হজব্যবস্থাপনায় ৩ দফা নিবেদন

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

হজ ব্যবস্থাপনা এককভাবে সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণে এবং তা প্রায় শত শত বছর থেকে। হজযাত্রীদের কল্যাণে সৌদি সরকার যে খুবই আন্তরিক তাতে ইতস্ততা নেই, কিন্তু সম্প্রতি হজ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত হজযাত্রীদের মধ্যে অসন্তুষ্টির ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। জেদ্দা হজ টার্মিনাল, পবিত্র মক্কা ও মদিনাকেন্দ্রিক হজের যাবতীয় কার্যক্রম নিয়ে। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত হজযাত্রীরা কতটুকু অনুকূল ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছেন তা মনে হয় বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এবং যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের নজরে আছে বলে মনে হয় না।
সাম্প্রতিক কয়েক বছর থেকে হজযাত্রীদেরর মধ্যে যেভাবে অসন্তুষ্টি ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা থেকে মৌলিক বিষয় তথা তিন দফা নিবেদন সৌদি বাদশহার কাছে পেশ করছি।
হজযাত্রীদের থেকে নেয়া ট্যাক্স ফেরত দেয়া : ২০১৫ ও ১৬ খ্রিষ্টাব্দে যারা হজে গমন করেছেন, ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ওই হজযাত্রীদের থেকে জনপ্রতি দুই হাজার রিয়াল করে ট্যাক্স নেয়া হয়। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ রিয়াল ফেরত দেয়া উচিত, যেহেতু হজকার্যক্রমে কোটা নির্ধারিত করা আছে। কোটার অভ্যন্তরে থেকে হজযাত্রী গমন করলে তা নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এখানে রাজকীয় সৌদি সরকার ট্যাক্স আদায় করা অমানবিক। এ রিয়াল ফেরত দিতে বিনীত নিবেদন রাখছি।
মহান সাহাবা, তাবেঈন, তাবে তাবেঈনরা সে সময় প্রতিকূল যোগাযোগেও বহুবার হজ করেছেন। বারে বারে হজ করা ধর্ম মতে বৈধ, সাওয়াবের কাজ। আবারো উল্লেখ করছি হজযাত্রী নিয়ে বিভিন্ন দেশে কোটা নির্ধারিত আছে। কোটা অনুসরণ করে হজযাত্রী গমন করলে সৌদি সরকার কোন যুক্তিতে ট্যাক্স নিবে? শুধু তাই নয়, যারা হজযাত্রীদের গাইড হিসেবে যাচ্ছে তাদের থেকেও গত হজে ট্যাক্স নেয়া হয়। কাজেই সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের কাছে বিনীত নিবেদন, গত হজে দুই হাজার রিয়াল করে নেয়া হজের ট্যাক্স ফেরত দেয়া হোক।
জেদ্দা হজ টার্মিনাল জরুরি সংস্কার করা : জেদ্দা হজ টার্মিনাল লাখ লাখ হজযাত্রীর জন্য চরম প্রতিকূল অবস্থানের এলাকা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত কান্ত পরিশ্রান্ত হজযাত্রীরা দ্বিতলবিশিষ্ট টার্মিনাল ভবনে ঢুকে কড়া এসিতে কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে পড়ে। সেখানে যেমনি টয়লেট ব্যবস্থা অপ্রতুল, তেমনি অপ্রতুল যাত্রী অনুপাতে চেয়ারের সংখ্যাও। বিদেশ থেকে আগত হাজীদের টয়লেটে গিয়ে লাইন ধরতে হয়। ইমিগ্রেশনের পর হাজীরা যখন মূল ভবন থেকে বাইরের চত্বরে আসেন, তখন ৩৭-৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় দগ্ধ হতে শুরু করেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত লাখ লাখ হাজী চরম প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হন। এখানে একাধিক ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয় বাসে উঠার জন্য। হজ টার্মিনালের বিশাল চত্বরে বসার ব্যবস্থা অপ্রতুল। যা আছে তাও মানসম্পন্ন নয়। তেমনি মানসম্পন্ন নয় টয়লেটগুলোর ব্যবস্থাপনাও।
হজের পর দেশে ফেরার ৭-৮ ঘণ্টা আগে হজ টার্মিনালে রিপোর্ট করতে পরিশ্রান্ত হাজীরা আবারো বাস থেকে নেমে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে প্রতিকূল অবস্থায় পড়েন। বাংলাদেশসহ অনেক দেশের হাজীরা অনভ্যস্ত বিধায় গরমে ছটফট করতে থাকেন। অবস্থাভেদে অনেক দূরত্বে ইমিগ্রেশনের দিকে যেতে টলি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে।
ইমিগ্রেশনের দূরত্ব অধিক হওয়ায় বিশ্বের বড় বড় বিমানবন্দরের মানসম্পন্ন টার্মিনালের মতো বেল্ট ওয়ে না থাকা, দেশে ফেরার সময়ও যাত্রী অনুপাতে বসার ব্যবস্থা না থাকা, টয়লেট-স্বল্পতা তথা নানা দুর্ভোগ পেরিয়ে হজযাত্রীদের বিমানে উঠতে হয়।
মসজিদুল হারাম দ্রুত সম্প্রসারণ করা : হজে ও রমজানে পবিত্র মক্কায় মসজিদুল হারামে নামাজ পড়তে গিয়ে কয়েক বছর থেকে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। এর মূলে মসজিদুল হারাম পরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণ না হওয়া। মূল মসজিদে হারাম পুনর্নির্মাণ কাজ সমাপ্তির পথে। গত প্রায় দুই বছর থেকে পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তির অবশিষ্ট কাজ বন্ধ রয়েছে। জানি না তার কারণ কী হতে পারে। বাদশাহ ফাহাদ কর্তৃক পশ্চিম দিকে সম্প্রসারণ মানানসই গ্রহণযোগ্য, কিন্তু বাদশাহ আবদুল্লাহ কর্তৃক উত্তর দিকে সম্প্রসারণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাদশাহ আবদুল্লাহর উচিত ছিল মসজিদুল হারামের চতুর্দিকে সম্প্রসারণে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে কাজ শুরু করা; কিন্তু তা হয়নি। বর্তমান মহামান্য বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের প্রতি বিনীত নিবেদন থাকবে, যেহেতু হজ ও ওমরাহ পালনকারীরা নামাজ পড়তে গিয়ে অবর্ণনীয় কষ্টের সম্মুখীন হন; তিনি যাতে শেষ বয়সে মসজিদুল হারামের চতুর্দিকের সম্প্রসারণের কাজটি শেষ করে যান। মসজিদুল হারামের মাত্র ১০০-১৫০ মিটারের মধ্যে জমজম টাওয়ার, হিলটন টাওয়ার, দার আল তৌগিদ হোটেল, যার অবস্থান কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। মাত্র কয়েক হাজার লোকের আরামের জন্য মসজিদুল হারামের একদম গায়ের ওপর এ তিনটি হোটেল থাকতে পারে না। সাফা পাহাড়সংলগ্ন জাবালে আবু কুবাইসের ওপর পাঁচ-সাতটি রাজপ্রাসাদের অবস্থানও গ্রহণযোগ্য নয়। রাজপ্রাসাদ থাক; কিন্তু তা আরো দক্ষিণে সরিয়ে নিতে হবে।
অর্থাৎ সম্প্রসারিত বাদশাহ ফাহাদ হেরেমের অনুসরণে চতুর্দিকে মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত জরুরি। এরপর থাকবে পবিত্র মদিনায় মসজিদে নববীর মতো ওপরে ছাতা দিয়ে সুন্দর চত্বর। এরপর হজ ও ওমরাকারীদের জন্য হাটেলাদি। আপনার মহান ভ্রাতা বাদশাহ ফাহাদ পরিকল্পিতভাবে মসজিদে নববীসহ পবিত্র মদিনাকে সাজিয়ে দিয়ে গেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পবিত্র মক্কায় মসজিদুল হারামে যা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত মনে করছি। এতে তিনটি হোটেল, রাজপ্রাসাদ কোনো অবস্থায়ই গুরুত্ব পেতে পারে না। এ কারণে লাখ লাখ হজ, ওমরাকারী কষ্ট পাচ্ছেন। আপনাদের প্রতি অসন্তুষ্টি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা কোনো অবস্থায়ই রাজপরিবারের জন্য কল্যাণকর নয়।
মহান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের প্রতি বিনীত নিবেদন, উপরি উক্ত তিনটি বিষয় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ করবেন আশা রাখছি।
লেখক : সভাপতি, হজযাত্রী কল্যাণ পরিষদ; চট্টগ্রাম

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.