মসজিদমুখী হোক যুবসমাজ

মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী

যুগে যুগে যুবসমাজই জরাগ্রস্ত পৃথিবীর বুকে এনেছে নবজীবনের ঢল। তিমির রাত্রির অবসানে রক্তরাঙা প্রভাতের সূচনা করেছে। যুবকদের চোখেই থাকে নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন। পৃথিবীতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রদত্ত অফুরন্ত নিয়ামতের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যৌবনের শক্তিমত্তা। অফুরন্ত প্রাণশক্তির আধার যুবসমাজই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। শতসহস্র ঝড়ঝাপটা ও বাতিলের কালো থাবা উপো করে তারাই পারে সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় বীর বিক্রমে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে। যুবকেরাই পারে পরিবার, সমাজ ও দেশকে কুসংস্কারমুক্ত করে সোনালি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রদত্ত শাশ্বত জীবনব্যবস্থা ইসলামে যৌবনকালের গুরুত্ব সীমাহীন। এ সময়ের ইবাদত আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। এ সম্পর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: ইরশাদ করেছেনÑ ‘সাত শ্রেণীর মানুষকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণী হলোÑ সেই তরুণ-তরুণী যে তার রবের ইবাদতের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে।’ (বুখারি শরিফ)।
অন্য দিকে মসজিদ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম স্থান। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা: এ সম্পর্কে ইরশাদ করেছেনÑ ‘জনপদগুলোর মধ্যে মসজিদ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং বাজার তার কাছে সর্বাধিক অপছন্দনীয়’। (মুসলিম শরিফ)। মহান আল্লাহ মসজিদকে জান্নাতের টুকরা বানিয়েছেন। রাসূল সা: বলেছেনÑ মসজিদগুলো আসমানবাসীদের জন্য আলোকস্তম্ভ, যেমন নত্রগুলো পৃথিবীবাসীদের জন্য আলোকমালা’। যুবসমাজের নৈতিক চরিত্র গঠনের েেত্র মসজিদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মসজিদে যাওয়ার প্রতিদান সম্পর্কে রাসূলে কারিম সা: বলেছেনÑ ‘কোনো ব্যক্তি সকাল ও সন্ধ্যায় (নামাজ আদায় করার জন্য) যতবার মসজিদে যাতায়াত করবে, আল্লাহ তায়ালা ততবারই তার জন্য জান্নাতে মেহমানদারির সামগ্রী তৈরি করে রাখবেন।’ (বুখারি শরিফ)
যেসব কারণে মুসলিম যুবসমাজ মসজিদে যেতে আগ্রহ হারাচ্ছে তার প্রধানতম কারণÑ বিজাতীয় অপসংস্কৃতির প্রভাব। ভ্যালেন্টাইন ডে, থার্টিফাস্ট নাইটসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বেলেল্লাপনা ও বেহায়াপনা যুবচরিত্রকে ধ্বংস করছে। বর্তমানে যুবসমাজ ধ্বংসে স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট, ফেসবুক প্রভৃতি প্রচার ও যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। এসবে আসক্ত মুসলিম যুবকেরা মসজিদের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।
যুবসমাজের মসজিদবিমুখ হওয়ার পেছনে বন্ধু-বান্ধবের প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। বন্ধু-বান্ধব ও সঙ্গী-সাথীর প্রভাব যুবসমাজের আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ডে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে অনেক যুবক ধূমপান, মাদকাসক্তি, টিভি, সিনেমা, পর্নোগ্রাফি প্রভৃতি কুঅভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। এসব কারণে তারা মসজিদের প্রতি আগ্রহ হারাতে থাকে। এ জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সৎ বন্ধু ও সত্যবাদী সাথীদের সাথে থাকার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেনÑ ‘হে ইমানদারেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।’ (সূরা আত-তাওবাহ : ১১৯)
যুবসমাজের মসজিদের প্রতি অনীহার েেত্র সবচেয়ে বেশি দায়ী পারিবারিক কারণ। কেননা পরিবার হচ্ছে সন্তানের প্রথম পাঠশালা। মা-বাবার কারণে অনেক যুবক ধ্বংসের পথে পা বাড়ায়। অনেক বাবা-মা আছেন, যারা নিজেরা নামাজ আদায় করেন এমনকি তাহাজ্জুদ নামাজেও খুবই যতœবান, কিন্তু তাদের যুবক ছেলেমেয়ে নামাজ আদায় করে কি না সে ব্যাপারে কোনো খোঁজখবর রাখেন না। সন্তানকে মসজিদমুখী করার েেত্র বাবা মা তথা পরিবারের ভ‚মিকা মুখ্য। এ সম্পর্কে রাসূলে করিম সা: ইরশাদ করেনÑ ‘তোমরা স্বীয় সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজ আদায়ের নির্দেশ প্রদান কর। ১০ বছর বয়সে নামাজ আদায় না করলে তাদেরকে প্রহার কর ও বিছানা পৃথক করে দাও।’ (আবু দাউদ শরিফ)। বাবা যদি নিয়মিত সন্তানদের সাথে নিয়ে মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করেন, তাহলে সন্তানেরাও যখন বড় হবে তখন তারাও মসজিদে যাতায়াত করবে।
পরিশেষে বলা যায়, যৌবনকাল জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের মোম সময় এটি। কিন্তু অনেক যুবক যৌবনের উচ্ছলতায় বিবেক, বুদ্ধি হারিয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। চরিত্র গঠনের জন্য ইমানের পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সা: আর যেসব প্রশিণমূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাজ কায়েম করা। তাই সমাজের যুবকদের প্রতি পরিবারসহ সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে তারা মসজিদমুখী জীবনযাপন করতে পারে। মা-বাবা ও মুরুব্বিদের উপদেশ যুবকদের জীবনের পাথেয়। ইসলাম এ ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। হজরত লুকমান আ: তার ছেলেকে দেয়া উপদেশ অত্যন্ত যতেœর সাথে পবিত্র কুরআন মজিদে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেÑ ‘হে আমার প্রিয় বৎস! নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, সৎ কাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয় এগুলো দৃঢ় সঙ্কল্পের কাজ।’ (সূরা লুকমান : ১৭)
যেকোনো মূল্যে আমাদের যুবসমাজকে মসজিদবিমুখতা থেকে রা করতে হবে। তাহলেই পথভ্রষ্ট যুবসমাজ আলোর পথে ফিরে আসবে। সমাজ থেকে দূর হবে সব অন্ধকার।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ মাইলস্টোন কলেজ, ঢাকা।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.