছে এবং আখেরাতের আবাস তো তাদের জন্য অবশ্যই উত্তম।’ (সূরা নাহল : ৩০)
মৃত্যু ও কিয়ামতের মাঝখানের অবস্থা : এ সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস থেকে এই চিত্র পাওয়া যায়। চিত্রটি হচ্ছেÑ মৃত্যু নিছক দেহ ও রূহের আলাদা হয়ে যাওয়ার নাম। একটি অপরাধী রূহকে ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসাবাদ, তারপর আজাব ও যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে যাওয়া এবং তাকে দোজখের সামনে উপস্থাপিত করাÑ এসব কিছু এমন একটি অবস্থার সাথে সাদৃশ্য রাখে, যা একজন খুনের আসামিকে ফাঁসি দেয়ার তারিখের একদিন আগে একটি ভয়ঙ্কর স্বপ্নের আকারে তার কাছে উপস্থিত হয়। অনুরূপভাবে একটি পবিত্র পরিচ্ছন্ন ও নিষ্কলুষ রূহের সংবর্ধনা, তারপর তার জান্নাতের সুখবর শোনা এবং জান্নাতের বাতাস ও খোশবুতে আপ্লুত হওয়া। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তিই মারা যায় তাকেই সকাল ও সন্ধ্যায় তার শেষ বাসস্থান দেখানো হতে থাকে। জান্নাতি ও দোজখি উভয়ের ক্ষেত্রেই এটি হতে থাকে। তাকে বলা হয়, কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তোমাকে পুনরায় জীবিত করে তাঁর সান্নিধ্যে ডেকে নেবেন, তখন তোমাকে আল্লাহ সে জায়গা দান করবেন এটা সেই জায়গা।’ (বুখারি, মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদ)
হাশরের ময়দানের অবস্থা : এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি সৎকাজ নিয়ে আসবে, সে তার চেয়ে বেশি ভালো প্রতিদান পাবে এবং এ ধরনের লোকেরা সেদিনের ভীতি-বিহ্বলতা থেকে নিরাপদ থাকবে। আর যারা অসৎ কাজ নিয়ে আসবে, তাদের সবাইকে অধোমুখে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। তোমরা কী যেমন কর্ম তেমন ফল ছাড়া অন্য কোনো প্রতিদান পেতে পারো?’ (সূরা নামল : ৮৯-৯০)
হাশরের ময়দানে জান্নাতের হকদার লোকদের সাথে অপরাধীদের থেকে ভিন্নতর ব্যবহার করা হবে। তাদের সম্মানের সাথে বসানো হবে। হাশরের দিনের কঠিন দুপুর কাটানোর জন্য তাদের আরাম করার জায়গা দেয়া হবে। যেমনÑ আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন যারা জান্নাতের অধিকারী হবে, তারাই উৎকৃষ্ট স্থানে অবস্থান করবে এবং দুপুর কাটানোর জন্য চমৎকার জায়গা পাবে।’ (সূরা ফুরকান : ২৪) সেদিনের সব রকমের কষ্ট ও কঠোরতা হবে অপরাধীদের জন্য। সৎকর্মশীলদের জন্য নয়। যেমন হাদিসে বলা হয়েছে, আবু সাঈদ খুদরি রা: থেকে বর্ণিত নবী সা: বলেছেন, ‘সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ আবদ্ধ, কিয়ামতের মহা ও ভয়াবহ দিবস একজন মুমিনের জন্য অনেক সহজ করে দেয়া হবে। এমনকি তা এত সহজ করে দেয়া হবে, যেমন একটি ফরজ নামাজ পড়ার সময়টি হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ) আল্লাহ বলেন, ‘সেই ভীতিকর অবস্থা তাদেরকে একটুও পেরেশান করবে না এবং ফেরেশতারা এগিয়ে এসে তাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানাবে এই বলে, ‘এ তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেয়া হতো।’ (সূরা আম্বিয়া : ১০৩) আল্লাহ আরো বলেন, ‘যাকে আল্লাহ পথ দেখান সে-ই পথ লাভ করে এবং যাদেরকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন তাদের জন্য তুমি তাঁকে ছাড়া আর কোনো সহায়ক সাহায্যকারী পেতে পারো না। এ লোকগুলোকে আমি কিয়ামতের দিন উপুড় করে টেনে আনব অন্ধ, বোবা ও বধির করে, এদের আবাস জাহান্নাম। যখনই তার আগুন স্তিমিত হতে থাকবে, আমি তাকে আরো জোরে জ্বালিয়ে দেবো।’ (বনি ইসরাইল : ৯৭)
হে আরশের মালিক! তুমি আমাদের সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করো এবং ডান হাতে আমলনামা যাতে গ্রহণ করতে পারি, সে কর্ম যেন করে আসতে পারি।
লেখক : ব্যাংকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫