ঢাকা, বুধবার,২৭ মে ২০২০

ইসলামী দিগন্ত

মুসলিম উম্মাহর বিপর্যয়

আবু হানিফ শাহরিয়ার

৩০ মার্চ ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

হজরত মুহাম্মদ সা: বলেন, যে বিষয় মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় তা হলো তাকওয়া এবং উত্তম ব্যবহার, আর যে বিষয় মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায় তা হলো জিহ্বা এবং লজ্জাস্থান (তিরমিজি)।
আমরা নিজেরা মুসিলম জাতি হিসেবে গর্ববোধ করি। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর মুসলিম জাতির কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে আমাদের মুসলমানিত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে মুসলিম উম্মাহ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। মুসলিম উম্মাহর এই বিপর্যয়, এর মূল কারণ হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সা:-এর সুন্নাহ ছেড়ে দিয়ে নিজেদের মনগড়া পন্থার অনুসরণ ও বিজাতির অনুকরণ। পরকালের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেয়া, দুনিয়ার লোভ-লালসা, আখিরাতের প্রতি উদাসীনতা ও সম্পদের মোহ, এসব ক্ষণস্থায়ী শান্তির জন্য মুসিলমরা কুরআন ও হাদিসকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, যার জন্য আজ আমাদের এই অবস্থা। এ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেন, ‘আর যে আমার কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সঙ্কীর্ণ করা হবে এবং আমি কিয়ামতের দিন তাকে অন্ধ করে উঠাব (সূরা ত্বহা ১২৪)।
তাই আমি বলি, অষষধয রং ঃযব এৎবধঃবংঃ. ও ধংশ অষষধয ভড়ৎ ভড়ৎমরাবহবংং. আমরা মুসিলমরা বিশ্বের বেশির ভাগের মালিক। বিশ্বের অধিকাংশ মূল্যবান সম্পদের মালিক মুসলিম বিশ্ব। বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ তেল সম্পদের মালিক মুসলিম বিশ্ব। বিশ্বের রাবার সম্পদের ৭০ শতাংশ পাটজাত দ্র্রব্যের ৭৫ শতাংশ এবং টিন সম্পদের ৪০ শতাংশ মালিকানা মুসিলমদের হাতে। এই এত সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। আমরা বারবার অমুসলিমদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছি। আমরা শুধু সম্পদের মালিক নামেমাত্র। কিন্তু এগুলো ভোগ করছে অমুসলিমরা। ওদের কাছে আমরা জিম্মি হয়ে রয়েছি। এটা শুধু আমাদের ব্যর্থতা।
বিপর্যয়ের মৌলিখ কারণগুলো
* অমুসলিমরা যখন কুরআন গবেষণা করে আশ্চর্যজনক সব আবিষ্কার করছে, তখন আমরা মুসিলমরা কুরআন-হাদিস চষে বেড়াচ্ছি বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজতে।
* ওরা যখন শান্তির নামে অশান্তি সৃষ্টিকারী মানব খুনি অং সান সু চির মতো নরপিশাচদের শান্তির জন্য নোবেল দিচ্ছে, তখন আমরা বিশ্ব মুসলিমদের মাঝে শান্তি স্থাপনের কাজে অগ্রগামী ভূমিকা পালনকারী বিশ্বনন্দিত নেতা এরদোগানকে তিরস্কার করে তাকে অপমানিত করছি।
* ওরা যখন কালজয়ী আলবার্ট আইনস্টাইন, কার্ল মার্কস তৈরি করছে, তখন আমরা ড. জাকির নায়েকের মতো ইসলামি স্কলারকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দেশত্যাগ করাচ্ছি।
* ওরা যখন সমাজ ধ্বংসকারী সিরিয়াল স্টার জলসা, জি-বাংলা তৈরি করছে তখন আমরা পিস টিভি, ইসলামিক টিভি বন্ধ করছি।
* ওরা যখন গবেষণায় ব্যস্ত সময় পার করছে, তখন আমরা সমাজ ধ্বংসকারী সিরিয়াল ও সময় অপচয়কারী খেলা দেখা নিয়ে ব্যস্ত।
* ওরা যখন নিজেদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপনে ব্যস্ত, তখন আমরা মাজহাব নিয়ে নিজেদের মধ্যে ফেতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টিতে মত্ত।
আজ আমরা মুসলিমরা এত অবহেলিত এত নির্যাতিত যে, আমাদের ভুলের জন্য আমাদের এই অবস্থা। স্বগত উচ্চারণ করতে ইচ্ছে হয়, ‘তুমি কি দেখ না আরাকানের কান্না, দেখ না বসনিয়া, ফিলিস্তিন, কাশ্মিরের কান্না? তবুও কি তোমাদের ঘুম ভাঙবে না। হে মুসলিম ওঠো জেগে ওঠো। যাও তাদের সাহায্য করো, মুসলিম জাতিকে হেফাজত করো।’
এ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেন, ‘তোমাদের কী হয়েছে, কেন তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করছ না’ (সূরা আসসফফাত ২৫)
এ সম্পর্কে হাদিসে রাসূল সা: বলেছেন, ইবনে উমার রা: হাদিসটি বর্ণনা করেন। তিনি রাসূল সা:কে বলতে শুনেছেন, পাঁচটি কাজ আছে যাতে লিপ্ত হলে শান্তি তোমাদের গ্রাস করবে।
* যখন কোনো জাতির মাঝে অশ্লীলতা ব্যাপকভাবে প্রকাশ পাবে তখন সে জাতির মধ্যে এমন রোগ দেখা দেবে যা তাদের পূর্বপুরুষের মধ্যে ছিল না।
* যে জাতি মাপে কম দেবে সে জাতি দুর্ভিক্ষ এবং খাদ্য সঙ্কটে পড়বে ও শাসকগোষ্ঠীর কাছে অত্যাচারের শিকার হবে।
* যে জাতি জাকাত দেয়া বন্দ করে দেবে সে জাতির জন্য বৃষ্টি বন্ধ করে দেয়া হবে, যদি অন্য প্রাণিকুল না থাকে তাহলে তাদের আদৌ বৃষ্টি দেয়া হতো না।
* যে জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে সে জাতির ওপর তাদের বিজাতীয় শত্রু দলকে ক্ষমতাসীন করা হবে, যারা তাদের বহু সম্পদ নিজেদের করে নেবে।
* যে জাতির শাসকগোষ্ঠী যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী দেশ শাসন না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তাদের মাঝে সন্ত্রাসী-গৃহযুদ্ধ স্থায়ী রাখবেন (বায়হাকি ও ইবনে মাজাহ)।
আমরা জানি, মিয়ানমারের আরাকান হলো মুসলিমদের রাজ্য। তবে দুঃস্বপ্নময় ভয়াবহ অঞ্চল এখন আরাকান। মিয়ানমারের ‘রাখাইন স্টেট’ নামের এ রাজ্যে মুসলমানদের জীবন আজ মগ বৌদ্ধ, সেনাবাহিনী এবং গণতন্ত্রের নতুন ফেরিওয়ালা অং সান সু চির হাতের মুঠোয় বন্ধী। মানুষের মাংসে বারবিকিউ বানানো কিংবা নোংরা যৌন লালসা চরিতার্থ করার জন্য এখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ আরাকানি জোয়ানদের মারণস্থল রোহিঙ্গা মুসলমানদের পিতৃভূমি। এ অঞ্চলটি আজ ইতিহাসের এক জঘন্যতম মৃত্যুপুরী।
হে মুসলিম জাতি, তোমরা কি আজ ঘুমন্ত?
অথচ তোমরাই তো ছিলে দুরন্ত!
আজ তোমাদের মাঝে নেই কেন ঐক্য?
অথচ তোমরাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে করেছ বহু যুদ্ধ!
কত কাল বলো ঘুমাবে হে মুসলিম সমাজ
রাসূল-সাহাবিদের কি এই ছিল কাজ!!!
তাই মুসলিম জাতির এই বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে হলে আল্লাহর কাছে নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে হবে। আল্লাহ কুরআনে বলেন, ঙঁৎ খড়ৎফ! এরাব ঁং রহ ঃযরং ড়িঁষফ ঃযধঃ যিরপয রং মড়ড়ফ ধহফ রহ ঃযব ঐবৎবধভঃবৎ ঃযধঃ যিরপয রং মড়ড়ফ, ধহফ ংধাব ঁং ভৎড়স ঃযব ঃড়ৎসবহঃ ড়ভ ভরৎব! (২ : ২০১)
অর্থাৎ, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কন্যাণ দাও এবং আখিরাতে কল্যাণ দাও এবং আমাদিগকে অগ্নির শাস্তি থেকে রক্ষা করো। (সূরা বাকারা ২৫০)।
হে মাবুদ আমি স্বীকৃতি দিচ্ছি আমি গুনাহগার। হে মাবুদ আপনি আমাকে শাস্তি দেবেন না। আমি আমার সব কৃতকর্মের জন্য নিজেকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করছি। তাই আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আপনি গোটা মুসলিম উম্মাহকে ক্ষমা করুন।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫