ঢাকা, রবিবার,৩১ মে ২০২০

থেরাপি

প্রেম অথবা একজোড়া কানের দুল

জোবায়ের রাজু

১৯ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

প্রেম ভালোবাসাÑ একদা এ দুটি জিনিসের বিপরীতে অবস্থান ছিল আমার। যারা দিব্যি প্রেম করে বেড়াত, তাদেরকে আমার সহ্য হতো না। কিন্তু সেই আমি হঠাৎ বদলে গেলাম। বদলে যাওয়ার কারণ নিলু।
নিলু। এই গ্রামের আলতাফ আলীর মেয়ে। শহুরে জীবনের ইতি টেনে ওরা গ্রামে স্থায়ী হয়েছে। ট্রাকভর্তি আসবাবপত্র নিয়ে ওরা গ্রামে এলো যেদিন, সেই দুপুরবেলা নিলুকে দেখে আমার তো মনের ভেতর পদ্মা মেঘনা যমুনার উথাল ঢেউ। এ ঢেউয়ের নাম প্রেম, এ আবেগের নাম ভালোবাসা। আমার ভেতরে বিন্দু বিন্দু জমতে শুরু করে প্রেম-ভালোবাসা।
দিনে দিনে জানলাম আলতাফ আলী আর আমার বাবা স্কুলজীবনের কাছের বন্ধু ছিলেন। শুধু বন্ধু নয়, জবর বন্ধু। গলায় গলায় ভাব যাকে বলে। আশির দশকে আলতাফ আলীরা সপরিবারে শহরবাসী হয়ে যায়।
সেই বাল্যবন্ধুকে আবার এত বছর পর পেয়ে আলতাফ আলী আর আমার বাবার মাঝে যে আনন্দের বন্যা, তা দেখার মতো। খুব অল্প দিনে দুই পরিবারে দারুণ বন্ধন গড়ে ওঠে। একই পাড়ার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে দুই পরিবারের সদস্যরা সকাল-সন্ধ্যা দুই পরিবারে আসা-যাওয়া করতে থাকে। এরই মধ্যে আমার ছোট বোন শ্যামা আর নিলুর মাঝে দারুণ ভাব দেখা যায়। হঠাৎ হঠাৎ শ্যামাটা উধাও। তার হদিস পাওয়া যায় না। পরে জানা যায় শ্যামা নিলুদের বাড়ি। নিলুও বেলা-অবেলায় আমাদের বাড়ি হাজির। আমি আড়াল আবডাল থেকে তাকে দেখি। ভালোবাসার কথাটি তাকে বলার সুযোগ খুঁজি। সুযোগ পাই না।
একদিন নিলু আমাকে ডেকে বলল, ‘এত উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার দরকার কী, আমার সাথে ফেসবুকে অ্যাড হও। সেখানে অনেক ছবি আছে আমার।’
ব্যস, সেদিনই নিলু আর আমি ফেসবুক ফ্রেন্ড হয়ে গেলাম। রোজ রাতে বালিশে মাথা গুঁজে দিয়ে নিলুর প্রোফাইলগুলো দেখি। আহা, কী রূপের মাধুর্য। যেন ডানাকাটা পরী।
এই ডানাকাটা পরীর রূপ লাবণ্যের সাগরে দিন দিন আমি তলিয়ে যাই। খুব ইচ্ছে করে সামনে দাঁড়িয়ে সাহসী গলায় বলিÑ এই মন তোমাকে দিলাম। কিন্তু বলা হয় না। যদি ফিরিয়ে দেয়। মনে এই সংশয়।
বন্ধু আকরামকে বিষয়টি খুলে বললাম। অভয় দিয়ে আকরাম বলল ‘বলতে এত দ্বিধা হলে আস্তে আস্তে গিফট পাঠা। আরো কোজ হয়ে উঠ। তারপর সময় বুঝে নিজেকে তার সামনে তুলে ধর।’
আকরামের বুদ্ধি পছন্দ হলো। গিফট পাঠানোর আইডিয়াটি মন্দ নয়। গিফট দিয়ে দিয়ে তার দিল নরম করে ফেলতে হবে। তারপর একদিন ঝোঁক বুঝে কোপ মারব। কিন্তু কী গিফট দেয়া যায়!
শ্যামার ঘরে এসে দেখি টেবিলের ওপর একজোড়া সুন্দর কানের দুল পড়ে আছে। শ্যামাটা এমনিতেই প্রসাধনপ্রিয় মেয়ে। নিশ্চয়ই মার্কেট থেকে এ দুলজোড়া কিনে এনেছে। দুলজোড়া আসলেই সুন্দর। নিলুকে মানাবে বেশ। আচ্ছা এই দুলজোড়া সরিয়ে ফেললে কেমন হয়! হ্যাঁ, তাই করতে হবে। নিলুকে এই দুলজোড়া গিফট করব। প্রথম গিফট। তারপর আস্তে আস্তে গিফটের সংখ্যা বাড়বে। শ্যামা এখন বাড়ি নেই। স্কুলে গেছে। যা করার এখনই করতে হবে।
আমার ঘরে নিয়ে এলাম দুলজোড়া। ড্রয়ারে রেখে দিলাম। নিলু এ বাড়ি এলে ওকে গিফট করব। ওমা! নিলুর কথা ভাবতে-না-ভাবতেই সে হাজির।
Ñরঞ্জু, কেমন আছো? কী করছ?
Ñকিছু না। তোমার জন্য একটি জিনিস গিফট এনেছি।
Ñকী?
ড্রয়ার খুলে দুলজোড়া নিলুকে দিলাম। গিফট পেয়ে নিলু প্রথমে কী যেন ভাবল, তারপর এত খুশি হবে আমি ভাবিনি। সামান্য একজোড়া কানের দুলে যে মেয়ে এত খুশি, সে তো ভবিষ্যতে আরো দামি গিফট দেখে আরো খুশি হবে। হ্যাঁ, নিলুকে আরো দামি গিফট দিয়ে আরো খুশি করতে হবে।

২.
বিকেল বেলা ফেসবুকে নক করলাম নিলুকে।
Ñকানের দুলজোড়া কেমন লেগেছে?
Ñহাঁ হাঁ হাঁ।
Ñহাসছ কেন?
Ñহাঁ হাঁ হাঁ।
Ñআবার হাসছ! বলো দুলজোড়া কেমন?
Ñরাত বারোটায় বলব।
Ñআচ্ছা।
আমি রাত বারোটার অপেক্ষায় জেগে থাকি নিলু দুলজোড়া সম্পর্কে কী মতামত জানায়, তা জানতে। এখন রাত দশটা। বারোটার আরো দুই ঘণ্টা বাকি। এই দীর্ঘ সময়ে নিলুর ফেসবুকে সময় কাটাব। ওর সুন্দর ছবিগুলো ভালো লাগে। আজ এত অসহ্য গরম। জানালা খুলে দিলাম। হু হু বাতাস এসে সারাঘর ভরে গেল।
আমার শোবার খাট জানালার পাশে। খাটে শুয়ে আমি নিলুর মেসেজের অপেক্ষায়। আহারে, কখন বাজবে বারোটা! শীতল হাওয়া খেতে খেতে আর নিলুর ছবি দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম, টের পেলাম না।
ঘুম ভাঙল সকালে। ঘুম ভাঙতেই মনে হলো নিলুর মেসেজের কথা। দুলজোড়া পেয়ে খুশি হয়ে কী মেসেজ লিখেছে, সেটা জানতে মোবাইলটার দরকার পড়ল। কিন্তু মোবাইল কই? কোথাও মোবাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক তল্লাশির পর বুঝতে বাকি রইল না যে কাল রাতে জানালা খোলা পেয়ে চোরবাবু ঘুমন্ত আমার বুকে পড়ে থাকা মোবাইলখানা নিয়ে ভেগেছে। ইদানীং আমাদের বাড়িতে চোরের উৎপাত। সেদিন রাতে খোঁয়াড়ের সব মোরগ গায়েব হয়েছে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে আমি ব্যাকুল হয়ে উঠি নিলুর মেসেজ পড়তে। রাত বারোটায় সে কী মেসেজ লিখেছে জানি না। নিশ্চয়ই লিখেছে, ‘রঞ্জু, কী দরকার ছিল শুধু শুধু এত দামি কানের দুল দেয়ার’। অথবা ‘আমি জীবনেও এত সুন্দর কানের দুল দেখিনি’ টাইপের কোনো মেসেজ। যা-ই হোক, যা-ই লিখেছে পড়তে হবে। মোবাইল তো চোরে নিয়েছে, তাতে কী! আকরামের কাছে যেতে হবে। ওর মোবাইলে আমার ফেসবুক আইডি লগ-ইন করতে হবে।

৩.
মোবাইল চাইতেই আকরাম সবিনয়ে দিয়ে দিলো। লগ-ইন করে মেসেজ অপশন চেক করে দেখি রাত বারোটায় নিলুর মেসেজ। সে লিখেছেÑ‘রঞ্জু, অনেক ধন্যবাদ কানের দুলজোড়া আমাকে দেয়াতে। জানো, দুলজোড়া যে আমারই। তোমাদের শ্যামা আমার রুম থেকে এই দুলজোড়া চুরি করতে আমি আড়াল থেকে দেখে যাই। ওকে হাতেনাতে ধরতে পারতাম। ও বাচ্চা মানুষ, তাই লজ্জা দিতে চাইনি। লাখ টাকা তো চুরি করেনি, সামান্য একজোড়া দুল। এই দুলজোড়া আমাকে কে দিয়েছে জানো? ঢাকায় থাকতে ইমন দিয়েছে। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি। রোজ রাতে ইমনের সাথে ফোনে কথা বলি। গ্রামে এসে ওকে বেশ মিস করছি। তা তুমি কী মনে করে আমাকে হুট করে গিফট দিয়েছ, তা-ও চুরি হয়ে যাওয়া আমারই দুল। শ্যামা জানে?’
নিলুর মেসেজ পড়ে আমার নার্ভাসনেস ক্রমশ বাড়তে লাগল। এ কী মেসেজ লিখেছে নিলু! কানের দুলজোড়া ওর? শ্যামা চুরি করেছে, এটা আগে জানলে নিলুকে এই দুল গিফট করতাম না। ষ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫