ঢাকা, রবিবার,৩১ মে ২০২০

অবকাশ

প্রবাসজীবন : জীবনের বাঁকে বাঁকে

আরিফুল ইসলাম

২৮ জানুয়ারি ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শিল্প, সাহিত্য ও ভালোবাসার নগরী হিসেবে খ্যাত সৌন্দর্যের অধিকারী প্যারিসে পাড়ি জমাবÑ কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় গৃহ ও পরিবার-পরিজন ত্যাগ করে পরবাসের খাতায় নাম লেখাতে হলো। বড় স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম বিলাতে (লন্ডন) লেখাপড়ার জন্য। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের প্রতি বছর দেশ থেকে লাখ লাখ টাকা এনে বিদেশে নিজেদের খরচে লেখাপড়া করা কতটা কষ্টসাধ্য তা বলে বুঝানো যাবে না। তাই লন্ডনে লেখাপড়ার মাঝপথেই সিদ্ধান্ত নিতে হলো স্বপ্নের শহর প্যারিসে পাড়ি জমাব। যেই চিন্তা সেই কাজ, ফ্রান্সে ভিসার জন্য লন্ডনের ফ্রান্স দূতাবাসে আবেদন করলাম। ভিসাও হয়ে গেল, চলে এলাম ফ্রান্সে। প্রথম দিকে ব্যাপারটা বনবাসের মতোই মনে হতো। একজন প্রবাসীকে প্রতিদিনই নতুন নতুন ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারও বৃদ্ধি পেতে থাকে সেই সাথে। এভাবেই কেটেছে বেশ কয়েক বছর। প্রবাসজীবন শিখিয়েছে কিভাবে আশপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনা এড়িয়ে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যেতে হয়। নিরাশার অতলগহ্বরে হারিয়ে যাওয়া মায়ের আদরের ছেলেটা আজ চোখের নোনাজল উপেক্ষা করে বলতে শিখেছে, ‘আমি ভালো আছি মা, তোমরা ভালো আছো তো?’
মায়ের নিপুণ হাতের রকমারি রান্না পছন্দ করা সেই ছেলেই আজ স্বাদবিহীন খাবার অমৃত সুধা মনে করে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে, আহা কী স্বাদ। যাকে সকালে ঘুম থেকে উঠাতে বাড়িসুদ্ধ লোকের ডাকাডাকি করতে হতো আর ঘুম থেকে উঠে মা এটা দাও ওটা দাও। সেই তাকেই কিনা আজ প্রবাসী হওয়ার কারণে সূর্যিমামার আগেই জেগে উঠতে হয়। প্যারিসে শীতের সময় ৯টায় সূর্যোদয় হয়। সকাল ৯টায় ঘুম থেকে উঠে ১০টায় ডিউটিতে বের হতে হয়। এভাবে চলছে কয়েক বছর ধরে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কাজ ছেড়ে দেই আবার চিন্তা করি, এখানে থাকি বা দেশে চলে যাই কাজ তো করতেই হবে। কিশোরবেলায় গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তির বইয়ে লেখা দেখেছিলাম, ‘ঝড় বৃষ্টি মানব না কেন্দ্র ঘর ছাড়ব না।’ কর্মজীবীদের অবস্থা এমনÑ দেশে বা বিদেশে যেখানেই কাজ করুক না কেন যতই ঝড় বৃষ্টি হোক, সময়মতো কর্মস্থলে থাকতেই হবে। প্রচণ্ড শীতে মাইনাস ১২-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্রবল তুষার ঝড় উপেক্ষা করে তবুও কর্মস্থলে হাজির হতে হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ের আগে। এমন দুর্যোগে ছুটি চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘শীত, তুষারপাত এখানকার মানুষের জীবনযাপনের স্বাভাবিক একটা অংশ।’ জ্বর-ঠাণ্ডাকে উপেক্ষা করে দুর্বল শরীরে রোদ-বৃষ্টি পেছনে ফেলে উদ্যমী হয়ে এগিয়ে যাওয়া বন্ধুদের নিয়ে অস্থির জীবনযাপনে অভ্যস্ত আমি। একসময় অন্য এক অস্থিরতায় পেয়ে বসে, আর তা হলো জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। এখানে টাকা খরচ করতে তাকে দু’বার ভাবতে হয়। কষ্টে উপার্জিত টাকা খরচ করতে গেলে বিবেকে বাধা দেয়। শত বাধাবিঘœ পেরিয়ে ও আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ ফ্রান্সে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। দেশে যে ছেলে কোনো কাজই করেনি, ঘর থেকে বেরোলেই যার রিকশা লাগত, তাকে এখন স্বচক্র যানে বা মেট্রো যানে পাড়ি দিতে হয় অনেক পথ। মায়ের আঁচলতলে বেড়ে ওঠা সন্তান হাজার হাজার মাইল দূরে নির্ভীক দিবানিশি কাটায় শুধু প্রবাসী বলেই। নরম বিছানায় গা এলিয়ে দেয়া স্বপ্ন এখন সম্ভাবনার পথে। কর্মজীবী প্রবাসীদের থাকতে হয় এভাবে ছাত্ররাজনীতির মাঠে বীরদর্পে প্রদক্ষিণ করা ছেলেগুলোই রাজনীতির ভেদাভেদ ভুলে, প্রতিহিংসাকে পেছনে ফেলে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়ে এগিয়ে চলে। বিপদে ভাই-বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ায়। সারা দিন কাজের শেষে রাত জেগে পড়াশোনা ও আড্ডায় ক্লান্ত হয় না। মাঝরাতে কাজ থেকে ঘরে ফেরা আবার সকাল হতে না হতেই বেরিয়ে পড়া কর্মস্থলে। প্রবাসীর এ উদ্যম দেখে ঘড়ির কাঁটা নিজেই যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শত কষ্ট, শত ব্যস্ততা ও ক্লান্তির মাঝেও প্রবাসীদের মন খুশিতে উচ্ছ্বসিত হতে বোধহয় বেশি কিছু লাগে না। দেশে সবাই ভালো আছে। প্রিয়জনের মুখে হাসি আর মধুর কণ্ঠস্বরই ভরিয়ে দেয় প্রবাসীদের প্রাণ। প্রবাসে চরিত্রগুলো ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু তাদের চাহিদা, জীবনযুদ্ধ, গল্পকথা একই রকম। প্রতিটি প্রবাসীর জীবনই প্রবাসে এসে বদলে যায়, সজ্জিত হয় সম্পূর্ণ এক নতুন ধাঁচে একেকজন সৈনিকের মতো, যাকে বলা চলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে নেয়ার প্রয়াসের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। প্রবাসজীবন শেখায় জীবনকে উপলব্ধি করতে, শত বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে চলতে।
প্যারিস, ফ্রান্স

 

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫