ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৮ মে ২০২০

ইসলামী দিগন্ত

মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ কল্যাণ বয়ে আনে

হইয়াসমিন নূর

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

শিশুদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তাকে খেলতে দেয়া হলে সে যতটা উৎফুল্লতার সাথে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে খেলে, পড়তে দিলে ঠিক তার উল্টো চিত্র দেখায়। অর্থাৎ তখন তার পেট ব্যথা শুরু হয়ে যায়, ঘুম পায় ও ুধা পায় প্রভৃতি। অবশ্য অনেক শিশু যে আগ্রহের সাথেও পড়াশোনা করে না তা নয়; তবে খেলাপ্রিয় শিশুদের ক্ষেত্রে প্রথম চিত্রটাই দেখা যায়। শুধু শিশুদের কথাই বলি কেন? আমাদের বড়দের ক্ষেত্রে কী ঘটে? আমরা যখন কোনো সিরিয়াল দেখতে বসি বা জম্পেশ আড্ডা দিতে অথবা আনন্দ-ফুর্তি করার মতো কোনো কাজে! তখন যে কোনো ফাঁকে চুলায় চাপানো রান্না পুড়ে যায়, সময়মতো বাড়ি ফেরা হয় না অথবা জরুরি কোনো কাজের সময় পার হয়ে যায় সে দিকে খেয়ালই থাকে না। অথচ যখন উপাসনা বা প্রার্থনা করতে বসি বা শিক্ষণীয় কোনো বইয়ের পাতায় চোখ রাখি তখন রাজ্যের যত চিন্তা এসে ভিড় করে, মনে পড়ে যায় জরুরি যত কাজের কথা। এর কারণ অন্য কিছুই নয়; এটা স্রেফ মনের কারসাজি। এ কারণেই ইসলামে বলা হয়েছেÑ ‘নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ।’ [আল-কুরআন : সূরা ইউসুফ; আয়াত-৫৩] অন্য দিকে আবার বলা হয়েছেÑ ‘হে প্রশান্ত মন! তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।’ (সূরা ফাজর : ২৭-৩০) ক্ষেত্রবিশেষে মনের শপথগ্রহণপূর্বক একে আশাতীত সম্মানের আসনে আসীন করে বলা হয়েছেÑ ‘শপথ সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয়।’ (সূরা কিয়ামত : ২)।
আল কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় মানবমনকে একাধিক বিশেষণে বিশেষিত করার কারণ জানতে হলে বাণীগুলোতে ব্যবহৃত মনের আরবি শব্দের দিকে দৃষ্টিপাত করা একান্ত জরুরি। এ দিকে লক্ষ রেখেই সে বিষয়ে আলোকপাত করা হলোÑ (১) প্রথম বাণীত আরবিতে মনকে ‘নাফসে আম্মারাহ’ বলা হয়েছে, যার অর্থÑ মন্দ কাজের আদেশদাতা। (২) দ্বিতীয় বাণীতে সেই মনকেই ‘নাফসে মুতমায়িন্না’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছেÑ যার অর্থ, প্রশান্ত ও নিরুদ্বেগ মন, প্রকারান্তরে এটি মহান স্রষ্টার বিশেষ অনুগ্রহ ও দয়ারই ফল। (৩) তৃতীয় বাণীতে সেই একই মনকে ‘নাফসে লাওয়ামা’ উপাধি দেয়া হয়েছে, যার অর্থÑ স্রষ্টা ও পরকালের ভয়ে মন্দ কাজ থেকে বিরত থেকে ক্ষমা প্রাপ্ত হওয়া। এ তথ্যবাহী বর্ণনার আলোকে মনের উপরোল্লিখিত যে তিনটি অবস্থা প্রকাশ পায় তাতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, মন একটিই এবং সে মূলত মানুষকে মন্দের দিকেই ধাবিত করে। কিন্তু তাকে শাসনের মাধ্যমে তার গতি পরিবর্তন সম্ভব। এখানেই শেষ নয়, এই মন্দের আদেশদাতাকেই নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে তাকেই বরং পৌঁছে দেয়া সম্ভব চূড়ান্ত সাফল্যের পথে। সম্ভবত এ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার কারণেই মানুষকে অন্য সব প্রাণী বা সৃষ্টির মধ্যে দেয়া হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা। হিন্দু ধর্মও প্রায় এমন কথার আভাস দিয়ে বলেÑ ‘অসংযতচিত্ত ব্যক্তির পক্ষে আত্মোপলব্ধি দুষ্প্রাপ্য। কিন্তু যার মন সংযত এবং যিনি যথার্থ উপায় অবলম্বন করে মনকে বশ করতে চেষ্টা করেন, তিনি অবশ্যই সিদ্ধি লাভ করেন। সেটিই আমার অভিমত।’ ‘গীতা; ষষ্ঠ অধ্যায়; শ্লোক-৩৬]
খ্রিষ্টধর্ম মনের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে বলেÑ ‘বৎস, আমার বাক্যে অবধান কর, আমার কথায় কর্ণপাত কর। তাহা তোমার দৃষ্টির বহিভর্‚ত না হোক, তোমার হৃদয় মধ্যে তাহা রাখ। কেননা যাহারা তাহা পায়, তাহাদের পক্ষে তাহা জীবন ও তাহা তাহাদের সর্বাঙ্গের স্বাস্থ্যস্বরূপ। সব লক্ষণীয় অপেক্ষা তোমার হৃদয় রক্ষা করে, কেননা তাহা হইতে জীবনের উদগম হয়।’ [বাইবেল; হিতোপদেশ; ৪ : ২০-২৩]
বৌদ্ধ ধর্ম শ্রেষ্ঠ জীবন লাভের অন্য উপায় হিসেবে মনকে স্থির করতে বলেছেÑ ‘অন্তরের পবিত্রতা রাজ্যসম্পদ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, স্বর্গবাস অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ এবং সর্বজগতের ওপর প্রভ‚ত্বের অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ।’ Ñ[বুদ্ধবাণী; সিদ্ধার্থের বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত; নৃপতি বিশ্বিমার]
উপযুক্ত বাণীগুলোর আলোকে এ শিক্ষাই লাভ হয় যে, চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যাপারে আন্তরিক সচেষ্ট হওয়া একান্ত আবশ্যক। ধর্মীয় উপায়ে হোক বা বৈজ্ঞানিক উপায়ে মনকে বশে এনে তাকে দিয়ে সর্বোচ্চ কল্যাণকর কাজ আদায় করে নেয়াই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। জীবনে পাওয়া স্রষ্টার সবচেয়ে বড় নিয়ামত ‘সময়’ কে অর্থহীন কাজে নষ্ট না করে তারই বিধিনিষেধ পালনে নিয়োজিত থাকতে হবে। মনের অন্যায় আবদার পূরণে যেন আমাদের কোনো সমর্থন না থাকে; বরং তাতে যেন তার ভাগ্যে শাসনের কষাঘাত জোটে। আর এতেই নিহিত রয়েছে আমাদের ইহকালীন-পরকালীন মঙ্গল ও কল্যাণ।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫