ঢাকা, সোমবার,২৫ মে ২০২০

থেরাপি

ট্রিট ভাগ্য

তারেকুর রহমান

১৯ এপ্রিল ২০১৮,বৃহস্পতিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

বেশ ছোটখাটো গড়নের ছেলে রুহুল আমিন। সে আমার কলিগ। আমরা তাকে রুহুল বলি। নাম ধরে ডাক দিতেই রুহুল বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলবে, আমার নাম রুহুল না। আমার নাম রুহুল আমিন।
আমরা গলা খেঁকিয়ে বলি, ও আচ্ছা রুহুল আমিন। এ কথা বলেই মিটিমিটি হাসি। রুহুল খুব ভালো করেই বোঝে আমরা তাকে নিয়ে মজা করি। রুহুল আবার প্রেমের ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস। এ পর্যন্ত যে ক’টি প্রেম করেছে সবই নাকি সিরিয়াসলি করেছে। প্রতিটা ব্রেকআপই রুহুলের কলিজা ভেঙে দুমড়ে-মুছড়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু এতেও সে ান্ত হয়নি। কিছু দিন পরই আবার নতুন করে কারো প্রেমে পড়েছে। রুহুল কখন প্রেমে পড়ে আবার কখন ব্রেকআপ করে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই।
নতুন করে প্রেমে পড়েছে রুহুল। ইদানীং তার কাছে ঘেঁষা বেশ মুশকিল হয়ে পড়েছে। প্রায়ই অফিসের বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসে। বিড়বিড় করে কী যেন বলে। আবার উশকো-খুশকো চুলগুলো পরিপাটি করতে বেশ ব্যস্ত হয়ে ওঠে। আমরা তার পরিবর্তন দেখে হাসি। সে হাসিতে রুহুলও শরিক হয়। কথা বলার তেমন সময় পায় না সে। ব্রেকিং নিউজের মতো কিছুণ পরপর কল আসে রুহুলের মোবাইলে। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই এক গাল হেসে বারান্দায় চলে যায়। এরপর হাত, পা, মাথা নাড়িয়ে কথা চলে। গ্লাসের ফাঁক গলে সেই হাসি আমাদেরও ছুঁয়ে যায়।
কয়েক দিন পর রুহুল আমিনকে দেখে বেশ বিষণœ মনে হলো। বুঝলাম প্রেমিকার সাথে ব্রেকআপ হয়ে গেছে। আমরাও তার দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি। পাশে গিয়ে তাকে উৎসাহ দিই। নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে বলি। মুখ কালো করে রুহুল বলেÑ না, আর প্রেম করুম না। ফাইনালি ব্রেকআপ নিয়েই নিয়েছি।
রুহুলের এই কথা অফিসের আকাশে-বাতাসে ভাসতে লাগল। সপ্তাহখানেক পর রুহুল আবার তার আগের প্রেমিকার সাথে পূর্ণোদ্যমে ডেটিং শুরু করে। রুহুল এ পর্যন্ত অসংখ্যবার ব্রেকিংয়ের প্রতিজ্ঞা করেও আজ পর্যন্ত করতে পারেনি। রুহুল এক গাল হেসে বলে, অপো করেন একবার ঠিকই ব্রেকআপ হয়ে যাবে।
দিন যায় রুহুলের প্রেমও বেশিদিন টেকে না। আবার ব্রেকআপও বেশিদিন টেকে না। সে নতুন করেই আগের প্রেমিকার সাথে প্রেম রিনিউ করে। আমরা তার নাম দিয়েছি ব্রেকআপ রুহুল। রুহুল ঘোষণা দিয়েছিল ফাইনালি ব্রেকআপ করলেই আমাদের ট্রিট দেবে। আমরা তার ট্রিটের অপোয় থাকি। কিন্তু দুর্ভাগ্য রুহুলের ফাইনালি ব্রেকআপও হয় নাই আর ট্রিটও আমাদের ভাগ্যে জোটেনি।

২.
রুহুল আলটিমেটাম দিয়েছে যে করেই হোক একটা স্মার্টফোন কিনবে। এখন আর সেকেলে মোবাইলে চলে না। নতুন নতুন মডেলের মোবাইল দেখতে প্রায়ই দোকানে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আসে। পত্রিকায় মোবাইলের বিজ্ঞাপন দেখলেই সেটি কেটে সংগ্রহ করে রাখা এখন রুহুলের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কারো হাতে মোবাইল দেখলেই সেটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে ভালো করে দেখে দাম জিজ্ঞেস না করলে রুহুলের খাবার হজমে সমস্যা হয়। অফিসের সবাইকে বলে বেড়িয়েছে, শোনেন এবার আপনাদের একটা ট্রিট দেবো। কিসের ট্রিট এ প্রশ্ন করার আগেই রুহুল মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে, শোনেন সেই মাপের একটা স্মার্টফোন কিনতেছি। আর ফোন কেনা মানেই আপনাদের ট্রিট দেয়া। দিন যায় মাস যায় রুহুলের আর মোবাইল কেনা হয় না। আমাদেরও আর ট্রিট দেয়া হয় না। আমরা তার নতুন নাম দিয়েছিলাম মিস্টার ট্রিট। অবশ্য এ কথা শুনলে রুহুল বেশ বিরক্তি নিয়ে বলত, এ রকম করলে কিন্তু ট্রিট দিমু না। আমরা মনে মনে হাসি তোমার ট্রিট আর আমাদের কপালে নাই।
আবহাওয়ার মতো রুহুলের ইচ্ছারও পরিবর্তন দেখা দেয়। হঠাৎ করে মোবাইল কেনার ইচ্ছে হচ্ছে না তার। তার ইচ্ছে হোন্ডা কিনবে। এইবার শুধু কথা না কাজেও দেখিয়ে ছাড়বে বলে প্রত্যয় করল। সারা দিন নেটে বসে বসে হোন্ডা দেখছে রুহুল। কোন কালারের হোন্ডার সাথে তাকে মানানসই লাগবে সেটি দেখতে লাগল। অফিসের আশপাশে কোথাও হোন্ডা দেখলেই টুপ করে উঠে বসে থাকে। ইতোমধ্যে হোন্ডা কেনার টাকা অনেকটা ম্যানেজ হয়ে গেছে। হঠাৎ মনে হলো, আরে রুহুল তো হোন্ডা চালাতেই জানে না। যা হোক, কয়েক দিন এক কলিগের হোন্ডা দিয়ে প্র্যাকটিস করা হয়ে গেছে। কিছু দিন পর বেশ হাঁকডাক দিয়ে হোন্ডা কিনে আনা হলো। হোন্ডা কেনার পর আমাদের ট্রিট দেয়ার মনস্থির করা হলো। রুহুল হোন্ডা নিয়ে ভোঁ করে চলল কিছু আনার জন্য। আমরা সবাই অপোয় আছি রুহুল কী ট্রিট দেয় তা দেখার জন্য। কিছুণ পর লোকজনের চেঁচামেচি শুনতে পেলাম। তাড়াতাড়ি করে অফিসের করিডোরে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখি রুহুল ফেরার সময় অফিসের পাশের ডোবায় নতুন হোন্ডাসহ পড়ে গেছে। তার সারা গায়ে কাদা লেগে আছে। হোন্ডার অবস্থাও খারাপ। বেচারার অবস্থা দেখে আমরা ট্রিটের কথা ভুলে যাই। এতদিন অপো করেও রুহুলের ট্রিট আমাদের ভাগ্যে জুটল না। শেষ পর্যন্ত বুঝলাম আমাদের ট্রিট ভাগ্য ভালো না। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫