ঢাকা, মঙ্গলবার,০২ জুন ২০২০

অবকাশ

আলতাবানু চারাগল্প

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

২৫ মার্চ ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আশা ছাড়েনি আলতাবানু। আবির কথা দিয়েছে যখন নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। এই বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে জীবনের পড়ন্ত সময়ে এসেও একবুক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন আলতাবানু। আবিরের দেয়া চশমার হাতল দুটো কবেই ভেঙে গেছে। দু-এক জায়গায় কাচ দুটোও ফেটেফুটে গেছে। আলতাবানু ভাঙা চশমার হাতল দুটো চিকন সুতা দিয়ে বিশেষ কায়দায় জুড়ে দিয়ে ব্যবহার করছে। পুরনো হলেও ভাঙা-ছেঁড়া চশমা তার কাছে অনেক প্রিয়। আবিরের গন্ধ পাওয়া যায়। যুদ্ধে যাওয়ার এক দিন আগে আবির তাকে কিনে দেয় চশমাটি। পেছন থেকে এসে আলতাবানুকে আবেগে চোখ চেপে ধরে। সহাস্যে কথা বলে,
‘বলো তো বানু, তোমার জন্য কী এনেছি?’
‘ওম্মা! কাণ্ড দেখো!! আমি কী করে বলব, কী এনেছ?’
‘আচ্ছা চোখ বন্ধ রাখো। আমি বললে তবেই খুলবে’।
‘আচ্ছা বাবা, তাই হবে।’
‘এবার চোখ মেলে তাকাও।’
‘ও মা, বাহ! কত সুন্দর চশমা!’
‘পছন্দ হয়েছে?’
‘হুম, বেশ পছন্দ হয়েছে।’
আলতাবানু আর ভাবতে পারে না। অবাধ্য চোখ থেকে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ে। ফেলে আসা দিনগুলো মনের কোঠরে জমা হয়। ইজি চেয়ারে বসে বাড়ির সদর দরজার দিকে চেয়ে থাকে আলতাবানু। এ বুঝি আবির ফিরে আসছে। এ বর্ণিল দৃশ্য দেখার লোভ হাতছাড়া করতে চায় না। চার যুগ ধরে এই প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে আলতাবানু। দিন-মাস গড়িয়ে বছরের পর বছর কেটে যায়। আবির ফিরে আসে না। আবারো নতুন করে আশায় বুক বাঁধে আলতাবানু। প্রিয়তম স্বামীকে জড়িয়ে ধরে আবেগে চুমু খেতে চায়। মাঝে মধ্যে সদর দরজা থেকে নজর চলে যায় বারান্দায় ঝুলানো ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে। সেখানে ডিসেম্বর মাসের পাতাটা সদ্য উল্টানো হয়েছে। আলতাবানু রুটিন করে প্রতিদিনের তারিখে লাল কালিতে গোল বৃত্ত এঁকে রাখে। ডিসেম্বর মাস এলে আলতাবানুর ব্যস্ততা বহুলাংশে বেড়ে যায়। এ মাসেই আবির তাকে ফিরে আসার কথা দিয়েছে। স্বামীর ব্যবহৃত সব কিছুই এখনো নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় পরম যতœ আর ভালোবাসায় রেখে দিয়েছে আলতাবানু। শার্ট-প্যান্ট ও গামছা থেকে শুরু করে সামান্য নেইল কাটার পর্যন্ত কোনো কিছুই বাদ যায়নি। আবির খুব ভালো বাঁশি বাজাতে পারত। নিশুত রজনীতে বাড়ির পাশে জারুলতলায় বাঁশি নিয়ে বসে যেত। তার বাঁশির মিষ্টি মধুর সুর রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে যেত। বাঁশি বাজাতে না পারলে সেদিন তার ভালো ঘুম হতো না। বিছানায় শুয়ে ছটফট করত। বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে আলতাবানু আবিরের প্রেমে পড়ে যায়। একজোড়া বাঁশি আজো ঘরের লকারে সযতেœ রেখে দিয়েছে আলতাবানু। একদিন গভীর রজনীতে আবির বাঁশি বাজাচ্ছিল জারুলতলায় বসে। সেই রাতে হঠাৎ করে দেশে যুদ্ধ বেধে যায়। বাঁশির সুর ছাপিয়ে চতুর্দিকে রাতের নির্জনতা রুক্ষ ও অশান্ত হয়ে ওঠে। মানুষের চিৎকার ও আর্তনাদধ্বনি পুরো পরিবেশকে ক্রমেই ভারী করে তোলে। পাক হানাদার বাহিনী এ দেশের নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় নিরস্ত্র মানুষের ওপর অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে। আলতাবানু দৌড়ে গিয়ে আবিরকে জড়িয়ে ধরে। রাতটা কোনো মতে পার করে ভয় আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। আবির কালক্ষেপণ না করে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখায়। চেনাজানা ১২-১৩ জন যুবক এরই মধ্যে তার সাথে যোগাযোগ করে। সবার চোখেমুখে দেশমাতৃকা রক্ষার দৃপ্ত শপথ উপচে পড়ছে। যুদ্ধে যাওয়ার আগের দিন আবির আলতাবানুকে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝায়। নিজের প্রতি ও আগত সন্তানকে দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। বাইরে পা ফেলার আগে আলতাবানুর হাতে গুঁজে দেয় ছোট্ট একখানা চিঠি। তারপর রাতের অন্ধকারে দ্রুত মিশে যায়। আলতাবানু পড়া শুরু করে ছোট্ট চিঠিখানাÑ
‘আলতাবানু
ভালোবাসা নিও।
তোমার মতো এ দেশকেও সমান ভালোবাসি। বাইরের শত্রুর কবলে আজ প্রিয় মাতৃভূমি রক্তাক্ত। এ অবস্থায় কাপুরুষের মতো ঘরে বসে থাকতে পারি না। তোমাকে পেতে হলে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। সুযোগ মতে, আমি তোমার সাথে দেখা করব। আমাদের অনাগত সন্তানের জন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সন্তানের নাম রাখবে স্বাধীন।
ইতি
তোমার আবির।’
আলতাবানু আর ভাবতে পারে না। ইদানীং ভাবনাচিন্তা বেশি দূর এগোয় না। মাথা ঝিম ধরে যায়। দাঁতমুখ খিঁচ মেরে ওঠে। একমাত্র ছেলে স্বাধীনের ডাকে তার ভাবনাচিন্তায় ছেদ পড়ে। স্বাধীন এখন অনেক বড় হয়েছে। ঠিক বাপের মতো হয়েছে ছেলেটা।
‘মা তুমি আবার কাঁদছ?’
‘কই বাবা; না তো।’
আলতাবানু চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করে। কিন্তু ছেলে ঠিকই বুঝতে পারে। এত বড় জোয়ানমর্দ ছেলেকে ফাঁকি দেয়া যায় না।
‘মা তুমি মিথ্যা বলো না। তোমার কিছু হলে আমি বাঁচব না।’
‘ছিঃ ছিঃ বাবা এমন কথা বলতে নেই। আমার কিচ্ছু হবে না।’
‘জানিস স্বাধীন, তোর বাবার সাথে যুদ্ধের প্রায় পুরোটা সময় আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।’
‘তাই নাকি মা?’
‘হুম।’
‘তারপর?’
‘বিশ্বাস কর বাপজান, ডিসেম্বরের ২ তারিখেও তোর বাবার সাথে দেখা হয়েছে। আমাকে বলেছে, আর মাত্র কয়েকটা দিন অপেক্ষা করো বানু। বিজয় দ্বারপ্রান্তে। একে একে সবাই ফিরে আসে। মানুষটি আর ফেরেনি। তাই আমার প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হয় না।’
ছোট শরীফপুর, সদর দক্ষিণ, কুমিল্লা

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫