ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৮ মে ২০২০

মতামত

‘বাজিকরের’ হাতে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ

এ কে এম এনামুল হক

২৪ এপ্রিল ২০১৮,মঙ্গলবার, ১৬:২২


প্রিন্ট
দেশে এক ধরনের দ্বৈতশাসন চলছে। তা হলো, পুলিশি শাসন এবং শাসকগোষ্ঠীর ক্যাডারদের শাসন।

দেশে এক ধরনের দ্বৈতশাসন চলছে। তা হলো, পুলিশি শাসন এবং শাসকগোষ্ঠীর ক্যাডারদের শাসন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মরহুম তাজউদ্দীন আহমদ প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উল্লেখ করেছিলেন, তা ছিল তিনটি। ০১. সাম্য; ০২. মানবতা ও ০৩. ন্যায়বিচার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান বা শাসনতন্ত্রে চারটি মূলনীতি সংযোজিত হয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি পরবর্তীকালে ক্রমান্বয়ে সে ঘোষিত মূলনীতিগুলো পরিত্যাগে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কারণ সে সময় শাসকগোষ্ঠীর মাঝে একজনকে শুধু মহিমান্বিত করার ম্যানিয়ায় ভুগতে দেখা গেল। তাই দেখা যায়, তখনকার রাজনীতিতে নতুন ও বিশেষ স্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে। যেমন- এক নেতা এক দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, বিশ্ব এলো নতুন বাদ ‘মুজিববাদ’ ইত্যাদি। এসবের কারণ ছিল শুধু একজনকে মহিমান্বিত করে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং দেশে এক ব্যক্তির শাসনের প্রচলন। স্বাধীনতার সব কৃতিত্ব একটি দল কুক্ষিগত করতে প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ফলে দেশে ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু এবং একজনকে সব ক্ষমতার অধিকারী করে বাকশাল প্রচলন করা হয়।

যার জন্য এত কিছু করা হলো, এমনকি দীর্ঘদিনের লালিত সব চেতনা ও মূলনীতিকে পরিত্যাগ করা হলো, তিনি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রধান নেতা হওয়া সম্বন্ধে কারো দ্বিমত ছিল না। কিন্তু শুধু একটি পরিবারকে সবকিছু অর্জনের কৃতিত্ব দেয়া দৃষ্টিকটু নয় কি?

দীর্ঘ দিন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি এখন দেশের ক্ষমতায় আসীন। বাস্তবে তারা দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এবং জাতীর চার মূলনীতিকে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মঞ্চ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে জনগণ মনে করে। অথচ বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে গণতন্ত্র জড়িত। দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে সামরিক জান্তাদের সাথে হাত মিলিয়েছে।

দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যায়- জেনারেল এরশাদ যখন ১৯৮২ সালে ক্যু-এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করলেন, তখন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তা মেনে নিয়েছেন সাংবাদিকদের একথা বলে- ‘I am not unhappy.’ এরশাদবিরোধী তিন জোট একপর্যায়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে এরশাদ ১৯৮৬ সালে তার শাসনের বৈধতা অর্জনের জন্য সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। তখন চট্টগ্রামে শেখ হাসিনা এ সংসদ নির্বাচনে যোগদানকারীদের জাতীয় বেঈমান ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ঢাকায় এসে কোনো এক ‘জাদুর কাঠি’র ছোঁয়ায় তিনি জামায়াতে ইসলামীসহ নির্বাচনে অংশ নিয়ে একই অভিযোগে নিজেরা অভিযুক্ত হলেন। তার রহস্য কী? একমাত্র তিনিই তা জানেন। এ ছাড়া ২০০৭ সালের প্রথমে যখন মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই সরকারকে ‘তার আন্দোলনের ফসল’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে তিনি বৈধতা দেবেন বলে অঙ্গীকার করেন। তা তিনি পালনও করেছেন। অথচ ওই সরকার তাকে স্লো পয়জনিং করেছিল বলে তারা অভিযোগ করেছেন। এতসব কর্মকাণ্ডের পুরস্কারও আওয়ামী লীগ হাতে হাতে পেয়েছে ২০১৪ সালের নির্বাচনে। বিপুল ও অদ্ভুত বিজয়। ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী।

১৯৯১ সালে প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিএনপি বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে মাগুরা উপনির্বাচনে কারচুপি হয়েছে দাবি করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি ওঠে। ১৭৩ দিন সহিংস হরতালের পর বিএনপি তা মেনে নেয় এবং সংবিধান সংশোধন করে ’৯৬ সালে নির্বাচন দেয়া হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে শাসনভার গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু গডফাদার সৃষ্টি ও ত্রাস সৃষ্টি করে পরিস্থিতি নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে আসতে প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু ২০০১-এ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় তাদের এ কৌশল সফল হয়নি। তাই ২০০৮ সালের নির্বাচনে শাসকগোষ্ঠীর সহায়তায় বিপুল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছে। নানা কূটকৌশলে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচনের কলকাঠি সম্পূর্ণরূপে কব্জায় নিয়ে নেয় তাদের নৃতৃত্বে পরিচালিত সরকার। তাই এখন বলছে- সংবধিান মাফিক নির্বাচন হবে। আত্মবিশ্বাসী হয়ে তাই মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলছেন- ‘জনগণের রায় আওয়ামী লীগ পেয়ে গেছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করতে নির্বাচন।’ কী চমৎকার কথা!

ক্ষমতাসীন নেতাদের দাবি, তারাই হলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী এবং সংবিধানের চার মূলনীতির রক্ষাকারী মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি। যদিও তারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল, কিন্তু পরে তাদের সুবিধাবাদী চরিত্রের দরুণ কখন সে সব চেতনা ও মূলনীতিগুলো হারিয়ে গেছে তা সম্ভবত তাদের উপলব্ধির বাইরে। দেশের মানুষে মানুষে সাম্য, মানবতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার সবাইকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বর্তমানে শাসকগোষ্ঠী বেমালুম হজম করে ফেলেছে। সাম্যের নামে দেশে অসাম্য বা বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে; তা অবিশ্বাস্য। দেশের কিছুসংখ্যক মানুষের আয় যখন মাসে কয়েক লাখ টাকা, তখন দেশের বেশির ভাগ মানুষের আয় সাত-আট হাজার টাকার তলানীতে ঠেকেছে। অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিভিন্নভাবে লোপাট হয়ে গেছে। লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। কোনো প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই। সব ব্যাপারে অনুসন্ধানের প্রতিবেদন জনগণকে না জানিয়ে বাক্সবন্দী। অর্থমন্ত্রী কখনো বলেন, চার হাজার কোটি টাকা লোপাট, তাতে কী হয়েছে; এ তো যৎসামান্য। আবার বলেন, পুকুর চুরি কোথায়, এ যে সাগর চুরি। আরো বলেছেন, অমুক তো ব্যাংকটিকে খেয়ে ফেলেছে।

শোনা যায়, ৯টি ব্যাংকের নাকি মূলধনের ঘাটতি দেখা হয়েছে। গরিব-দুঃখীদের কঠোর শ্রমে ও অর্থায়নে সে কৃষক বা গার্মেন্টস কর্মী বা অভিবাসী যেই হোক না কেন, তাদের ঘাম ঝরা পরিশ্রমেই এখন পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতি সচল। আন্তর্জাতিক মহল দেশটিকে উন্নয়নশীল দেশের দোরগোড়ায় প্রথম পদক্ষেপ রাখার স্বীকৃতি দিয়েছে। এটা নিয়ে সরকারি দলের সে কী হইচই ও উল্লাস, যেন এসব কিছু তাদের একার অর্জন এবং অন্য কারো এতে কোনো প্রকার অবদান নেই। আসলে দেশের এ উন্নতি সবার সম্মিলিত প্রয়াসে ধারাবাহিকতার জন্য হয়েছে।

দেশের মানুষ যেভাবে হত্যাযজ্ঞ, বন্দুকযুদ্ধ, গুম, খুন, পুলিশি নির্যাতন, ধর্ষণের শিকার, তাতে মানবতাবোধের ও ন্যায়বিচারের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। দেশে আবার সুকৌশলে বাকশালী শাসনব্যবস্থা কায়েমের জন্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো যেভাবে এককেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তার প্রতিক্রিয়ায় বহির্বিশ্বের কোনো কোনো মহল এ দেশকে শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি ‘স্বৈরাচারী’ রাষ্ট্রের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এদিকে ঘুষ, দুর্নীতি, অপশাসন, নকলবাজি ও প্রশ্ন ফাঁসের কারণে শিক্ষাব্যবস্থার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এ জন্য মন্ত্রীও বলতে বাধ্য হয়েছেন, ঘুষ খাও কিন্তু রয়ে-সয়ে। মোটকথা, ‘জাতির মেরুদণ্ড’ ভেঙে যাওয়ার পথে।

দেশে এক ধরনের দ্বৈতশাসন চলছে। তা হলো, পুলিশি শাসন এবং শাসকগোষ্ঠীর ক্যাডারদের শাসন। এরকম একটি অবস্থার কারণে এ দেশে ১৭৭০ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা এক ভয়াবহ দুর্যোগের সৃষ্টি করেছিল। আমরা দ্বৈতশাসনের কারণে যেন আরেক বিপর্যয়ের সম্মুখীন না হই।

লেখক : স্কোয়ার্ডন লিডার (অব:), বাংলাদেশ বিমানবাহিনী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫